জামায়াতের এই দুরবস্থা কি অতি উৎসাহী ভূমিকার মাশুল ?

দেশ যে ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে ২০০৯ সাল থেকে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের অত্যাচার নির্যাতনের সবচেয়ে বেশি শিকার হয়েছে জামায়াত । এরপর বিএনপি ।এইযে নির্যাতন, প্রাণহানি, এর দায় কার ? মূল দায় অবশ্যই আওয়ামী লীগ ও সরকারের , কারণ বেশিরভাগ প্রাণহানি সংঘাত-সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে সরকারের তরফে । কিন্তু জামায়াত বা বিএনপিরও কি কোন দায় আছে ? আমার ধারণা হলো- ‘আছে’ । বরাবরের মত জামায়াত তার নিজের শক্তি-সামর্থ নিয়ে এবং প্রতিপক্ষের শক্তিসামর্থ সম্পর্কে ভুল মূল্যায়ন করেছে । আর সেভাবেই সিদ্ধান্তও নিয়েছে । যা বাস্তবতাবিমুখ এবং ক্ষতিকর হয়েছে । নিজের পায়ে কুড়াল মারার মত হয়েছে।জামায়াত ও বিএনপির বর্তমান অবস্থান নৈতিকভাবে ঠিক হলেও রাজনৈতিক চিন্তাধারা ও কর্মসূচী-পদক্ষেপের দিক থেকে ছিল নানা ভুলে ভরা ।

কয়েকদিন আগে সাংবাদিক-কলামিস্ট মাসুদ মজুমদার দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকায় ‘নিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবি হওয়ার সহজ উপায়’ শিরোনামে একটি কলাম লেখেন (http://goo.gl/I9aUfR) । এতে আমার এই ধারণা আরো জোরালো হয় ।
তাঁর ভাষায়-

“ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় কখনো কখনো এমন ক্রান্তিকাল বা সন্ধিক্ষণ এসে দাঁড়ায়, তখন ভূমিকা হতে হয় সত্য-মিথ্যার লড়াইয়ের মতো। রাজনৈতিক লাভালাভ ও দলীয় স্বার্থের চেয়ে জাতীয় স্বার্থ, গণতন্ত্রের দায়, সংবিধান রক্ষার তাগিদ বেড়ে যায়। বর্তমান সময়ে খালেদা জিয়ার অবস্থান সেই লক্ষ্যে ইতিবাচক এবং জরুরিও বটে” ।

সত্য-মিথ্যার লড়াইয়ে , ন্যায়-অন্যায়ের প্রশ্নে আওয়ামী লীগ সরকারের বিপক্ষে বিএনপি ও জামায়াতের এই জোরালো অবস্থান সঠিক ।
কিন্তু পরিস্থিতি মূল্যায়ন, কর্মসূচী নির্ধারণ অর্থাৎ রণকৌশলে প্রচুর ভুলভ্রান্তিতে ছিল বিরোধী জোট ।

জনাব মজুমদারের ভাষায়-

“রণকৌশল যুদ্ধনীতির অংশ। চেয়ারম্যান মাও বলতেন, দশ কদম এগোনোর স্বার্থে তিন কদম পেছনে যাওয়া পরাজয় নয়, কৌশল। তা ছাড়া যুদ্ধ একধরনের ধোঁকা । প্রতিপক্ষকে ধোঁকা দিয়ে বোকা বানানো সব যুগেই রণকৌশল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। চেয়ারম্যান মাও বলেছেন, বিপ্লব ধ্বংস নয়, সৃষ্টির প্রসববেদনা। কোনটা ধ্বংস, কোনটা প্রসববেদনার বিষয় সেটা বোঝা নেতৃত্বের প্রজ্ঞার ওপর নির্ভর করে। কর্মীদের ওপর দোষ চাপিয়ে নেতৃত্ব রেহাই পেতে পারে না” ।

এই প্রজ্ঞার জায়গায় চরমভাবে মার খেয়েছে বিএনপি ও জামায়াতের নেতৃত্ব ।

সবচেয়ে বেশি বোকামীর পরিচয় দিয়েছেন জামায়াতের নেতৃত্ব । তারা তাদের সীমিত সংখ্যক নিবেদিতপ্রাণ জনশক্তিকে রাষ্ট্রশক্তির বিপক্ষে খালি হাতে যুদ্ধে নামিয়ে দিয়েছেন । গনতান্ত্রিক রাষ্ট্রে শক্তি নির্ধারিত হয় জনসমর্থন দিয়ে । জনসমর্থনের পরিমাপে জামায়াতের অবস্থান তৃতীয় বা চতুর্থ । জনসমর্থন সাকুল্যে ১০% হবে । কিন্তু বাস্তবে জামায়াত ভূমিকা নিয়েছে প্রধান বিরোধী দলের । ফলে দুর্বল ও ক্ষুদ্র প্রতিপক্ষের ওপর সোৎসাহে হামলে পড়েছে ৪০% জনসমর্থধারী দল আওয়ামী লীগ এবং আওয়ামী লীগের পরিচালনাধীন রাষ্ট্রশক্তি । শুধু আওয়ামী লীগকে হয়তো জামায়াত আন্দোলনের মাঠে টেক্কা দিতে পারবে, কিন্তু এর সাথে যে রাষ্ট্রীয় শক্তি এবং প্রতিবেশি দেশ ভারতের শক্তি যুক্ত এটাকে তাঁরা সঠিকভাবে বিবেচনায় নিতে ব্যর্থ হন । সরকারবিরোধী রাজনীতিতে জামায়াত হতে পারে সহায়ক শক্তি, মূল শক্তি নয় । মূল শক্তি হতে হলে জনসমর্থন ৪০% হতে হবে । সে কারণেই জামায়াতের অবস্থা তাই দাঁড়িয়েছে- ল্যাংড়ার রেসলিং খেলার মত ।

জনাব মজুমদার লিখেছেন-

“বুঝতে হবে দুর্গতিনাশিনী দুর্গার নাকি ১০ হাত, রাষ্ট্রশক্তির একুশ হাত। যারা রাষ্ট্রশক্তিকে চ্যালেঞ্জ করতে চান তাদেরও বাড়তি হাত থাকতে হয়। রবিনহুড, দস্যু বাহরাম, বনহুর, মাসুদ রানা কিংবা নীহার রঞ্জনের কিরিটি রায় হোন আপত্তি নেই, মাটি ও মানুষকে বশে না রেখে অথবা বিগড়ে দিয়ে কিছু হয় না, হবে না” ।

তিনি যথার্থই লিখেছেন –

“রাষ্ট্রশক্তি ও সরকারের মধ্যে যারা তফাৎ ঘুচিয়ে দেয় তারা নিজেরাই নিজেদের বিপদ ডেকে আনে। যারা সাত-পাঁচ না ভেবে, ভূতভবিষ্যৎ চিন্তা না করে রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ বাধায় তারা আহাম্মক, বোকার হদ্দ। ক’টা টাকা সঞ্চয় থাকলে যেমন বেহিসাবি হতে হয় না, তেমনি ক’গণ্ডা জনশক্তি থাকলেই রাষ্ট্রশক্তির অপব্যবহারে সিদ্ধহস্ত চিহ্নিত দুশমনদের মুখের গ্রাস বানাতে হয় না” ।

ইঙ্গিতটা যে জামায়াতের দিকে সেটা স্পষ্ট । ক’গন্ডা জনশক্তিকে বিশাল শক্তি ভেবে দুশমনের মুখের গ্রাস বানানো হয়েছে ।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরেই জামায়াত ভারতবিরোধী আন্দোলন শুরু করে । অন্য সব দল যখন চুপচাপ , তখন জামায়াত প্রত্যেক বিভাগে বিশাল বিশাল সমাবেশ ডেকে টিপাইমুখ বাঁধ বিরোধী আন্দোলনের ডাক দেয় । যে দায়িত্ব জনগন জামায়াতকে দেয়নি (মাত্র ২ টি আসনে জিতেছিল) , সে দায়িত্ব অতিউতসাহী হয়ে নিজের কাঁধে তুলে নেয় জামায়াত । দেশরক্ষার দায়িত্ব জামায়াতকে কে দিয়েছে ? এর ফলে ভারতের রোষানলে পড়ে জামায়াত । স্বল্পভাষী বলে পরিচিত ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং পর্যন্ত জামায়াতের বিরুদ্ধে মুখ খোলেন সেসময় । ফলে জামায়াতের ওপর নেমে আসে সর্বাত্মক ক্র্যাকডাউন ।

জামায়াতের জন্য দরকার ছিল জনগনের মাঝে বিনা বাধায় আরো কাজ করার । কিন্তু বিভিন্ন সময় হুদাইবিয়ার সন্ধির কথা বললেও এক্ষেত্রে জামায়াত নেতৃবৃন্দ সেকথা বেমালুম ভুলে যান । ইসলামী দল হিসেবে অন্য দলগুলোর চেয়ে ভালো হলেও রাজনীতিতে বেশিরভাগ সময় (৭১, ৭৯, ৮৬, ৯৬, ২০০৯) ভুল সিদ্ধান্ত নেয়া দল জামায়াতের কেন যেন রাজনীতির দিকেই মারাত্মক ঝোঁক !

জনাব মজুমদার লিখেছেন-

“হুদাইবিয়ার সন্ধি হয়েছিল বলেই মদিনা সনদও কার্যকর হতে পেরেছে, মক্কা বিজয়ও সম্ভব হয়েছে। বাস্তিল দুর্গ পতনের আগেই সরকার রাষ্ট্রশক্তি ও জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল” ।…

জামায়াত নিজেকে রাজনীতিতে ‘ফ্যাক্টর’ ভাবলেও বাস্তবে তা নয় । বাস্তবে জামায়াতের অবস্থা এখনো কার্টুনের মত । নিজের শক্তি-সামর্থের ব্যাপারে ভুল মূল্যায়ন জামায়াতকে ঠেলে দিয়েছে ভারসাম্যহীন ও হঠকারী কর্মপরিকল্পনার দিকে।জনাব মজুমদারের ভাষায়;

“…মোটাতাজা মানুষ আর সুস্বাস্থ্যের অধিকারী মানুষ এক নয় । অসুস্থ মানুষ, দল, সংগঠন ও প্রাণীর শরীর কার্টুনের মতো ভারসাম্যহীন। হাত চিকন, পেটমোটা, মাথা ছোট, পা শুকনো মানুষ কার্টুনসদৃশ । লক্ষ্য-উদ্দেশ্য-কর্মসূচি, কর্মপদ্ধতি ও কর্মপরিকল্পনায় ভারসাম্যহীন হলে চলে না। লক্ষ্যভেদী হতে হলে কক্ষচ্যুত হওয়া যায় না । সময় মেপে পথ চলতে হয়” ।

আওয়ামী লীগ তো হঠকারী অপরিণামদর্শী রাজনীতি করছেই , জামায়াত ও বিএনপিও কি তা করছে না ? তিনি লিখেছেন-

“সরকার ও সরকারের প্রতিপক্ষ সবাই এখন অপরিণামদর্শী ও হঠকারী কি না সবাইকে যার যার অবস্থান থেকে ভাবতে হবে” ।

কয়েকদিন আগে প্রথম আলোয় ‘জামায়াতের পাঁচটি ভুল ধারণা’ নিয়ে একটা রিপোর্ট হয় । সেখানে দেখানো হয়েছে – আওয়ামী লীগ যে এতটা ভয়ংকরভাবে মোকাবেলা করবে তা নাকি ধারণায়ই ছিলনা জামায়াত নেতাদের ! আমি মনে করি – এইটা যদি ধারণায় না থাকে , তাহলে আওয়ামী লীগের সাথে রাজনীতি করার যোগ্যতাও নেই জামায়াতের । শেষ করছি জনাব মাসুদ মজুমদারের সেই কলামের উদ্ধৃতি দিয়েই;

“বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন যারা কথামালার খই ফুটাচ্ছেন, ক্ষমতার ফুটানি দেখাচ্ছেন, তারা নিশ্চিত পরাজয়ের মুখোমুখি দাঁড়াবেন। যারা নিজেদের ওজন না মেপে কণ্টকাকীর্ণ পথ চলছেন, তারাও অস্তিত্ব বিপন্ন করবেন। যারা তামাশা দেখছেন, তারাও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বেন। শেষপর্যন্ত জনগণ জিতবেই” ।

3 Responses

  1. আবু সুলাইমান
    আবু সুলাইমান at |

    মোটাতাজা মানুষ আর সুস্বাস্থ্যের অধিকারী মানুষ এক নয় । অসুস্থ মানুষ, দল, সংগঠন ও প্রাণীর শরীর কার্টুনের মতো ভারসাম্যহীন। হাত চিকন, পেটমোটা, মাথা ছোট, পা শুকনো মানুষ কার্টুনসদৃশ । লক্ষ্য-উদ্দেশ্য-কর্মসূচি, কর্মপদ্ধতি ও কর্মপরিকল্পনায় ভারসাম্যহীন হলে চলে না। লক্ষ্যভেদী হতে হলে কক্ষচ্যুত হওয়া যায় না । সময় মেপে পথ চলতে হয়” ।

    Reply
  2. মুহম্মদ আশরাফ আজীজ ইশরাক
    মুহম্মদ আশরাফ আজীজ ইশরাক at |

    সেই অদূরদর্শীতার পরিনাম ভোগ করতে হয় মাঠকর্মীদের।

    Reply

Leave a Reply