বাংলাদেশি মিডিয়ার অন্ধকার জগত-২

বাংলাদেশের মিডিয়া কতটুকু স্বাধীন? এই প্রশ্ন কিছুদিন আগে আমারই এক অনুজ করেছিল। উত্তরে তাকে একটা ঘটনা বলি। আমি যে অফিসে কাজ করি, তারই একটা ঘটনা। একদিন সম্পাদক সাহেব রিপোর্টিং সেকশনে এসে বলছেন, আজ থেকে আমরা পুরোপুরি সরকারের সমর্থন করব। এমনিতেই পত্রিকাটি সরকারের সমর্থক। তারউপর সম্পাদক সাহেবের এমন নির্দেশনা, কার দুঃসাহস হবে সরকারের বিরুদ্ধে কিছু যোগাড় করে এনে রিপোর্ট করার! কারও হয়নি। কেউ রিপোর্ট করেও না।

এই ঘটনাটা বর্ণনা করার পর আমার মনে আরও একটা বিষয় উঁকি দিল। আসলে মিডিয়ার স্বাধীনতা বলতে আমরা যা বুঝি তা কতটুকু সত্য? পশ্চিমা মিডিয়া তো খুব নাকি স্বাধীন। কিন্তু সেখানেও তো একজন ফিলিস্তিনি শিশুর বুকে পা রাখা ইসরাইলি সৈনিকের ছবি প্রকাশিত হয় না। বরং একজন ফিলিস্তিনি কতটা ভয়ঙ্করভাবে ইসরাইলি ট্যাঙ্ক বহরের দিকে কঙ্কর নিক্ষেপ করছে তা ফলাও করে প্রচার করা হয়। আসলে মিডিয়ার স্বাধীনতা বলতে যদি সরকারী বিধি-নিষেধের কথা বলা হয়, তবে এক কথা। আর সার্বিক স্বাধীনতা আর এক কথা। সরকারী বিধি নিষেধ তো ভারতীয় মিডিয়ায় কম নেই। তারপরও এনডিটিভি একজন বাংলাদেশি নাগরিকের উপর করা বিএসএফের জুলুমের দৃশ্য প্রচার করেছে। আনন্দবাজার প্রকাশ করেছে কিভাবে শেখ হাসিনার সরকারকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে ভারতীয় সরকার বাজেট বরাদ্দ দিয়েছে। এসব আমাদের পাশ্ববর্তী দেশের উদাহরণ।

বর্তমানে বাংলাদেশে নিত্যদিনই পেট্রল বোমা হামলার কথা শোনা যায়। আসলে এগুলো কারা নিক্ষেপ করছে? কারা প্রতিনিয়ত সাধারণ মানুষকে পুড়িয়ে মারছে। আমার একটা ঘটনার কথা মনে আছে। ঘটনাটা প্রায় দেড় বছর আগের। আমি এবং আমার এক বন্ধু বাসে করে আসছিলাম। সেদিন ছিল হরতাল। হঠাৎ করে বাস থেমে পরল। তাকিয়ে দেখি মার মার কাট কাট রবে লাঠি সোটা হাতে দশ/পনের জনের একটা দল বাসের দিকে তেড়ে আসছে। তবে তারা বাস ততক্ষণ ভাঙেনি যতক্ষণ বাসে মানুষ ছিল। মানুষ নেমে যাওয়ার পর বাসের কয়েকটা খিড়কি ভেঙ্গে দিয়ে চলে গেল। তাদের পরিচয় জানি না, তবে এমন হরতালকারী অন্তত আওয়ামী লিগে হওয়ার কথা নয়। এটা আমার জীবনের অভিজ্ঞতার কথা বললাম। এখন সত্যিকারেই যারা বোমা মেরে বাসের আগুনে পুড়িয়ে সাধারণ মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করছে তারা কারা?

ঠিক এই প্রশ্নটাই একজন সিনিয়র সাংবাদিক বন্ধুকে দিন কয়েক আগে করেছিলাম। তিনি সাফ বলে দিলেন, এসব ছাত্র লীগের কাজ। বন্ধুবরের কাছ থেকে খবর জানার দিন কয়েক পরই প্রথম আলোর অনলাইন ভার্সনে একটা নিউজ দেখলাম ‌‌”মাগুরায় বাসে আগুন দিতে গিয়ে ছাত্রলীগের তিন কর্মী গ্রেফতার”। পরেরদিন সংবাদটা কোন পত্রিকায় দেখিনি (সংবাদটা অবশ্য পরে দুয়েকটা পত্রিকা ছেপেছিল)। অথচ সংবাদটা ছিল লীড নিউজ হওয়ার মতোই। এমন আরও কত ঘটনা যে মিডিয়া অফিসে বাতিল সংবাদের স্তুপে জমা পরে তার খবর কে রাখে!

মিডিয়ার স্বাধীনতা সরকার কিংবা সংবিধান ঠিক করে দেবে না। এর স্বাধীনতার প্রকৃতিটা ঠিক করতে হবে মিডিয়াকর্মীদেরই। একজন আওয়ামী লীগার কিংবা বিএনপি সমর্থক হিসেবে সাংবাদিক হলে মিডিয়ার স্বাধীনতা কখনোই আসবে না। প্রধানমন্ত্রী যদি সম্পাদক সাহেবদের ডেকে নিয়ে সংবাদ ছাপানোর ব্যাপারে কোন বিধি নিষেধ দিয়েও থাকেন, তা খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়। সত্যি বলতে মিডিয়াম্যানরাই তো চান না এমন সংবাদ ছাপাতে যা শেখ হাসিনাকে রুষ্ট করতে পারে। স্বপ্রণোদিত এসব সাংবাদিকরা যতদিন বাংলাদেশের মিডিয়া জগতে পদচারণা করবেন ততোদিন মিডিয়ার স্বাধীনতা নিয়ে কোন আলোচনা ”উলুবনে মুক্তো ছড়ানো”র মতোই।

Leave a Reply