ইতিহাসের দুটি নির্মম হত্যাকান্ড এবং এর বিপরীতমুখী চরিত্র

স্বাধীন বাংলাদেশের সংক্ষিপ্ত ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় নির্মম দুটি হত্যাকান্ড ঘটে গেল ভিন্ন দুটি যুগে। প্রথমটি একজন রাষ্ট্রপ্রধানের। যখন তিনি রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তারই নিয়ন্ত্রণে ছিল বাংলাদেশের সসস্ত্র বাহিনী থেকে শুরু করে সবকিছু। তাকে হত্যা করল সেনাবাহিনীর একটি বিক্ষুব্ধ দল। দ্বিতীয় নির্মম হত্যাকান্ডটিকে ‌’জুডিশিয়াল মার্ডার’ বলে আখ্যায়িত করাটাই হবে সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত। নিহত ব্যক্তিটি ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের হওয়ায় মিথ্যা অভিযোগে প্রমাণহীন বিচারে মৃত্যূর মুখে পতিত হন। দুটি হত্যাকান্ড নিঃসন্দেহে নির্মম। তবে এর চরিত্রের মধ্যে অনেক ভিন্নতা রয়েছে। এতক্ষণে পাঠকরা নিশ্চয়ই বুঝেছেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকান্ড এবং ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর শহীদ আবদুল কাদের মোল্লার হত্যাকান্ড নিয়েই আলোচনা হচ্ছে।

কিছুদিন আগে ইতিহাসের গাতিধারার সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন এবং নিয়মিত গবেষণা করেন, এমন একজন পন্ডিত ব্যক্তির সঙ্গে আলাপ হচ্ছিল ১৯৭৫ সালের শেখ মুজিব হত্যা কান্ড নিয়ে। তিনি বলছিলেন, যাকে বাঙালি জাতির জনকের আসনে বসানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, তার মৃত্যূতে এই জাতি এক ফোঁটা চোখের অশ্রু ফেলেনি! কেউ কোন শোক মিছিল করেনি! দেশের মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল! পন্ডিত ব্যক্তিটির কথা না হয় প্রমাণ হিসেবে গ্রহন করা ঠিক হবে না। কিন্তু আহমদ ছফা একজন গ্রহনযোগ্য ব্যক্তি হিসেবেই বাংলাদেশের সবশ্রেণীর মানুষের নিকট পরিচিতি পেয়েছেন। তিনি তার ‘শেখ মুজিবুর রহমান’ প্রবন্ধে লিখেছেন,

এ কেমন মৃত্যূ, এ কেমন পরিণতি শেখ মুজিবের সুদীর্ঘ কর্মময় জীবনের! সব চুপচাপ নিস্তব্ধ! তাহলে কি ধরে নিতে হবে বাংলাদেশের মানুষ যারা তাঁর কথায় হাত ওঠাত, দর্শন মাত্রই জয়ধ্বনিতে আকাশ-বাতার মুখরিত করত, তাঁর এমন করুণ, এমন ভয়ঙ্কর মৃত্যূ দেখেও ‌’বাঁচা গেল’ বলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে?

কথিত জাতির পিতার সমালোচনা করে আহমদ ছফা এই প্রবন্ধের বলেছিলেন, শেখ মুজিব সময়ের পিতা হওয়ার যোগ্যতা রাখেন না। তিনি সর্বোচ্চ সময়ের সন্তান হতে পারেন। তিনি পিতা কিনা, এই বিতর্ক করা এ প্রবন্ধের উদ্দেশ্য নয়। যার মৃত্যূতে কোথাও কোন শোক হলো না, তার জন্য তিন যুগ পর বাংলাদেশকে বিভক্ত করতে হবে! রাজনৈতিক ভিন্ন মতের কারণে একটি শ্রেণীকে ঠেলে দিতে হবে ভয়ঙ্কর পরিণতির দিকে!

এই বিষয়ে বাংলাদেশের সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিকের একজন সিনিয়র রিপোর্টারের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছিল। তিনি জবাব দিলেন, সরকারের ভয়ে কেউই ঘরের বাইরে শেখ মুজিবের হত্যাকান্ডের প্রতিবাদ জানাতে পারেনি। দুঃখ পেলেও তা মনে মনেই ছিল। রিপোর্টার সাহেবের এই মন্তব্যের উত্তরটা প্রবন্ধের দ্বিতীয় অংশেই ফুটে উঠবে আশা করি।

এবার আসা যাক, দ্বিতীয় নির্মম হত্যাকান্ডটির বর্ণনায়। গত ১২ ডিসেম্বর রাতে ‌রাষ্ট্রীয়ভাবে হত্যা করা হয় একজন নির্দোশ ব্যক্তিকে। কসাই কাদেরের দোষ চাপানো হয় ইসলামী আন্দোলনের একজন একনিষ্ঠ নেতা শহীদ আবদুল কাদের মোল্লার উপর। মিথ্যা স্বাক্ষীর ভিত্তিতে ফাঁসি দেয়া হয় তাকে। কিন্তু এ ফাঁসি কার্যকরের পূর্বাপর পরিস্থিতি কি ছিল! শেখ মুজিব ছিলেন একজন রাষ্ট্রপ্রধান। আর এখন তো রাষ্ট্রই হত্যা করল একজন নিরপরাধকে। এই হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধে ইসলামপন্থী জনগণ প্রতিবাদ জানাল। তারা সরকারের অস্ত্রের ভয় করল না। তারা কারো চোখ রাঙানির পরোয়া করল না। একটি অন্যায়ের প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে শত শত মানুষ নির্দ্বিধায় জীবন দিতে লাগল। ১৯৭৫ সালে নিশ্চয়ই সরকার জনগণের উপর সরাসরি গুলি চালানোর নির্দেশ দেয়নি! এখন যেমনটি দিচ্ছে! তাহলে কি দুটি নির্মম হত্যাকান্ডের চরিত্র ভিন্ন আঙ্গিকে সামনে হাজির হয় না!

এবার কিছুটা বিশ্লেষণে আসা যাক। ‘শেখ মুজিব’ টেবলেট গিলিয়ে একটা শ্রেণীর মস্তিষ্ক বিকৃত করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু এতে মনে করার কোন কারণ নেই, যে শেষ পরিণতি এটাই। বরং পরিণতির পরও পরিণতি থাকে। ইতিহাসের দিকচক্রবালে এর দেখা মিলবেই। যে লোকটার মৃত্যূতে কেউ কাঁদল না, সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল, তার হত্যাকারীদের বিচার যদি তিন যুগ পরে বাংলাদেশের মাটিতে হতে পারে, তবে যার মৃত্যূতে কেবল দেশের মানুষ নয়, পৃথিবীর লাখো কোটি ইসলামপন্থী মানুষ আহাজারি করল, নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়ে এই হত্যাকান্ডের প্রতিবাদ জানাল, তার হত্যার বিচার তো এই বাংলাদেশের মাটিতে নিঃসেন্দেহে হবে। এতে সন্দেহ পোষণকারীদের জন্য দুঃসংবাদ। এই কোটি জনতার কেউ না কেউ, এই নির্মম হত্যাকান্ডের আরো নির্মম প্রতিশোধ নিবেই। সেদিনের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে আজকের হত্যাকারীদের। কারণ, সেদিনটি বেশি দূর নয়।

Leave a Reply