রাজনীতিতে রাজনীতিবিমুখ সমর্থকের গুরুত্ব বোঝা জরুরী

একটি রাজনৈতিক দল বা একটি আন্দোলন সফল করার জন্য শুধু কর্মীই যথেষ্ট নয় । কর্মী যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন রাজনীতিতে অসক্রিয় সমর্থক গোষ্ঠি । কর্মীরা দলের কর্মসূচী বাস্তবায়ন করবে- কিন্তু রাজনীতিবিমুখ সমর্থকের কাছে শুধু এতটুকু আশা করা উচিৎ যে- তারা বলবেন ‘এরা ভালো, ওরা খারাপ’ , অথবা ‘ওদের চেয়ে এরা ভালো’ ।

সব মানুষ কর্মী হয়না , কিছু মানুষের জন্মগত বৈশিষ্ট্যই থাকে ডানপিটে-প্রতিবাদী-সংগ্রামী । তারাই কর্মী হয়, নেতা হয় । সেজন্যই আমরা দেখি বিশ্বের রাজনীতিতে নেতাদের রাজনীতির ইতিহাস অনেকটা কৈশোর থেকেই ।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সক্রিয় কর্মী এবং অসক্রিয় সমর্থক গোষ্ঠী উভয় দিক থেকে সামঞ্জস্যপুর্ণতায় এগিয়ে আছে আওয়ামী লীগ । আওয়ামী লীগের যেমন আছে নিবেদিত কর্মী, তেমনি আছে রাজনীতিতে অসক্রিয় সমর্থক ।

বিএনপি পিছিয়ে আছে সক্রিয় কর্মীর দিক থেকে । বিএনপির অসক্রিয় সমর্থক আছে অনেক, কিন্তু রাজনৈতিক কর্মসূচী বাস্তবায়নের জন্য সক্রিয় নিবেদিত কর্মী অপ্রতুল ।

ইসলামী দলগুলোর মধ্যে জামায়াতের সক্রিয় ও নিবেদিত কর্মী যথেষ্ট , কিন্তু রাজনীতিবিমুখ বা অসক্রিয় সমর্থক আছে কম । জামায়াতের বাইরে অন্য দলগুলোর সক্রিয় কর্মী এবং রাজনীতিবিমুখ ও অসক্রিয় সমর্থক কোনটাই নেই । আসলে তাঁদের এমন কোন কর্মসূচী কিংবা কর্মপদ্ধতিই নেই যা সক্রিয় কর্মী অথবা অসক্রিয় সমর্থক তৈরি করে ।

ইসলামী দলগুলোর ভেতর কেন যেন রাজনীতিবিমুখ ও রাজনীতিতে অসক্রিয় জনগনের প্রতি এক ধরণের উপেক্ষা-অবহেলা ও উদাসীনতার মনোভাব দেখা যায় । তারা আছেন কর্মীবাহিনী নিয়ে , রাজনীতির যত কথা কর্মীদের জন্য । জনগনের জন্য তারা একটাই কাজ করেন- সেটা হলো ‘সুরেলা কন্ঠে ওয়াজ’ ।

এই মনোভাব থেকে বেরিয়ে এসে রাজনীতিবিমুখ ও অসক্রিয় মানুষকে গুরুত্ব দেয়া শিখতে হবে । দশজন কর্মীই হয়তো যথেষ্ট, কিন্তু দশজন অসক্রিয় সমর্থক যথেষ্ট নয় । অসক্রিয় সমর্থক হতে হবে অগুনতি ।

গত ৮-১০ বছরে এই ক্ষেত্রে জামায়াতের বেশ উন্নতি হয়েছে । কিন্তু জামায়াতের জন্য সমস্যা হচ্ছে ‘ছিদ্র’ । জামায়াত একটি শক্ত বোতল, কিন্তু এর তলায় একটি ছিদ্র আছে – যে ছিদ্র দিয়ে জামায়াতের অর্জনগুলো বেরিয়ে যায় । ছিদ্র- ’৭১ । ৪০ বছর ধরে ৭১ ইস্যুতে জামায়াতের বিরুদ্ধে ক্রমাগত প্রচারণা চালানো হয়েছে সব মাধ্যম ব্যবহার করে । পাকিস্তানি বাহিনীর সকল অপকর্মের দায় চাপানো হয়েছে জামায়াতের ওপর । অথচ সেই সময় যত মানুষ রাজাকারে ছিল তার ১% এর বেশি জামায়াত ছিলনা । বাকিরা ছিল মুসলিম লীগ,আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য স্বার্থান্বেষী লোকজন । কিন্তু জামায়াত মাঝে মাঝে মিউ মিউ করে ‘আমরা অপরাধ করিনি’ বলা ছাড়া বাকি সময় মুখে কুলুপ এটে ছিল । জামায়াতের ভূমিকা কী ছিল- কী ছিলনা, কেন জামায়াতকে দোষী বলা উচিৎ হবে না , নেতাদের অবস্থান কী ছিল-কী করেছেন এসব বিষয়ে তেমন কোন বই লেখা হয়নি , সাক্ষাৎকার হয়নি । ফলে যা হবার তাই হয়েছে – দলে দলে মানুষ আদর্শের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে , কিন্তু সেই ছিদ্র দিয়ে চুইয়ে চুইয়ে পড়ে গেছে আবার । রয়ে গেছে অল্প কিছু যারা দেয়াল আঁকড়ে ধরেছে আর যারা মোটাসোটা, ছিদ্র দিয়ে বেরুনো অসম্ভব ।

হেফাজতে ইসলাম সফল হবে না , কারণ তারা রাজনীতি বোঝে না । তাদের রাজনৈতিক সংগঠক সক্রিয় কর্মীবাহিনী নেই – শুধু হুজুগে সমর্থক দিয়ে কোন ভাল ফল বা সফলতা আশা করা যায় না ।

ইসলামী রাষ্ট্র গঠন বলি আর ক্ষমতায় যাওয়াই বলি- সক্রিয় কর্মীর সাথে অসক্রিয় সমর্থক গোষ্ঠীর অনিবার্য প্রয়োজন আছে । এই বিষয়টা বুঝতে হবে । আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য নীতি-আদর্শের ব্যাপক প্রচারণা ও কর্মসূচী বাস্তবায়ন , মানুষের মনের কথা বলা এবং বিরোধী প্রচারণার জবাব দিয়ে- ছিদ্র বন্ধ করে রাজনীতিবিমুখ ও রাজনীতিতে অসক্রিয় সমর্থক সৃষ্টির কোন বিকল্প নেই ।

One Response

  1. আহমদ মুসা
    আহমদ মুসা at |

    খুব সলিট একটা বিষয় নির্দিষ্ট করেছেন ।

    Reply

Leave a Reply