হেফাজতে ইসলাম,আহলে হাদীস এবং দরদি বন্ধু সেকুলার রাজনীতি।পর্ব – (তিন)

দ্বিতীয় পর্বের পর –
পাঁচ)
তখন বাকশালীদের সুস্বাদু আচার! জনাব এরশাদ সাহেবের শেষ বেলা। আল্লামা সাঈদী সাহেবের তাফসীর মাহফিল যেখানে – ১৪৪ ধারা সেখানে। আবার যেখানে ই ১৪৪ ধারা জারি করা হত – ঠিক একই দিন আবার হরতাল আহব্বান করা হত খুছরা কিছু সংগঠন থেকে।
অবশ্য তখন আজকের মত এত ৭১ চেতনা ব্যবসায়ী ছিল না।তবে মুক্তিযুদ্ধা কমান্ড এবং কিছু দরবারী (ভন্ড) আলেম দিয়ে মাঠ গরম রাখা হয়েছিল। দু:খ জনক হলেও সত্য – আমাদের কওমী হাজারাত এই কর্মে লিপ্ত ছিলেন। বরাবরের মত তারা ফতোয়া দিয়ে নিজেদের দায়িত্ব শেষ করতেন।
এখানে বলে রাখা ভাল – চট্রগ্রামের মত সিলেটের তাফসীর মাহফিল ছিল সারা বছরের অপেক্ষামান একটি গন মানুষের মহা মিলন মেলা।দৃশ্যত এটা শুধু তাফসীর মাহফিল ছিল না। বরং সিলেট আলীয়া ময়দানের তিনদিনের তাফসীর মাহফিলের জন্য প্রস্তুতি নেয়া হত বছর ব্যাপি।সিলেট বাসীর সাথে আসামের গৌহাটি,করিমগন্জ,শিলচরের মুসলমান – অমুসলমান সবাই আসতো এই তাফসীর মাহফিলে।

চট্রগ্রাম তাফসীর মাহফিল শুরু হবার তিন বছর আগে সিলেটের তাফসীর মাহফিল শুরু হয়। আল্লামা সাঈদী সাহেবের পূর্বে এরকম কোরআনের সরাসরি তাফসীর মাহফিল হত না।যা হত সেগুলো জন নন্দিত এবং গনমানুষের কাছে হৃদয় স্পর্শ করতে পারেনি। ওয়াজ নসিহতের নামে যা ছিল – মাযার পন্থীরা করতেন ইসালে সাওয়াব,মিলাদুনব্বী ধরনের মাহফিল।সেগুলোতে মানুষের চরিত্র সংশোধনের কোন উপাদান থাকতো না।বরং মুসলমানকে নির্জিব এবং বিদআতের শিক্ষা দেয়া হত।
আর ক্বাওমী (পন্থী) মাছলাকের লোক মাদ্রাসা ভিত্তিক দাস্তারবন্ধী মাহফিল করতেন। এই মাহফিলগুলো হত সংলিষ্ট মাদ্রাসা প্রাঙ্গনে। অত্র মাদ্রাসা থেকে যারা ফারেগ (পরিক্ষায় পাশ) করতেন তাদেরকে পাগড়ি পরানো হত এবং মাদ্রাসার জন্য পয়সা উঠানো হত।দৃশ্যমান উদ্দেশ্য হত মাদ্রাসার উন্নতির জন্য অর্থের যোগান দেয়া। এতে বিদেশ থেকে মেহমান আনা হত।
এরকম পরিবেশে সম্পুর্ণ বিপরীত এবং সত্যিকার মানুষের সংশোধন এবং সমকালীন জিজ্ঞাসার বাস্তবধর্মী আলোচনা নিয়ে আসেন আল্লামা সাঈদী সাহেব। আল্লামা সাঈদী সাহেব দেশ স্বাধীন হবার ১৯৭৪ থেকে শুরু করেন পরিকল্পিত তাফসীর মাহফিল। অবশ্য মাঝখানে তাকে জেলে যেতে হয়েছিল কয়েক মাসের জন্য। তার পর অবিরাম চলছিল এই কার্যক্রম।রেডিকাল পরিবর্তন বলতে যা বুঝায় তা শুরু হয়ে যায়। এতদিন যারা জশনে জুলুস,দাস্তারবন্ধী আর ঈদে মিলাদুন্নবী নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন তারাও তাফসীর মাহফিল এবং সিরাতুন্নবী (সাঃ) নামে শুরু নিজেরা শুরু করতে বাধ্য হন।
এই পর্যায়ে একটি বস্তবতা তৈরী হয় – সাঈদী সাহেব সহ এই অঙ্গনের আলেমরা যে ভাবে কুরআনের তাফসীর করেন এবং গনমানুষের হৃদয়ে জায়গা করেন। বাকিরা সবাই পিছনে পড়ে যায়। ফলাফল হয় ওয়াজ নসীহ যাদের রুজি রুটির একমাত্র উপায় ছিল তাদের সমস্যা হয়। কিস্সা কাহিনী নির্ভর উদ্দেশ্য বিহীন ওয়াজ নসীহত দিয়ে মানুষ আর সন্তুষ্ট থাকে না।
সমাজের আরেক শ্রেণীর মাথায় বাজ পড়ে। দেশের কমিনিষ্ট এবং মানব রচিত মতবাদের রাজনীতি প্রমাদ গুনতে থাকে। মানব রচিত মতবাদের তুলনামূলক আলোচনায় তাফসীর মাহফিলগুলো যুব সমাজের মধ্যে টনিকের মত কাজ করে।তাদের পুকুরের জিয়ানো মানব সম্পদ (যুবসমাজ) ইসলামী আন্দোলনের পুকুরে স্থানান্তরিত হতে থাকে।

তাই সম্মিলিত বাধার মুখে পড়ে দেশের তাফসীর মাহফিলগুলো।এই ছিল সেই সময়কার ১৪৪ ধারার হাকিকত। বুলবুলি সাহেবের সেই মিটিং ছিল এরই ধারাবাহিকাতার একটি।
(ছয়)
মাওলানা হাবিবুর রহমান (বুলবুলি) সাহেব ক্বাওমী আলেমদের মধ্যে বেশ প্রভাশালী।একটি উদাহরণ দেই। একবার কাজীর বাজার মাদ্রাসার (তিনি ঐ মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা মুহাতামীম) বার্ষিক জলসায় আফগানী হাফিজূল হাদীসকে দাওয়াত করে আনা হয়। অবশ্য মাওলানা হাবিবুর রহমান সাহেব প্রত্যেক বছর হয় পাকিস্তান,ইন্ডিয়া অথবা আফগান থেকে মেহমান দাওয়াত করতেন। ঐ বার বিশ্বের একমাত্র হাফিজুল হাদীস আল্লামা দরখাস্তীকে (রঃ) নিয়ে আসেন। মাহফিল উপলক্ষে একটি কৌড়পত্র বের করা হয় মাদ্রাসার পক্ষ থেকে। হেড লাইন করা হয় – ‌’মাওলানা হাবিবুর রহমান ইচ্ছা করলে আসমান থেকে জিব্রাইল ও আনতে পারেন।’ পরের দিন সিলেটের সকল পত্রিকায় তা হেড লাইন করে।
সিলেটের ব্রেরলভী গ্রুপ (ফুলতলী পীর) এ নিয়ে চরম হাংগামা শুরু করে। এদিকে জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা গত শতাব্দীর মুজাদ্দিদ আল্লামা মওদুদী (রঃ) কে নিয়ে একটি বই লিখেন বুলবুলি সাহেব। ‘সত্যের আলো’ নামের এই বইটির জবাব লিখেন কুদরত উল্লাহ মসজিদের পেশ ইমাম সাহেব।আর যায় কোথায়? সমস্ত ক্বাওমী আলেম একত্রিত হন সাঈদী সাহেবকে রুখতে হবে। এই রুখার কাজে কারা বাতাশ করতে ছিল,কারা পয়সা দিচ্ছিল,কারা মিটিংয়ে লোক সাপ্লাই করছিল তা আমরা সব জানতাম।
জামায়াত বরাবরের মত এই সব কাজে তার জনশক্তিকে ব্যবহার করতো না। আবার অন্যায় ফতোয়ার কোন জবাব ও দিত না।এটা জামায়াতের ভুল না শুদ্ধ কর্ম পদ্ধতি। তা এখানে বিবেচ্য নয়। তবে জামায়াত যদি এ পর্যন্ত যত ফতোয়া দেয়া হয়েছে আমাদের ক্বাওমী হাজারাতের পক্ষ থেকে তার জাবাব দিত তাহলে আমার মনে হয় – ইতিহাসে আরেকটি ফতওয়ায়ে আলমগীরী হত।
মাওলানা হাবিবুর রহমান সাহেব আলোচিত মিটিংয়ে -বলেন – আংগুল উচু করে ঐযে মসজিদ দেখছেন (কুদরতউল্লাহ) এটা মসজিদ নয়।বরং তা মসজিদে জিরার। এখানে সালাত আদায় করা কোন মুসলমানের জন্য হারাম। তিনি ঘোষণা করেন – আমার লাশের ওপর দিয়ে বাতিল ফিরকার আলেম সাঈদি সিলেটে আসতে হবে।’ আরো অনেক কথা।
আমি ইমামের হুজরা থেকে বের হয়ে পাশের মার্কেটের একটি পরিচিত ফটোকপির দোকান থেকে মাওলানার বক্তব্য শুনছিলাম।
প্রবাসের সেই আলেমদের বৈঠক থেকে বের হয়ে সিলেটের ঐ দিনের দৃশ্য চোখে দেখছিলাম। আর ভাবছিলাম,১৯৮৯ থেকে ২০১১ পর্যন্ত সময়ের ব্যবধান অনেক। অনেক কিছুর পরিবর্তন হয়েছে।আমাদের ক্বাওমী হাজারাতের মনোজগতের কোন পরিবর্তন হয়নি। বরং যা ছিলেন তারা ৪৭ সালের আগে এবং পরে আজ ও সেই একই চিন্তা চেতনায় আছেন।আগে ছিল বন্ধু সেকুলার কংগ্রেস – আর আজ সেকুলার বাকশাল।এখানে ইসলাম মুসলমান কোন বিবেচ্য নয়। আকাবীরে দেওবন্দের অনুকরণ অনুসরন আসল।(ক্ষমা করবেন)
প্রশ্ন হল – ঈমান, আকিদার জন্য এই বন্ধু নির্বাচন না শুধুমাত্র নিজেদের দুনিয়াবী স্বার্থের জন্য।
==================================
আগামী পর্বে – তিন দিন পর –
=========
দ্বিতীয় পর্বের লিংক –
http://www.onbangladesh.org/blog/blogdetail/detail/1876/IBNAHMED/44016

Leave a Reply