উপজেলা নির্বাচনে যে কারণে জামায়াত বেশি ভোট পেল

সরকার নানাভাবে চরম কোণঠাসা করে রাখার পরেও উপজেলা নির্বাচনে কী করে জামায়াত এত ভোট পেল ? এই নিয়ে চলছে জল্পনা কল্পনা । জামায়াতের সমর্থক-জনশক্তিরা অনেক কষ্টের ভেতর, হতাশার ভেতর পেয়েছেন আশার আলো । নতুন করে আত্মবিশ্বাস বেড়েছে তাদের । অপরদিকে আওয়ামী লীগ এবং বামদলগুলো কিছুটা হতবাক । হাসানুল হক ইনু বলেছেন – জনগন কেন জামায়াতকে ভোট দিয়েছে জনগনই জানে ।

এ ব্যাপারে সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ ব্যাপারটি হলো , জামায়াত এবার অনেক বেশি ‘ভাসমান ভোট’ পেয়েছে । এমনিতে জামায়াতের সমর্থকগোষ্ঠী অনেকটাই নির্দিষ্ট । সাধারণত একটা বিশাল অংকের ভোট থাকে ‘ভাসমান’ । সেই ভোট নির্ভর করে ব্যক্তির জনপ্রিয়তা, বিরোধী প্রার্থীর জনবিচ্ছিন্নতা, সমসাময়িক বিভিন্ন ইস্যু ইত্যাদির ওপর । এইসব দিক থেকে এবার জামায়াত অনেক বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে ।

একটা বিষয় হলো আওয়ামী লীগের বিরোধিতা । আওয়ামী লীগযে নাস্তিকদের সমর্থক, নবী-রাসুল (আঃ) দের গালিগালাজ করা বিকৃত মানসিকতার ব্লগারদের লালনকারী, নাস্তিক ব্লগারকে ‘শহীদ’ ঘোষণাকারী এটা এখন গ্রামের সাধারণ কৃষকও জানে । প্রত্যেক মসজিদে- মাহফিলে এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে । চায়ের দোকানে আলোচনা হয়েছে । মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে আছে এই কথা । মানুষ এটাকে ভুলতে পারেনা , হয়তো ভুলবেওনা ।

৫ইমে ২০১৩র রাতে ঢাকায়, শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের শান্তিপুর্ণ সমাবেশে বর্বরোচিত হামলা চালিয়ে যে গনহত্যা চালানো হয়েছিল – সেই রক্তের দাগ মানুষের মনে রয়ে গেছে । আমি দেখেছি – সাধারণ মানুষকে কাঁদতে, আফসোস করতে । আলেম ওলামা হত্যাকারি হিসেবে আওয়ামী লীগকে চিহ্নিত করেছে দেশের মানুষ । এই দাগ হয়তো আওয়ামী লীগ সহজে মুছতে পারবে না । যে একবার ৫ই মে’র বিভীষীকাময় সে রাতের গনহত্যার ভিডিও দেখে , মুহুর্মুহু গুলির ভেতর আলেম-অলামাদের জবাইকৃত গরুর মত কাতরাতে দেখেছে সে আওয়ামী লীগকে আর ভোট দেবে না নিশ্চিত করে বলা যায় । সেটি একটি বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করেছে এই নির্বাচনে ।

যেসব এলাকায় জিতেছে , প্রায় প্রতিটি এলাকায় বিরোধী দলের- বিশেষ করে জামায়াতের কেউ না কেউ আওয়ামী লীগ অথবা পুলিশের দ্বারা হত্যার শিকার হয়েছে । টিভি- পত্রিকায় সারাদিন যাই বলা হোকনা কেন , মানুষ চোখের সামনে যা দেখেছে সেটাকে তো অস্বীকার করতে পারেনা । গ্রামের মানুষ সবাই বিভিন্নভাবে পরস্পরের সাথে সম্পর্কিত । শহরের মত পরস্পরবিচ্ছিন্ন নয় । একজনের সুখে দুঃখে আরেকজন মিশে যায় ।

জামায়াতের নেতাকর্মীরা অমানবিক জীবন কাটাচ্ছে । তারা নিজেদের ঘরে থাকতে পারে না , শান্তিতে দুবেলা দুমুঠো খেতে পারেনা । পরিবারের সাথে সময় কাটাতে পারেনা । যেসব এলাকায় জামায়াতের কোন নেতা বা সক্রিয় কর্মী আছে (প্রায় প্রত্যেক এলাকাতেই কেউ না কেউ আছে ) সেসব এলাকার প্রতিটি মানুষের চোখে আতংক । আতংকের নাম যৌথবাহিনীর অভিযান , অভিযানের নামে লুটপাট ভাংচুর শ্লীলতাহানি । আর কাউকে ধরে নিয়ে গেলে দু-একদিনের মধ্যে লাশ পাওয়ার সম্ভাবনা । যৌথবাহিনী অভিযান চালিয়ে দাড়ি-টুপি দেখে ওলামা লীগের ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাকে পর্যন্ত গ্রেপ্তার করেছে , আওয়ামী লীগের স্থানীয় কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে । জামায়াত ভেবে তাদেরও মামলা দেয়া হয়েছে অজামিনযোগ্য ধারায় ।
এই অবস্থায় আওয়ামী লীগের বিপক্ষে মানুষ যাকেই পাবে তাকেই ভোট দেবে । সেখানে যদি নির্যাতিত জামায়াতের লোক হয় তাহলে ভোট দিয়ে অন্তত সহানুভূতি না জানানোর কোন কারণ নেই ।
আর অনেক প্রচার-অপপ্রচার থাকলেও জামায়াতের লোকেরা ব্যক্তিগত জীবনে সৎ এবং ভালোমানুষ এটা সবাই স্বীকার করেন । কিন্তু আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির নেতাদের বিরুদ্ধে সবজায়গাতেই কমবেশি দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে ।
এছাড়া এই সময়ে জনগনের পক্ষে, ইসলামের পক্ষে রাজনৈতিক ভুমিকা পালন করায় এগিয়ে ছিল জামায়াত । প্রধান বিরোধী দল হিসেবে বিএনপির কাছে মানুষের যে প্রত্যাশা ছিল – তাতে জনগন অনেকাংশেই হতাশ হয়েছে ।
সেজন্য নির্ধারিত ভোটের বাইরেও এবার ভাসমান ভোট পেয়েছে জামায়াত অনেক বেশি ।

জামায়াতের জন্য যেটা চিন্তার বিষয়- সেটা হলো বেশ কিছু উপজেলায় গতবারের জামায়াত চেয়ারম্যান হেরেছে । কেন হেরেছে ? হতে পারে আগে থেকে সরকারের নজর থাকায় কারচুপি হয়েছে । অথবা জামায়াতের চেয়ারম্যান জনগনের আশা আকাংখা পুরণ করতে পারেনি ।

আসল প্রশ্ন যেটা সবার মনে ঘুরছে- সেটা হলো ‘জামায়াতের কি জনসমর্থন বেড়েছে ?’ এই প্রশ্নের সহজ উত্তর নেই, কতটুকু সমর্থন বেড়েছে এখনই সেটা নিশ্চিত করে বলা মুশকিল । এটা নিশ্চিত যে – সহানুভূতি বেড়েছে । সহানুভূতির সাথে সমর্থনও বেড়েছে, এটা ভোটেই প্রমাণিত হয়েছে । তবে এই সমর্থন অনেকটা সাময়িক প্রতিক্রিয়া । এই সহানুভূতিকে প্রকৃত সমর্থনে পরিণত করতে হলে জামায়াতকে আরো গণমূখী হবার বিকল্প নেই । এছাড়াও সেজন্যে জামায়াতকে ৭১সহ তাদের সম্পর্কে যেসব প্রশ্ন আছে তা জনগনের সামনে পরিস্কার করতে হবে । দীর্ঘমেয়াদে ভাসমান সমর্থন, প্রতিক্রিয়ামূলক বা সহানুভূতিমূলক সমর্থন খুব বেশি কাজে আসবে না । জামায়াতের মত আদর্শবাদী দলের জন্য আদর্শিক সমর্থন বেশি জরুরী ।

One Response

  1. সাজ্জাদুর রহমান
    সাজ্জাদুর রহমান at |

    “দীর্ঘমেয়াদে ভাসমান সমর্থন, প্রতিক্রিয়ামূলক বা সহানুভূতিমূলক সমর্থন খুব বেশি কাজে আসবে না । জামায়াতের মত আদর্শবাদী দলের জন্য আদর্শিক সমর্থন বেশি জরুরী।”

    খুবই গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। নির্বাচনে ভাল ফলাফল করে এখন এই মৌলিক বিষয়টি ভুলে না গেলেই হলো।

    Reply

Leave a Reply