‘৭১ প্রসঙ্গে আল্লামা সাঈদীর একটি বক্তব্য বিশ্লেষণ ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা

যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে শুনানি চলাকালীন অবস্থায় অসুস্থ হওয়ার পর , শ্রদ্ধেয় আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বড় ছেলে , বিশিষ্ট আলেম – রাফীক বিন সাঈদী আকস্মিকভাবে ইন্তেকাল করেন । প্যারোলে মুক্তি পেয়ে ছেলের জানাজায় লাখো মানুষের উপস্থিতিতে আল্লামা সাঈদী এক সংক্ষিপ্ত এবং আবেগঘন ঐতিহাসিক ভাষণ দেন । তিনি বলেনঃ

‘৫০ বছর কোরআনের তাফসীর করেছি সারা বাংলাদেশে, সারা পৃথিবীতে। আমাকে বানানো হয়েছে রাজাকার, আমাকে বানানো হয়েছে চোর, ডাকাত, হত্যাকারী, ধর্ষণকারী ।
আমি আল্লাহর নামে কসম করে বলিঃ ও আল্লাহ , তোমার জাতের কসম, তোমার ইজ্জতের কসম, তোমার সম্মানের কসম। ১৯৭১ সালের একফোটা বালি বা কাদা আমার গায়ে লাগে নাই, লাগে নাই, লাগে নাই’ ।

আমি বিশ্বাস করি- তিনি নিরপরাধ । তাঁর সেই ভাষণ হতে আমি যে অংশটুকু বোল্ড করেছি ‘১৯৭১ সালের একফোটা বালি বা কাদা’ । এর অর্থ হচ্ছে আল্লামা সাঈদী ৭১ প্রসঙ্গকে ‘বালি বা কাদা’ – মনে করেন । সচেতন কিংবা অবচেতন মনে তিনি সেটা ব্যক্ত করেছেন ।
বলাবাহুল্য , ‘বালি বা কাদা’ কোনটাই ভালো অর্থ প্রকাশ করে না ।

২।
জামায়াতের কর্মীগন দাওয়াতী কাজ করতে গেলে প্রথমেই এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়- একাত্তরে জামায়াতের ভূমিকা কী ? অনেক মানুষ আছে যারা জামায়াতের আদর্শ , কর্মনীতির সাথে একমত , ভালোবাসে – কিন্তু একাত্তরের ‘বালি বা কাদা’র কারণে সক্রিয় হতে পারেনা । তাদেরকে ‘হীনম্মন্য’ আখ্যা দিয়েই কি জামায়াত দায়িত্ব থেকে মুক্তি পেয়ে যাবে বলে মনে করে ? বাইরের সাধারণ মানুষের কথা বলে আর কী হবে- একাত্তর ইস্যুতে শিবিরের ভেতরেই তো দুইবার কেন্দ্রীয় পর্যায়ে বড় ধরণের ভাঙ্গন হয়ে গেছে । কেন সাধারণ ছাত্রদের কাছে বারবার এই কথাটা বলতে হয়- জামায়াতের সাথে শিবিরের সম্পর্ক নাই ! (যদিও এখন আর সেটা বলারও কোন সুযোগ নাই । ) কেন তাহলে সংঘ থেকে শিবির করা হলো ? সংঘ নামেই থাকলে কি শিবিরের এই অগ্রগতি সম্ভব হতো ? বাংলাদেশে রাজনীতি করতে গেলে ৭১ কে অস্বীকার করার উপায় নাই । গায়ের জোরে হয়তো বলা যায় ‘যুদ্ধাপরাধ ইস্যু হাওয়ায় উড়ে যাবে’, (২০০৮ সালে জামায়াতের তৎকালীন সেক্রেটারি জেনারেল বলেছিলেন) কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনা । একাত্তরের অপরাধের সামান্য হলেও নৈতিক দায় জামায়াত এড়াতে পারেনা । আমি নিঃসংকোচে স্বীকার করি – এটা হয়তো আমারই হীনম্মন্যতা , কিন্তু তবু আমি জোরগলায় কখনো বলতে পারিনা – জামায়াত সম্পূর্ণ নির্দোষ । আমি জানি – বাংলাদেশের ৯৫% মানুষ আমার মতই হীনম্মন্য , তারা একাত্তরকে ভুলতে পারেনা । তাঁদের ভুলতে দেয়া হয়না । ৪০ বছর ধরে জামায়াতকে নিয়ে সেক্যুলাররা এই একই খেলা খেলছে । ক্লাস থ্রির সমাজ-পরিচিতি বইয়ে যখন লেখা থাকে ‘একাত্তরে জামায়াতে ইসলামী মানুষ খুন করেছে , তখন ‘হীনম্মন্য’ হওয়া ছাড়া উপায় থাকেনা । শুধু গায়ের জোরে, উটের মত বালিতে মুখ লুকিয়ে , শৈশব থেকে ভিন্ন শিক্ষা পেয়ে বড় হওয়া এইসব মানুষকে ইসলামের পথে আনা যাবে না ।

৩।
জামায়াতের দায়িত্বশীল পর্যায়ের কয়েকজনের কাছে এই প্রশ্নটি তুললে তারা উত্তর দিয়েছিলেন – মানুষকে বোঝাতে হবে যে একাত্তরে যেসব অপরাধ হয়েছে সেগুলো জামায়াতের লোকেরা করেনি ।

কিন্তু কেন ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের এই একাত্তরের প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে এত বছর পরে এসেও ? ইসলামের দাওয়াতের সাথে এর সম্পর্ক কী ? এই ইস্যুকে পুরোপুরি ইগনোর করার সুযোগ ছিল এবং আছে, সেখানে কেন এই প্রজন্মকেও সেই ৭১ এর জবাবদিহী করতে হবে ? নিজের গায়ের সাথে সেই ‘বালি বা কাদা’ মেখে চলতে জামায়াতের কেন এত আগ্রহ ?

ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের ওপর বাতিলের জুলুম নির্যাতন আসবেই । যুগে যুগে সেটা আন্দোলনের কর্মীরা হাসিমুখে মেনে নিয়েছে । জেল-জুলুম-ফাঁসি-বুলেটকে সবসময়ই তাচ্ছিল্যভরে ভ্রূকুটি করে এসেছে । কিন্তু সাধারণভাবে ‘ইসলামী আন্দোলনের কথা বলার কারণে’ যে অত্যাচারের শিকার হতে হয় তার সাথে এই একাত্তর ইস্যুর গুণগত পার্থক্য আছে । আল্লামা সাঈদীর সেদিনের বক্তব্য থেকেই উদ্ধৃতি দেয়া যাক-

‘কোরআনের কথা বলার কারণে যদি আমাকে ফাঁসি দেয়া হয়- আমি হাজারবার ফাঁসিতে ঝুলতে প্রস্তুত । কিন্তু চোর-ডাকাত-ধর্ষণকারী হিসেবে এক দিনের জন্যও জেল খাটতে রাজী নই’ ।

জামায়াতের বিরুদ্ধে তো আরো অনেক কথাই বলা হয় । জঙ্গিবাদ, সাম্প্রদায়িকতার সাথে জামায়াতের নাম জড়ানোর অপচেষ্টা করা হয় । জামায়াতের আমীর মাওলানা নিজামীকে দশ ট্রাক অস্ত্র মামলার আসামী করা হয়েছে । সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুহাম্মাদ মুজাহিদকে গ্রেনেড হামলা মামলার আসামী করা হয়েছে । এসব ব্যাপারে তো কেউ একটি কথাও বলেনা, কারো মনে এতটুকু ‘হীনম্মন্যতা’ নেই । তাহলে কেন একাত্তর প্রশ্নে জোরগলায় কথা বলা যায়না ? এই চরম বাস্তবতাকে অস্বীকার করা অহেতুক গোঁড়ামি ছাড়া আর কি ?

জামায়াতের নেতৃবৃন্দ অনেকেই ইখুয়ানুল মুসলিমুনের উদাহরণ টেনে বলার চেষ্টা করেন, স্বাধীনতার বিরোধিতা না করার পরেও তো তাঁদের ওপর নির্যাতন কম হচ্ছেনা । কিন্তু এখানেও যে জামায়াতের সাথে একটা গুনগত পার্থক্য আছে সেটা তারা অনেকেই বুঝতে চান না । মিশরের ঘটনায় সবাই স্পষ্টভাবেই জানে যে- এটা জুলুম হচ্ছে । নিরপরাধ মানুষগুলোকে শুধুমাত্র ইসলামের কথা বলার কারণেই নির্যাতন করা হচ্ছে । বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কি তা হচ্ছে ? এখানে তো জঘন্য সব অভিযোগ তুলে বিচার করা হচ্ছে- আর তার চেয়ে বড় কথা জামায়াতের রুকন-কর্মী নন এমন মানুষেরা সত্যি সত্যি বিশ্বাস করে যে জামায়াতের নেতৃত্ব আসলেই দোষী । এর চেয়ে বড় দুর্ভাগ্য আর কী হতে পারে ? আদর্শকে বুঝতে না পেরে ইসলামী আদর্শ গ্রহণ না করা এক কথা , আর দায়ী’র ভুলে আদর্শ গ্রহণ থেকে দূরে থাকা এই দুইয়ের মধ্যে আছে বিস্তর ফারাক । দ্বিতীয় ক্ষেত্রে দা’য়ী গনের দায় এড়ানোর সুযোগ থাকে না ।

One Response

  1. mazhar
    mazhar at |

    এই জন্যই জামায়াতের দরকার ছিলনা পূর্বের নামে ফিরে যাওয়ার।
    নতুন নামেই শুরু করা দরকার ছিল। নামের ব্যাপারে জামায়াতের অবস্থান হলো উটের বালির ভেতর মাথা লুকানোর মতই।

    Reply

Leave a Reply