ইসলামী রাজনীতিতে নবচিন্তাঃ হীনম্মন্যতা নাকি অনিবার্য প্রয়োজন ?

১.

উদার চিন্তার বৈশিষ্ট্যই এটা যে – কট্টর-প্রাচীনপন্থি বা পুরনো ধ্যানধারণার কেউ যদি কোন কথা বলেন বা লেখেন সেটাকেও যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা – তা যতই সেকেলে হোক, যতই অপরিপক্ক হোক কিংবা একগুঁয়েমি হোক ।

একদেশদর্শিতা নয়, নিজের পক্ষে খোঁড়া যুক্তি দাড় করানোর ভঙ্গুর অপচেষ্টা নয়, যেকোন পক্ষের বা বিপরীত যুক্তিকে সত্যিকার খোলা মন নিয়ে যুক্তি-প্রমাণের কষ্টিপাথরে যাচাই করা । মূলনীতিই এটা থাকে যে, আমি যদি নিজেকে প্রগতিশীল চিন্তার ধারক মনে করি- আমার যেমন কথা বলার , লেখার অধিকার আছে- সেকেলে বা প্রাচীনপন্থি যাকে মনে করি তাঁরও অধিকার আছে ।

এই অবস্থানটাই একজন উদারপন্থি-প্রগতিশীল চিন্তাধারার মানুষের সাথে একজন গোঁড়া – প্রাচীন ধ্যানধারণার মানুষের পার্থক্য গড়ে দেবে ।

মুক্তচিন্তার আরেকটা বিষয় গুরুত্বপুর্ণ- কথার জবার কথায় , লেখার জবাব লেখায় , যুক্তির জবাব যুক্তিতে হতে হবে । যুক্তিতে হেরে গিয়ে ভিন্ন পন্থা গ্রহণের অর্থই হলো নিজের কূপমণ্ডূকটার সুস্পষ্ট প্রকাশ ।

আমি এমন অনেক মানুষকে দেখেছি- একটু ভিন্নমত দেখলেই ‘সংস্কারপন্থি’, ‘ভাঙ্গন ধরানোর অপচেষ্টায় লিপ্ত’, ‘শৃংখলা বিনষ্টকারী’ বলে দূরে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন । আসলে তাঁর সামর্থ্য বা মগজ নেই- যুক্তিপুর্ণ কথার জবাব দেয়ার, এর চেয়ে ভালো কোন পন্থার সন্ধান দেবার ।

‘নতুন কিছু মানেই ভালো’ এমনটি সত্য নয়- বাস্তবও নয় । তেমনিভাবে ‘নতুন কিছু মানেই খারাপ’ – এই চিন্তা খুবই সংকীর্ণ চিন্তা । এই চিন্তার প্রকোপ ইসলামপন্থি দের ভেতর বেশি দেখা যায় । কিন্তু ইতিহাস বলে- পৃথিবীর যাকিছু উন্নতি-ভালো সবকিছু হয়েছে ‘নতুন কিছু’ করার প্রেরণা থেকে, চেতনা থেকে ।

আমি বলি – যুক্তিযুক্ত কারণ দেখানো ছাড়াই নতুন কোন চিন্তাকে, নতুন কোন উদ্যোগকে বাতিল করার চিন্তা হলো আবু জেহেলীয় চিন্তা । আবু জেহেল যেরকমভাবে জেনেবুঝেও শুধুমাত্র বাপদাদার ধর্ম- হাজার বছর ধরে পালন করে আসা ধর্ম ছাড়তে চায় নি সেরকম ।

সেজন্য খোলামনের যুক্তিবাদী মানুষই আমার কাছে পছন্দের । তবে ইসলামী রাজনীতি-আন্দোলন নিয়ে যথেষ্ট প্রগতিশীল চিন্তাভাবনা করেন তাদেরও কারো কারো মাঝে দেখি অন্যদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার একটা মানসিকতা প্রায়ই উঁকিঝুঁকি দেয় । এটা ঠিক নয় । নতুনের প্রতি আকর্ষণ যেমন মানুষের বৈশিষ্ট্য, পুরণোকে সহজে ছাড়তে না পারাও মানুষের বৈশিষ্ট্য । আর পুরনো চিন্তার ওপরেই গড়ে ওঠে নতুন চিন্তার প্রাসাদ । সেটাও মনে রাখা দরকার ।

ইসলাম মুক্তচিন্তাকে এভাবে প্রণোদনা দেয় যে- কে বলেছেন সেটা বিবেচ্য নয়, কী বলেছেন সেটাই বিবেচ্য হবে । খলিফা ওমর(রাঃ) বলেছেন তাই চুপ করে মেনে নিতে হবে এমনটি নয়- বরং খলিফা ওমর কী বলেছেন তার ভিত্তিতে পাল্টা দলিল ও যুক্তি দেয়া যাবে । যেমনটি করেছিলেন এক বৃদ্ধা । আর আলহামদুলিল্লাহ- ওমর (রাঃ) তাকে সসম্মানে এপ্রিশিয়েট করেছিলেন ।

২.

বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতিতে জামায়াত দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছে । প্রায় অর্ধ-শতাব্দি পর এখন পদ্ধতি-কর্মসূচি ও চিন্তাধারার মোডিফিকেশনের কথা উঠে আসছে । এই অবস্থায় মাসখানেক আগে দৈনিক সংগ্রামে জনাব ‘আবু নকীব’ একটি নিবন্ধ লেখেন যেটার বেশিরভাগ অংশের সাথে আমি একমত । কিন্তু যে অংশটির সাথে আমি একমত নই সেটুকু হচ্ছে –

‘অবশ্য ইসলামী আন্দোলনের সাথে সংশ্লিষ্টদের একটা পথ বন্ধ হলে দশটা পথ খোলার মত যোগ্যতা-দক্ষতা অবশ্যই থাকতে হবে। তবে বাস্তবে পথ বন্ধ হবার আগে কৃত্রিমভাবে নিজেদের পক্ষ থেকে পথ বন্ধ করে কোন কৌশল অবলম্বনের চিন্তা-ভাবনা হীনমন্যতারই পরিচয় বহন করে এতে কোন সন্দেহ সংশয়ের অবকাশ নেই’ ।

ইঙ্গিত হচ্ছে- ইসলামী আন্দোলনের নতুন প্ল্যাটফর্ম তৈরির প্রসঙ্গে । নিবন্ধের শিরোনাম ছিল ‘ইসলামী আন্দোলনে হীনম্মন্যতাবোধের সুযোগ নেই’ ( লিংক =”http://www.dailysangram.com/news_details.php?news_id=125508″) ।

অর্থাৎ উপরোল্লিখিত বক্তব্য অনুযায়ী –এখন জামায়াত যে অবস্থায় আছে তার একটা হেস্তনেস্ত না হওয়া পর্যন্ত কিংবা জামায়াত চূড়ান্তভাবে নিষিদ্ধ হয়ে রাজনৈতিক ময়দান থেকে নির্বাসিত না হওয়া পর্যন্ত বিকল্প কোন চিন্তা করাকে হীনম্মন্যতা বলা হয়েছে ।

এই বক্তব্য কতটুকু যৌক্তিক ? ভালো অবস্থায় বিকল্প চিন্তা করলে বলা হয় –

‘কোন প্রয়োজন নেই, এসব বেহুদা চিন্তা । উল্টাপাল্টা কথা বলে সময় নষ্ট, অতিমাত্রায় দুশ্চিন্তা বা ভীতির কারণে এমন চিন্তা করা হচ্ছে’ কিংবা ‘আগে ঐরকম পরিস্থিতি আসুক’ , ‘যখনকার ব্যাপার তখন দেখা যাবে’

ইত্যাদি ;

আর খারাপ অবস্থায় বিকল্প চিন্তা করলে বলা হয় –

‘এই রকম অবস্থায় এসব চিন্তা মাথায় আসে কী করে ! আগে পরিস্থিতি ভালো হোক- তখন চিন্তা করা যাবে’ ।

এর মানে কী ? এর অর্থ কি এই যে যেকোন উপায়ে ভিন্নচিন্তাকে এড়িয়ে থাকা ?

ঐ নিবন্ধ থেকে উল্লেখিত অংশটুকু অনুযায়ী সমাধান হচ্ছে- একান্ত বাধ্য না হলে এবং পথ একেবারে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও এবং খুন্তি শাবল দিয়েও তা পুনরুদ্ধার সম্ভব না হলে শুধুমাত্র তখনই বিকল্প পথের চিন্তা করা যাবে । এর আগে কোন বিকল্প চিন্তা করলে তা হচ্ছে ভীতি ও হীনম্মন্যতা থেকে উৎসারিত !

এই বক্তব্য আমার কাছে যুক্তিযুক্ত বা বুদ্ধিদীপ্ত ও বাস্তব মনে হয় না । প্রতিপক্ষকে দিশেহারা করে লক্ষ্যে পৌঁছানোর প্রধান উপায় হল- অনেকগুলো পথ খোলা । সবগুলো পথে যাবার প্রস্তুতি নিয়ে রাখা । প্রতিপক্ষ যেন ‘আমি কোন পথে যাচ্ছি’ এইটা বুঝতে বুঝতেই আমি অনেকদূর এগিয়ে যেতে পারি ।

একটা ফুটবল খেলায় গোল দেয়ার জন্য সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে দুজন স্ট্রাইকার দৌড়ানো যাতে যেকেউ গোলটা দিতে পারেন । একজনকে যদি ডিফেন্ডাররা আটকাতে যায় তিনি যেন বলটা পাস করে তাদের বিভ্রান্ত করতে পারেন । এগুলো সহজ কথা । এতে হীনম্মন্যতার কী আছে ?

দরজা খোলা রাখার আপ্রাণ প্রচেষ্টা চলবে । কিন্তু সেই সাথে দরজা বন্ধ হয়ে আটকে পড়ার আগেই জানালাটা খুলে রাখার চিন্তা কি হীনম্মন্যতা নাকি বুদ্ধিমানের কাজ ?

খন্দকের যুদ্ধের আগে মদীনার চারপাশে খন্দক খোড়ার পরামর্শ দেন পারস্য থেকে আসা সালমান ফারসী (রাঃ) । সেই অনুযায়ী কাফেররা আসার আগেই খন্দক খোড়া হয় । সামনাসামনি মোকাবেলার চেয়ে কাফেরদের দুর্বল করার পরিকল্পনা নেয়া হয় । আমরা কি এটা বলতে পারি যে – সালমান ফারসীর(রাঃ) সেই পরামর্শ হীনম্মন্যতা কিংবা ভীতি ছিল (নাউযুবিল্লাহ) ?

একটা এন্টিবায়োটিক দীর্ঘদিন যেনতেনভাবে ব্যবহার করলে ব্যাকটেরিয়া সেটার বিরুদ্ধে রেজিস্ট্যান্স ডেভেলপ করে । বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতির ব্যাপারে সেক্যুলার ব্যাকটেরিয়া সেভাবে রেজিস্ট্যান্স ডেভেলপ করেছে । সুতরাং এন্টিবায়োটিক চেঞ্জ করাটা বা আপগ্রেডেড জেনারেশনের এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করাটা সময়ের দাবি ।

নতুন এন্টিবায়োটিক ব্যবহারের চিন্তা হীনম্মন্যতা নয়- জীবন রক্ষার পরিকল্পনা ।

২৮-০৯-২০১৩

2 Responses

  1. omar mukhtar
    omar mukhtar at |

    .

    Reply

Leave a Reply