খিলাফতের বিভিন্ন মাত্রা

(বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে অনেক ব্যক্তি খেলাফত চান। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু তাদের অধিকাংশই খেলাফতের পূর্ণ তাৎপর্য বোঝেন কি না তা পরিষ্কার নয়। এই কারণেই এই লেখাতে খেলাফতের বিভিন্ন মাত্রা স্পষ্ট করা হয়েছে।)

খিলাফত ইসলামের একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইসলামের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় খিলাফতের গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য রয়েছে। অনেক গুরত্বপূর্ণ দল বা গ্র“প খিলাফত প্রতিষ্ঠা করতে এটাকে তাদের কর্মসূচির অংশ হিসেবে নিয়েছে।এই খিলাফতের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা বা ধারণা রয়েছে আর তাই সে সম্পর্কে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

প্রথমতঃ নৈতিক ও আধ্যাত্মিক অর্থে খিলাফত বলতে বোঝায় যে, পৃথিবীতে সকল মানবজাতি আল্লাহর খলিফা বা আল্লাহর প্রতিনিধি। ‘‘নিশ্চয়, আমরা পৃথিবীতে আমাদের প্রতিনিধি (খলিফা) প্রেরণ করতে চাই” (সূরা বাকারা : আয়াত ৩০) -এই আয়াতেরই ভাবার্থ এটা। সকল মানবজাতি আল্লাহর খলিফা, যদিও তাদের অনেকে পাপ কাজ করে এবং খলিফার মতো আচরণ করে না (সূরা আনআম : আয়াত ১৬৫; সূরা নামল : আয়াত ৬২; সূরা ফাতির : আয়াত ৩৯)। এটা ইসলামের আধ্যাত্মিক খিলাফত।

দ্বিতীয়তঃ খিলাফত বলতে ইসলামের রাজনৈতিক নীতিমালা বোঝায়। এটাই খিলাফতের সবচেয়ে উল্লেখ করার মতো মাত্রা বা ডাইমেনশন। খিলাফত, রাজনৈতিক এবং রাষ্ট্র পরিচালনার একটি পদ্ধতি হিসেবে রাসূল (স) এর সাহাবীদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়। ইসলামে খিলাফত বা রাজনৈতিক ব্যবস্থার মূল দিকগুলো  নিম্নরুপ:

ক. আল্লাহর সার্বভৌমত্ব: আল্লাহর সার্বভৌমত্ব বলতে বোঝায় শরিয়াহর (কোরআন ও সুন্নাহর) সর্বোচ্চ আধিপত্য। রাষ্ট্রের মৌলিক আইন কোরআন এবং সুন্নাহর উপর ভিত্তি করেই হবে। আর বিস্তারিত আনুষঙ্গিক ও সম্পূরক আইন যা ফিকাহবিদদের মাধ্যমে প্রণীত এবং প্রাপ্ত। তারা এই আইন প্রণয়ন করে ইজতেহাদের মাধ্যমে।

খ. সরকার: সরকার সব মানুষের উন্মুক্ত পছন্দের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হবে। এটাই অধিকাংশের মত। অর্থাৎ এর মানে হলো, বর্তমান বিশ্বে সরকার জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হবে। এ ব্যাপারে ইসলামের অধিকাংশ আলেম একমত। এটাই মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সংবিধানে কার্যত গৃহীত হয়েছে।

গ. মৌলিক অধিকার: জাতি ও ধর্ম নির্বিশেষে সকল নাগরিকদের মানবাধিকার থাকতে হবে। বিশ্বের বিভিন্ন সংবিধানে মৌলিক অধিকারের উপর একটি অধ্যায় আছে বা রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের প্রয়োজনীয় অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। কোরআন এবং সুন্নাহর আলোকে দীর্ঘ আলোচনার পর এই অধিকারের বিষয়ে আলেমরা একমত হয়েছেন । (ওআইসি’র মানবাধিকার ডকুমেন্ট দ্রষ্টব্য)।

ঘ. আইনের শাসন ও বিচার বিভাগ: আইনের শাসন ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ইসলামের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জনগণ এবং সংসদ সব সরকারের ব্যক্তিবর্গের মাঝে বিভিন্ন ফোরামের মাধ্যমে শুরা বা শলাপরামর্শ ইসলামের রাজনৈতিক তত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এটাই ইসলামের গণতন্ত্রের ভিত্তি। অধিক সংখ্যক ইসলামের পণ্ডিতবর্গ অনুভব করেন গণতন্ত্র শব্দটি ইসলামিক কাঠামোতে ব্যাবহার করা যেতে পারে। (সূত্র: পাকিস্তানের ইসলামিক সংবিধানের প্রস্তাবনা, যেখানে বলা হয়েছে যে রাষ্ট্র ‘‘ইসলামের ধারণার আওতায় গণতন্ত্র” হবে। আলেমরা এই শব্দগুচ্ছ গ্রহণ করেছেন)।

এই সবই ইসলামী রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিভিন্ন উপনাদান যাকে ইসলামের খিলাফত বলা হতো। (সূত্র: খেলাফত ও রাজতন্ত্র, সাইয়েদ আবুল আলা মওদূদী)।

খিলাফতের তৃতীয় মাত্রাটি হলো, এটা ইসলামের সরকারের রূপ (ভড়ৎস) বোঝায়। বর্তমানে উলামারা মোটামোটিভাবে একমত যে, ইসলামের রাজনৈতিক তত্ত্বের সার্বিক কাঠামোর মধ্যে, আজকের রাষ্ট্রপতি শাসিত বা সংসদীয় সরকার উভয় ইসলামের সাথে সংগতিপূর্ণ

(সূত্র: ইরান ও পাকিস্তানের ইসলামিক সংবিধান, সাইয়েদ আবুল আলা মওদূদী-এর ইসলামিক আইন এবং সংবিধান গ্রন্থ)।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি, খিলাফত বলতে শুধুমাত্র রাষ্ট্রপতিকেই খলিফা বলা হবে তা বোঝায় না। এটা তার চেয়েও অনেক বেশি কিছু। এটা ইসলামের রাজনৈতিক ব্যবস্থার নির্যাস বা সারাংশ মাত্র।

Leave a Reply