বিচার পদ্ধতির সংস্কার প্রয়োজন

আমরা পত্রপত্রিকায় বিভিন্ন সময় দেখেছি, বাংলাদেশের নি¤œ আদালতগুলো (ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট, জজ কোর্ট) কয়েক লক্ষ মামলা পড়ে আছে। অন্য দিকে উচ্চ আদালতেও (হাইকোর্ট ও আপিলাত বিভাগ) অসংখ্য মামলা পড়ে আছে। মাননীয় প্রধান বিচারপতি ও সাবেক প্রধান বিচারপতিগণ বিচারব্যবস্থার নানা সংকটের কথা উল্লেখ করেছেন।

অন্য দিকে কোর্ট বিলম্ব হওয়ার কথাও আমরা জানি। মামলা শুরু হওয়ার পরও বারবার মুলতবি হওয়া এবং অন্যান্য কারণে বিলম্ব হতেই থাকে। এ পরিস্থিতি নতুন নয়, অনেক দিনের। সমস্যার সমাধান হচ্ছে না, বরং সমস্যা গভীর হচ্ছে।

অন্য দিকে সাধারণ মানুষ (শতকরা ৯৫ জন ) অ্যাডভোকেট সাহেব বা ব্যারিস্টার সাহেবদের উচ্চ ফি দিতে অক্ষম। সুতরাং তাদের পক্ষে সুবিচার পাওয়া প্রায় অসম্ভব। তাদের অনেক অভিযোগ কোর্টে আসে না। তারা অনেক অত্যাচার-অন্যায় সহ্য করে নেয়।

অনেকেই জজের বা বিচারকের সংখ্যা বাড়ানোর কথা বলেছেন। তা বাড়ানোও হচ্ছে, হয়তো আরো বাড়ানো হবে। কিন্তু বিচারপ্রক্রিয়া যদি সহজ করা না হয়, তাহলে এ মামলার জট শেষ হবে না।

আমি মনে করি, সুবিচারের স্বার্থে, জনগণের জন্য সুবিচার সহজলভ্য করতে বিচারপ্রক্রিয়া বেশ কিছু সংস্কার প্রয়োজন। আমরা ইতিহাসের দিকে দৃষ্টি দিতে পারি। আব্বাসী ও মুঘল যুগের বিচারব্যবস্থার দিকে নজর দিতে পারি। তাদের সব কিছু আমরা নিতে পারব না। কিন্তু সে ব্যবস্থার ভালো দিকগুলো নিতে পারি, যার ফলে জনগণ সহজেই সুবিচার পেতে পারে। প্রথমত তাদের বিচারব্যবস্থায় কোনো কোর্ট ফি ছিল না। আমরাও কোর্ট ফি তুলে দিতে পারি। তাতে সাধারণ লোকের পক্ষে কোর্টে আসা সহজ হবে। দুষ্ট লোকদেরও হয়তো সুবিধা হবে। তা দূর করার জন্য যারা মিথ্যা মামলা নিয়ে আসবে, তাদের শাস্তির বিধান রাখা যেতে পারে। রাষ্ট্রকে সেই বিচারব্যবস্থার খরচ বহন করতে হবে, যেমন তারা প্রাইমারি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার ক্ষেত্রে করছে। এ ফি গ্রহণ ইসলামী খিলাফতের সময় ছিল না।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার হবে, সবাইকে কোনো উকিলের মধ্যস্থতা ছাড়া (যে কোর্টের এখতিয়ার) কোর্টে মামলা দায়ের করা, তার বক্তব্য কোর্টকে বলার অধিকার দিয়ে বিচার পদ্ধতি (ঔঁফরপরধষ ঢ়ৎড়পবফঁৎব) সংশোধন করা। যারা উকিল নিতে সক্ষম, তারা উকিল নিতে পারবে। কিন্তু যে পারে না সে সরাসরি কোর্টে হাজির হবে। আসামিও সরাসরি কোর্টে হাজির হবে বা সে চাইলে উকিলের মাধ্যমে হাজির হবে। কোর্টের অধীনে একজন বা বেশী আইনজ্ঞ থাকবেন, কোর্টকে এবং বাদী-বিবাদীকে সাহায্য করার জন্য। আগের মুসলিম আমলে কোর্টকে সাহায্য করার জন্য মুফতি থাকতেন, যাতে লোকেরা সরাসরি কোর্টে হাজির হতে পারে, তার অত্যন্ত সহজ বিধান করে ঈ.চ.ঈ ও ঈ.জ.চ.ঈ সংশোধন করতে হবে। এ ব্যাপারে যত সহজ হওয়া যায় তত ভালো।

আমার নিজের জীবনের অভিজ্ঞতার কথা বলি। ১৯৭৫ সালে আমি এক মিথ্যা মামলায় আসামি হয়ে যাই। আমাকে মাসে মাসে হাজিরা দিতে হতো। কখনো ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব আমাকে দেখেননি বা ডাকেননি। উকিলের মাধ্যমে আমাকে হাজিরা দিতে হতো। আমার তখন আর্থিক অবস্থা খুবই নড়বড়ে ছিল। কিন্তু উকিলের পয়সা আমাকে যোগাড় করতে হতো।

যদি বিচারব্যবস্থা উপরে যেভাবে ব্যাখ্যা করেছি সেভাবে সংস্কার হয়, তাহলে এ ধরনের অবস্থা হবে না। বিচার দ্রুত হবে, বাদী নিজেই তার কেস তুলে ধরতে পারবে, আসামি সরাসরি তার উত্তর দিতে পারবে। কোর্ট নিজে প্রশ্ন করে নিশ্চিত হতে পারবে। এর ফলে মামলা জট কমে যাবে এবং একসময় শেষ হয়ে যাবে।

আরেকটি কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন, আমাদের দেশে ‘আইনগত সহায়তা দান’ (খবমধষ ধংংরংঃধহপব) পদ্ধতি সত্যিকার অর্থে কাজ করেনি। এতে খুব বেশি হলে এক শতাংশ লোকের কাজ হয়েছে। এ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করা যায় না।

আরো একটি বিষয় বিবেচনা করা দরকার। বর্তমানে কোনো কোনো ক্ষেত্রে আপিল স্তর তিন বা চারবারও হয়ে যায়। আমার মনে হয়, আপিল স্তর দু’টির বেশি হওয়া উচিত নয়। এ বিষয়টি মামলা নিষ্পন্নে অধিক সময় লাগার অন্যতম কারণ। এ ব্যাপারটিও বিবেচনা করা এবং আইন সংশোধন করা দরকার।

Leave a Reply