আমাদের মুসলমানিত্ব এবং কামড়া-কামড়ির রকমফের-২

 

সাড়ে তিনহাত শরীরে ইসলাম কায়েমের অর্থ আছে কি?

জ্বী আছে, কিন্তু তাহা কিভাবে সম্ভবপর হইবে? আসলে হুজুররা যেইভাবে সহজভাবে বলেন, সেইভাবে কি সাড়ে তিনহাত শরীরে ইসলাম কায়েম করা সম্ভব, অন্তত বর্তমানের এই চরম ইসলামবিরোধী পরিবেশে? নাহ, সম্ভব নহে যদি না চার খলিফার মতোন ইসলামী সমাজব্যবস্থা কায়েম থাকে!!


যেই সমাজে বিদেশ হইতে চড়াসুদে আমদানিকৃত সকল কিছুই যেমনঃ আপনার পরিহিত জুব্বা-কোর্তার কাপড়, খাদ্য-বস্থু, ব্যবহৃত ও ভোগ্য জিনিসপত্র আমরা ভোগ করিয়া থাকি এমনকি মসজিদ-মাদ্রাসায় প্রাপ্ত টাকা বা বেতনের সহিতও সুদ-ঘুষের টাকার সম্পর্ক রহিয়াছে এবং কুরআন নির্দেশিত পন্থায় এখন পর্দারক্ষা করা আদৌ সম্ভবপর নহে, যেইখানে অসহায় ধর্ষিতাদের আপনি ইসলামী বিধানে সুরক্ষা দিতে ১০০% ব্যর্থ এবং ধর্ষক, চোর-ডাকাত, সরকারি-বেসরকারি লুটেরা, জুয়াড়ু-মদারুদের আপনি সংশোধনী কিংবা ইসলামী পন্থায় শাস্তি দিতেও অক্ষম; সেইখানে কী করিয়া আপনি আপনার সাড়ে তিনহাত বডিতে ইসলাম ধারণ করিবেন, তাহাতো আমার মতোন অর্ধশিক্ষিত বান্দারও বুঝেই আসিতেছে না!! তবে আপনার কিভাবে সমঝে আসিলো কিছুই বুঝিলাম না।


নোংরা-পচা সমুদ্রসদৃশ এই সমাজে বা বিষাক্ত-দুষিত বাতাসের সাগরে নিজের শরীর ডুবাইয়া রাখিয়া কিংবা নাপাক পানিতে অজু করিয়া আপনি কিভাবে বলিতে পারেন যে, আপনি পাক-পবিত্র আছেন এবং আপনার শরীরে হারামখাদ্য ঢুকিয়া যায় নাই, আপনার পর্দা আপনি রক্ষা করিতে পারিতেছেন? আপনার ইবাদত-বন্দেগী সঠিক হইতেছে কিনা, আপনার আমার মতোন দায়িত্ব-জ্ঞানহীনের প্রার্থনা মহান বিবেচক আল্লাহর কাছে কবুলই হইতেছে কিনা–সেইটাই আগে ভাবিবার বিষয়। তাহার পরেই না আপনি অন্যের খুঁত ধরা কিংবা অন্য ইসলপন্থীদের সমালোচনার জাবর কাটিতে পারেন মাত্র!!


আপনার শরীরে হারাম রক্ত আছে কিনা, আপনার পোশাক পবিত্র কিনা, আপনার ক্রয়করা জায়নামাজ নির্ভেজাল কিনা, আপনার খাদ্য হালাল কিনা, আপনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে জিহাদ করিতেছেন কিনা, চার খলিফার মতোন আপনিও আল্লাহর আইনমতে ”আকিমুদ্দিন” অর্থাৎ সমাজ-রাষ্ট্র হইতে সকল খারাবী দূর করিয়া ন্যায়প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইসলাম কায়েমের চেষ্টা করিতেছেন কিনা–পরকালে মুক্তির জন্য ইহাই হইলো আসল বিবেচ্য বিষয়। কেননা হাদীসে এইকথাও লিখা আছে যে, ইসলাম বা দ্বীন কায়েমের চিন্তা ব্যতীত যে মৃত্যুবরন করিলো, তাহার মরণ হইলো জাহিলিয়াতের মৃত্যু। এখন ভাবুন–আমরা কেমন ধারার মুসলিম হিসাবে বড়াই করিয়া যাইতেছি!!


সুতরাং কাঁদার ভিতরের পিচ্ছিল বাইম বা গছিমাছ হইয়া বাঁচিলেই কিন্তু পবিত্রতার দোহাই দিয়া আমরা পরকালে রক্ষা পাইবোনা।।


মুসলিমের প্রকারভেদ (!)
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলিয়াছেন—হজরত ইব্রাহীমই আঃ তোমাদের পরিচয় মুসলিম নামে নির্ধারণ করিয়াছেন। ইহার অর্থ কী দাঁড়াইলো? মুসলিম অর্থ আল্লাহতে বা ইসলামে সম্পূর্ণভাবে আত্মসমর্পিত ব্যক্তি, যাহাদের খণ্ডিত বা আংশিক ইসলামপালনের চেষ্টার কোনোই সুযোগ নাই। আবার নিজেকে মুসলিম দাবী করিয়া ইসলামছাড়া অন্য কোনো জীবনবিধান পালনেরও একবিন্দু সুযোগ নাই। ইসলামের নামে বা মুসলিম হিসাবে জগাখিচুড়ি জাতীয় কিছু পালনেরও কোনো কায়দাই নাই। তাই মুসলিম কমুনিস্ট, ধর্মনিরপেক্ষ মুসলিম, আহাম্মদী মুসলিম, বাহাই মুসলিম, সুন্নি মুসলিম, শিয়া মুসলিম, হানাফি, আহলি হাদীস, শাফিঈ মুসলিম বলিয়া ইসলামে কিছুরই অস্তিস্ত্ব আমি অন্তত খুঁজিয়া পাই নাই। কুরআন-হাদিসেও এমন কিছুর চিহ্ন নজরে পড়ে নাই। শুধু ঈমান-আমল সঠিক থাকিলেই তাহার জান্নাত অবধারিত- ইহাই আল্লাহ-নবীর মূলকথা বলিয়া জানিয়াছি।


আমার মতোন অধমের মতে, যাহারা এমনধারা নিজেদের আসল-খাঁটি মুসলিম বলিয়া জাহির আর অন্যদের বেঈমান বা দুর্বল মুসলিম বলিয়া দাবী করেন, তাহারা যেমন কুরআনিক এই পরিভাষাটিকে কলঙ্কিত ও অপমানিত করিতেছেন, তেমনই যাহারা মওদুদীবাদ, ওয়াহবী ইসলাম ইত্যাদি বলিয়া অন্য ইসলপন্থীদের গালি দিয়া থাকেন–তাহারাও আল্লাহর ঘোষিত ইসলামী পরিভাষাটিকে কলঙ্কিত ও অপমানিত করিয়া থাকেন। তবে কাদিয়ানী বা আহাম্মদী নামক কুফরি ফেরকার ব্যাপারে আমিও সহমত পোষণ করিয়া থাকি।

কুরআন-হাদিস পড়িয়া আমার ধারণা ও বিশ্বাস জন্মিয়াছে–বিভিন্ন ফেরকা বা উপদল নাম দিয়া যাহারা অমুকপন্থী মুসলিম, তমুকপন্থী মুসলিম হিসাবে কাউকে পরিচিত করাইতেছেন যাহারা আসলেই ঈমানদার, আল্লাহর কাছে তাহার কানাকড়িও মুল্য নাই। বরং কুরআন বলে–হে মুসলিমগন, তোমরা ইসলামের দড়িকে শক্তভাবে আঁকড়াইয়া ধরো, পরস্পর বিচ্ছিন্ন হইও না বা উপদলে বিভক্ত হইও না। তবে আমার মতে, ইসলামী আন্দোলন বা ইসলাম কায়েমের কৌশল হিসাবে বিভিন্ন ইসলামী নাম ধারণ করায় কোনো অপরাধ নাই এবং ইহাকে উপদল বা ফেরকা বলিবারও কারণ নাই।


এই যখন বাস্তবতা, তখন শিয়া-সুন্নি, হানাফি-মালিকী-শাফিঈ-হাম্বলী-লা-মজহাবীর নামে মারামারি, বাহাস বা কুতর্কের সমর্থনে কোনো দলীল আমি কুরআন-হাদিসে খুজিয়া পাই নাই!! এমনকি কাহারো সাধ্যও নাই ইহার সমর্থনে দলীল পেশ করিতে পারে? ইসলামে যাহা আছে তাহা শুধুমাত্র ”মুসলিম” নামের একটিই পরিচয়? ইহার বাহিরে কাহাকেও মওদুদীপন্থী, ওহাবী ইত্যাদি বলা সম্পূর্ণ অন্যায়, মিথ্যা অপবাদ, তোহমত এবং পাপ। কারণ আল্লাহ কাহাকেও মন্দ নামে ডাকিতে নিষেধ করিয়াছেন যাহার মানে এমন কাজ করা হারাম!!


অথচ অনেক মুসলিম নামধারী এই কাজটিই জোরে-শোরে করিয়া যাইতেছেন আর নিজেকে খাঁটি মুসলিম দাবী করিয়া যাইতেছেন, যাহার কোনো সমর্থন ইসলামে আদৌ নাই।


ইহারা কতোই না বেকুব যে, ইসলামের দৃষ্টিতে দেশে বেশুমার পাপ-মহাপাপ, হারাম, অসামাজিক কাজ, নির্লজ্জতা, খুন-খারাবী ইত্যাদির বন্যা বহিয়া চলিলেও তাহাদের মনে ঈমানের দাবী বা ইহাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করিবার দায়িত্ববোধ জাগিয়া ওঠে না। অথচ সমগ্র-কুরআন-হাদীসের মূলকথাই ইহাই? (ধারাবাহিক)

পূর্বের পর্ব-১ পড়তে এইখানে ক্লিক করুন

Leave a Reply