যুক্তি ও ঈশ্বরদর্শন

যুক্তি ও ঈশ্বরদর্শন

Part 1:

ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাসীদের সবাই-ই কোন না কোন যুক্তির কারণেই ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস স্থাপন করেন। এর মধ্যে সকলেই যে তার নিজস্ব যুক্তির বিষয়ে সচেতন তা না। বেশিরভাগ মানুষের মনেই অবচেতনভাবে তার যুক্তিগুলো বিরাজিত থাকে।

ঈশ্বরতত্ত্ব বিষয়ে যারা মোটামুটি সচেতন তারা সাধারণত বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব/যুক্তির আলোকে ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণে সচেষ্ট হন। কিন্তু যখন দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি ও যুক্তির আলোকে ঈশ্বরের সত্ত্বাকে উপলদ্ধির চেষ্টা করা হয় তখন বেশিরভাগ বিশ্বাসী সাচ্ছন্দ বোধ করেন না। কেননা তাঁরা মনে করেন এতে ভুল যুক্তিতে উপনীত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু বৈজ্ঞানিক যুক্তির চেয়ে দার্শনিক যুক্তিতে ঈশ্বরের সত্ত্বা উপলদ্ধি করাই সম্ভবত বেশি যুক্তিসংগত। কেননা কোন “যুক্তি”কে আমরা কেন “যুক্তি” বলব বা কোন “যুক্তি” আসলে কতটা “যৌক্তিক” তা দর্শনের আলোচনার বিষয়।

যদি আমরা ধরে নিই যে ঈশ্বরের সৃষ্ট জগত এবং স্বয়ং ঈশ্বর একজন যৌক্তিক স্বত্ত্বা, তাহলে যুক্তিকে ভয় পাওয়ার কোন কারণ থাকতে পারেনা। কেননা তাহলে কেউ যদি সঠিক যুক্তিতে অগ্রসর হয় তাহলে অবশ্যম্ভাবী ভাবেই সে ঈশ্বরের আরো কাছাকাছি উপনীত হবে।

তবে এখানে দুটো প্রশ্ন সামনে এসে যায়ঃ
১. আমরা কি প্রথমে ঈশ্বরকে স্বতসিদ্ধ ধরে নিয়ে এরপর যুক্তির আলোকে ঈশ্বরকে আরো সম্যকরূপে উপলদ্ধি করার চেষ্টা করবো, নাকি যুক্তিকে স্বতসিদ্ধ ধরে তার আলোকে ঈশ্বরকে উপলদ্ধি করার চেষ্টা করব?
২. যদি আমরা যুক্তিকে স্বতসিদ্ধ ধরি তাহলে স্বয়ং যুক্তি বিষয়টা কি?

ঈশ্বরের সংজ্ঞানুসারে ঈশ্বরেই স্বতসিদ্ধ হওয়া উচিত। কিন্তু আমরা যদি প্রশ্ন করি কেন ঈশ্বরের স্বতসিদ্ধ হওয়া উচিত? তাহলে এর উত্তরেও বিভিন্ন যুক্তিই দেয়া হবে অথ্যাৎ যৌক্তিক কারণেই ঈশ্বরের স্বতসিদ্ধ হওয়া উচিত। এতে করে কি মনে হচ্ছে না যে যুক্তির আপেক্ষিক গুরুত্ব ঈশ্বরের চেয়ে বেশি বা যুক্তির অবস্থান ঈশ্বরের স্বত্ত্বারও উপরে?

কিন্তু যদি তাই হয় তাহলে তো তা ঈশ্বরের সংজ্ঞার সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে যাচ্ছে। কেননা সংজ্ঞানুসারে ঈশ্বর হচ্ছেন সকল কিছুর উর্ধ্বে অবস্থিত এক অনপেক্ষ ও স্বতসিদ্ধ স্বত্ত্বা। এই পর্যায়ে এসে সম্ভবত আমরা এমন প্যারাডক্সে এসে উপনীত হয়েছি যেখানে কোনটিকেই অস্বীকার করা যাচ্ছে না।

আমার ধারণা আমাদের ঈশ্বরতাত্ত্বিক অনুধ্যানী চিন্তা একটা সময়ে এসে থেমে যেতে বাধ্য, যেখানে এসে আমরা এই ধরনের বা অন্য কোন ধরনের প্যারাডক্সের মুখোমুখি হবো। সসীম মানুষের পক্ষে অসীম ঈশ্বরের স্বত্ত্বাকে পুরোপুরি অনুধাবন করা কখনোই সম্ভব নয়। কেননা, আমরা যদি ঈশ্বরকে পুরোপুরি অনুধাবন করতে পারি তাহলেও তো তিনি সীমার মধ্যে বাঁধা পড়ে যান যা হওয়ার কথা না।

তাহলে আমরা কি অনুধ্যানী চিন্তা বন্ধ করে দেব? সম্ভবত এর উত্তর না হওয়াই বাঞ্চনীয়। কারণ যদিও আমরা জানি আমরা অসীমকে সম্পুর্ণরূপে ধারণ করতে পারব না, তেমনি আবার এটাও জানি যে অসীমত্বের কতদূর পর্যন্ত আমাদের জানার সীমা সেটা আমরা জানিনা। আমরা হয়ত পুরোপুরি পারফেক্ট জ্ঞান অর্জন করতে পারব না কিন্তু অনুধ্যানী চিন্তার মাধ্যমে আমরা পারফেকশনের আরো কাছাকাছি উপনীত হতে পারব। বিষটা অনেকটা “পাই” এর মানের মতো, দশমিকের পর যত ঘর পর্যন্ত মান নেয়া হোক না কেন তা কখনোই পারফেক্ট হবে না, কিন্তু যত বেশি ঘর পর্যন্ত মান নেয়া হবে ততোই তা পারফেকশনের কাছাকাছি পৌঁছুবে।

…………………….
যুক্তি বলতে আসলে আমরা কি বুঝি তা নিয়ে আরেকদিন কথা বলার চেষ্টা করা হবে।

Leave a Reply