জামায়াতের বর্তমান নেতারা পদত্যাগ করেন!

আজ দৈনিক প্রথম আলোতে সেলিম জাহিদের ‘পাঁচ বিষয়ে ধারণা ভুল ছিল নেতাদের: আপাতত ‘নমনীয়’ থাকবে জামায়াত’ শিরোনামের একটি প্রতিবেদন ছাপানো হয়েছে।

দায়িত্ব নিয়েই বলছি সেলিম জাহিদ জামায়াত বিটের প্রতিবেদন করার ক্ষেত্রে বিশ্বাসযোগ্য সাংবাদিক। এই দারুন সময়েও তিনি প্রতিবেদন লেখার সময় জামায়াতের পলাতক নেতাদের সাথে যােগাযোগ করেন। যে সব জামায়াত নেতা আত্মগোপনে আছেন তাদের সাথে তিনি কথা বলতে পারেন।

কাজেই আমি মনে করছি সাম্প্রতিক আন্দোলন নিয়ে তিনি জামায়াতের যে মূল্যায়নের কথা বলছেন তা বিশ্বাসযোগ্য। মানে তিনি গুলতানি করে মনের মাধুরি মিশিয়ে কিছু লেখেননি। তিনি যে ঠিক ঠিক জামায়াতের মূল্যায়নের কথা জানিয়েছেন এটা ধরে নেয়া যায়।

তো সেলিম জানাচ্ছেন-“দেশের রাজনীতির গতি-প্রকৃতি নিয়ে সম্প্রতি জামায়াতের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে একটি মূল্যায়ন হয়। তাতে উঠে আসে যে পাঁচটি বিষয়ে জামায়াতের ধারণা ভুল ছিল।”

এই পাঁচ ভুল হলো-
১. দলের নেতা-কর্মীদের দেখামাত্র গুলি-গ্রেপ্তারসহ তাঁদের ওপর সরকারের ‘দমননীতির’ মাত্রা যে এতটা ব্যাপক হতে পারে, তা ভাবতে পারেননি দলটির নীতিনির্ধারকেরা। 
২.একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বিষয়টি আওয়ামী লীগ যে এত জোরালোভাবে দেশে জাগিয়ে তুলতে পারবে, সেটাও ছিল ধারণার বাইরে। 
৩. জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির জোট বাঁধাকে আওয়ামী লীগ যেভাবে ‘ইস্যু’ করে তুলেছে, সেটাও চিন্তার বাইরে ছিল। দলটির নেতারা মনে করেছিলেন, আওয়ামী লীগ যে অতীতে জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন করেছিল, সেটা তারা এতটা ভুলে যাবে না। 
৪. গত কয়েক বছরের সব রাজনৈতিক সহিংসতা এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা ও নির্যাতনের দায় এককভাবে জামায়াতের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে, সেটাও তাঁরা ভাবতে পারেননি। 
৫. প্রতিবেশী দেশ ভারত আওয়ামী লীগকে দিয়ে জামায়াতকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করছে বলে মনে করছেন দলটির নীতিনির্ধারকেরা। তাঁদের কাছে ভারতের এতটা কঠোর অবস্থান প্রত্যাশিত ছিল না।

পাঁচ ভুল এবং ‘উলিল আমর’ ছদ্মবেশী পার্টি আমলাতন্ত্রের দায়

আমরা জানি জামায়াত ও শিবিরের নেতাকর্মীরা তাদের নেতাদেরকে ‘উলিল আমর’ মনে করেন। তারা যে শপথ নেন তাতে এই উলিল আমরের নির্দেশ মেনে চলাকে ফরজ হিসেবে দেখানো হয়েছে।

আমরা অনেক দিন ধরে দাবি করে আসছি জামায়াতের উলিল আমররা আসলে উলিল আমর না। তারা শুধুই জামায়াতের নেতা, আর নেতা মানে দলটি আমলারা। দলটির মধ্যে যে আমলাতন্ত্র কাজ করছে সেই আমলাতন্ত্রের কর্মচারীরাই নিজেদের নেতা পরিচয় দেন এবং দাবি করেন তারা কুরআন শরীফে বর্নিত উলিল আমর।

জামায়াত-শিবিরের তৃণমূল নেতাকর্মীরা ইসলাম কায়েমের জন্য জানমাল কোরবানি করার সিদ্ধান্ত নিয়ে জামায়াতের রাজনীতিতে জড়িত হন। কাজেই তারা উলিল আমরের নির্দেশে জানমাল কোরবানি করতে পিছপা হন না। এবং তারা উলিল আমর মনে করে পার্টি আমলাতন্ত্রের নির্দেশে জানমাল কোরবানি করেন, এ ব্যাপারে তাদের মধ্যে কখেনা সন্দেহ-সংশয় কাজ করে না। ফলে দেখা যায় বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মীদের মধ্যে এতোটা দৃঢ়তা ও সাহসিকতা দেখা যায় না।

এখন কথা হলো ইসলামী আন্দোলন পরিচালনার জন্য জামায়াত-শিবিরের নেতারা যে দায়দায়িত্ব নেন তারা তাকে ‘আমানত’ মনে করেন। এই ‘আমানত’ রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুদায়িত্ব ও এর খেয়ানত করলে কেয়ামতে দোযখে যেতে হবে মনে করেন তারা।

এই মনে করার বিষয়টি কতোখানি গুরুতর তা দেখা যায় জামায়াত-শিবিরের লোকদের কোনাে দায়িত্ব গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রার্থী না হওয়া এবং দায়িত্ব পাওয়ার পর শপথ গ্রহণকালে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার দৃশ্যাবলীর মাধ‌্যমে।

আসুন এবার আমরা বিচার করে দেখি যে জামায়াত নেতারা তাদের আমানতের খেয়ানত করেছেন কি না। এবং সেই খেয়ানতকেই তৃণমূল জামায়াত-শিবিরের কাছে উলিল আমরের নির্দেশ হিসেবে হাজির করে তাদের অসম লড়াই, মৃত্যু ও পরাজয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছেন কি না।

আশা করি এটা সবাই বুঝবেন যে প্রথম আলোতে জামায়াত নেতাদের যে পাঁচটি ভুল ধারণার কথা প্রকাশিত হয়েছে, তাতে এটিই পষ্ট যে তারা তিনটি শক্তির ব্যাপারে ভুল ধারণা করেছিল। ১. ইসলাম বিদ্বেষী আন্তর্জাতিক মহল, ২. বাংলাদেশ বিদ্বেষী আঞ্চলিক শক্তি ভারত ও ৩. জামায়াত বিদ্বেষী দেশীয় শক্তি সেক্যুলার আওয়ামী লীগ।

তিন শক্তি কোন রণনীতি নিয়ে কোন পর্যায়ের রণকৌশল নিয়ে জামায়াতের বিরুদ্ধে সক্রিয় রয়েছে এই বিষয়টি অনুধাবন না করে জামায়াত রণনীতি ও রণকৌশল নিয়েছে এটিই ভুল ধারণার উপলব্ধি থেকে পষ্ট হয়।

কাজেই সিদ্ধান্ত টানা যায় যে, পরিস্থিতির তাৎপর্য সম্পর্কে মনগড়া পর্যালোচনা করে জামায়াতের নেতৃবৃন্দ দলটির তৃণমূল নেতাকর্মীদের ও ছাত্রশিবিরকে একটি ভুল লড়াইয়ে ঠেলে দিয়েছিল। যেই লড়াইয়ে নিশ্চিত মৃত্যু, কারাবরণ, নির্যাতিত হওয়া, পঙ্গুত্ব বরণ করা ও পালিয়ে বেড়ানোর মতো পরিণতি ছিল।

আমরা এই তথ্য জানি যে ২০১২ সালের রমজান মাসে ও তার পরে সারা দেশে জামায়াতের নেতারা দলের নেতাকর্মীদের সাথে যোগাযোগ করেছেন। সেই সময় তারা লড়াইয়ের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন। এই লড়াইয়ের জন্য কর্মীদের তারা শহীদ হতে উদ্বুদ্ব করেন এবং শপথ করান।

কাজেই আমরা দাবি করতে পারি যে তিন শক্তির শত্রুতা সম্পর্কে ভুল ধারণা থাকলেও আন্দোলন করতে গিয়ে যে মৃত্যু, কারাবরণ, নির্যাতিত হওয়া, পঙ্গুত্ব বরণ করা ও পালিয়ে বেড়াতে হবে এ সম্পর্কে জামায়াত নেতাদের ধারণা ভুল ছিল না। যার মানে দাঁড়ায় তারা জেনেবুঝে আগুনে ঝাঁপ দিয়েছেন।

এখানে প্রসঙ্গক্রমে বলতে হয়, জামায়াত আন্তর্জাতিক, আঞ্চলিক ও দেশীয় শকইত সম্পর্কে যে ভুল ধারণা করেছিল তার পেছনে একটা ‘ব্যাপার’ কিন্তু আছে। বিগত ২০১০ ও ১১ সালে জামায়াত আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থন পেতে শত শত কোটি টাকা ব্যয় করে। যেই টাকা তারা বিভিন্ন লবিস্ট ফার্মে ও প্রোপাগান্ডিস্টদের মধ্যে বিলি করে।

একই সময়ে জামায়াত আওয়ামী লীগের কিছু মন্ত্রী ও নেতাকেও বিপুল সংখ্যক টাকা দেয়। পুলিশসহ নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদেরও টাকা বিপুল অঙ্কের টাকা দেয়। সুশীল সমাজ ও আওয়ামী লীগপন্থী বুদ্ধিজীবী-সাংবাদিকদেরও তারা টাকা দেয়।

তবে ভারতের সাথে জামায়াত কোনো লবি করতে পেরেছে বলে আমি নিশ্চিত হতে পারিনি। দেশটির কিছু মিডিয়াতে টাকা বিলি করলেও নীতি নির্ধারক পর্যায়ে সম্ভবত জামায়াত পৌছতে পারেনি। এ জন্য যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসের একজন সদস্য লবি করতে আগ্রহী হলেও তিনি ব্যর্থ হন বলে জানি।

জামায়াত বস্তায় বস্তায় টাকা ঢেলেছিল বলেই ধারণা করেছিল তিন শক্তি তাদের সাথে চূড়ান্ত মাত্রার শত্রুতা করতে পারবে না। কিন্তু তিন শক্তি যে শত্রুতা করবে বলে আগে থেকেই আভাস দিয়ে আসছিল সেটা পদে পদে বাস্তবায়ন করায় জামায়াত মনে করছে তাদের ধারনা ভুল ছিল।

কাজেই এখানে ধারনা ভুল নয় টাকার অপচয়ের সিদ্ধান্তটি ভুল ছিলো বলেই তারা স্বীকার করলেন।

এখন আমার কথা পষ্ট, জামায়াতের যে সব নেতা সাম্প্রতিক আন্দোলনে জড়িত ছিলেন তারা পদত্যাগ করুক। ‘উলিল আমর’ হওয়ার দাবি করে তারা মানুষকে যেভাবে অসম লড়াইয়ের মধ্যে ঠেলে দিয়ে নিহত, নির্যাতিত, পঙ্গুত্ববরণ ও পালিয়ে বেড়ানোর পরিণতির শিকার করেছেন তার দায়-দায়িত্ব তারা নিক। তারা আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুক, জনগণের কাছে দুঃখ প্রকাশ করুক। এবং সহজ-সরল ইসলামপন্থীদের মৃত্যু ও নিপীড়নের যন্ত্রণার শিকার হতে উস্কানি দিয়ে যে ফৌজদারি অপরাধ করেছে তার জন্য প্রচলিত আদালতের শাস্তি পাক।

সবাইকে মনে করিয়ে দিচ্ছি, ১৯৭১ এও একটি দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ না করে হানাদার সেনা বাহিনীর প্রলোভন বশতঃ দালালি করার পরিণাম সম্পর্কেও ভুল ধারনা করেছিলেন জামায়াতের পার্টি আমলাতন্ত্র। এই ভুলকে তারা রাজনৈতিক ভুল দাবি করেন।

কিন্তু পার্টি আমলাতন্ত্রের রাজনৈতিক ভুলের ফলে ২০০০ হাজার জামায়াত নেতাকর্মী শহীদ হয়, ১২ হাজার বন্দি হয়। স্বাধীনতার পর অনেক আলেম-উলামা হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। তাদের বাজারে পুড়িয়ে মারা হয়, অনেকের লাশ নদীর পারে ও জঙ্গলে পরে ছিল।

সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় বাংলাদেশের জনগণের। ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশে ইসলাম যেন অচ্ছুত হয়ে যায়। তরুণদের দাড়ি-টুপি আর মেয়েদর হিজাব করা বাধাগ্রস্ত হয়।

কাজেই অপরিণামদর্শন ও কুযুক্তির আশ্রয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নেয়ার ফলে যখন ওই দলের নিরীহ লোকদের নিপীড়িত হতে হয় তখন তা আর কোনো ভাবেই রাজনৈতিক ভুল থাকে না। তা অপরাধ, অপরাধ এবং অপরাধ।

এবারও ইসলাম ও সেক্যুলারিজমের যুদ্ধের সময় জামায়াতের পার্টি আমলাতন্ত্র ভুল ধারণা করে একই অপরাধ করেছে। তাদের অপরাধের কারণেই শত শত মানুষ নিহত হয়েছে, ১০ হাজারেরও বেশি লোক পঙ্গুত্ব বরন করেছে। ৫ শতাধিক শিবির নেতাকর্মী পুরুষত্বহীন হয়েছে। ২০ হাজারেরও বেশি লো কারাবরন করেছে। লাখেরও বেশি মানুষ আজ পলাতক জীবন যাপন করছে।

৫ জানুয়ারির পর একের পর এক মানুষ নিহত হচ্ছে। পুরুষেরা পালিয়ে যাওয়ায় বাসাবাড়িতে নারীরা ধর্ষিত হচ্ছে। সাতক্ষীরার এমন ঘটনার খবর এখন আর ধামাচাপা দেওয়া যাচ্ছে না।

এ অবস্থায় দায়ী জামায়াত নেতাদের দায়দায়িত্ব নিতে হবে। তাদের পদত্যাগের ঘোষণা দিতে হবে। অপরাধের দায় নিতে হবে।

সবশেষ বলি, যারা আমাদের গালি দিয়ে সত্যের উপলব্ধি নাকচ করে দিতে চান তারা হুঁশিয়ার হোন। ভেবে দেখুন পার্টি আমলাতন্ত্রকে ফেরেশতা দাবি করে আপনারা কি ভুল রাজনীতির অপরাধকে জারি রাখতে ভূমিকা রাখছেন কি না!

সবাইকে মনে রাখতে হবে ইসলামী আন্দোলন এক জিনিশ আর ইসলামী পার্টি রাজনীতি আরেক জিনিশ। ইসলামী পার্টি রাজনীতি ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য জুলুম ছাড়া আর কিছুই বয়ে আনে না

Leave a Reply