পাকিস্তানের অখন্ডতা চাওয়া যুদ্ধাপরাধ নয়

লিখেছেন; নেয়ামত ইমাম

লেখক নেয়ামত ইমাম

যেসব পূর্বপাকিস্তানী নাগরিক ১৯৭১ সালে পৃথক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অস্তিত্ব ও স্বাধীনতার ব্যাপারটি সমর্থন করেনি বা তার বিরোধিতা করেছে তারা যুদ্ধাপরাধী নয়। তারা শুধু তাদের মত বা ভাললাগা প্রকাশ করেছে মাত্র। পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক ঐক্য পাকিস্তানের একজন নাগরিকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হতে পারে খুব সহজেই, ঠিক যেভাবে বর্তমান বাংলাদেশীদের কাছে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব গুরুত্বপূর্ণ। বৃটেনের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন স্কটল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করলেও সঙ্গত কারণেই তিনি চান না স্কটল্যান্ড বৃটেন থেকে আলাদা হয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হোক। বৃটেনের চারজাতির ঐক্য রাষ্ট্রটির ভবিষ্যতের উন্নয়ন ও প্রতিযোগিতার বাজারে টিকে থাকার জন্য অপরিহার্য বলে তিনি মনে করেন। তাকে কি অপরাধী বলা যাবে? একই ভাবে স্পেনের কাটালোনিয়া, কানাডার কুইবেক প্রদেশ, ভারতের কাশ্মীর, ইত্যাদি এলাকায় স্বাধীনতার দাবি বেশ উচ্চকিত হলেও দেশগুলোর অসংখ্য মানুষ সে দাবির বিপক্ষে রয়েছে।

 কুইবেকের অভ্যন্তরীণ ফরাসি ভাষাভাষী একটি বিরাট জনসমষ্টি চায় না কুইবেক ইরেজি ভাষাভাষী কানাডা থেকে সরে গিয়ে একটি পৃথক রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করুক, যার কারণে কখনো কখনো রিসার্চে দেখা যায় কুইবেকের স্বাধীনতার দাবিটি সময়ে সময়ে দূর্বল হয়ে উঠছে। একই কথা বলা যায় আমাদের নিজেদের ক্ষেত্রেও। পার্বত্য এলাকায় আদিবাসী পাহাড়ি মানুষদের স্বাধীনতার সংগ্রামের কথা আমাদের জানা। প্রায়শঃই সেখানে রক্তারক্তি ঘটে, মৃত্যুমূখে পতিত হয় অনেক বাংলাদেশী ও পাহাড়ি। বাংলাদেশের সরকার তাদের দাবি মেনে নিচ্ছে না বলেই সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে সেনানিবাস, পাঠানো হয়েছে সেনা। আরো পাঠানো হয়েছে বাংলাদেশীদের, যাতে বহু বছরের একটি সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের মাধ্যমে স্বাধীন রাষ্ট্রের চিন্তাটি পাহাড়িদের মাথা থেকে ধীরে ধীরে মুছে যায়। বাংলাদেশ সরকারের সেনা এবং বাংলাদেশীরা পাহাড়িদের ওপর অনেক অত্যাচার করেছে বিভিন্ন সময়, তাদের নারীদের ধর্ষণ করেছে, ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে, কৃষিকাজ ব্যবস্থা ধ্বংস করেছে, জোর করে তাদের ধর্মান্তর ঘটিয়েছে, তাদের শিশুদের শিখিয়েছে বাংলাদেশীদের ভাষা-গান-জাতীয় সঙ্গীত, যার প্রমাণাদি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মাধ্যমে প্রচারিত ও প্রকাশিত হয়েছে। তবু আমরা কি একটি মুহূর্তের জন্যও নিজেদেরকে অপরাধী মনে করছি এবং বলছি ফলস্বরূপ আমাদের সবার ফাঁসি হোক?

একাত্তরে বাংলাদেশ ছিল একটি আইডিয়া, পাকিস্তান ছিল একটি আইডিয়া। যারা বাংলাদেশ নামক আইডিয়াটির বিরোধিতা করেছে বাংলাদেশের প্রতি তাদের ভালবাসা কোন অংশে কম ছিল না। তারা শুধু পশ্চিম পাকিস্তানকে ভালবাসেনি, ভালবেসেছে পাকিস্তান নামক দেশটিকে। তারা ভেবেছে পূর্ব পাকিস্তান হারিয়ে বৃহত্তর ভারতের তুলনায় পাকিস্তান ভৌগোলিকভাবে একটি দূর্বলতর প্রতিবেশি-রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্য পূর্বপাকিস্তান বা বাংলাদেশ অপরিহার্য ছিল বলেই বায়ান্নতে পাকিস্তানের সরকার বাংলাদেশীদের ওপর উর্দূ চাপিয়ে বাংলাদেশে বাংলাভাষা-ভিত্তিক জাতীয়তাবাদের উত্থানটি রোধ করার কঠিন চেষ্টা করেছিল যার মধ্য থেকে বেরিয়ে আসে একুশে ফেব্রুয়ারি।

তাহলে কারা যুদ্ধাপরাধী? যারা বাংলাদেশ নামক আইডিয়াটিকে পাকিস্তান নামক আইডিয়াটি দিয়ে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে নাকচ করতে না পেরে একটি যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশীদের ওপর, তাদের বৈষয়িক ক্ষতি করেছে, তাদের প্রাণ বিনাশ করেছে, তাদের সম্ভ্রম কেড়ে নিয়েছে, এবং অন্য সব বিষয় যেগুলো আদালত মানবাধিকার লঙ্ঘনের উপাদান বলে বিবেচনা করে। যারা এ ধরণের অপরাধের সাথে জড়িত ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায়, তাদের সবাইকে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে ও আদালতের বিধান অনুযায়ী সাজা ভোগ করতে হবে। তবে মানে রাখতে হবে প্রতিটি জীবনই গুরুত্বপূর্ণ, এমনকি যে বুঝতে পারে না তার জীবন গুরুত্বপূর্ণ কি না, তার জীবনটিও। যারা অপরাধীদের নিষ্ঠুরতার শিকার হয়েছে, তাদের জন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে অপ্রয়োজনীয় নিষ্ঠুরতার পথটি বেছে নিয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘন করা কোন সুখকর সমাধান হতে পারে না।

তাহলে জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে কি করবো আমরা? তাদের কোন কোন নেতা একাত্তরে বাংলাদেশ নামক আইডিয়াটির বিরোধিতা করেছে, কোন কোন অনুসারী হত্যা করেছে বাংলাদেশীদের বা পাকিস্তানী বাহিনীর হাতে তুলে দিয়েছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, তাদের দিয়েছে মুক্তিবাহিনীর গোপন আস্তানার খোঁজ। কোন কোন জন বাংলাদেশ নামক স্বাধীন রাষ্ট্রে বাস করে একে পাকিস্তানের সাথে একাত্ম করতে চেষ্টা করে গেছে। [আমি কোন কোন জন বলছি এই কারণেই যে বর্তমানের জামায়াতে ইসলামী বা ছাত্রশিবিরের অধিকাংশ সদস্যই একাত্তরে নাবালক ছিল বা আদৌ জন্মগ্রহণ করেনি।] আমরা কি ধরণের পদক্ষেপ নেবো তাদের জন্য?

আমার সাংবাদিক বন্ধু বলেন একটি সন্ত্রাসী দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করার কথা। আমার শিক্ষক বন্ধু ব্লগার রাজীব হত্যার সূত্র ধরে একই সিদ্ধান্তের কথা বলেন। আমার কবি বলেন জামায়াত এবার নিশ্চই নিষিদ্ধ হবে এবং যদি তা সত্যিই ঘটে তবে তিনি একটি নতুন কবিতা লিখবেন – আমি তার বিছানার পাশে কাগজ-কলম রেডি দেখেছি। আমি রিক্সায় বসে টুপি পরা বয়স্ক রিক্সাওয়ালাকে জিজ্ঞেস করেছি এ ব্যাপারে; সে বলেছে আওয়ামী লীগ সরকারের দৃঢ়তা দেখে এবার প্রথমবারের মত তার মনে হয় জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষিত হবে এবং মনে হয় এখন বুঝি শেখ মুজিবই দেশ চালাচ্ছেন, শেখ হাসিনা নয়।

রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা যাবে না। যদি সরকার তা করে, এবং সমগ্র দেশের মানুষ সরকারের সিদ্ধান্তটি মেনে নেয় বা সে সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানায়, সমগ্র জাতি একটি বিরাট ভুলের ভিতর প্রবেশ করবে। একটি দেশে যেখানে শতকরা ৯০ ভাগ মানুষ ইসলাম ধর্মের অনুসারী, সেখানে ইসলামী শিক্ষা ভিত্তিক একটি রাজনৈতিক দল বিরাজ করবে এটাই স্বাভাবিক। আমি দর্শনশাস্ত্রের অধ্যাপকের বাড়িতে দেখেছি প্রতিদিন সকালে মৌলভী তার ছেলেকে আরবী পড়াতে আসে, একটি রুগ্ন ছাত্রকে সাহায্য করতে গিয়ে দেখেছি আমার আগেই সেখানে ইসলামী বিশ্বাসে বিশ্বাসী পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক তার বিছানাপাশে হাজির। ইসলামী বিশ্বাস যদি বাংলাদেশে প্রচন্ড না হতো তবে ১৯৪৭-এ বাংলাদেশ পাকিস্তানের অংশ না হয়ে হতো ভারতের অংশ। ইসলাম এই দেশের মানুষের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা, শুধু ধর্মীয় বাস্তবতা নয়। যদি কোন শান্তিপ্রিয় বাংলাদেশী মনে করে জামায়াতে ইসলামী তার রাজনৈতিক ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে পারবে, তবে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র বা এর অন্য সব নাগরিকের কোন অধিকার নেই সেই বাংলাদেশীর সেই ইচ্ছাটিকে বাস্তবায়ন করার অধিকারটি কেড়ে নেয়ার। যদি জামায়াতের ১০০ জন সদস্য থাকে এবং তার ৯০ জন সদস্যই কোন না কোন অপরাধের সাথে জড়িত থাকে, তাহলে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী পরিচালনার মাধ্যমে সে ৯০ জনকে আইনের সামনে দাঁড় করাতে হবে এবং বাকি নির্দোষ ১০ জনকে তাদের মত প্রকাশ করতে দিতে হবে নির্দ্ধিধায়।

জামায়াত একটি রাজনৈতিক দল। ইসলামনির্ভর মনে হলেও তারা প্রকৃতপক্ষে ইসলামী দল নয়। ইসলামকে তারা গ্রহণ করেছে তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য। যদি ক্ষমতায় যাবার আর কোন পথ খোলা থাকে, সবার আগে তারাই একে পেছনে ফেলে যাবে। সামাজিক জীবনে বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তাদের অনৈসলামিক ক্রিয়াবলী ও সহিংসতা দেখে তাই মনে হয়। অন্য তিনটি প্রধান রাজনৈতিক দলের মত তাদের কর্তাব্যক্তি নেই, ইতিহাস নেই। সেজন্য তারা ইসলাম ধর্মটিকে আঁকড়ে পড়ে থাকে, ব্লগার রাজীব ইসলামের বিরুদ্ধে কথা বললে তাকে হত্যার পরিকল্পনা করে ও সবশেষে হত্যা করে যাতে মানুষ বুঝতে পারে তারা ইসলামের রক্ষক। এদিক থেকে তারা অন্যসব দলের মতোই। শেখ মুজিব তাদের অ্যামনেস্টি দিয়েছিলেন ইসলামকে শোষন করে তার জনপ্রিয়তা ধরে রাখার জন্যই। জিয়াউর রহমান তাদেরকে কাছে রেখেছিলেন বছরের পর বছর, তাদের নতুন করে জাগিয়ে নিয়েছিলেন ঐ একই উদ্দেশ্যে। মুহম্মদ এরশাদ মসজিদে মসজিদে ঘুরেছেন ইসলামপ্রিয় মানুষদের প্রিয় হবার জন্য। আওয়ামী লীগের নেতাদের দেখেছি টুপি ও মুজিব কোট দুটিই একসাথে পরে নির্বাচনের প্রচারণায় যেতে। আজকের সমস্যাটি ইসলাম নয়, ইসলামপ্রিয়তা বা ইসলাম-অন্ধত্ব নয়; সমস্যাটি হচ্ছে এই ইসলাম প্রিয় দলটি আগামি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের আধিপত্য অনেকাংশে খর্ব করতে পারে।

সোর্স:“সরকার,শাহবাগ ও অসহায় বাংলাদেশ ” নামক প্রবন্ধের অংশ বিশেষ

2 Responses

  1. aynashah
    aynashah at |

    “একাত্তরে বাংলাদেশ ছিল একটি আইডিয়া, পাকিস্তান ছিল একটি আইডিয়া।” না, ‘৭১এ বাংলাদেশ একটি আইডিয়া ছিল সেটা ঠিক আছে, কিন্তু পাকিস্তান তখন আইডিয়া চিলনা, ছিল বাস্তব। ‘৪৭ এর আগে পাকিস্তানের জন্যও এই বাংলাদেশের মানুষ প্রান দিয়েছে, দিয়েছে সহায় সম্বল সবকিছু। সেদিন ছিল পাকিস্তান একটা আইডিয়া, ৭১ এ নয়।

    Reply
    1. mazhar
      mazhar at |

      আমিও একমত।

      Reply

Leave a Reply