তবে কি হিজরতই শেষ উপায়!

চেঙ্গিস খান খারেজম শাহের উপর হামলা করেছিলেন বাগদাদের খলীফা নাসিরুদ্দিনিল্লাহর অনুমোদন নিয়েই। খারেজম শাহের সঙ্গে খলিফার বিরোধ খলিফাকে কেবল নিরপেক্ষই রাখেনি, বরং চেঙ্গিস খানকে খারেজম রাজ্য আক্রমনে উৎসাহও জুগিয়েছিল। এক গভীর ষঢ়যন্ত্রের শিকার হয়েছিল আলমে ইসলাম। বাগদাদের আওয়াম তখন কি করছিল?

আব্বাসীয় আমলে বাগদাদ ছিল পৃথিবীর স্বপ্ন নগরী। সুরম্য অট্টালিকা আর বাহারি ফুল সমৃদ্ধ বাগগিচাগুলো বাগদাদের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেছিল বহুগুনে। আরাম-আয়েশের জন্য বাগদাদের বাসিন্দাদের কোন কায়িক পরিশ্রমের প্রয়োজন ছিল না। বহু বছর তারা আলমে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে বিশ্রাম নিতে নিতে অলস হয়ে পড়েছিল। সময় কাটানোর জন্য বেছে নিয়েছিল বেহুদা বিতর্ক। ইসলামের কোন সাচ্চা সেবক যদি তাদের ভুল ধারণা দূর করার চেষ্টা করতো তাহলে সবার আগে তাকে ‌’আপনি কোন ফেরকার’ প্রশ্নের উত্তর দিতে হতো। সময়টা ছিল ১২০০ সালের পরের।

আলাউদ্দিন মুহাম্মদ খারেজম শাহ খলীফা নাসিরুদ্দিনিল্লাহর সঙ্গে বিরোধে জড়িয়েছিলেন। এই বিরোধের ফলে খলীফা চেঙ্গিস খানকে খারেজম রাজ্য আক্রমণে উস্কানি দেন। খলীফার এই ষড়যন্ত্র সম্পর্কে যে কয়েকজন ব্যক্তি জানতেন, তাদের একজন ছিলেন মুহাল্লাব বিন দাউদ। তিনি পরবর্তীতে চেঙ্গিস খানের দূত হিসেবে বাগদাদে এসেছিলেন। খলীফ মুসতানসিরের সময় তিনি ছিলেন উজিরে আজম। যা হোক, মূল প্রসঙ্গে ফিরি। তাতারদের সর্বগ্রাসী আক্রমণ যখন পূব থেকে পশ্চিম দিকে ধাবিত হচ্ছিল, তখন সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য প্রতেরোধের শেষ ঘাঁটি ছিল খারেজম। সুলতান আলাউদ্দিন মুহাম্মদের পরাজয় ছিল বাগদাদেরই পরাজয়। সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য তখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার এক টুকরো জমিনও ছিল না। সে সময় বাগদাদের খলীফা যদি সুলতান আলাউদ্দিনকে মৌখিক সমর্থনটুকুও দিতেন, বেঁচে যেত আলমে ইসলাম। কিন্তু ব্যক্তি স্বার্থ চরিতার্থ করতে গিয়ে খলীফা আলমে ইসলমাকে চরম বিপদে ফেলে দিলেন। শেষ পর্যন্ত সুলতান আলাউদ্দিন পরাজয় স্বীকার করে মাঠ ছাড়েন। সুলতান আলাউদ্দিনকে ইতিহাস একজন বুজদীল হিসেবে চিত্রিত করলেও তার পুত্র জালালউদ্দিন সম্পর্কে অনেক বিস্ময়কর কথাই ইতিহাসে লিখিত আছে।

একজন দুর্দান্ত সৈনিক হিসেবে তিনি প্রসংশা কুড়িয়েছিলেন চরম শত্রুরও। চেঙ্গিস খানের মৃত্যূর পর তোলাই খান খারেজম শাহ জালাউদ্দিনের উপর চূড়ান্ত আঘাত হানেন। তখনো বাগদাদেন জনগণ ছিল আরাম-আয়েশে লিপ্ত। খলীফা নাসিরের পর তার পুত্র জহির ঘুমন্ত জাতিকে জাগিয়ে তোলার একটা চেষ্টা হয়ত করতে পারতেন। কিন্তু তার স্বল্পকালীন শাসনের পর মুসতানসিরের ক্ষমতায় আরোহন ইসলামী দুনিয়ার জন্য নিয়ে আসে দুঃখে ভরা দীর্ঘ রজনী। তার পুত্র মু’তাসিম বিল্লার সময়ই তাতার সেনাপতি হেলেগু খান বাগদাদ আক্রমণ করেন। কথিত আছে, প্রায় দশ লক্ষ লোক হেলেগু খানের আক্রমণে নিহত হয়েছিল। ধ্বংস করা হয়েছিল দি গ্রান্ড লাইব্রেরী অব বাগদাদের বিশার সংগ্রহ। ইতিহাস, বিজ্ঞান, সাহিত্যের মহামূল্যবান গ্রন্থাদি চিরতরে হারিয়ে গিয়েছিল এক তাতার মূর্খের ধ্বংসযজ্ঞের নিচে। পৃথিবীর সৌন্দর্য্যের রানী বাগদাদ নগরী পরিণত হয়েছিল পরিত্যক্ত শহরে। শকুন আর কুকুর খেলছিল মৃতদের ছিন্ন ভিন্ন লাশ নিয়ে। হায়! অভাগা বাগদাদবাসী। দাফনটাও জোটেনি তাদের কপালে।

ইতিহাস বৃত্তাকারে আবর্তিত হতে থাকে পৃথিবীতে। চেঙ্গিস খানের আগে এমন বহু ঘটনা ঘটিয়েছে নিষ্ঠুর সেনাপতিরা। ধ্বংস করা হয়েছিল সমৃদ্ধ ট্রয় নগরী। এরপরেও বহু ঘটনা এমন ঘটেছে। হিরোশিমা ও নাগাসাকির ঘটনা তো আধুনিক। জেরুজালেম ধ্বংস করেছে খ্রিস্টানরা। এমনই আরও কত ঘটনা রয়েছে। কিন্তু ইতিহাস থেকে মানব জাতি কখনোই শিক্ষা নেয়নি। বিশেষ করে মুসলমানরা!

কওমের শাহরগে পৌঁছে গেছে দুশমনের হাতিয়ার। ফিলিস্তিন, কাশ্মির, আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া সবখানেই ছদ্মবেশি দুশমনদের থাবা। এমনটা ভাবা ভুল হবে, যে ইতিহাসে এমন ঘটনা কখনোই ছিল না। আলমে ইসলামে এমন বহু গাদ্দার ছিল, যাদের কারণে ধ্বংস হয়ে গেছে একেকটি সভ্যতা। ইবনে আলকেমির ষড়যন্ত্রেই ধ্বংস হয়েছিল বাগদাদ। এই অবস্থায় মুসলিম জাতি কি করতে পারে? নেতারা সঠিক সিদ্ধান্ত দিতে পারছেন না। কর্মীদের মধ্যে নেই ইমানী জজবা। সবদিকেই অভাব। এর মধ্যেও হয়ত কিছু লোক রয়েছেন, যারা দিন রাত কওমকে গোলামীর জিঞ্জির থেকে মুক্ত করতে চিন্তায় মগ্ন। কিন্তু চিন্তায় কি হবে? ঘুমে থাকলে জাতিকে হয়ত জাগিয়ে তোলা যেত। কিন্তু ঘুমের ভান করে আছে যে জাতি, তাকে কিভাবে জাগানো সম্ভব!

নেতাদের ঘাড়ে দোষ দিয়ে আমরা প্রশান্তিতে দিন কাটাচ্ছি। দোষ স্থলনের এ এক অভিনব পন্থা। সে জাতি কতটাই না দূর্ভাগা যারা প্রকাশ্যে নেতাদের বদনাম করে বেড়ায়! কিন্তু আওয়াম করবে কি? তাদের সামনে পথ কি? এসব প্রশ্নের উত্তর নিয়ে কেউ হাজির হয় না। সমস্যা অনেক। সমাধানের পথ খুব কম। উমাইয়ারা যখন আরব থেকে বিতাড়িত হলো তারা স্পেনে প্রতিষ্ঠা করল পৃথিবীর সেরা সভ্যতার একটা। যে সভ্যতা ইউরোপকে আলোর সন্ধান দিল। মুহাম্মদ বিন কাসিমের সঙ্গে বহু মুসলমান বাড়ি ছেড়ে চলে এসেছিলেন হিন্দুস্তানে। সেই মুহাজিররাই হিন্দুস্তানে ইসলামী সালতানাত প্রতিষ্ঠার পথ প্রশ্বস্ত করেছিলেন। মধ্য এশিয়া পেরিয়ে উত্তর আফ্রিকা এবং মধ্য আফ্রিকার গভীর জঙ্গলে ইসলামকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মুহাজিররাই। পূর্ব ইউরোপে ইসলামকে নিয়ে গিয়েছিলেন তারাই। বাংলার যে গুটি কয়েক খাঁটি মুসলমান রয়েছে তাদের কর্তব্য কি? শত চেষ্টায়ও যেখানে সত্যের সন্ধান পাওয়ার আশা করা যায় না সেখানকার মানুষগুলোর কি করা উচিত? হিজরত কি?

বাগদাদে বহু লোক ছিলেন সত্যিকারের মুসলমান। সেসব সত্যিকারের মুসলমানরা হেলেগু খানের অত্যাচর থেকে বাঁচতে পারেননি। আল্লাহর আজাব যখন কোন জনপদে আপতিত হয়, তখন সেখানে ভাল-মন্দ সবাইকেই ভুগতে হয়। বাংলাদেশে আল্লাহর কঠিন আজাব কখন আসবে তা কেবল অন্তর্জামীই জানেন। সেই আজাব থেকে বাঁচার একটা উপায় বলেছিলেন শহীদ আবদুল কাদের মোল্লা-গণ তওবা করা।

গণ তওবা করা সম্ভব কি অসম্ভব তা পাঠকের উপরই ছেড়ে দিলাম। শহীদ আবদুল কাদের মোল্লার কথা হয়ত ঠিক। গণ তওবা করলে আল্লাহ তা কবুল করতে পারেন। যদি তা সম্ভব না হয় তাহলে অন্তত আল্লাহর চূড়ান্ত ফায়সালা আসার পূর্ব পর্যন্ত সত্যিকারের মুসলমানদের এমন কোন ঠিকানা খুঁজে নেওয়া উচিত যেখানে ইসলাম প্রচারের কাজ করার পাশাপাশি ইমানের শর্তগুলোও পূরণ করা যাবে।

[লেখাটা খুবই দ্রুততার সঙ্গে লিখেছি। অনেক ভুল ত্রুটি থাকতে পারে। ভুল ধরিয়ে দিলে কৃতজ্ঞ থাকবো।]

2 Responses

  1. আবু সুলাইমান
    আবু সুলাইমান at |

    ধন্যবাদ ভাইয়া। তবে মাঠ ছেড়ে পালিয়ে বাঁচার চিন্তা কেন? আর পালাবে কোথায়? সব দেশেই তো একই অবস্থা…

    Reply
  2. sahin
    sahin at |

    Thanks

    Reply

Leave a Reply