আমাদের পরিচয় কি? আমরা কি কুরআনের অনুসারি নাকি অনুসরন-প্রয়াসি ?

 

আমরা বাঙ্গালী মুসলিম সমাজে বসবাসরত এবং বাংলাদেশি জাতিয়তাবাদের বাক্সবন্দি হলেও বিশ্ব মুসলিম সমাজের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। মানুষ পরিচয় বড় নাকি মুসলিম পরিচয় বড় সে বিতর্কে না গিয়ে আমরা যারা বিশ্ব-মুসলিম সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়ায় আনন্দিত- তাদের নিয়েই আমাদের আলোচনা।

আলকুরআন আমাদের গাইড বুক। সুন্নাহ তথা রাসূলের বাস্তব-জীবন আমাদের আলোকবর্তিকা। কুরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে আমরা আমাদের পথনির্দেশিকা লাভ করে থাকি। কুরআন ও সুন্নাহর জ্ঞানই আমাদের জীবন চলার পাথেয়। আমরা জীবন চলার পথে যে সকল নতুন সমস্যার মুখোমুখি হয়, কুরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে আমরা সে সকল সমস্যার সমাধান করে থাকি। সুস্পষ্টভাবে যে সকল নতুন সমস্যার সমাধান কুরআন ও সুন্নাহতে পাইনা, সে সকল নতুন সমস্যার সমাধানে আমরা ইজমা, কিয়াস কিংবা ইজতিহাদের মাধ্যমে এমন মুলনিতির অনুসরন করার চেষ্টা করি যা কুরআন ও সুন্নাহর মৌলনীতির সহিত সামঞ্জস্যপূর্ন।

গোটা বিশ্বব্যাপি মুসলমানরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। বিশ্বব্যাপি এই মুসলমানদের সামনে যে সকল সমস্যা উদ্ভুত হয় সেই সমস্যাগুলো প্রধানত ২ প্রকার: (ক) কিছু সমস্যা একেবারেই নতুন, (খ) আর কিছু সমস্যা যার সমাধান দেয়া হয়েছে কিন্তু তা বিস্তৃত মুসলিম সমাজে ব্যাপকভাবে প্রচারিত নয়।

মুসলিম সমাজ, নি:সন্দেহে, কুরআন ও সুন্নাহ কে পরিপুর্ন অনুসরন করেই জীবন পরিচালনা করতে চাই। এটা প্রত্যেক মুসলমানের একান্ত কামনা। কুরআন ও সুন্নাহর অনুসরন প্রচেষ্টার মাঝেই মুসলমানের সফলতা নিহিত। সাধারনত কুরআন ও সুন্নাহর বিধি-বিধান কে আমাদের জীবনে মেনে চলার এই প্রচেষ্টাকে আমরা বলি কুরআনের অনুসরন অথবা অনুসরন-প্রয়াস/ প্রচেষ্টা। সাধারন দৃষ্টিকোন থেকে “অনুসারি” কিংবা “অনসুরন-প্রয়াসি” অথবা “অনুসরন” কিংবা “অনুসরন-প্রয়াস/ প্রচেষ্টা” শব্দদ্বয়ের মাঝে কোন পার্থক্য না থাকলেও গভীর দৃষ্টিকোন থেকে পর্যবেক্ষন করলে শব্দদ্বয়ের মাঝে বিস্তর পার্থক্য চোখে পড়ে। আর এর ফলে ব্যষ্টিক প্রভাব কখনো কখনো দৃষ্টিগোচর না হলেও সামষ্টিক বা সাংগঠনিক জীবনে তা মারাত্মক ক্ষতির সৃষ্টি করে। যেমন:

(১) অহংকারের জন্মলাভ: 

অহংকার আল্লাহর চাদর। সৃষ্টির জন্য অহংকার করা নিষিদ্ধ। অহংকার পতনের কারণ। অহংকার ব্যক্তির বা সমাজের সাম্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ নষ্ট করে। অহংকার ব্যক্তির বা দলের মধ্যে ঘৃণা-বিদ্বেষের জন্ম দেয়। পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতার পরিবেশ নষ্ট করে। কাজেই যে সব চিস্তা, দর্শন, বা শব্দচয়ন আমাদের মনে অহংকারের জন্ম দেয় তা পরিহার করতে হবে।কোন মুসলিম যখন মনে করে যে সে কুরআনের অনুসারি তখন খুব ধীবে ধীবে তার মনে জন্ম নেয় আত্মতুষ্টির, আত্মশ্লাঘার । তার মনে কিছুটা হলেও সুপারিওরিটি জন্মলাভ করে, অন্যকে ভাবতে শুরু করে অপেক্ষাকৃত ইনফেরিওর, যা এক সময় অহংকারে পরিনত হয়।

 (২) কর্মবিমুখতা/ পরিশ্রমবিমুখতা: 

কোন মুসলিম যখন ভাবে যে- সে সর্বদাই ভাল কাজ করে এবং এর ফলে সে জান্নাতে যাবে, তখন তার মনে জন্ম নেয় অলসতার, পরিশ্রমবিমুখতার । যেহেতু তার সম্পাদিত সকল কাজকেই সে ইসলাম/ কুরআনের পূর্ণাঙ্গ অনুসরন বলে মনে করে ফলে তার মনের ভিতরে নিত্যনতুন কাজের চিন্তা জাগ্রত হয়না। সে যতটুকু দায়িত্ব পালন কওে, ততটুকু দায়িত্ব পালন করেই সে খুশি থাকে। সমাজের সামগ্রিক কাজের চিন্তা তাকে পেরেশান করেনা। ফলে ক্রমাগত সে তার দায়িত্বের চৌহদ্দি ছোট করতে থাকে, যা এক সময় তাকে করে তোলে কর্মবিমুখ।

 (৩) ধর্মীয় গোড়ামি: 

যখন কোন মুসলমান ভাবে যে- সে যে কাজ করে তার পুরোটাই ইসলামি/ কুরআনের পূর্ণাঙ্গ অনুসরন তখন সে তার চিন্তা-চেতনাকে চরম বা পরম ভাবতে শুরু করে। সে ভাবে তার ভাবনাই কোন ভূল-ভ্রুান্তি নেই্। পরবর্তীতে কেউ তার সাথে কোন বিষয়ে ভিন্নমত পোষন করলে সে তাতে চরমপস্থা বা গোড়ামি অবলম্বন করে।

 (৪) উদারতাবাদের অভাব : 

ভিন্নমতের প্রতি সহিষ্ণুতাবোধ না থাকা কোন ব্যক্তি যখন ভাবে যে, ্েস কুরআনের অনুসারী, তখন তার মনে জন্ম নেয়া আত্মতুষ্টি বা ধর্মীয় গোড়ামী তার মনে প্লুরালিজাম বা বহুত্ববাদের জন্ম না দিয়ে বরং সিংগুলারিটির জন্ম দেয় । একই বিষয়ে ভিন্নমত বা নতুন চিন্তাকে সে সহজে মানতে পারে না।একক পথের বিপরীতে বহুমুখী পথ ও পন্থাকে সহ্য করতে পারে না।

(৫) ইজতিহাদ বিমুখতা/ জ্ঞানানুসদ্ধিৎসা কমে যাওয়াঃ

কেউ যখন ভাবে যে সে পূর্ণাঙ্গ ঈমানের অনুসারী, তখন সমাজের নবসৃষ্ট সমস্যা নিয়ে তার চিন্তা কমে যায়। ভবিষ্যতে মানব সমাজে কি ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে, সে সকল সমস্যার কিরূপ পন্থা অবলম্বন করতে হবে এবং এই সকল সমস্যার সমাধান নিয়ে অন্য কেউ কাজ করছে কিনা, কিংবা কাজ করলে তার ধরন কেমন, সেখানে কি কি ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে ইত্যাদি বিষয়ে নবতর চিন্তা ভাবনা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির হৃদয়েও জাগরিত হয়না।

 

(৬) অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ কমে যাওয়া:

যখন কোন ব্যক্তি কোরআনের অনুসারি হিসাবে পরিচিত হয় তখন স্বাভাবিকভাবেই যেহেতু তার কর্মকান্ড নিয়ে নিজের মধ্যে দোদুল্যমানতা বা সংশয় থাকেনা, তাই সে অন্যের মুখাপেক্ষী ও হয়না। ফলশ্রুতিতে কোন বিষয়ে সে কারো সাথে পরামর্শ করার প্রয়োজন বোধ করে না। আবার ঐ বিষয়ে কেউ পরামর্শ প্রদান করলে সে তা গ্রহণও করতে চায় না। এভাবে ধীরে ধীরে ব্যক্তির মধ্যে ইসলাম ভিন্ন অন্য সকল বিষয়েও পরনির্ভরতা কমে যায় এবং অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল মনোভাব ধীরে ধীরে লোপ পায়।

 উপরোক্ত প্রক্রিয়াসমূহ চলমান থাকলে ক্রমান্বয়ে আরও নানাবিধ অপকারিতা সৃষ্টি হয় যা সামগ্রীক ভাবে ব্যক্তি ও সমাজ বা সংগঠনের জন্য ক্ষতিকর। যেহেতু ইসলাম তথা কুরআন ও সুন্নাহ হচ্ছে আমাদের জন্য পূর্ণাঙ্গ জীবন-ব্যবস্থা এবং এটি ওহী দ্বারা স্বীকৃত, তাই পরবর্তীতে আমরা যারা মুসলিম তারা আল্লাহর আইন তথা আলকুরআন ও সুন্নাহ অনুসরণ করার চেষ্টা করি। সবাই সব কাজ সমান ভাবে অনুসরন করতে পারিনা। ইসলাম অনুসনের এই প্রচেষ্টার উপর ভিত্তি করেই আমরা মহান রবের নিকট আমাদের মুক্তির আশা করতে পারি।

আমরা সরাসরি কোরআনের অনুসারি বললে যেহেতু নানাবিধ নেগেটিভ গুনের সৃষ্টি হয় যা ব্যক্তি/সমাজ/সংগঠনকে ক্রমান্বয়ে ক্ষতিগ্রস্থ করে তাই, আমার মতে, আমরা যারা মুসলিম তারা আসলে কুরআনের অনুসারী নয়ই বরং অনুসরন-প্রয়াসী (ট্রাই টু ফলো দ্য আলকুরআন এন্ড সুন্নাহ)। ইহাই বিজ্ঞানসম্মত, যুক্তিযুক্ত, এবং ইসলামিকও বটে। আর এই অনুসরন- প্রচেষ্টার মধ্যেই আমাদের ইহকালীন ও পরকালীন সাফল্য নিহিত।

 

(অসমাপ্ত…)

Leave a Reply