হেফাজতে ইসলাম,আহলে হাদীস এবং দরদি বন্ধু সেকুলার রাজনীতি।পর্ব – (দুই)

প্রথম পর্বের পর –
তিন)
দেশে কতটি মাদ্রাসা আছে যা কওমী নেসাবে চলে।এর হিসাব হয়তো কারোর কাছে নেই।তাদের নিজেদের মধ্যে এত ভাগ (দল-উপদল) তা নিজেরাই হিসাব রাখার প্রয়োজন মনে করেন না।এবতেদায়ী (প্রাইমারী) পর্যন্ত মাদ্রাসা। নাম দেয়া হয় জামেয়া (বিশ্ববিদ্যালয়)।যিনি মুহাতামীম তিনি হয়তো কয়েক বছর আগে দাওরা ফারেগ (পাশ) হয়েছেন। মুতামীম সাহেবের পরিচিত কোন সম্পদশালী ব্যক্তির অনুদানে শুরু হয় মাদ্রাসার কার্যক্রম। এভাবেই যাত্রা শুরু।
কে পয়সা দিচ্ছে,তার উপর্জন হালাল কি না,সে সেকুলার না বামপন্থী – আস্তিক না নাস্তিক রাজনীতি করে ইত্যাদি বিবেচনা করার কোন প্রয়োজন পড়ে না।আল্লাহর ওয়াস্তে দিচ্ছেন আর মুহতামীম হুজুর নিচ্ছেন। চলছে মাদ্রাসা। খুব কম মাদ্রাসা আছে যেগুলো এই সব বিষয় বিবেচনা করে।
নাম করা অনেক মাদ্রাসার মুহতামীমরা প্রবাসে এমন সব ব্যক্তিদের মেহমান হন – যাদের অর্থ উপার্জন ও ব্যক্তিগত রাজনৈতিক চিন্তা চেতনা এবং নৈতিক দিক থেকে খুবই বিতর্কিত।খুবই বিবৃত হতে হয় মাঝে মধ্যে।
কওমী মাদ্রাসাগুলো দেশের জন্য কি করছে।এই একটি পয়েন্টে সবাই এক হওয়া প্রয়োজন ছিল।কওমী বোড কতটি আছে কারো জানা নেই।সামান্য মত পার্থক্য হলেই নতুন একটি বোড। তবে শাহবাগী মাওলানা – ফরিদ উদ্দিন মাসউদের মতে কওমী বোড কয়েকশত।

আমাদের জাতীয় পর্যায়ে এর একটি সমীক্ষা হওয়া প্রয়োজন। আমি মনে করি কওমী মাদ্রাসাগুলো থেকে যে সমস্ত আলেম ওলামা বের হচ্ছেন তারা আমাদের দ্বীনের রাহবার হতে পারতেন। অতীতে এই জাতি অনেকবার তাদের ওপর ভরসা করেছে। আগামীতে ও করবে।বাস্তবতা হল প্রতিবারই জাতি আশাহত হয়েছে। আরো বেশ কিছু বিতর্ক জন্ম দিয়ে ইন্তিকাল হয়েছে।ব্যক্তি কেন্দ্রিক যে আন্দোলনের জন্ম হয় তার উপসংহার এভাবেই হয়।এটা ইতিহাস। ব্যক্তিগত ইগো,সামান্য দুনিয়াবী স্বার্থ,মাদ্রাসার প্রধান পদটি হয় এই সমস্ত কারণ। সমস্যা হল – তারা নিজেরাই।
মরহুম হাফিজ্জি হুজুর (রঃ) তওবার রাজনীতি শুরু করেছিলেন – জাতির মধ্যে কত বড় আশা জেগেছিল ঐ সময়। কিন্তু ঐ একই সমস্যা। পবিত্র এই আন্দোলনে বাধা হলেন তারই পুত্র আর জামাই। এগুলো একেবারে নিকটি ইতিহাস।
এরশাদকে দিয়ে আল্লামা আজিজুল হক সাহেবকে বের করা হল লাল ভাগ থেকে। আজকের এমপি হাজি মকবুল সাহেব এগুলো খুবই ভাল করে জানেন। রহমানীয়াতে গিয়ে ও তিনি শান্তিতে ছিলেন না।
বর্তমান হেফাজতে ইসলাম পর্দার অন্তরালে চলে যাবার কারন ও ঐ একটা।
কেউ একমত না হতে পারেন – তবে আমার বিবেচনায় আসল সমস্যা হল – ইসলাম সম্পর্কে কওমী ওলামাদের ইসলামের খন্ডিত ব্যাখ্যা।যদিও বিবেচনাটা খুবই শক্ত। তবে এটাই ইতিহাস। ৪৭ পূর্ব দেওবন্দের আকাবীরদের অবস্থান পর্যালোচনা করুন।
মাসলায়ে কওমিয়াত (জাতিয়তাবাদ) নিয়ে হোসেন আহমাদ মাদানী (রঃ) হিন্দু মুসলিমকে এক জাতি করে ফতওয়া দিয়ে দিলেন।দেওবন্দের ওলামারা সেদিন যদি জাতীয়তার প্রশ্নে ইসলামের মৌলিক আকিদা ঠিক রাখতেন। তাহলে উপমহাদেশের চেহারা ভিন্ন হত।

ইসলামের খন্ডিত রুপকে তারা তখন যেমন মনে করতেন আসল ইসলাম।নিজেদের ইজতেহাদকে ইসলামের একমাত্র ব্যাখ্যা হিসাবে বিশ্বাস করতেন।
এই ভূল এবং মারাত্মক আকিদায় আক্রান্ত তখনকার কওমী আলেম ছিলেন। আজও সেই জায়গা থেকে বের হতে পারেননি আমাদের সম্মানীত এই মানুষগুলো।
সমস্যাটা এই জায়গায়।
আজকের ভারতীয় পরারাষ্ট্রমন্ত্রীর (সালমান খুরশীদ) চাচা (শাইখ হাবিবুর রহমান) একজন আকাবীরে দেওবন্দ।এই দেশ থেকে যারা যেতে পারেন তাদের মধ্যে শহবাগী মাওলানা (ফরিদ উদ্দিন মাসউদ) একমাত্র প্রতিনিধি।এদেশের দেওবন্দের আলেমদেরকে ভারত যেভাবে চায় সেভাবেই চলতে বাধ্য করে।তার প্রমান অতীত নির্বাচনে এই জাতি প্রত্যক্ষ করেছে।আল্লামা সাঈদি সাহেবকে যারা ভোট দিবে তারা শুকুরের গোশত খাবে। এমন ফতোয়া দিয়েছিলেন ২০০১ সালে। ইনকিলাবের উপসম্পদকীয়তে এ বিষয়ে বিস্তারিত লেখা হয়েছিল।
বাংলার রাজনৈতিক এতিম ইনু মেননরা যখন বীর দর্পে ঘোষনা দেন – কওমী মাদ্রাসা বন্ধ করার। তখন দেখা যায় – কওমীর কিছু আকাবীর সরকারের সাথে মিটিং করছেন। কওমী মাছলাকের আলেমদের কাছে ইসলাম পন্থী দল বা মানুষ যত না গ্রহনীয় তার চাইতে বেশী আপন হলো – সেকুলার ও বামপন্থী গোষ্ঠী।এটা অপ্রিয় হলেও সত্য। বর্তমান সরাকারের সাথে তিনবার বঙ্গ ভবনে বৈঠক করেছেন আল্লামা শফী সাহেব। তার পর শাপলা চত্তর। এর পর আবার তারপর আওয়ামীলীগ দরদি বন্ধু হবার ঘোষণা।
উপজেলা নির্বাচনে জামায়াতের বিজয় হয়েছে বড় কারণ।বন্ধুর সাথে পিরীত হতে সময় লাগেনি।যা আগে ছিল -কেননা – মোতায়াল্লী সাহেবরা (অর্থদাতাগোষ্ঠী) যা বলবে তা না মানলে তো মাদ্রাসা চালানো যাবে না।করুণ এবং নিদারুন বাস্তবতা হল এটা।
চার)
কওমী ওলামাদের মনোজগতটা কেমন তা বুঝতে আমার ব্যক্তিগত একটি অভিজ্ঞতা শেয়ার করি।
গত কয়েক বছর আগে একটি প্রোগ্রাম হয়েছিল আলিয়া এবং কওমী হাজারাতদের নিয়ে।এটার আয়োজন করেছিলেন আমাদের পরিচিত প্রবাসী এক আলেম। যিনি খেলাফত মজলিসের বড় দায়িত্বশীল। আমি দাওয়াত পেয়েছিলাম আমার ঐ চাচার পরিচিতিতে।আমি শাইখ বদরপুরীরর ভাতিজা।এরকম পরিচিতি খুবই বড় হয় কওমী ওলামাদের কাছে।
আমি বয়সে,কর্মে,ছিরতে ও ছুরতে মজলিসের একেবারে ছোট মানুষ। আমার শুনা ছাড়া আর কিছু করার ছিল না।ঐ পরিবেশে কথা বললে উপস্থিত সবার কাছে হত চরম বেয়াদবী।
মজলিসে জামায়াতের কেউ ছিলেন মনে পড়ছে না। তবে আলোচনাটা শুরু হয় জামায়াতকে নিয়েই। জামায়াতের আকিদা,মাওলানা মওদুদী – এদের সাথে কোন ঐক্য সম্ভব নয়। ঈমান বাঁচাতে অবশ্যই আমাদের (কওমী তথা দেওবন্দী) আকাবিরদের অনুসরণ করতে হবে।
তেমন কোন কর্মসূচি ছিলনা। তবে আলোচনার প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ ভাগই জামায়াতকে নিয়ে। তার পর খাবার দেয়া হল। আমি খাবারের সময় যিনি দাওয়াত করেছেন তাকে সকল বিনয় আর শ্রদ্ধা একত্রিত করে জিজ্ঞেস করলাম – আজকের বৈঠকের উদ্দেশ্য কি ছিল। তিনি আমার দিকে তাকালেন, মুচকি হাসলেন। বললেন – আমি জানতাম তুমি এরকম প্রশ্ন করবে।
আমি বললাম,এত সময় দিলেন – লাভ হল কী? বরং আরো ক্ষতিই তো হল।
তিনি আর কিছু বললেন না। আমার দিকে তাকিয়ে শুধু বললেন – দেখলে তো জামায়াতের ব্যাপারে আমাদের আলেমদের চিন্তা কেমন।
আমি বললাম, আপনি ইচ্ছা করলে তো জামায়াতের একজনকে রাখতে পারতেন। তাহলে তারা এর জবাব দিত।আলেম সাহেব আর কিছু বললেন না। মনে হল বিরক্ত হচ্ছেন।
আমি খাবার টেবিলের দিকে অগ্রসর হতেই দেখা হল আমার আগের পরিচিত একজনের সাথে। তিনি আমাকে দেখে খুবই চমকালেন। বললেন,আপনি ছিলেন অথচ কিছুই বললেন না।আপনারা আর কবে এক হবেন।আপনারা এক না হলে তো এরকম হবেই।বাকশালীরা আপনাদেরকে পিটাবে। আর বিএনপি আপনাদেরকে নিয়ে খেলা করবে।
আমি তাকে কাছে টেনে বললাম,ভাই কাকে এক হতে বলছেন?
জামায়াত সেই ১৯৪১ ইংরেজী থেকে এক আছে। কবে তারা ভাগ হল। এতক্ষণ যে হুজুরদের কথা শুনলেন,তারা কবে এক এবং ঐক্য ছিলেন?
তওবার রাজনীতি দিয়ে যারা শুরু করছিলেন – তারা আজ সম্ভবত এক ডজনের বেশী ভাগে ভাগ হয়ে আছেন।একজন আরেকজনকে বিশ্বাস করেন না। একজনের মাদ্রাসায় আরেকজন দাওয়াত গ্রহন করেন না।কমিনিষ্টরা তারা সাইনবোড ভাগ করেছে। আদর্শ ভাগ করেনি। আফসোস হল – আমাদের সম্মানীত হুজুররা নিজেদের স্বার্থের জন্য ইসলামকে বহু ভাগে ভাগ করেছেন।
জামায়াতকে টার্গেট করে যত কথা বলেছেন তার চাইতে শতগুন বেশী সমস্যা রয়েছে তাদের নিজেদের মধ্যে। নিজেদের মাদ্রাসার চার দেয়ালের ভিতর গোটা দুনিয়াটা ভাবেন। মাত্র কয়েক হাজার ছাত্রদের মুহতামীম হয়ে নিজেদেরকে আমীরুল মুজাহীদীন বলে ভাবতে থাকেন।বললাম যারা নিজেরা মাত্র কয়েক বছর একসাথে চলতে পারলেন না তারা আবার ঐক্য করবেন এটা আপনি বিশ্বাস করেন?

খাওয়া দাওয়া শেষ করে যারা খুবই উচ্চকন্ঠ ছিলেন তাদের সাথে মিলিত হলাম।চেহারা সুরত দেখে মনে হল আজ তারা বড় জিহাদ করেছেন। আমার বয়সী এবং কিছুটা পরিচিত একজনকে জিজ্ঞেস করলাম – জামায়াতের বিষয়ে একটা সিদ্দান্ত হওয়া প্রয়োজন ছিল? তিনি বললেন – আমি মুফতি সাহেবকে বলেছিলাম। কিন্তু মুফতি সাহেব রাজি হননি।আমি বললাম আপনি কি ভাবছেন – বললেন প্রবাসী ওলামাদের পক্ষ থেকে একটি ফতোয়া দেয়া উচিত।
পরিচিত হয়ে জানলাম – তিনি এক মসজিদের খাদেম।তার ব্যবসা হল ইন্টারনেট।ভাল পয়সা কামিয়েছেন। বিবি বাচ্ছা নিয়ে আছেন।
গাড়িতে বসে চিন্তা করছিলাম আর আমি নিজের অজান্তেই চলে গেলাম ১৯৮৯ সালে। সিলেট জিন্দাবাজার পয়েন্ট। সভা চলছে। আমি কুদরত উল্লাহ জামে মসজিদের ইমাম সাহেবের (মাওলানা জমীর উদ্দিন) হুজরাতে বসা। কিছুক্ষন পর প্রতিবাদ সভায় বক্তৃতা করবেন সিলেটের কাজীর বাজার মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা হাবিবুর রহমান (বুলবুলি) সাহেব।সভার আয়োজন করেছে জাগ্রত জনতা বা এরকম নতুন নামের কোন সংগঠন। আল্লামা দেলওয়ার হোসেন সাঈদি সাহেবকে রুখতে হবে শাহজালালের মাঠিতে।এটা তাদের ভাষায় ঈমান রক্ষার আন্দোলন।
আগের দিন একই জায়গায় একই দাবীতে জনসভা করেছেন কমিনিষ্ট পার্টি।সভাপতি ছিলেন কমরেড সদর উদ্দিন।
আগামী পর্বে – জিন্দাবাজার পয়েন্টে জনাব বুলবুলির বক্তৃতা –
====================================
প্রথম পর্বের লিংক।http://www.onbangladesh.org/blog/blogdetail/detail/1876/IBNAHMED/43914

Leave a Reply