মেধানির্ভর বনাম অভিজ্ঞতানির্ভর নেতৃত্ব

কেমন নেতৃত্ব চাই ? মেধানির্ভর নাকি অভিজ্ঞতানির্ভর ?
নেতৃত্বের জন্যে কোনটা বেশি দরকারি এবং উপকারী ? মেধা নাকি অভিজ্ঞতা ?

বহুদিন থেকে বাংলাদেশের ছাত্রসংগঠন গুলোতে মেধার চেয়ে ‘অভিজ্ঞতা’ বেশি মূল্য পেয়ে আসছে । ইসলামি সংগঠনেও পড়েছে তার ছাপ । ক্যারিয়ারের বারোটা বেজে গেছে, তবু আছে ‘নেতৃত্ব’ ।
পড়াশোনা কম করা যেজন, সেজনই দেন নেতৃত্ব । ফলে অবস্থা দাঁড়ায় যা- তাকে বলা যায় ‘দুষ্টচক্র’ ।
মেধাবীরা ভালো রেজাল্ট করে , বিভিন্ন জায়গা থেকে তাদের চাকরির অফার আসে- তারা চলে যায় । থেকে যান ‘ড্রপ’ দেয়া , দীর্ঘদিন ধরে দলের কাজ করতে করতে ‘অভিজ্ঞ’ হয়ে যাওয়া ছাত্র । যার সাধ্য নেই কারো সাথে আধাঘন্টা ডিবেট করার, সামর্থ্য নেই ভালো সাবজেক্টে পড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্রটির সামনে দাঁড়িয়ে তাঁকে কনভিন্স করার, সামর্থ্য নেই প্রস্তুতি ছাড়া ইংরেজীতে আধা ঘন্টার একটা বক্তৃতা করার, সামর্থ্য নেই আগামী দিনের রাজনীতি ও সমাজব্যবস্থার ব্যাপারে বাস্তবসম্মত একটা মূল্যায়ন দাড় করানোর, সামর্থ্য নেই এক পৃষ্ঠার একটা মানসম্মত আর্টিকেল লেখার ।

সিনিয়রকে ডিঙ্গিয়ে , ‘অভিজ্ঞ’ জনকে টপকিয়ে তো আর কাউকে নেতৃত্বে আনা যাবেনা- যতই মেধাবী হোক ! একটা প্রটোকল আছে না ? চেইন বা সিঁড়ি আছে না ? মেধাবীরা অপেক্ষা করতে না পেরে একদিন চুপচাপ সিঁড়ির গোড়া থেকেই চলে যায় , যারা সিঁড়ির রেলিং ধরে থাকতে পারেন তারা একদিন চলে যায় ‘নেতৃত্বে’ ।
চলতে থাকে দুষ্টচক্র ।

অভিজ্ঞতা কীভাবে আসে ? কাজে ঠেকে ঠেকে । একটা কাজ একই নিয়মে করতে করতে তৈরি হয় ঐ বিষয়ের অভিজ্ঞতা ।
কিন্তু রাজনীতিতে, জনশক্তি পরিচালনায় , প্রতিপক্ষ মোকাবেলায়, নতুন কর্মসূচী প্রণয়নে- অভিজ্ঞতার চেয়ে মেধা বেশি কাজে লাগে । অভিজ্ঞতানির্ভর নেতার সামনে যখন এমন কোন সমস্যা আসে যে পরিস্থিতিতে তিনি আগে কখনো পড়েননি – তখন তিনি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যান । পথ খুঁজে পান না । হয়ে পড়েন সিদ্ধান্তহীন ।

মেধানির্ভর নেতৃত্বকে কাজে ঠেকে ঠেকে অভিজ্ঞতা পেতে হয়না । তিনি অভিজ্ঞতা পান দেখে , গন্ধ শুঁকে , পুরনো ইতিহাস জেনে এবং বিশ্লেষণ করে । জ্ঞান তাঁকে পথ চেনায় । নতুন পরিস্থিতি তাঁকে সিদ্ধান্তহীন করে দেয় না , বাতলে দেয় নতুন পথ । নতুন পরিস্থিতি মোকাবেলায় তিনি বের করেন অভিনব সব পন্থা ।

অভিজ্ঞতানির্ভর নেতৃত্বের চিন্তা থাকে – কোনমতে উত্তরাধিকারসুত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণ ।
নতুন পথের সন্ধান, নতুন কর্মপন্থা তাঁর কাছে পাওয়া যায় না ।

মেধানির্ভর নেতা প্রতিনিয়ত নতুন সব উপায় বের করেন মানুষের কাছে আদর্শ তুলে ধরার , প্রাপ্ত উত্তরাধিকার রক্ষা নয়- তাকে বহুগুণে বৃদ্ধি করাই হয় তাঁর লক্ষ্য ।

কতজনকে দেখেছি অকালে চলে যেতে , আর দীর্ঘশ্বাস ছেড়েছি । যারা দারুণ সব কর্মপন্থার কথা ভাবতেন , স্বপ্ন দেখতেন তাঁদের দেখেছি সিঁড়ির গোড়া থেকেই চলে যেতে । জিজ্ঞেস করেছি, ‘কেন যাচ্ছেন ?’ কাতর কন্ঠে অনুরোধ করেছি- ‘ভাই, থেকে গেলে হয় না ?’ জবাব পেয়েছি- ‘চিন্তা করবেন না, এটা একটা সফটওয়ারের মত । লক্ষ্যে পৌঁছুক আর না পৌঁছুক-আল্লাহর ইচ্ছায় টিকে থাকবে’ ।
আমি মনে মনে ভেবেছি ‘টিকিয়া থাকাই কি চরম স্বার্থকতা ? অতিকায় হস্তি লোপ পাইয়াছে , কিন্তু তেলাপোকা টিকিয়া রহিয়াছে’ ।
কেউ কেউ সিঁড়ির দিকে ইঙ্গিত করেছেন । এত ভালো রেজাল্ট, ক্যারিশমাটিক চিন্তাধারা, ক্যারিয়ারের হাতছানি ভুলে যদিবা থেকেও যান- কে জানে একদিন প্রশ্ন তোলা হবেনা ‘নেতৃত্বের লোভে রয়ে গেছে !’

মনটা খচ খচ করে- লক্ষ্য অর্জনের পথে যদি এগোতে না পারলাম, তেলাপোকা হয়ে থাকার কী দরকার ?

মাঝে মাঝে দুয়েকজন হয়তো ডিঙ্গিয়ে গেছেন সিঁড়ি, আর সংগঠন তার কাজেকর্মে – চিন্তাধারায় এগিয়ে গেছে বহুদূর । আবার এসেছে বন্ধ্যাত্ব । সেই ‘উত্তরাধিকার রক্ষা’র সীমাবদ্ধ প্রচেষ্টা । অভিজ্ঞতার জাবর কাটা নেতৃত্ব – যার সামর্থ্য নেই একটা নতুন প্রজেক্ট হাতে নেয়ার , জনতার সামনে একটা সুন্দর প্ল্যান তুলে ধরার ।

স্বপ্ন মরে নি । আজও স্বপ্ন দেখি ‘শুনলাম ও মেনে নিলাম’ নয়- প্রতিটি সিদ্ধান্ত আসবে একেকটা প্রজেক্ট আকারে- হবে বিতর্ক, হবে চুলচেরা বিশ্লেষণ । আর এভাবে একদিন জাহেলিয়াতের সমস্ত চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করে প্রতিষ্ঠিত হবে ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব ।

2 Responses

  1. এম এন হাসান
    এম এন হাসান at |

    অভিজ্ঞতাকে মেধার বিপরীতে দাঁড় করিয়ে উদ্ভুত সমস্যার সমাধান হবেনা কেননা অভিজ্ঞতা ও মেধা একে অপরের পরিপূরক, প্রতিদন্ধি নয়।সমস্যার গোড়াটা অন্য জায়গায়।সমস্যাটা সিস্টেমে।সিস্টেম তৈরি হয়েছিল মানুষকে পরিচালনা করে কালেক্টিভ এফোর্টের মাধ্যমে একটি লক্ষ্যে পৌঁছানো কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সেই সিস্টেম এখন মানুষকে গিলে ফেলেছে।এখন সিস্টেমের দোহাই দিয়ে মানুষ নীতি, নৈতিকতাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখায়, তেমনি সিস্টেমও এক সময় প্রতিশোধ নেয়।সিস্টেম প্রতিশোধ নিয়েছে যারাই সাবেক হয়েছে তাদের উপর।বাদ যায়নি মাওলানা মওদুদী, গোলাম আযমরা কেউই সেই প্রতিশোধ থেকে।সাহস থাকলে সিস্টেম পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেন। ধন্যবাদ

    Reply

Leave a Reply