জামায়াতের রাজনীতির পোস্টমর্টেম ও আগামীর পথচলা – পর্ব -২

 পর্ব – ১

যে বিষয়গুলোর দৃষ্টি আকর্ষন
১) ইসলামী রাষ্ট্র আর মানব কল্যাণ দুটি আলাদা জিনিষ –
আলোচিত সাক্ষাৎকারে মানুষের কল্যাণ করা আর ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা দুটি আলাদা বিষয় হিসাবে পেশ করা হয়েছে।পরামর্শ দেয়া হয়েছে ভারতের বিজেপির সাথে বজরং দল সহ আরএসএসর।

আমার কাছে এটা হচ্ছে প্রথম সমস্যা।অবশ্য তা চিন্তার ক্ষেত্রে। উদাহরণ হিসাবে হিলফূল ফুজুল এর নাম নেয়া হয়েছে। প্রথমত – হিলফূল ফূজুল প্রতিষ্ঠানটা রাসূল (সঃ) এর নবুয়ত পূর্ব সামাজিক প্রচেষ্টা। পূর্ব থেকেই এই চিন্তাটা ছিল মক্কায়। জাহেলী যুগের ছয় জনের নামের সাথে মিলিয়ে হিলফূল ফূজূল রাখা হয়েছিল। রাসূল (সঃ) এই প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নেবার পর এটাকে একটি সাংগঠনিক এবং সামাজিক তথা সামগ্রিক রুপ দান করেন।তখনকার মক্কার গোটা পরিবেশের ওপর এর প্রভাব পড়ে। কিন্তু এই সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনের কোন প্রকার সফল চেষ্টা হয় নাই। সমাজ সেবা একটি দিক আর সমাজ পরিবর্তন করে একটি কল্যাণমূখী ব্যবস্থা স্থাপিত করা ভিন্ন বিষয়। যা হিলফূল ফুজুল দিয়ে সম্ভব হয় নাই।
এবং এটা ইতিহাস- নবুয়ত লাভের পর বা প্রায় তিন থেকে আড়াই বছর পূর্ব থেকে রাসূল (সঃ) নিজেও এই সামাজিক সংগঠনে তেমন সক্রিয় ছিলেন না।

২য় বিষয় হল – নবুয়ত পাবার পর মক্কাতে ১৩ বছর আর মদিনায় ১০ বছর হিলফূল ফুজুলের মত প্রতিষ্ঠান হয়নি। অবশ্য ব্যক্তিগত জীবনে রাসূল সহ মুহাজীর আনসার সাহাবীরা সবাই ছিলেন একেকজন মানব কল্যাণে – সেই সময়ে সবার চেয়ে অগ্রসর এবং নিবেধিত।
একটি ঘটনা বলা যেতে পারে। এটি বর্ণনা করেছেন মা খাদিজা (রাঃ) নিজে। তখনো নবুয়ত লাভ করেন নি। নির্জনতা রাসূলের স্বভাবে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।তখন ও তিনি হেরা গুহাতে যাতায়াত শুরু করেন নি।ঐ সময় মক্কাতে মঙ্গা চলছিল।
একদিন রাসূল বাহির থেকে এসে সোজা কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লেন। মা খাদিজা রাসূলের চেহারা দেখে বূঝতে পারেন,রাসুলের মন খারাপ। চেহারাতে তা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। মা খাদিজা আলতো মাথায় হাত দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, হে আবুল কাসিম – আপনার কি হয়েছে? কেন আপনাকে এত বিচলিত দেখা যাচ্ছে। আমাকে খুলে বলূন। রাসূল (সঃ) কেঁদে ফেললেন। বললেন, খাদিজা আমি যে দৃশ্য দেখে আসলাম তা বরদাশত করতে পারছি না-দেখলাম ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চারা খাদ্যের অভাবে ছটফট করছে। আমি পাশ দিয়ে চলে আসলাম।অথচ তাদেরকে কিছুই সাহায্য দিতে পারলাম না।

খাদিজা বললেন, হে রাসূল (সঃ) আপনি মন খারাপ করবেন না। একটু অপেক্ষা করুন। খাদিজা মক্কার টপ টেন ব্যবসায়ীদের একজন। তার ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যে যারা বন্ধু ছিল। তাদের সবাইকে ডাকলেন। এদের মধ্যে আবুবকর,আব্দুর রহমান ইবনে আউফ,ওয়ারাকা ইবনে নওফেল সহ আরো অনেকেই। খাদিজা সবাইকে আহব্বান করলেন -দুস্থ মানবতার জন্য সাহায্য করতে। খাদিজার ঘরে সিরিয়াতে ব্যবসায়ী ট্যূরে পাঠাবেন,এমন সব মালামাল ছিল।সব রাসূলের সামনে হাজির করলেন। অবস্থা এমন হল – যে সবার অংশগ্রহনে মালামালের বিরাট স্তুপে পরিণত হল।

খাদিজা বলেন – হে আবুল কাসিম – আপনার সামনে যা সম্পদ দেখছেন। তা সবই আপনার।যাকে যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে সাহায্য করুন।
মা খাদিজা বলেন – রাসূল আমার বিপরীতে বসা ছিলেন- জমাকৃত সম্পদ দেখে রাসূলের মুখে হাঁসি ফূটে উঠলো। আমি খুবই খুশি হলাম। আমি নিজে – আবুবকর সহ সবাই রাসুলের দেখা ঐ বাচ্ছাগুলোর কাছে গেলাম। তাদের প্রয়োজনের চাইতে বেশী দেয়া হল। তার পর মক্কাতে খুঁজে খুঁজে দুস্থ অসহায় পরিবারকে রাসূল নিজ হাতে সাহায্য দিয়ে আসলেন। মা খাদিজা বলেন – আমার জীবনে নবুয়ত পূর্ব জীবনে রাসূলকে এত খুশি আর কখনো দেখিনি।

এখন প্রশ্ন হল – মানব কল্যাণ আর ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্টা যদি দুটি আলাদা বিষয় হয়। যা আপনার সাক্ষাৎকারে দাবী করা হয়েছে।আরো দাবী করা হয়েছে এভাবেই বর্তমান জামায়াতকে সাজাতে।তাহলে এই সিসটেম টা কেন পরবর্তীতে চালূ রাখা হল না।
আপনি কি বলতে পারবেন – নবুয়ত পাবার পর মক্কার ১৩ বছরের ইতিহাসে হিলফূল ফূজুল আবার কাজ শুরু করেছে?
আমার মনে হয় – মানব কল্যাণ আর ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্টা মুদ্রার এপিট ওপিট।কেননা সামাজিক সংগঠন,ব্যক্তি বা ব্যক্তি বলয়ে কাজ করে। আর ইসলামী রাষ্ট্রের কর্ম পরিধি হল গোটা জাতির প্রতিটি সদস্য।একটি কল্যাণ রাষ্ট্রের বিপরীতে একটি সামাজিক সংগঠন কখনো তুলনীয় হতে পারে না।

আরেকটি বিষয় – সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনের উদাহরণগুলো আমাদের জন্য সহায়ক,উৎসাহের? সেই প্রচেষ্টা থাকা চাই এবং উচিত।তবে পদ্ধতিগত চিন্তাগুলো আপনার আমার আলোচনার বিষয় হতে পারে।

বর্তমানে তুর্কিতে গুলেন আন্দোলনকে দলীল পেশ করতে পারেন।আমি বলবো একটু অপেক্ষা করুন।তুর্কীর গুলেন আন্দোলনের সুন্দর একটি পরিসমাপ্তি সময় এখনো আসেনি। তাদের অবদান রয়েছে তুর্কী সমাজে। এমনটি বর্তমান তুর্কি সরকারে যারা আছেন তারা স্বীকার করেন। কিন্তু এটাই একমাত্র কারন বা সম্ভাবনা অথবা বিকল্প যদি বলতে চান, তহলে বিপত্তিটা হবে বড় আকারে। আমি আগাম কিছু বলতে চাই না। তবে আমি নিশ্চিত যে, আপনি আমাকে একসময় সমর্থন করে লিখবেন।

একই চেষ্টা করা হয়েছিল মিশরে ৮০ দশকে।এখনো তা আছে।মিশরে গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ৫ম হয়েছিলেন ড: আবুল ফুতুহ। তিনি ইখওয়ানের আন্তর্জাতিক রিলিপ ওয়ার্কের প্রধান ছিলেন। পাকিস্থানে ৬০ এর দশকে জামায়াত থেকে বেশ কয়েকজন উচুমানে (নঈম সিদ্দিকির মত) নেতৃত্ব বের হয়ে চেষ্টা করেছিলেন। কিছুই দাঁড় করাতে পারেন নি। খেদমতে খালক করতে গিয়ে মুল শ্রোত থেকে তারা হারিয়ে গিয়েছেন। আলেজেরিয়া এবং তিউনিসিয়ার উদাহরণ দিতে পারেন।আমি একমত। খবর নেন।সেখানকার সামাজিক সংগঠনগুলো মুল আন্দোলনের সহায়ক ছিল এবং আছে।মূল সংগঠনের একটি কমিটি তাদের নীতি নির্ধারন করে দেয়। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে কখনো হস্তক্ষেপ করে না।

জামায়াতের সমস্যা হল এই জায়গায়। সব কিছু করতে হবে আমীর বা তার নিয়োজিত কোন একান্ত পছন্দের ব্যক্তি।আর প্রায় সকল ক্ষেত্রে যারা দায়িত্ব পালন করেন তারা সেই ফিল্ডের লোক না। যেমন মুমতাজূল মুহদ্দীস মরহুম আবুল কালাম মোহাম্মদ ইঊসুফ (রঃ) কে চাষী কল্যাণ সমিতির সভাপতি করা।আমি মনে করি এটা তার ফিল্ড ছিল না।জাতী আরো বেশী উপকৃত হত যদি হাদীসের মৌলিক গ্রন্থের বাংলায় শরাহ (ব্যাখ্যা) লিখতেন।কাজটা হত তার জন্য স্বাচ্ছন্দের। উপভোগ করতেন তিনি তার জীবন।
একটা হল সহযোগী সংগঠন আর আরেকটা হল অঙ্গ সংগঠন।এই ক্ষেত্রে জামায়াত তার সকল সহযোগী সংগঠনকে অঙ্গ সংগঠনের পরিণত করে ফেলে। সমালোচনা বা পরামর্শ দেবার জায়গাটা হতে পারে এই পয়েন্টে।

আমি মনে করি এবং এটা প্রতিষ্ঠিত সত্য বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একমাত্র জামায়াত ই সত্যিকার (প্রায়) দুর্নিতিমুক্ত সামাজিক সংগঠনের জন্ম দিয়েছে। অসংখ্য অগনিত সংগঠন যা জামায়াতের দ্বারা প্রভাবিত,পরিচালিত হচ্ছে। এগুলোর দুর্বলতা রয়েছে,সমস্যা রয়েছে এটা সত্য। আওয়ামীলীগ বিএনপি সহ অন্য দলের লোকেরা যেখানে এমপি বা জেলা কমিটিতে যাবার জন্য সামাজিক সংগঠন করে। ঠিক সেই জায়গায় জামায়াত সামাজিক দ্বায়বদ্ধতার ও মানবতার কল্যাণে কাজ গুলো করে থাকে। একমত না হতে পারেন। কিন্তু সত্যটা স্বীকার করা আমাদের সকলের জন্য মঙ্গলজনক।
==================================

মাদ্রাসা শিক্ষা এবং নেতৃবৃন্দের সন্তানদের পড়া লেখা নিয়ে হিপোক্র্যাসি শব্দটা চয়ন করেছেন।এই শব্দটা যদি ব্যবহার করে থাকেন সামগ্রিক অর্থে তাহলে আমি মোটেই একমত না।এবং এটা হবে সামগ্রিক অর্থে জুলূম করার সামিল।
এটা সত্য কিছু দায়ীত্বশীল আছেন তারা এই ভুল করছেন। এবং তার খেসারত দিচ্ছেন।আমি এরকম বেশ কিছু পরিবার জানি। যাদের কপাল পুড়েছে। ছেলেকে পাঠিয়েছেন বিদেশে ডাক্তার বানাতে। ছেলে বাপের আদর্শকে গালি দেয়। এরকম দৃষ্টান্ত খুবই কম। এখনও বিরাট একটি অংশ দ্বীনি মাদ্রাসাকে ই প্রাধান্য দিচ্ছেন।হিপোক্র্যাট সংখ্যায় খুবই কম। দু:খ জন সত্য হল এদের কয়েকজন জামায়াত নামক নৌকার মাঝি হয়ে আছেন।

এটাকে আপনার ভাষায় – স্টাবলিশম্যান্ট সমস্যা।এই প্রকারের যারা আছেন ইসলামী আন্দোলনে তাদের জন্য করুনা হয়। হতে পারেন তাদের সন্তানরা বড় বড় ডিগ্রি অর্জন করে সমাজে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু এক সময় এরাই হবে জামায়াতের জন্য গলার ফাঁস।

সমস্যাটা হবে মুসলীমলীগের মত। পরিবারের সদস্যদেরকে ইসলামী আন্দোলন সম্পর্কে অজ্ঞ রেখে জাতির মধ্যে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা বিজ্ঞতার পরিচয় নয়।বরং সেটা বুমেরাং হয়।হওয়াটা স্বাভাবিক।

আগামী –পর্ব -৩)

3 Responses

  1. আবু সুলাইমান
    আবু সুলাইমান at |

    কোট-আনকোটঃ “আমার মনে হয় – মানব কল্যাণ আর ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্টা মুদ্রার এপিট ওপিট।কেননা সামাজিক সংগঠন,ব্যক্তি বা ব্যক্তি বলয়ে কাজ করে। আর ইসলামী রাষ্ট্রের কর্ম পরিধি হল গোটা জাতির প্রতিটি সদস্য।একটি কল্যাণ রাষ্ট্রের বিপরীতে একটি সামাজিক সংগঠন কখনো তুলনীয় হতে পারে না।”

    “রাষ্ট্র বনাম সামাজিক আন্দোলন” বিষয়ক একটি লিখা লিখে ফেলা যেতে পারে। বিশ্ব সভ্যতার ধারাবাহিকতা অবলম্বনে লিখলে আশা করি আমরা অনেক কিছু জানতে পারে। ইবনে আহমাদ ভাই আপনি লিখে ফেলতে পারেন…

    Reply
  2. আবু সুলাইমান
    আবু সুলাইমান at |

    আমরা যখন ইস্লামি রাস্ট্র কিংবা সমাজ কল্যাণের কথা অধিক গুরুত্ব দিয়ে বলি তখন একটি ডাইমেনশান মিস করি- সেটি হচ্ছে ধর্মের মূল উদ্দেশ্য কি?

    আমরা অনেক রাস্ট্র আর সমাজিক সংগঠনের ক্ষেত্রে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, রাষ্ট্র কাঠামো কোন মৌলিক বা প্রাইমারী বিষয় নয়। বরং একটি কন্সিকুয়েনশাল বিষয়। অর্থাৎ রাষ্ট্র কাঠামো নিজে কোন উদ্দেশ্য নয়; বরং মানুষের জীবন কে সুন্দ

    Reply
  3. আবু সুলাইমান
    আবু সুলাইমান at |

    (পরবর্তী অংশঃ) সুন্দর ও স্বাচ্ছন্যপূর্ণ করে গড়ে তুলতে নানা বিধ স্তর ও ঘটনার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র কাঠামো গড়ে উঠে। আর বর্তমান স্তরের রাষ্ট্র কাঠামোর জন্ম তো আরো অনেক পরে। এই তো সেদিন। ফলে এই রাষ্ট্র কাঠামোকে গড়ে তোলা কিভাবে ইস্লামের মৌলিক উদ্দেশ্য হতে পারে?

    কারণ এই রাষ্ট্র-কাঠামোর বাইরে জীবন যাপন করে চলে গেছে অসংখ্য, অগণিত মানুষ। এ দিক দিয়ে বরং রাষ্ট্র কাঠামোর চাইতে সমাজ কাঠামো তুলনামূলক বেশি রূট লেভেলের।

    আরেকটি বিষয়- ইস্লামি রাষ্ট্র কাঠামো শুধুমাত্র মুস্লিম মেজোরিটি দেশগুলোর সাথে সম্পর্কিত। কিন্তু মুস্লিম মেজোরিটি দেশগুলোর বাইরেও রয়েছে আরো আরো লক্ষ লক্ষ মানুষ, যাদের রাষ্ট্র কাঠামো দ্বারা এ্যাকোমোডেট করা সম্ভব নয় কিন্তু সমাজ কাঠামো দ্বারা এ্যাকোমোডেট করা সম্ভব।

    ধর্মের একটি অন্যতম মৌলিক উদ্দেশ্য- মানুষ কে তাঁর স্রষ্টার সাথে পরিচিত করিয়ে দেয়া এবং স্রষ্টার অনুসারী করে তোলা। এ পর্যন্ত যত মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছে তাদের কেউই কোন রাষ্ট্র দ্বারা প্রভাবিত হয়ে নয় বরং মুস্লমান্দের ব্যক্তিক জীবন, দাওয়াত, কুরআন, হাদীশ, প্রফেটের জীবন ধারা, সামাজিক কাঠামো ইত্যাদি দেখে উৎসাহিত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে মুসলমান্দের সামাজিক কাঠামোর গুরুত্ব অনেক বেশি।

    তাই সামাজিক আন্দোলন বনাম রাষ্ট্র কাঠামোর আলোচনায় এই সকল বিবেচনায় নেয়া দরকার।

    Reply

Leave a Reply