জামায়াতের রাজনীতির পোস্টমর্টেম ও আগামীর পথচলা – পর্ব – ৪

প্রথম পর্ব 
২য় পর্ব 
৩য় পর্ব

৪) জামায়াত অখন্ড ভারত চায়?
এই অভিযোগটা নতুন না।অকৃপণ ভাবে মুসলীমলীগ – পাকিস্তান আন্দোলনে মাওলানা মওদুদীর (রঃ) সাহিত্য কাজে লাগিয়েছিল। কিন্তু তার পর কিছু সেকুলার রাজনৈতিক – মাওলানাকে পাকিস্তানের দুশমন হিসাবে প্রচার চালায়।বলা হল অখন্ড ভারতের স্বপ্ন দেখতেন মাওলানা মরহুম।নির্ভেজাল অপবাদ।এটা নতুন না।
———————————————————–
অথচ আমাদের দেওবন্দি হাজারাত এক জাতি তত্বের ভিত্তিতে অখন্ড ভারতের প্রবক্তা ছিলেন। এই বিষয়ে কেউ কোন কথা বলে না।আক্রমন করে কোন লিখা লেখা হয় না। মাওলানা হোসেন আহমদ মাদানী (রঃ) সহ আকাবিরে দেওবন্দের গোটা মাছলাক (পন্থি) অখন্ড ভারতের পক্ষে ছিলেন। তাদের ফতোয়া সহ সকল প্রচেষ্টা ছিল অখন্ড ভারতের উদ্দেশ্যে। এমনকি হিন্দু – মুসলিম এক জাতি – এ নিয়ে মাওলানা হোসেন আহমাদ মাদানী পুস্তক লেখেন। কংগ্রেস সেই পুস্তক প্রচার করেছিল।
ঠিক এর বিপরীতে মাওলানা মওদুদী (রঃ) মাসলায়ে কওমিয়াত (ইসলাম ও জাতীয়তাবাদ) নামে একটি পুস্তিকা লেখেন। যাতে কোরআন হাদীসের দলীল সহ যুক্তিক ভাবে প্রমান করেন- তেল আর পানি সম্পূর্ণ আলাদা। হিন্দু আর মুসলিম জাতি এক নয়।দ্বিজাতি তত্বের পক্ষে তার এই খেদমতের পুরস্কার পেয়েছিলেন পাকিস্তান হওয়ার পর ফাঁসির আদেশের মাধ্যমে।অবশ্য স্পষ্টভাষী মাওলানা মওদুদী (রঃ) পাকিস্তান হবার পূর্বেই এই আশংকা প্রকাশ করেছিলেন।
———————————————————-
মাওলানা মওদুদী (রঃ) কখনো কংগ্রেস বা মুসলিমলীগের সদস্য ছিলেন না। আমাদের ভাইদের ভুল এই জায়গায়। সমাজে তৃতীয় একটি অবস্থান হতে পারে। এবং আদর্শিক জায়গা থেকে আন্দোলনকে সাহায্য করা যায়। এর প্রমান হল – ইসলাম ও জাতিয়াতাবাদ বইটি। পাকিস্তান আন্দোলনে জামায়াত বুদ্ধিভিত্তিক সাহায্য করেছে।এই সত্যটি অনেকে স্বীকার করতে চান না।
মাওলানা মওদুদী (রঃ) মাসলায়ে কওমিয়াত বইটি যদি তখন না লিখতেন, তাহলে ওলামায়ে দেওবন্দের সাথে জামায়াতের এত বড় সমস্যা তৈরী হত না।আজও সেই একই মানসিক সমস্যায় ভুগছে দেওবন্দের আলেম সমাজ। শাইখুল হিন্দের বিপরীত অবস্থান গ্রহন করা জায়েয হতে পারে। এটা তাদের কল্পনা জগতের বাহিরের বিষয়। বলা যায় চিন্তার ক্ষেত্রে ওলামায়ে দেওবন্দের একটি চরম দৈনদশা।আজও তারা বের হতে পারেননি।

————————————————————
নতুন ঢাকা ডাইজেস্ট নামে মাসিক একটি পত্রিকা ছিল। বর্তমানে সম্ভবত ইতিহাস। আমি নিয়মিত রাখতাম। সাউদিতে আসার পর ও প্রায় ৭ বছর রেখেছি। আমার কাছে ডাইজেস্ট সেই কপি গুলো এখনো আছে। আনোয়ার হোসেন মন্জু যিনি কামরুজ্জামান সাহেবের আত্মীয়। ডাইজেস্টে আসার আগে ছিলেন সংগ্রামে। সংগ্রামের সম্পাদক আর আনোয়ার হোসেন মতের মিল অথবা বড় আকারে সমস্যা তৈরী হয়। প্রফেসার গোলাম আযম সহ কেউই সমাধান করতে পারেন নি।তখন বিষয়টা নিয়ে ডাইজেস্টে ধারাবাহিক লিখেন। অবশেষে তিনি সম্পাদক হন ডাইজেস্টে।
১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জামায়াতের পরাজয়ের পর তিন কিস্তিতে লিখেন একটি পর্যালোচনামূলক কলাম। সেখানে তুলে আনেন বেশ কিছু দুর্বলতা।
পত্রিকার পাতায় জামায়াতের নিজেদের লোকের নিজেদের কাগজে এই প্রথম সমালোচনা শুরু।জামায়াতের জনশক্তির কাছে এটা ছিল চরম অপ্রত্যাশিত।তাই –
চিঠি পাতার কলামে হুমড়ি খেয়ে পড়েন জামায়াত শিবিরের ক্ষুদে আব্দুল গফ্ফাররা। বেচারা সম্পাদক কয়েকবার কাফ্ফারা দিয়ে জবাব লিখতে হয়।আমি ও তখন ঐ গ্রুপে ছিলাম। আমার মনে আছে আমার লিখাতে তাকে ব্যক্তিগত আক্রমন করে ছিলাম। আজ এই সেই পুরানো কপি গুলোতে যখন চোখ বুলাই তখন মনে হয় – বড় মিস করেছে জামায়াত। বেশ কিছু সমালোচনা করা হয়েছিল চোখে আঙ্গুল দিয়ে। সেগুলোকে যদি জামায়াত বিবেচনায় নিত, তাহলে নিশ্চিত কিছুটা হলেও উপকার হত। সেই সময় এই ধারা চলতে দিলে কিছু জামায়াত পন্থি কলামিষ্ট তৈরী হত।
কিন্তু আমার মনে হয় – (সঠিক জানি না) তার পর তিনি ভারতে গেলেন – তার পর কন্ডোলিসা রাইসের অধিনে কি যেন ডিগ্রি করলেন। মাঝে মধ্যে দেখা যেত নয়া দিগন্তে। বেশ কিছু দিন হয় তার লেখা পড়ি না। জনাব আনোয়ার হোসেন আরেকটি লেখায় নিজের মত করে প্রমান দিলেন – জামায়াত তার ভুল রাজনীতির খেসারতের সুযোগে ২১বছর পর বাকশালীরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার সুযোগ হয়েছে। তখনকার চরম আলোচিত প্রবন্ধটির নাম ছিল – আ:লীগ-জামায়াত কি অখন্ড ভারত পূন:প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করছে? (১০ম বর্ষ,৭ম সংখ্যা অক্টোবর- ১৯৯৬ – আশ্বিন- কার্তিক ১৪০৩)
————————————————————–
ভারতের গোয়েন্দা সংস্থ ‘র’ এর ওপর লিখা সাবেক সামরিক সদস্য আবু রুশদের একটি অনন্য বই। আমার জানা মতে ইন্ডিয়ার গোয়েন্দা সম্পর্কে জানার জন্য এই বইটি খুবই প্রাসঙ্গিক। সেই বইতে জামায়াতের দুই নেতা সম্পর্কে ইঙ্গিতে বলা হয়েছে তারা ‘র’এর জামায়াতের ভিতরের এজেন্ট। অবশ্য আবু রুশদ লিখেছেন – হয়তো কথিত জামায়াত নেতারা সেটা জানেন না।
১/১১ এর রুইকাতলা খ্যাত উপদেষ্টা জেনারেল আব্দুল মতিনের একটি সাক্ষাৎকার রয়েছে আবু রুশদের বইতে।মঈন ফখরুদ্দিন সরকারের উপদেষ্টা সাহেব বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান ছিলেন বিএনপির গত টার্মে। তিনি ইঙ্গিতে বিএনপির নেতাদের এজেন্ট হবার কথা স্বীকার করেছেন।এমনকি তারেক জিয়ার আশে পাশের লোকদেরকেও সন্দেহ করেছেন।
————————————————————–
একবার শেখ মুজিব বলেছিলেন,পাকিস্তানীদেরকে – খায় দায় জব্বার আলী আর অপরাধি হয় চিকন আলীরা।
প্রকাশ্যে অখন্ড ভারতের পক্ষে যাদের অবস্থান।যাদের রাজনীতিই হল এই দেশের ৫৬ হাজার বর্গমাইল মুছে দেয়া।যারা বাঙ্গালী চেতনার নাম করে বাংলাদেশের বৃহত জনগোষ্ঠীকে অখন্ড ভারতের লীন করার নিরন্তর সংগ্রাম করছে তাদের বিষয়ে আলোচনা,সামালোচনা নেই। ভাবটা এমন যে, বাকশালীরা যেহেতু পরিচিত ভারতের একমাত্র এজেন্ট। তাই তাদের কোন দোষ নেই। যত দোষ হল ব্যটা জামায়াতের।
যেই কাজটা আনোয়ার হোসেন মন্জু করেছিলেন ব্যাখ্যা দিয়ে- ঠিক আপনার (মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক) সাহেবের সাক্ষাৎকারে তাই বলা হয়েছে নতুন করে।
—————————————————————
আমি মাওলানা মরহুমকে যতটুকুন পড়েছি।শক্ত ভাবেই বলতে পারি কেউ প্রমান দিতে পারবেন না। মাওলানা মরহুম কখনো তার লিখায় অথবা পাবলিক বক্তৃতায় বলেছেন – অখন্ড ভারতের কথা। হতে পারে আমার জানার বাহিরে।
সাক্ষাৎকারে বিষয়টা এমন ভাবে লিখলেন – মনে হল এটা ছিল জামায়াতের দলীয় ষ্ট্যান্ড। আমাদেরকে কি জানতে দিবেন কোথায় আছে এই তথ্য।
আমি ব্যক্তিগতভাবে যে কোন তথ্যই হিডেন রাখার পক্ষে নই।এতে ক্ষতির মাত্রাটা বেশী হয়। যে দলটি গনমানুষের মতামত নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার স্বপ্ন দেখে তাদের উচিত হবে – গনমানুষের সকল প্রশ্নের জবাবে নিজেদেরকে প্রস্তুত রাখা। জামায়াতের যে সমস্ত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ভুল ছিল। সেগুলোর জন্য জামায়াত প্রকাশ্যে কথা,আলোচনা করা প্রয়োজন।
আমি মনে করি একটি প্লাট ফরম থাকা চাই যারা জামায়াতের কর্মসূচী,রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত,জামায়াতের নেতৃবৃন্দ সবার পাবলিকলি সমালোচনা করতে পারে নির্ভয়ে। এতে উপকার হবে জামায়াতের ই বেশী।রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত আর শরয়ী সিদ্ধান্ত দুটি আলাদা বিষয়।
————————————————————-
সত্যি যদি জামায়াত অখন্ড ভারত চাওয়ার দল হত। তাহলে আজ তার নেতৃবৃন্দের ওপর এই কিয়ামত আসতো না।এটা সত্য যে জামায়াতের ভুল রাজনীতির কারনে বাংলাদেশে অখন্ড ভারতীয় দালালরা ক্ষমতার মসনদে বসতে পেরেছ। আমি মনে করি এর বিচার ইতিহাস করবে।
বাংলাদেশী প্রতিটি নাগরিকের উচিত হবে – বর্তমান ভারতীয় দালালদের মুখোশ উন্মোচন করা।
সেকুলার,অসাম্প্রদায়িকতা,৭১এর মেইড ইন আওয়ামী চেতনা এগুলো এক একটি প্রতারণা। এই সত্যগুলো সাহসের সাথে প্রকাশ করা জরুরী।এই প্রয়োজনটা আমাদের জাতির জন্য,বৃহত জনগোষ্ঠীর বোধ বিশ্বাসের জন্য অপরিহার্য।
যার যা আছে তা নিয়ে আমাদেরকে এগিয়ে আসা উচিত। কারন ভারত আমাদের পিছনে যে ইনভেষ্ট করছে তার ষোলআনাই উসূল করছে। ১৯৭১ সালের ইনভেষ্ট দিয়ে কিছু পারিবারিক দালাল তৈরি করতে পেরেছিল। আজ তা একটি শেখ পরিবার থেকে কয়েক হাজার পরিবার হয়েছে। একজন শেখ হাসিনার বদলে তাদের হাতে অসংখ্য অগণিত হাসিনা রয়েছে।

দেশটাই যদি না থাকে তাহলে জামায়াতে ইসলাম আর ইসলামী আন্দোলন থাকবে কোথায়? দেখবেন মিডিয়াতে একটি আবহ তৈরী করা হয়েছে – ভারতের অনুমোদন ছাড়া এদেশে কেউ ক্ষমতায় থাকতে পারবে না। এই মানসিক দাসত্ব করার জন্য ১৯৭১ সালে পিন্ডি থেকে আমরা আলাদা হয়নি। আজ যারা স্বাধীনতা – চেতনা – বাঙ্গালীত্ব নিয়ে বেশী মাতামাতি করছেন, তাদের কাছে এই শব্দগুলো অর্থ,বোধ,বিশ্বাস সম্পুর্ণ ভিন্ন।তারা সবাই একই উদ্দেশ্যে কাজ করছে।এরাই মূলত অখন্ড ভারতের জন্য বাংলাদেশী এজেন্ট।
————————————————————
ভারতীয় সৈন্য বাংলাদেশ দখল করার কোন সম্ভাবনা নেই।এই বোকামী ভারত কখনো ই করবে না। ভারত কখনো ১৭ কোটি মানুষের পেটের দায়িত্ব নিবে না।বরং আমাদেরকে মানষিক গোলাম করে আরো কিছু নতুন নতুন শেখ হাসিনা তৈরী করবে। যারা ভোট ও ভাতের অধিকার প্রতিষ্ঠার নাম করে ভারতের গোলাম বানিয়ে রাখবে।এটাই প্রতিষ্ঠার আন্দোলন চলছে বর্তমানে ডিজিটাল বাকশালের মাধ্যমে।
ভারতের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাংলাদেশে প্রধান বাধা হল জামায়াতের জনশক্তি। অচিরেই প্রমান হবে জামায়াতই বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর প্রধান ভরসা। এই ঐতিহাসিক এবং বড় কাজটি জামায়াতের বর্তমান নেতৃত্ব দিয়ে হবে না নতুন কোন ফরমেটে হবে তা আগামীই ঠিক করবে।
এই বিষয় নিয়ে ঐতিহাসিক এবং একাডেমিক আলোচনার ইচ্ছা রয়েছে। সময় ও সুযোগের অপেক্ষায় আছি। সবাইকে ধন্যবাদ।
—————————————————————————————-

One Response

  1. মুহসিন আব্দুল্লাহ
    মুহসিন আব্দুল্লাহ at |

    শিরোনামে ‘জামায়াতের রাজনীতির পোস্টমর্টেম’ কেন লিখলেন বুঝলাম না । পোস্টমর্টেম শব্দটা আমরা ব্যবহার করি মৃত ব্যক্তির মৃত্যুর কারণ নির্ণয়ের উদ্দেশ্য ব্যবচ্ছেদ করার ক্ষেত্রে । আপনি কি মনে করেন জামায়াতের রাজনীতি মৃত ? (তা তো মনে হলো না )

    Reply

Leave a Reply