ওরা কেমন করে বুঝবে এ হাসির রহস্য!

বাংলাদেশে ইসলামী আন্দোলন করতে গিয়ে অনেকেই শহীদ হয়েছেন। গত কয়েক বছরের হিসেবটা ঘোলাটে হওয়ায় এর সংখ্যা নির্ধারণ করা কিছুটা কষ্টকর বৈকি। এসব শহীদদের জন্য জান্নাতে সর্বোচ্চ মর্যাদা কামনা করা প্রতিটি ঈমানদারেরই কর্তব্য। তাদের অপূর্ণ মিশনকে এগিয়ে নেয়ার দায়িত্বও তাদের। হাজারো শহীদের ভীড়ে আরো একটি নাম যোগ হয়েছে গত ১২ ডিসেম্বর দিবাগত রাত ১০টা ১ মিনিটে। শহীদ আবদুল কাদের মোল্লা। প্রতিটি শাহাদাতের মাঝেই ইসলামী আন্দোলনের জন্য লুকিয়ে থাকে অজানা অনেক গৌরব গাঁথা। শহীদ আবদুল কাদের মোল্লার শাহাদাতের মাঝে ছিল ভিন্নতা। তার শাহাদাত ছিল বাংলাদেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত প্রতিটি কর্মীর জন্য নতুন তোরণের উন্মোচন। যে তোরণ দিয়ে সরাসরি প্রবেশ করা যায় জান্নাতের সবুজ বাগিচায়। এ তোরণ দিয়েই দেখা যায় দীন ইসলামের জন্য শহীদ হওয়া অগনিত সম্মানিত আত্নাদের চির বাসন্তী বাগে আনন্দ-কোলাহলে মেতে থাকতে।

শহীদ আবদুল কাদের মোল্লার প্রতিটি কদম যখন এগিয়ে চলছিল ফাঁসির মঞ্চের দিকে, তিনি দেখছিলেন সেইসব মর্দে-মুজাহিদদের যারা দীন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নিজেদের কুরবান করেছেন। তাকে স্বাগত জানানোর জন্য দুহাত বাড়িয়ে রেখেছিলেন জান্নাতের চির সবুজ বাগে খেলতে থাকা হাসান-হুসাইনসহ অসংখ্য শহীদান। তিনি দেখতে পাচ্ছিলেন আল্লাহ তায়ালার ওয়াদাকৃত শহীদের জন্য নির্ধারিত প্রাসাদে তাকে নেয়ার জন্য জান্নাতী ফেরেশতারা তার দিকে এগিয়ে আসছেন। তিনি অনুভব করছিলেন, জান্নাতী মৃদুমন্দ বাতাস তাকে দুলিয়ে দিচ্ছে। তিনি মিশকে আম্বরের মনোমুগ্ধকর সুঘ্রাণ অনুভব করছিলেন পুরো স্বত্তা দিয়ে। এই দৃশ্যগুলোই তার সদা হাস্যোজ্জল মুখে এনে দিয়েছিল পরিতৃপ্তির শেষ হাসি। সুদৃঢ় পথে তিনি ফাঁসির মঞ্চে উঠে এসেছিলেন। চর্ম-চক্ষু দিয়ে পৃথিবী প্রত্যক্ষ করল একজন মর্দে-মুজাহিদের ঈমানী শক্তি। কুফুরী শক্তির জন্য শহীদ আবদুল কাদের মোল্লার প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল মৃত্যুর দিকে। ছিল ধ্বংসের দিকে। কিন্তু একজন প্রকৃত ঈমানদার জানেন, কি ছিল তার মনে। কেন তিনি হাসি মুখে গলায় পড়েছিলেন ফাঁসির দড়ি। শাহাদাতকে জেনে বুঝেই কবুল করেছিলেন আল্লাহর একজন প্রিয় বান্দা। পৃথিবীর গোলাপ বাগ থেকে আল্লাহ তার আরো একটি অতি প্রিয় গোলাপ তুলে নিলেন নিজের কাছে।

শহীদ আবদুল কাদের মোল্লাকে যে রাতে ফাঁসি দিতে চেয়েছিল মোনাফেক আওয়ামী লীগ সরকার, সে রাতে তারা দিতে পারেনি। তবে সেই রাতেই গত কয়েক দশক ধরে একই সঙ্গে সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেয়া জীবন সঙ্গিনী জেলে দেখতে গিয়েছিলেন তাকে। দেখা হওয়ার আগে তিনি সাংবাদিকদের সামনে দেখালেন ‘বিজয়’ চিহ্ন। ক্যামেরার শাটারে হাত রাখা ফটো সাংবাদিকের হাত থেমে গিয়েছিল সেদিন। অবাক হয়ে নাস্তিক সাংবাদিকেরা দেখছিল একজন ভবিষ্যত শহীদের স্ত্রীর গৌরবদীপ্ত বাচনভঙ্গি। তারা ভাবছিল, এ কেমন নিষ্ঠুর স্ত্রী! একটুও কি দয়া-মায়া নেই তার! কোথায় কেঁদে-কেটে একাকার হবার কথা! এতো দেখছি পাষাণ হৃদয়ের! কিন্তু জান্নাতের চির সবুজ-বাগে যাওয়ার জন্য যার আত্না পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে, যিনি ইসলামকে আল্লাহরই জমিনে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য জান কবুল করে প্রতিটি পদে এগিয়ে চলেছেন, যার জান-মাল তিনি জান্নাতের বিনিময়ে বিক্রি করে দিয়েছেন মহান রাব্বুল ইজ্জতের কাছে, তার কাছে স্বামীর শাহাদাতের সংবাদ কোন রাজ্য জয়ের চেয়ে কম মধুর ছিল না। কেয়ামতের মাঠে তিনি মহান রবের সামনে একজন শহীদের গর্বিত স্ত্রী হিসেবে দাঁড়াবেন। এর চেয়ে গৌরব আর কি হতে পারে! কিন্তু সেইসব সাংবাদিকদের এই হাসির, এই বিজয় চিহ্নের রহস্য বুঝে উঠার সাধ্য নেই। তারা কেবল অবাক হতে পারে। অন্যায়ের দাবিদার মানুষের অট্টহাসির সঙ্গে যোগ দিতে পারে।

একজন শহীদের শাহাদাত কবুল হলো কিনা, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ পৃথিবীতেই পাওয়া যায়। শহীদ আবদুল কাদের মোল্লার গায়েবানা জানাজায় অংশ নেয়া লাখো-কোটি মানুষের ভীড়ে এমন কিছু আল্লাহর প্রিয় বান্দা নিশ্চয়ই ছিলেন, যাদের দোয়া আল্লাহ কখনোই ফিরিয়ে দেন না। যাদের কান্না আল্লাহ সহ্য করতে পারেন না। তবে এর চেয়েও বড় প্রমাণ হলো, আল্লাহর সিদ্ধান্তের উপর শহীদ আবদুল কাদের মোল্লা এবং তার পরিবারের সন্তুষ্টির বিষয়টি। যে আল্লাহর সিদ্ধান্তের উপর সদা সন্তুষ্ট থাকে, তার উপর আল্লাহও সন্তুষ্ট থাকেন। তার পরিবারের বর্তমান যে সংবাদ আমরা পেয়েছি বিভিন্ন মাধ্যমে, তাতে তারা শহীদ আবদুল কাদের মোল্লার শাহাদাতকে নিজেদের জন্য মর্যাদার এবং গৌরবের মনে করেন। তার স্ত্রী নিজেকে একজন শহীদের বিধবা বলে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করেন। তার সন্তানেরা নিজেদেরকে শহীদের সন্তান বলে পরিচয় দিয়ে তৃপ্তি পান। এমন একজন শহীদের জন্য আল্লাহ তায়ালার কাছে নিঃসন্দেহে বান্দার ধারণার চাইতেও বড় পুরস্তার অপেক্ষা করছে। (আল্লাহ আমাদেরকে ভাইকে তার ধারণার চেয়েও বড় পুরস্কারে ভূষিত করুন। আমীন)

শহীদ আবদুল কাদের মোল্লা ভাই। তাকে ভাই বলতে গর্বে আমার বুক ফুলে উঠছে। হতে পারে, তার সঙ্গে আমার কখনোই দেখা হয়নি। হতে পারে তিনি আমাকে জানেনই না। হতে পারে, তার সঙ্গে একই ইসলামী আন্দোলনের কর্মী হিসেবে যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন রয়েছে তার বাইরে আর কোন সম্পর্ক নেই। কিন্তু রাতের পর রাত অশ্রুতে জায়নামাজ ভিজিয়ে দেয়ার জন্য, দিনের পর দিন রোজা রেখে আল্লাহর দরবারে তার মর্যাদা বৃদ্ধির দোয়ার করার জন্য এটুকুই যথেষ্ট। বাংলাদেশের ইসলামী আন্দোলনের অগ্রপথিকের জন্য হৃদয়ের সবটুকু আবেগ নিংড়ে দিয়ে দোয়া করতে চাই, আল্লাহ তাকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করুন। আমীন।

শহীদ আবদুল কাদের মোল্লার শাহাদাতের পর বাংলাদেশের ইসলামী আন্দোলন নতুন গতিপথ খুঁজে পাওয়ার কথা। পেয়েছেও নিঃসন্দেহে। কিন্তু সেই গতি ইসলামী আন্দোলনের নেতৃত্ব কতটা সঠিক পথে ঠেলে দিতে পারছে, তার সমালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। যে আবেগ একজন ইসলামী আন্দোলনের কর্মীকে হাসিমুখে শাহাদাতের পথে ঠেলে দিতে পারে, সেই আবেগকে শ্রদ্ধা করতে হবে। সেই আবেগকে সঠিক পথে এগিয়ে দিতে না পারলে ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে লজ্জিত হতে হবে আমাদের। কেয়ামতের মাঠে লজ্জায় আমরা মুখ দেখাতে পারবো না শহীদ আবদুল কাদের মোল্লার মতো মর্দে-মুজাহিদদের সামনে। বাংলাদেশে ইসলাম কবে, কখন, কোন অবস্থায় ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হবে? এই প্রশ্নের উত্তর কেবল আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জতই ভাল জানেন। আমরা কেবল সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে পারি। মনে রাখতে হবে, চেষ্টাটা যেন সর্বোচ্চ হয়। এই সর্বোচ্চ চেষ্টার মধ্যেই থাকতে হবে সঠিক সিদ্ধান্তও। আমাদের আফসোস করবার যথেষ্ট কারণ রয়েছে, আমরা এমন নেতৃত্ব এখনো পাইনি, যার হাত ধরে মাঝ দরিয়ায় ডুবতে থাকা তরণী নিয়েও তীরে পৌঁছবার আশা করতে পারি। আমরা মুসান্না বিন হারেসার মতো নেতৃত্ব চাই। যার নেতৃত্বে ইসলামী আন্দোলন পাবে নতুন গতি। ‘ইসলাম যিন্দা হোতা হ্যায়, হার কারবালা কে বাদ’ প্রবাদের সত্যতা নিরূপনের সময় কিন্তু সামনেই। আমরা এখন কারবালার ময়দানেই অবস্থান করছি। এবার ইসলামকে যিন্দা করার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন একজন যোগ্য নেতার। মনে রাখতে হবে,

একজন প্রকৃত নেতার আগমণের জন্য মঞ্চ প্রস্তুত করতে হয়। তার আগমণের জন্য যুগের পর যুগ ধরে একটি জাতিকে সম্মিলিতভাবে সাধণা করতে হয়।

আমরাও হয়ত সাধনা করেছি। এই সাধনাকে এবার চূড়ান্ত রূপ দেবার সময় এসেছে।

2 Responses

  1. Abu Sulaiman
    Abu Sulaiman at |

    আলহামদুলিল্লাহ। ভালো লাগলো। তবে এই বাক্য দুটো না থাকলে আরো ভালো হতো। “একজন শহীদের শাহাদাত কবুল হলো কিনা, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ পৃথিবীতেই পাওয়া যায়। শহীদ আবদুল কাদের মোল্লার গায়েবানা জানাজায় অংশ নেয়া লাখো-কোটি মানুষের ভীড়ে এমন কিছু আল্লাহর প্রিয় বান্দা নিশ্চয়ই ছিলেন, যাদের দোয়া আল্লাহ কখনোই ফিরিয়ে দেন না। যাদের কান্না আল্লাহ সহ্য করতে পারেন না।”— কারণ কথাগুলো যত না বাস্তবিক তার চেয়ে বেশি আবেগ তাড়িত… আফটার অল ধন্যবাদ…

    Reply

Leave a Reply