বাংলাদেশে ইসলামী দলের ভ্রান্তি ও বিপদ

বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী এবং আরো কয়েকটি দল ইসলামী শাসনব্যবস্থা চালুর জন্য কাজ করছে । কিন্তু একটা বিষয়ে তারা ভুল অনুসিদ্ধান্তের ওপর দাঁড়িয়ে আছেন ।

জামায়াতের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠাতা সাইয়েদ আবুল আলা মওদূদী (রঃ) এবং অধ্যাপক গোলাম আযমের চিন্তা এরকম ছিল । তিনি বলেন,

দেশের মানুষ ইসলাম চায়, নেতৃত্বই সমস্যা…..।

প্রয়োজন শুধু নেতৃত্বের এবং যোগ্যতার । এবং এই চিন্তাধারায় প্রভাবিত জামায়াতের অনেক নেতা ও দায়িত্বশীল কর্মী ।

আসলে কি তাই ? আসলে এই উপমহাদেশের মানুষ ইসলামকে ভালো করে বোঝেই না, চাওয়াতো দূরের কথা।

সত্যিকারার্থে বাংলাদেশের মানুষ যে ইসলাম চায় তা হলো তা হলো ‘ধর্ম’ ইসলাম , দ্বীন ইসলাম নয় । অনেক ক্ষেত্রে তারা ইসলামকে দ্বীন হিসেবে চেনেই না । পুর্ণাংগ জীবন বিধান হিসেবে তারা ইসলামকে বোঝেনা এবং চায়ও না । পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, রোজা , হজ্জ । শুক্রবারের নামাজ , আশুরা, শবে কদর , শবে বরাত, ঈদের নামাজ, কুরবানী করে গোশত খাওয়া এগুলোই হলো কাম্য ইসলাম ।

রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় যাকাত, ইসলামী উত্তরাধিকার আইনের সঠিক বাস্তবায়ন, সুদ ও সকল দুর্নীতির মূলোৎপাটন , ইসলামের দণ্ডবিধির সঠিক বাস্তবায়ন , জিহাদের বাধ্যবাধকতা , সমাজের সর্বস্তরে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি ইসলামের মৌলিক বিষয়ে বেশিরভাগ মানুষের তেমন জ্ঞান নেই । গীবত , পরনিন্দা , অপবাদ ইত্যাদি আচরনগত বিধিবিধানের ব্যাপারেও রয়েছে অজ্ঞতা ও উদাসীনতা ।

ইসলামের রাজনৈতিক দিক নিয়ে সত্যিই চরম কুধারণা আছে জনগনের মধ্যে । তাদের অনেকেই ইসলামের জন্য বা ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনীতিকে ভণ্ডামী মনে করে থাকে ।

ইসলাম প্রতিষ্ঠা মানে সাধারণ মানুষের এবং প্রচলিত ইসলামী দলের অনেক কর্মীর ধারণা হলো –

১।

ইসলামী সরকার ক্ষমতা নেয়ার পরদিনই সকল গার্লস স্কুল , মহিলা কলেজ বন্ধ করে দেয়া হবে । কালো বোরকা পড়ে রাস্তায় বের না হলে পুলিশ দিয়ে ঠেঙ্গাবে । মহিলাদের ঘর থেকে বের হওয়াটাই বন্ধ করে দেবে । পুরুষদের একাধিক বিয়ে করতেই হবে ইত্যাদি ইত্যাদি ।

২।

সকল সিনেমা হল একযোগে বন্ধ করে দেয়া হবে । গান নাটক সিনেমার সকল বই সিডি ক্যাসেট খুঁজে খুঁজে ধ্বংস করে ফেলা হবে । বিনোদন বলতে কিছু থাকবে না ।

৩।

দেশে হিন্দু বৌদ্ধ দের ধরে ধরে কচুকাটা করা হবে । কিংবা তাদের দ্বিতীয় তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে থাকতে হবে ।

৪ ।

কেউ চুরি করেছে শুনলেই ধরে খচ করে দুই হাত কেটে দেয়া হবে । ছেলেমেয়ে একসাথে চলতে দেখলেই ধরে দোররা মারা হবে । ব্যভিচার বা ধর্ষণের অভিযোগ উঠলেই ধরে এনে পুতে ফেলা হবে । পাথর মেরে সঙ্গেসার করে দেয়া হবে ।

একজন তো অভিযোগ তুলেছে , সাঈদী এমপি ছিল , কই একটা সিনেমা হলও বন্ধ করেনাই । আবার ইসলামের কথা কয় !

মাদ্রাসার ছাত্ররাই রাস্তায় নেমে শ্লোগান তুলবে , সরকারের ১ বছর হয়ে গেল । এখনো একজনকেও রজম করা হলো না । এই সরকার ইসলাম বাস্তবায়ন করছে না ।

বিগত জোট সরকারে জামায়াতের দুজন মন্ত্রী (৬৪ জনের মধ্যে দুইজন !) থাকায় এই প্রশ্ন অনেককেই করতে শুনেছি যে , কী করেছে ওরা সরকারে গিয়ে ? ইসলামের একটা আইনও এস্টাবলিশ করে নাই । ইসলামের নামে ওরা আসলে শুধু ক্ষমতা পেতে চায় ইত্যাদি ।

ইসলামী দলগুলো ইসলাম কায়েমের কথা বলে । কিন্তু ইসলাম কায়েম হলে জনগন বাস্তব জীবনে কীভাবে উপকৃত হবে তা তারা ঠিকমত উপস্থাপন করতে পারেনি । এবং এটা জনগনের সামনে উপস্থাপন করে জনগনকে বোঝানোর মত বাস্তবসম্মত কর্মসূচীও দেখা যায় না ।

মানুষকে অবশ্যই তার লাভ দেখাতে হবে । এটা আল্লাহর সুন্নাত । কুরআনুল কারীমে যেখানেই কোন নির্দেশ দেয়া হয়েছে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেখানেই তার পুরস্কার হিসেবে জান্নাতের কথা বলা হয়েছে । জান্নাতের মনোরম বর্ণনাও দেয়া হয়েছে ।

কিন্তু ইসলামী দলগুলো জনগনকে বাস্তব লাভ দিতেও ব্যর্থ হয়েছে এবং লাভের স্বপ্ন দেখাতেও ব্যর্থ হয়েছে । সেদিক থেকে অন্যান্য দলের নেতারা দুটোই করতে সক্ষম হয় । তারা নির্বাচনের আগে মানুষকে অনেক উজ্জ্বল ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখায় । কালভার্টের টাকা লুটেপুটে খেলেও নির্বাচনের আগে হাতে হাতে নগদ টাকা ধরিয়ে দেয় । প্রচুর চা , বিড়ি খাওয়ায় । কর্মীদের বিরিয়ানি খাওয়ায় । ফলে ভোট তাদের মার্কাতেই পড়ে ।

ইসলামী দলগুলো ভোটের আগে টাকা দিতে গেলেও বিপদ । জনগন টাকা নেয় , কিন্তু ভোট দেয়না । কারণ জনগন এটাকে ইসলামী দলের আদর্শচ্যুতি মনে করে । ইসলামের কথা কয় , আবার টাকা দিয়া ভোট কিনতে আসছে , বেটারা ভন্ড !

তাহলে করণীয় কী ?

উপরের আলোচনা থেকে কিছু অংশ আবার উল্লেখ করছি ।
১।

অনেক ক্ষেত্রে তারা ইসলামকে দ্বীন হিসেবে চেনেই না । পুর্ণাংগ জীবন বিধান হিসেবে তারা ইসলামকে বোঝেনা এবং চায়ও না । রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় যাকাত, ইসলামী উত্তরাধিকার আইনের সঠিক বাস্তবায়ন, সুদ ও সকল দুর্নীতির মূলোৎপাটন , ইসলামের দণ্ডবিধির সঠিক বাস্তবায়ন , জিহাদের বাধ্যবাধকতা , সমাজের সর্বস্তরে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি ইসলামের মৌলিক বিষয়ে বেশিরভাগ মানুষের তেমন জ্ঞান নেই । গীবত , পরনিন্দা , অপবাদ ইত্যাদি আচরনগত বিধিবিধানের ব্যাপারেও রয়েছে অজ্ঞতা ও উদাসীনতা ।

ইসলামের রাজনৈতিক দিক নিয়ে সত্যিই চরম কুধারণা আছে জনগনের মধ্যে ।

২।

ইসলাম কায়েম হলে জনগন বাস্তব জীবনে কীভাবে উপকৃত হবে তা তারা ঠিকমত উপস্থাপন করতে পারেনি । এবং এটা জনগনের সামনে উপস্থাপন করে জনগনকে বোঝানোর মত বাস্তবসম্মত কর্মসূচীও দেখা যায় না ।

মানুষকে অবশ্যই তার লাভ দেখাতে হবে । এটা আল্লাহর সুন্নাত । কুরআনুল কারীমে যেখানেই কোন নির্দেশ দেয়া হয়েছে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেখানেই তার পুরস্কার হিসেবে জান্নাতের কথা বলা হয়েছে । জান্নাতের মনোরম বর্ণনাও দেয়া হয়েছে ।

এই সমস্যাটিকে মোকাবেলার জন্য দলীয় দাওয়াত নয় , ব্যাপকভিত্তিক , বৃহৎ পরিসরে জ্ঞানের প্রসারের ব্যবস্থা করতে হবে । দলীয় ব্যানারে নয় – স্রেফ একটা মিশনারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে । হতে পারে কোন এনজিও হিসেবেও । ইসলামের জ্ঞান ছড়িয়ে পড়লে , মানুষ সচেতন হলে কোন সংগঠনের দাওয়াত দেয়া লাগবে না । মানুষ নিজেরাই যার যার স্থান থেকে কাজ শুরু করে দিবে ইসলামের প্রতিষ্ঠার জন্য ।

সোমবার, সেপ্টেম্বর 10, 2012

Leave a Reply