ইসলাম কি রাজনীতির খুঁটি নাটি নির্দিষ্ট করে দেয়?

ড: আহমাদ বিন সা’দ হামদান আল-গামিদী (র) উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘আকীদা ডিপার্টমেন্টের উচ্চতর শিক্ষার সাবেক অধ্যাপক, তার ইসলামি রাজনীতির ওপর লেখা বই “তাজদীদুল-ফিক্‌হিস-সিয়াসী ফী-ল-মুজতামা’ই-ল-ইসলামী” -এ দশটি রাজনৈতিক বাস্তবতার (‘আশার হাকাইক) কথা উল্লেখ করেছেন। এগুলো অনুবাদ করেছেন বাংলাদেশের তরুন আলেমে দ্বীন ও অত্যন্ত প্রাঞ্জলভাষী ও প্রজ্ঞাপূর্ন লেখক আসিফ সিবগাত ভূঞা। আলোচ্য শিরোনামের জবাবে এই অংশটুকু তুলে দেওয়া হল।

প্রথমত: উম্মতের জন্য একজন রাষ্ট্রপতি বা নেতা নিয়োগ করার ব্যাপারটি বা আরও একটু খুলে বললে একজন রাষ্ট্রপতির বৈশিষ্ট্য কেমন হবে, কীভাবে তাকে নিয়োগ করা হবে বা এর বিস্তারিত বর্ণনা কুরআন বা হাদীসে আসেনি। এ থেকে বোঝা যায় যে ব্যাপারটিতে আল্লাহ বা তার রাসূল (সা:) কোনও বিধান দেননি অর্থাৎ ব্যাপারটি দ্বীনের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার নয় বা ধর্মীয় ব্যাপার নয়। এটি একটি পার্থিব ব্যাপার। যদি এটি ধর্মীয় বা দ্বীনি ব্যাপার হতো তাহলে আমাদের রব্ব এবং তার রাসূল (সা:) সেটাকে উল্লেখ করতেন যেমনটি আল্লাহ্‌ কুরআনে বলেছেন: “আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করলাম ও তোমাদের ওপর আমার অনুগ্রহকে সম্পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের জন্য ইসলামকে দ্বীন হিসেবে গ্রহণ করলাম”। [আল-মাইদাহ্‌: ৩]

দ্বিতীয়ত: কুরআন এবং হাদীসে সুবিচারের ব্যাপারে আদেশ এবং অত্যাচারের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এটি একটি সাধারণ সিদ্ধান্ত যা প্রতিটি কর্তৃপক্ষকে বা যার নিয়ম-কানুন তৈরির সাথে সম্পর্ক আছে তাকে বা মিমাংসার কাজে নিয়োজিত কোনও ব্যক্তিকে বাস্তবায়ন করতে হবে।

তবে কুরআন এবং হাদীসে এটা মোটেও উল্লেখ করা নেই যে সুবিচার কোন পদ্ধতিতে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। বরং ব্যাপারটি মানুষের রীতি-নীতি ও বিবেচনার ওপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে। অথবা তারা তাদের জীবনে যে মাধ্যম বা উপায় খুঁজে পায় এটি বাস্তবায়নে তার ওপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে। অতএব যে কোনও পদ্ধতি বা মাধ্যমে সুবিচার প্রতিষ্ঠিত হলে সেটাই আল্লার বিধান। এটাই এই দ্বীনের পরিপূর্ণতার পরিচায়ক যে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু আমাদের জানাচ্ছেন যে পদ্ধতি এবং মাধ্যম নির্ধারিত বা নির্দিষ্ট নয়, বরং মানুষের জন্য সেই পথ বেছে নিতে দেয়া হয়েছে যা সেই যুগের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রযোজ্য।

তৃতীয়ত: কুরআন এবং হাদীসে পরামর্শ (আশ-শূরা) করাকে একটি মূলনীতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে সেই সব বিষয়ে যেখানে কুরআন বা হাদীসে স্পষ্ট কোনও নির্দেশ মিলছে না। এটা একটি সাধারণ মূলনীতি যা যে কোনও দলীয় বা সামষ্টিক বিষয়ে প্রযোজ্য হবে।

এবং শূরা-র জন্য কোনও নির্দিষ্ট পদ্ধতি বা মাধ্যমও নির্ধারণ করে দেয়া হয়নি। বরং এটি পরামর্শকের জন্য ছেড়ে দেয়া হয়েছে, তিনিই দেখবেন কোন পদ্ধতিতে শুরা-র কাজ করলে শরী’আর লক্ষ্য অর্জিত হবে।

চতুর্থত: রাষ্ট্র পরিচালনা সংক্রান্ত কাজে সাহাবীদের কর্ম হচ্ছে নৈমিত্তিক কাজের মতো, এগুলো দ্বীনি কাজ নয় বা প্রচলিত অর্থ ‘ইবাদাত নয়। ফলে এর অবস্থান হচ্ছে যে এটি মুবাহ (বৈধ) কিন্তু একে আইনের পর্যায়ে নিয়ে ফেলা যাবে না। কেননা তাশরী’ বা দ্বীনের বিধান তৈরি করা সৃষ্টিকর্তার আওতাধীন এবং বিধান তৈরিতে তিনি তার রাসূলকে (সা:) কেবল অনুমতি দিয়েছেন কিন্তু আর কাউকে নয়।

সুতরাং যে দাবী করবে যে আল্লাহ্‌র রাসূল (সা:) ব্যতীত আর কারও কথাকে ধর্মের বিধান হিসেবে মানা যাবে বা মানতে হবে – হোক সেটি ধর্মীয় বা পার্থিব ব্যাপার – তাহলে তার এই দাবী প্রত্যাখ্যান করতে হবে।

একারণেই খলীফা নির্বাচনে সাহাবীদের কর্মপদ্ধতি একটি পার্থিব ব্যাপার, এটা ধর্মীয় ব্যাপার নয়। কেননা রাষ্ট্র পরিচালনা বাস্তবিক অর্থে দ্বীনের অন্তর্গত নয়। কাজেই সাহাবীদের এই বিষয় সংক্রান্ত কাজগুলোকে ধর্মীয় বিধানের পর্যায়ে ফেলা যাবে না।

হ্যাঁ রাষ্ট্র পরিচালনা ধর্মকে বাস্তবায়নের মাধ্যম বটে এবং যা ছাড়া একটা আবশ্যিক কাজকে সম্পাদন করা যায় না সেটাও আবশ্যিক। কিন্তু এই মাধ্যম মানুষের ইজতিহাদ বা চিন্তাভাবনার ওপর নির্ভরশীল এবং পার্থিব রীতিনীতির ওপরও নির্ভরশীল।

তাই ঠিক যেভাবে সাহাবীরা চাষবাস করতেন, ব্যবসায় করতেন, বিয়ে-শাদি করতেন এবং এগুলোর কোনওটাই ধর্মীয় বিধান নয়, একইভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা সংক্রান্ত কাজগুলোও পার্থিব বিষয়। যে মনে করে যে সাহাবীরা করেছেন বলে কাজগুলো দ্বীনের গন্ডিতে চলে এসেছে তারা আল্লাহ্‌ এবং তার রাসূলের ওপর জ্ঞান ফলাচ্ছে।

আল্লাহ ‘আয্‌যা ওয়াজাল্ল্‌ নিজেই যেহেতু দ্বীনের পরিপূর্ণতার কথা ঘোষণা করেছেন তার রাসূলের (সা:) জীবদ্দশাতেই, এর পরবর্তী যে কোনও কাজকে দ্বীনের বিধান হিসেবে ধরা চলবে না।

এছাড়াও সাহাবীদের একে অপরকে নেতৃত্বের জন্য বেছে নেয়ার যে কাজগুলো সেগুলোর কিছু নির্দিষ্ট বিশেষত্ব রয়েছে যা অন্যদের ব্যাপারে প্রযোজ্য নয়। সুতরাং এর ওপরও কিয়াস বা তুলনামূলক আলোচনা প্রযোজ্য নয়। যার বর্ণনা পরবর্তীতে আসবে (বইয়ের পরবর্তীতে)।

পঞ্চমত: পার্থিব কাজসমূহের বৈধতার ব্যাপারে সাধারণ নীতি হচ্ছে সেগুলো বৈধ। সুতরাং যে কোনও কাজ যাতে উম্মতের জন্য উপকার রয়েছে তাকে বাস্তবায়ন করাও বৈধ যদিওবা এর বৈধতার ব্যাপারে কুরআন ও হাদীসে সরাসরি কোনও সিদ্ধান্ত আসেনি।

ষষ্ঠত: পার্থিব বিষয়াদির যেগুলোতে অমুসলিমরা নৈপূন্য দেখিয়েছে তা থেকে গ্রহণ করাতে কোনও সমস্যা নেই যতক্ষণ পর্যন্ত এর ব্যাপারে কুরআন ও হাদীসে কোনও স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা মেলে। কেননা পার্থিব বিষয়গুলোর ব্যাপারে মৌলিক সিদ্ধান্তই হোলো বৈধতার যেটা আমরা আগেই বলেছি।

সপ্তমত: মুসলিম উম্মত এর দীর্ঘ ইতিহাসে শাসকদের হাতে – বিশেষ করে আমাদের সময় – বহু নির্যাতন, স্বৈরাচারিতা, নৈতিক ও ধর্মীয় স্খলন, সম্পদ আত্মসাৎ ইত্যাদির মুখোমুখি হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে জনগণের একত্রিত হওয়া এবং বিদ্রোহ করার এটাই কারণ। অতএব উম্মতকে কীভাবে তার শাসকদের হাত থেকে নিরাপদ রাখা যায় তা নিয়ে গবেষণা করার প্রয়োজন অনস্বীকার্য।

অষ্টমত: অতীতে ইসলামিক রাজনৈতিক বিধান তখনকার বাস্তবতা দিয়ে প্রভাবিত ছিলো এবং এর বেশিরভাগই ছিলো তাত্ত্বীক যার বাস্তবায়নের পদ্ধতি নির্ধারিত করে দেয়া হয়নি। অথবা এগুলো ছিলো স্রেফ শাসকদের জন্য পরামর্শ বা উপদেশ যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কর্ণকুহরে প্রবিষ্ট হয়নি। এ ব্যাপারটিও গবেষণা ও সংস্কারের দাবী রাখে।

নবমত: শাসকদের হাতে নির্যাতনের স্বীকার হওয়া কিছু অমুসলিম সমাজ রয়েছে যারা রাজনৈতিক বিধানসমূহকে উন্নত করার দিকে মনোযোগী হয়েছে এবং সক্ষম হয়েছে সমাজে সুবিচার, স্বাধীনতা এবং নাগরিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে।

দশমত: ইসলামি রাজনৈতিক বিধানের দিকে পুন:বিশ্লেষণ করা ও এর উন্নয়ন ঘটানো আজকের দিনের সবচেয়ে জরুরী কাজগুলোর একটি যাতে করে উম্মতের মাঝে সুবিচার প্রতিষ্ঠা করা যায়, এর মর্যাদা ফিরিয়ে আনা যায় এবং তাকে তার প্রাপ্য অবস্থানে ফিরিয়ে আনা যায়।

[পৃ: ১২৩ – ১২৬, প্রসঙ্গত লেখক (র:), যিনি মাত্র কিছুদিন আগে মৃত্যুবরণ করেছেন, উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘আকীদা ডিপার্টমেন্টের উচ্চতর শিক্ষার অধ্যাপক ছিলেন]

 প্রথম প্রকাশঃ https://www.facebook.com/asifshibgat.bhuiyan/posts/401608799971388