পহেলা বৈশাখে নববর্ষ উদযাপন কি ইসলামবিরুদ্ধ ?

পহেলা বৈশাখ উদযাপন নিয়ে তরুণ সমাজ যথারীতি দুটি পক্ষে সক্রিয় হয়ে ওঠে । একটি গ্রুপ গড্ডালিকা প্রবাহে ভেসে যথারীতি মেতে ওঠে নানা উন্মাদনায় । আর ‘ইসলামপন্থি’ হিসেবে অনেকেই নববর্ষ উদযাপনের বিপক্ষে কট্টর অবস্থান নেন । ‘নববর্ষ উদযাপন’ করাটাকেই ‘শিরক’ , ‘অনৈসলামিক’ হিসেবে তুলে ধরেন । এতে করে একটা সন্দেহ সবার মনে ঢুকে যায় ‘এরা যে ইসলামী সমাজের কথা বলে ,সেখানে তাহলে পহেলা বৈশাখ বলে কিছু থাকবে না’ !

খন্ডিত ও সংকীর্ণ চিন্তার মাধ্যমে ইসলামী সংস্কৃতিকে স্থানীয় সংস্কৃতির সাথে সাংঘর্ষিক করে দেখানোটা ঠিক নয় । ইসলাম মানেই সব স্থানিক সংস্কৃতিকে বিসর্জন দেয়া নয় ।

পহেলা বৈশাখে নববর্ষ উদযাপন উপলক্ষে যেসব কাজ করা হয় সেগুলোর একটা অংশ আছে বড় ধরনের গুনাহ এবং ঈমান – আক্বিদার পরিপন্থি । আরেকটা অংশ আছে যেগুলোকে শরীয়াতের দৃষ্টিতে ‘মুবাহ’ বলা যেতে পারে ।‘মুবাহ’ হচ্ছে এমন বিষয় যে সম্পর্কে ইসলাম বাধাও দেয়না , উৎসাহিতও করেনা । নেকীও নেই , গুনাহও নেই । পান্তা ভাত খাওয়া ,সামর্থবানদের ইলিশ খাওয়া ,বৈশাখি মেলায় যাওয়া , বেলুন ও ঘুড়ি ওড়ানো, নাগরদোলায় চড়া, পরিবারের সবাইকে নিয়ে কোথাও ঘুরতে যাওয়া, দোকানে ‘হালখাতা’ অনুষ্ঠান করা ইত্যাদি এই অংশে পড়ে । সারাদেশের সাধারণ মানুষ নববর্ষ উদযাপন বলতে এগুলোকেই বোঝে । এগুলোই করে । এগুলো কি গুনাহের কাজ ? এগুলো কি ঈমান – আক্বিদার সাথে সাংঘর্ষিক ? উত্তর-না ।

বড় শহরগুলোতে বিশেষত ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী এবং এলিটদের একটা অংশ অতিরিক্ত যেসব কাজ করে – সকাল বেলা ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামক বিশেষ শোভাযাত্রা, ঢাকার রমনা বটমূলে এবং চট্টগ্রামে ডিসিহিলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে । গান গেয়ে বৈশাখকে স্বাগত জানায় । কোথাও কোথাও কনসার্টের আয়োজন থাকে । এসব স্থানে নারী পুরুষের অবাধ মেলামেশার সুযোগ থাকে।

এই অংশটা ‘মুসলিমদের জন্য’ ঈমান পরিপন্থি কাজ । তবে অন্যান্য ধর্মাবলম্বিদের জন্য নয় । কারণ , তাদের ধর্মে এসব অনুমোদিত ।

পহেলা বৈশাখ দিনটিকে কোন পবিত্র দিন মনে করা , এদিনে দুঃখ কষ্টদুর হয়ে যায় এরকম কোনবিশ্বাস করা ঈমানের সাথে সাংঘর্ষিক হবে । পহেলা বৈশাখকে উপলক্ষ করে সংকীর্ণ ‘জাতীয়তাবাদ’ উস্কে দেয়া ,অন্তরে লালন করা এগুলোও মৌলিক আক্বীদার পরিপন্থি । কনসার্টে অংশগ্রহণ , ছেলেমেয়ে অবাধ মেলামেশার সুযোগ গ্রহণ করা স্পষ্ট সীমালংঘন । কিছু রীতি অনুসরণ (মঙ্গলপ্রদীপ জ্বালানো, শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ , বিদঘুটে চেহারাধারন , প্রতিকৃতি তৈরি) করা হাদিস অনুযায়ী উম্মতের অন্তর্ভুক্তি হতে বের হওয়ার কারণ । এসকল বিষয়ে মুসলিমদের সতর্ক থাকতে হবে ।

কিন্তু এসব না করেও নববর্ষ উদযাপন করা যায় ।‘শোভাযাত্রা’ নিজে হারাম নয় , এর সাথে যুক্ত হওয়া মুর্তি , বিভিন্ন বিদঘুটে প্রতিকৃতি , বেপর্দা অবস্থায় নারী পুরুষের একসাথে অংশগ্রহণ এসব উপাদান এটিকে দূষিত করেছে । এসব উপাদান বাদ দিয়ে শোভাযাত্রা করলে সেটাও হারাম বা গুনাহ না হয়ে ‘মুবাহ’ পর্যায়ে পড়বে । নিষিদ্ধ বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার না করে এবং নারী পুরুষের অবাধ মেলামেশার সুযোগ না রেখে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও করা যেতে পারে । বিভিন্ন স্থানে শিশু- কিশোর সংগঠন ‘ফুলকুড়ি’ এবং অন্যান্য ইসলামী সাংস্কৃতিক সংগঠন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে । এসব অনুষ্ঠান নারীদেরও উপভোগ করার সুযোগ রাখা হয় ।

কেউ কেউ নববর্ষ উদযাপনকে ‘হিন্দু’ সংস্কৃতি বলে পুরোপুরি বর্জন করার কথা বলছেন । ‘কোন ব্যক্তি যে জাতির অনুসরণ করবে সে তাদের অন্তর্ভূক্ত’ এই হাদীসকে ব্যবহার করছেন ।

কীভাবে এটা ‘হিন্দু’ সংস্কৃতি হলো ? বেদ, গীতা ,ভগবত , রামায়নে কি পহেলা বৈশাখ উদযাপনের কথা বলা হয়েছে ? পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও তো হিন্দুরা বাস করেন , সবদেশের হিন্দুরা কি পহেলা বৈশাখে নববর্ষ উদযাপন করেন ? না । তাহলে কেন ? কলকাতার হিন্দুরা আগে থেকে এটা পালন করেন । শুধুমাত্র এই যুক্তিতে এটাকে ‘হিন্দু সংস্কৃতি’ বলে চালানো ঠিক হবে না । কলকাতা একসময় এই অঞ্চলের রাজধানী ছিল । সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু ছিল । সেজন্য ওখানে হয়তো জাকজমক বেশি ছিল । ওখানকার খবরও প্রচারিত হয়েছিল বেশি ।

অন্য ধর্মের লোকেরা করলেই কি সব ‘পরিত্যাজ্য’ হয়ে যায় ? শিখরা তো দাড়ি রাখে এবং পাগড়ী পড়ে, তাই বলে কি সেসব মুসলিমদের জন্য নিষিদ্ধ হয়ে যাবে ?

মঙ্গল শোভাযাত্রা শুরু হয়েছে অতিসম্প্রতি , ১৯৮৯ সাল থেকে । এটা নববর্ষ উদযাপনের কোন সার্বজনীন অনুষঙ্গ নয় । বাঙ্গালির হাজার বছরের ঐতিহ্যও নয় । এটাকে সহজেই বাদ দেয়া যেতে পারে।

সুতরাং , ‘পহেলা বৈশাখে নববর্ষ উদযাপন’কে সরাসরি ইসলাম বিরোধী বলার কোন যৌক্তিকতা আমি দেখিনা । বিষয়টাকে এভাবে দেখা যেতে পারে- গ্লাসে করে কেউ মদ খায়, তাই বলে গ্লাসটাই হারাম ? তা নয় । মদবিহীন গ্লাসে আমরা পানিও খেতে পারি । এটাকে পহেলা বৈশাখ বা নববর্ষ উদযাপনের ‘ইসলামাইজেশন’ বলারও দরকার নেই । কথায় কথায় ইসলামাইজেশন শব্দটার ব্যবহার আসলে একধরণের হীন্মমন্যতা । ইসলামাইজেশন কেন ? বরং বলা যেতে পারে দূষিত যেসব উপাদান ঢুকেছে সেগুলোকে এড়িয়ে যাওয়ার মাধ্যমে পরিশুদ্ধকরণ ।

ইসলাম শুধু আরবের জন্য ছিলনা , ইসলাম সারা বিশ্বের জন্য । বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে নানারকম স্থানীয় সংস্কৃতি রয়েছে । সবকিছুই ইসলাম বিরোধী নয় , হতেও পারেনা । ইসলামের মৌলিক সীমার ভেতরে যেকোন উৎসব গ্রহণযোগ্য । স্থানিক সংস্কৃতির সাথে আরব সংস্কৃতির মিল না থাকতে পারে , তাই বলে সবকিছুকে ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক করে দেখানো ইসলামের প্রসারের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হবে ।

আমি মনে করি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলেও সেখানে নববর্ষ উদযাপনের ব্যবস্থা থাকতে হবে । যেসব বিষয় মুসলিমদের জন্য ঈমান পরিপন্থি , অন্যান্য ধর্মাবলম্বিদের জন্য সীমিত পরিসরে সেসব উপাদানসহ উদযাপনের সুযোগ দিতে হবে । কারণ, তাদের ধর্মে তো সেসব নিষেধ নেই ।

মোটকথা , ইসলামের সীমার ভেতরে থেকে অবশ্যই নববর্ষ উদযাপন করা যাবে । যদি কেউ সন্দেহ পোষণ করেন তাহলে তিনি তাক্বওয়াবান হিসেবে নিজে বিরত থাকতে পারেন ।

আমি নিজে সাধারণত ঘুমিয়ে এবং বই পড়ে পহেলা বৈশাখ কাটিয়ে দেই । কখনো কখনো বিকেলে বন্ধুদের সাথে ঘুরতে বের হই । পান্তা ,কাঁচামরিচ আমার মত মানুষের জীবনে নিত্যদিনের খাবার । আর ইলিশ আমার নাগালের বাইরে । তবে কেউ দাওয়াত দিলে মিস করিনা বটে !

। এপ্রিল ১৪, ২০১৩ ।

Leave a Reply