হেফাজতে ইসলাম,আহলে হাদীস এবং দরদি বন্ধু সেকুলার রাজনীতি।পর্ব – (চার)

তৃতীয় পর্বের পর –
সাত
প্রথম তিনটি পর্ব ব্লগে প্রকাশিত হবার পর বেশ কিছু মন্তব্য পেয়েছি ব্লগার ছাড়া আমার মেইলে। যা নিয়ে আজকের পর্বের কিছু কথা।বাধ্য হয়ে লিখছি।আমাদের ভাইদের মনোজগতটা কেমন – আচরণে কেমন প্রান্তিক হই।
=================================
লন্ডন থেকে এক ভাই লিখেছেন – আপনার জাহান্নামে যাবার জন্য এই লেখাই যথেষ্ট।তওবা করুন।
=================================
আরেকজন (বাংলাদেশ থেকে) খুবই দরদ দিয়ে লিখেছেন -আপনি আকাবীরীন সম্পর্কে তেমন কিছু জানেন না। তাই এমন ভুল করছেন। এতে আপনার প্রতি করুণা হয়। তিনি দাবী করেছেন – যতটুকু ইসলাম আছে উপমহাদেশে – তার সবটুকুন কৃতিত্ব হল ওলামায়ে দেওবন্দের।
==================================
তৃতীয় একটি মেইল পেয়েছি – যিনি সউদি আরবের প্রবাসী। তিনি আমার ওপর ফতোয়া জারি করেছেন।লিখেছেন – ‘আমি আহলে সুন্নাতের আকাবীরীনদের বিষয়ে বাজে মন্তব্য করার কারনে মিল্লাতে ইসলামীয়া থেকে খারিজ হয়েছি। তওবা ছাড়া উপায় নেই’।
====================================
চতুর্থ মেইলটি আমাকে বেশী আকৃষ্ট করেছে। তিনি বলেছেন – জামায়াত প্রতিষ্ঠা থেকে এ পর্যন্ত যা করেছে, তা উম্মাতের জন্য কল্যাণকর কিছু করেনি।বরং এটা একটা বাতিল ফেরকা তা প্রমানিত।আল্লামা সাঈদি সাহেব সম্পর্কে খুবই বাজে মন্তব্য করেছেন।সেগুলো শেয়ার করার মত নয়।
সাঈদী সাহেবের তাফসীর কোন তাফসীর ই না। বরং এগুলো হল মানুষকে সিরাতুল মুস্তাকিম থেকে দুরে রাখার ইয়াহুদি কৌশল। আরো অনেক কথা।তিনি সাঈদী সাহেব সম্পর্কে আপত্তি করতে গিয়ে জামায়াতের জনশক্তিকে একেবারে মুসলমান থেকে খারিজ করেছেন।
===================================
বলা যায় – প্রথম তিনটিই আমার সম্পর্কে। এবং এগুলোর দায়িত্ব আমার নিজের। তওবা করার প্রয়োজন হলে অবশ্যই করবো।এবং প্রতিটি জান্নাত প্রত্যাশী মানুষের তওবা করা উচিত বলে মনে করি।
চতুর্থ প্রশ্ন সম্পর্কে কিছু লেখা প্রয়োজন।আমি বিস্তারিত বা ইতিহাস না লিখে বরং পয়েন্ট ভিত্তিক কিছু প্রশ্ন রাখছি।আশা করি বিশ্লেষণধর্মী মন্তব্য পাবো।
====================================
(আট)
ইখতেলাফ না তাফরেক্কা –
দেওবন্দী হাজারাতের সাথে দেশের বৃহত্তর ইসলামী আন্দোলনের (জামায়াতে ইসলামী) মধ্যে সমস্যা কী? এগুলো শুধু ইখতেলাফ (মতপার্থক্য) যা দ্বীনের মৌলিক বিষয় নিয়ে।না – এটা শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত তাফরেক্কা? বিষয়টা নিয়ে বর্তমান প্রজন্মকে চিন্তা করা প্রয়োজন।কেন প্রয়োজন তার জলন্ত একটি উদাহারণ দেই।
একটা সময় ছিল – ক্কাওমী মাদ্রাসাগুলোতে ইংরেজী পড়ানো হত না। কারন – এই ভাষা ছিল ইংরেজের। বিধর্মীর ভাষা পড়া হারাম। এরকম ফতোয়া দিয়ে তিনটি প্রজন্মকে পিছনে ঠেলে দেয়া হয়েছে। এখন অবশ্য ক্বাওমী মাদ্রাসাগুলোতে নিচের ক্লাসগুলোতে কিছু ইংরেজী সংযোজন করা হয়েছে।
প্রশ্ন হল – যে সমস্ত আকাবীরীনরা ইংরেজী পড়া হারাম বলেছিলেন – তাদের এই বিবেচনা (আমি ফতোয়া বলতে নারায) ভূল ছিল। আর এই ভুলের খেসারত দিতে হয়েছে এবং বর্তমানে হচ্ছে।
আবার ইসলামে যা হারাম হয় তা সবসময়ের জন্যই হারাম। সময়ের কারনে তা হারাম আবার হালাল হয়ে যায় না। একমাত্র শরয়ী ওযর (কারণ) পাওয়া না গেলে।বিষয়টা একবারে উসুলের (ইসলামী নীতিমালা) কথা।একটি মোবাহ (কোন কোন ক্ষেত্রে) বিষয়কে নিয়ে যে আহম্মকী করা হল তার দায়িত্বটা কে নেবে?
আমার মনে হয় – এই বোধ বা চেতনা আমাদের ক্বাওমী নতুন প্রজন্ম বুঝতে শুরু করেছে।
আরেকটি উদাহরণ দেই।
ওমরা করতে এসেছিলেন সাবেক ইসলামিক টিভির বড় কর্মকর্তা। তিনি দেশে পরিচিত একজন ক্বাওমী আধুনিক আলেম। ওমরা শেষে জেদ্দায় একটি সুধী প্রোগ্রাম হয়। এই প্রোগ্রামে দাওয়াত করা হয় ক্বাওমী আলেম ওলামাদের। অবশ্য তার সাথে সফর সঙ্গী ছিলেন আরেকজন বড় আলেম। যিনি খুবই পরিচিত ওয়াইজ (মাহফিল করেন)। তাদের উপস্থিতিতেই প্রবাসী ক্বাওমী ওলামারা ইসলামিক টিভির বেশ সমালোচনা করেন। সমালোচনার লক্ষ বস্তু ছিল বেচারা জামায়াত।
অভিযোগের মুল বিষয়গুলো ছিল এমন –
# কেন জামায়াতের আলেমদেরকে নিয়ে আসা হয় ইসলামিক টিভিতে?
# কেন সাইমুমের গান গাওয়া হয়?
# কেন ক্কাওমী বড় বড় শাইখদের আনা হয় না?
# দাস্তারবান্দী মাহফিলগুলোকে কেন লাইভ দেখানো হয় না?
আরো অনেক অভিযোগ। ইসলামিক টিভির দায়িত্বশীল সবগুলো নোট করলেন। যখন তার বক্তৃতার সময় হল। তখন তিনি বললেন – আপনারা এতক্ষণ বলেছেন। আমি শুনেছি। কোন কথা বলেনি। আপনাদের এই প্রশ্ন গুলোর সাথে আমি একমত। আমার ও দাবি হল আপনাদের মত।আমার সাধ্যের মধ্যে হলে তাই করতাম।কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।
বাস্তবতাটা কেমন তা আপনাদেরকে শুনার জন্য অনুরুধ করছি।আমরা ইসলামিক টিভি করার পর যখন প্রথম লোক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেই, তখন যতগুলো আবেদন পেয়েছিলাম – তার মধ্যে হাতে গোনা কয়েকটি আবেদন – ক্বাওমী মাছলাকের ছেলেদের ছিল।বাকি সবগুলো ছিল জামায়াত শিবিরের। বার বার সময় বাড়ানোর পর ও কাউকে পাইনি। এটা হল বাস্তবতা। এখন কাকে দায়ী করবো – বলূন।
আমাদের আকাবীররা ফতোয়া দিলেন ইংরেজী পড়া হারাম। তার খেসারত এখন পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। মাদ্রাসায় পড়ানো,মসজিদে ইমামতি করা,বড় খতম পড়া,ওয়াজ নসীহত করা এগুলো দ্বীনের আমানতদার হিসাবে আপনাদের দায়িত্ব।কিন্তু একটা টিভি চালাতে হলে শিক্ষিত এবং প্রফেশনাল লোকের বিকল্প নেই।
আপনাদের দ্বিতীয় প্রশ্ন হল –
জামায়াতের আলেমদের কেন সব প্রেগ্রামে নিয়ে আসি। আমি যদি বলি – তারা যোগ্য। তারা যুগ জিজ্ঞাসার জবাব দিতে পারে। তাদের কাছে সব ইনফরমেশন আপডেট থাকে।তারা সমাজের সব শ্রেণীর মানুষের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে। জামায়াতের আলেমদের যেমন দুনিয়ার ডিগ্রি আছে তেমন দ্বীনকে সহজ ভাষায় উপস্থাপনার যোগ্যতা আছে।
ইসলামিক টিভি বাংলাতে চলে। আপনাদের কয়জন শুদ্ধ বাংলা বলতে পারেন? যাদের কথা চিন্তা করে এই প্রশ্ন তুলেছেন – তারা বাংলায় দশ মিনিট কথা বলতে পারবেন? টিভিতে প্রোগ্রাম করতে গিয়ে মাওলানা রুমির কসিদা পড়লে দর্শকপ্রিয়তা পাবে না। এগুলো বাস্তবতা। এতগুলো শক্ত কথা বললেও তিনি উত্তেজিত হননি। মনে হল কথাগুলো তার ভিতর থেকে উচ্ছারিত হচ্ছে।
তার পর তিনি বেশ কিছু প্রস্তাব করেন।
আমি খুব মজা পাচ্ছিলাম। একটা কাজের কাজ হয়েছে।এই কথাগুলো আমাদের মুখ থেকে বলা হলে – আকাবিরীনদের নামে গোস্তাকী করার জন্য তওবা করতে হত।আ’মাল নষ্ট হয়ে যেত। দায়িযূস হবার তকমা লাগতো।ঘটনা এখানে শেষ।
====================================
আমার ব্যক্তিগত মত হল – যে সমস্ত ইখতেলাফ আছে জামায়াতের সাথে, সেগুলো সবই গোষ্ঠীগত এবং ব্যক্তিগত। এর প্রমান দিয়েছেন অনেকবার। কারাবন্দী মজলূম অধ্যাপক গোলাম আযম সাহেবের একটি বই আছে। এখনো বাজারে পাওয়া যাবার কথা।বইটির নাম মন হয় ‘ঐক্য প্রচেষ্টা বা একম কিছু’। আরেকটি বইতে বিস্তারিত পাবেন – ‘জীবনে যা দেখলাম’। তিনি নির্মোহ থেকেই লিখেছেন। কিভাবে আমাদের এই হাজারাত তাদের গোষ্ঠীগত,ব্যক্তিগত চিন্তা চেতনার বাহিরে বৃহত্তর পরিসরে ইসলাম মুসলামানের পক্ষে যে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহনে বড় বাধা।
এর প্রমান আগে তারা দিয়েছিলেন। আর এবার ও হেফাজতের নামে দিয়েছেন। চিন্তা হয় – শাপলা চত্তরের শহীদরা যখন কিয়ামতে দাঁড়াবে,তখন কি জবাব দিবেন?
আগামী পর্ব – পাঁচ।
=======
তৃতীয় পর্বের লিংক –
http://www.onbangladesh.org/blog/blogdetail/detail/1876/IBNAHMED/44143

Leave a Reply