ইসলামী সংগঠনে মেধাবীদের ভূমিকা বিষয়ক একটি পোস্টের উল্টো পিঠ

‘কতিপয় মেধাবীর ইসলামী সংগঠনে অন্তর্ভুক্তির সংকটঃ কে দায়ী- সংগঠন নাকি মেধাবী নিজেই?’ শিরোনামে একটি লেখা imbd ব্লগে প্রকাশিত হয়েছে । এই লেখাটি মূলত ঐ পোস্টটির প্রতিক্রিয়ায় লেখা কিছু মন্তব্য । এই মন্তব্যগুলো পড়ার আগে ঐ পোস্টটি পড়ে নিতে পারেন । এখানে ইসলামী সংগঠন বলতে মূলত জামায়াতে ইসলামীকেই ইংগিত করা হয়েছে ।

১। লেখাটার দুটা অংশ আছে । প্রথম প্যারা পড়লে মনে হয় এটা বোধহয় সংগঠনের ভেতরের / সংগঠনের সাথে আদর্শিক বিরোধ নেই এমন লোকদের কথা বলা হচ্ছে । কিন্তু পরের দুটি প্যারায় আবার গনতন্ত্র কুফরী কিনা, ভোটের মাধ্যমে ইসলাম কায়েম হবে কিনা এসব ব্যাপারে যাদের মতের ভিন্নতা আছে তাঁদের কথা বলা হচ্ছে । সেজন্য ঠিক কোন লোকদের সংগঠনে ধরে রাখা দুষ্কর হচ্ছে সেটা দুইভাবে ব্যাখ্যা করতে হচ্ছে । যারা আদর্শিকভাবে , অর্থাৎ গনতন্ত্র বা মানুষের সমর্থনে ইসলাম কায়েমে বিশ্বাস করেনা , তাদেরকে তো সংগঠন ধরে রাখার প্রশ্নই ওঠেনা । সুতরাং আমি আমার মন্তব্যে সেই অংশটা আগেই বাদ দিচ্ছি ।

প্রথম অংশের ব্যাপারে বলতে গেলে এটা বলা যায়- এই বক্তব্য নতুন কিছু নয় । চিরাচরিতভাবে পড়ুয়া / চিন্তাশীল লোকদের যেভাবে

‘বুদ্ধিজীবি হইছে, বেশি বুঝে, উফ বৈঠকে এত কথা বলে, খালি প্যাচায়, আরে বেশি মেধাবীরা অনেক কথাই বলে- ওসবে কান দিলে চলে নাকি’

এই জাতীয় কথা বলে ব্যংগ-বিদ্রুপ করা হয় তারই একটা পরিশীলিত রূপ । এখানে একতরফাভাবে সেই লোকদেরকেই দায়ী করা হয়েছে যারা সংগঠনকে ভালোবেসেও সক্রিয় নন । কেন তারা সক্রিয় হচ্ছেন না সেটার কারণ উদঘাটনের চেষ্টা না করে তাঁদেরকে বনী ইসরাইলের সাথে তুলনা করা হয়েছে । এটাও এক ধরণের বিদ্রুপাত্মক প্রান্তিক বক্তব্য । এ ধরণের বক্তব্য দিয়ে কখনো মেধাবীদের বিকর্ষণ বৈ আকর্ষণ করা যায় না ।

আমি এই বক্তব্যের টার্গেটদের কাতারে পড়িনা , কারণ আমি মেধাবীও নই আর এখন কিংবা তখন, কখনো নিষ্ক্রিয়ও ছিলাম না । হয় আমাকে সংগঠন ধরে রেখেছে অথবা আমিই সংগঠনকে আঁকড়ে ধরেছি । সুতরাং আমার বক্তব্য কোনরকম বিদ্বেষপ্রসূত বা গায়ে লেগেছে তাই ক্ষেপেছে জাতীয় নয় ।

২। এই লেখার বিভিন্ন পয়েন্ট একটা একটা করে ব্যবচ্ছেদ করার আগে মেধাবী শব্দটা নিয়ে একটু বলি । যারা স্কুলে কলেজে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো রেজাল্টধারী , কারিকুলার এবং কো কারিকুলার বিভিন্ন কাজে পারদর্শী এ ধরণের লোকেরাই মেধাবী হিসেবে সর্বস্তরে স্বীকৃত । বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ইসলামী আন্দোলনে এ ধরণের লোকেরা সামনের সারিতে নেতৃত্ব দিচ্ছে- শুধু বাংলাদেশেই ব্যতিক্রম । ২০০৭ সালে শফিকুল ইসলাম মাসুদ ভাই মালয়েশিয়া, তুরস্ক, শ্রীলংকা ইত্যাদি দেশে ঘুরে এসে এই কথা আফসোসের সাথে স্বীকার করেছিলেন । তিনি বলেছিলেন, আমি বিভিন্ন দেশে গেলাম- সবখানে দেখি কেন্দ্রীয় কমিটির নব্বই ভাগ সদস্য ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যারিস্টার, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক । ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ারের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি । আফসোস, বাংলাদেশে ১-২ জনও নেই ।

প্রশ্ন হচ্ছে, সব দেশে মেধাবীরা, পেশাজীবিরা নেতৃত্ব দিতে পারলে, সময় দিতে পারলে , কর্মি হতে পারলে বাংলাদেশে কেন পারছে না ? শুধু বাংলাদেশের এরাই কি বনী ইসরাইলের বংশধর ?

৩। ভাই বলেছেন-

‘মেধাবীদের একটা মেন্টাল সাইকোলজি থাকে, সিমিলার প্রকৃতির। এরা মুল্যায়ন পেতে চায়, মুল্যায়ন না পেলে যত ভাল কাজই হোক খুব কম মেধাবীই সেটি করতে চায়।’

তো কথা হচ্ছে মূল্যায়ন কে না চায় ? ডঃ মুহাম্মাদ শহীদুল্লাহ তো কবেই বলে গেছেন- যে জাতি গুণের কদর করতে জানে না , সেখানে গুনী জন্মায় না ।
ধরা যাক একটা ছেলে জীবনের সবক্ষেত্রে মূল্যায়ন পেয়ে এসেছে, ভালো পড়াশোনা করেছে ভালো রেজাল্ট পেয়েছে, শিক্ষকদের ভালোবাসা পেয়েছে, সহপাঠীদের সমীহ পেয়েছে , তাঁর কথা সবসময় গুরুত্বের সাথে বিবেচিত হয়েছে , অনেককে পরিবর্তন করেছে , তাঁর কথা যুক্তিপূর্ণ । তো আপনি হঠাত করে তাঁকে এমন সহযোগী সদস্য বানালেন যার কথা বলার কোন জায়গা নাই । কথা বললেই আপনার ইউনিট সভাপতি থামিয়ে দিয়ে বলেন- আরে ভাই থামেন । আগে ঠিকমত রিপোর্ট লেখেন, তারপর কথা বলতে আসিয়েন !
তো আপনি কীভাবে আশা করেন ঐ লোক দিনের পর দিন, বছরের পর বছর ঐভাবে চুপ মেরে থেকে সংগঠনের সামনের সারিতে থেকে কাজ করবে ? আপনার ইউনিট সভাপতি তো রুকন হবার ক্লিয়ারেন্স দিবেনা , বলবে – বেশি কথা কয় !

যে কাজের কোন মূল্য নেই, সে কাজ একজন লোক কেন করতে যাবে ? আওয়ামী লীগ, বিএনপি,বামরা মূল্যায়ন করতে পারলে আমরা কেন পারিনা ? এর দায় শুধু তাঁদের ওপর চাপিয়ে দিলেই কী আমরা খালাস হয়ে যাবো ?
৪।

‘এরা দায়িত্বশীল কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হয়ে নয়, বরং নিজে নিয়ন্ত্রন করতে বা অন্তত উপদেষ্টার সম্মান চায়। নিয়ন্ত্রিত হতে গেলেই নিয়ন্ত্রনের যে পলিটিক্যাল ক্যামিষ্ট্রি তা তারা বুঝতে চায় না, অথবা মানতে চায় না।’

এটা একটা একপেশে কথা । আপনি যদি পলিটিকাল কেমিস্ট্রি , মানে শুধু ‘দায়িত্বশীলে’র পদবী দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে চান তাহলে কোনকালেই কাউকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না – কিছু জ্বি হুজুর গোছের লোক ছাড়া । নিয়ন্ত্রণের জন্য জ্ঞান লাগবে, যুক্তি লাগবে, ব্যক্তিত্ব লাগবে । আপনি যদি একজন কর্মীর প্রস্তাবের অসাড়তা যুক্তি দিয়ে খন্ডন না করে আনুগত্যের আয়াত দিয়ে করেন তাহলে কোন মেধাবীই সংগঠনে টিকতে পারবে না । অল্প কিছু ব্যতিক্রম বাদে যারা স্পষ্ট ভুল সিদ্ধান্ত হতে দেখেও সবকিছু সয়ে বৈঠক থেকে বেরিয়ে কেঁদে ফেলে তারা ছাড়া ।

মেধাবীরা নতুন নতুন পথ-পন্থা প্রস্তাব তুলে ধরবে এটাই স্বাভাবিক । আপনি যদি সেগুলোর চেয়ে উত্তম প্রস্তাব না দিতে পারেন আবার একের পর এক প্রস্তাব নাকচ করত থাকেন তাহলে কীভাবে আশা করেন মেধাবীরা এখানে বসে বসে আনুগত্যের আয়াত শুনতেই থাকবে ? তাঁর সামনে তো অনেক পথ আছে । অথবা সে নিজেই নতুন পথ সৃষ্টির উপযোগী হতে পারে ।

৫। আপনি যদি দেখেন যে একের পর এক ভুল সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে, কোন কথাই আমলে নেয়া হচ্ছে না তাহলে কীভাবে আপনি সেখানে বসে থাকবেন ? একজন মেধাবী কেন সেইসব সুস্পষ্ট ভুল সিদ্ধান্তের দায় নিজের কাঁধে নিবে ?

৬।

যদি তারা মেনে নিতে চাইতো তাহলে অনেক ক্ষেত্রে শুনলাম এবং মান্য করলাম প্রক্রিয়াতে প্রবেশ করলে তবেই সংগঠনে থাকতে পারে, অন্যথায় আর কোন প্রক্রিয়া নেই এদেরকে ধরে রাখার।

এইটাও একটা ভুল পর্যালোচনা যেটা দাঁড়িয়ে আছে একটা ভুল অনুসিদ্ধান্তের ওপর । শুনলাম এবং মান্য করলাম এটা শুধুমাত্র আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসুলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য । কিন্তু আমরা এটাকে সংগঠনের প্রতিটি ইউনিট পর্যন্ত দেখতে চাই । হাউ পসিবল ? যুক্তি-বুদ্ধি পরিসংখ্যান তথ্য এসবের কি তাহলে কোন মূল্য নেই ? অন্ধ আনুগত্যমূলক সংগঠন নয়- যুক্তি-বুদ্ধি-তথ্য-ইতিহাস-পরিসংখ্যান ভিত্তিক সংগঠন ও কর্মপদ্ধতি দাঁড় করান , আনুগত্যের আয়াত মুখস্ত করিয়ে দারস দিয়ে ধরে রাখতে হবেনা, মেধাবীরা নিজে থেকেই এগিয়ে আসবে । ডাকতেও হবেনা । মেধাবীরা বনী ইসরাইল না মদীনার আনসার সেটা প্রমাণ হবে ।
৭।

‘একটা প্রক্রিয়া আছে, তা হল এদেরকে বুদ্ধিজীবী ডিক্লেয়ার করে তেমন একটা প্লাটফর্ম করে তাদেরকে তেল মারা, উন্নত জীবন দেয়া, মুল্যায়ন করা। বিনিময়ে তারা আপনাকে বুদ্ধি দেবে, গবেষনা করবে ইত্যাদি। খুব কম মানূষই তাঁর মেধাকে সংগঠনে বিলীন করে কর্মী হিসেবে জীবন যাপন করতে চায়।’

আমার তো বরং উল্টোটাই মনে হয় (বাস্তবেও অনেক ক্ষেত্রে তাই হচ্ছে), মেধাবীরা তেল না দিয়ে বরং উলটো পরামর্শ দেয় । প্রস্তাব দেয় । নতুন কর্মসূচী দেয় , যেগুলো দায়িত্বশীলের মাথায় ধরেই না । আর উন্নত জীবন মেধাবীদেরকে সংগঠন দিবে কেন , উন্নত জীবনই তো তাঁদের পেছনে ছোটে । সংগঠন যদি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষককে ঝটিকা মিছিলের আনুগত্য করতে বলে , সেটাকেই যদি আনুগত্যের চূড়ান্ত প্রমাণ মনে করে তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের পক্ষে ক্লাস বাদ দিয়ে ঝটিকা মিছিলে যাওয়া সম্ভব না । ধরে রাখা , কীভাবে সম্ভব ? তিনি যদি মেধাকে ঝটিকা মিছিলে বিলীন না করেন, এতে যদি তাঁর কর্মী হওয়া না হয়- আমি তাঁকে কীভাবে দোষ দেবো ?

অনেক ঝটিকা মিছিলে গিয়েছি, শুধু আনুগত্যের খাতিরে । আগেও ঝটিকা মিছিলের বিপক্ষে ছিলাম , আজো আছি । কেউ কি বলতে পারেন, শহরের এক গলিতে পাঁচ ঝটিকা মিছিলের মাধ্যমে কোন লাভটা হয়েছে ? ২০০৮-০৯ সালে ফেসবুক ব্যবহার করতে বাধা দেয়া হত , তখন অনেকেই বলেছিলেন – ফেসবুকই হবে একসময় সবচেয়ে বড় মিডিয়া । সেইসব ফেসবুক বিদ্বেষী দায়িত্বশীলকে এখন দেখি ফেসবুকে পেজ খুলেছেন । কেন, আমরা এত দেরিতে বুঝি কেন ? কোনটা ছেড়ে কোনটা বলবো ? আপনি যখন দিনের পর দিন দেখেন আপনার চোখের সামনে বিরোধীদের আন্ডারএস্টিমেট করে গাধার মত সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে , সংগঠনের জান-মালের বিফল ক্ষয় ক্ষতি করা হচ্ছে তখন কেন একজন মেধাবী বসে বসে সেইসব সিদ্ধান্তের ‘শুনলাম এবং মান্য করলাম’ আনুগত্য করবে ?

৮।

‘তারা উপদেষ্টা হতে চান, কর্মী নন। তারা আনুগত্য করতে নয় বরং উপদেশ দিতে চান। তাদেরকে ধরে যদি রাখতেই হয় তাহলে কর্মি বানানো বা আনুগত্যের আশা করে সংগঠনের ফরম্যাট তৈরি করলে হবে না।’

এটাও একটা ভুল পর্যালোচনা । কথা ছিল আমাদের সংগঠনে সব কর্মীই উপদেষ্টা হবে । কিন্তু আফসোস , এখন উল্টো কর্মীদেরকে স্রেফ ‘ওয়ার্কার’ হিসেবে ভাবা হচ্ছে , যা কইছি তার আনুগত্য করেন- এত কথা কিসের ?
মেধাবীরা যুক্তি দিয়ে চিন্তা করবে , তারা তাঁদের যুক্তির কথা বলবে । সেটাকে আপনি একজন কর্মীর পরামর্শ মনে না করে উপদেশ মনে করেন- এইটা কার সমস্যা ? আপনার তো এইটাকে উপদেশ মনে না করে পরামর্শ মনে করার কথা ছিল , উপদেশ মনে হচ্ছে কেন ? কর্মী-সমর্থকদের পরামর্শকে উপদেশ মনে করে গ্রাহ্য না করার এই মানসিকতা যদি সবার ভেতর ঢুকে থাকে , কী ভয়ংকর ব্যাপার ভাবা যায় !

সবাই আনুগত্য করবে , মেধাবীরাই মুরসি হবে । যদি সংগঠনের কর্মীকে মাটিকাটা কর্মীতে পরিণত না করেন ।

[এখানে ‘আপনি’ শব্দটা পোস্টদাতাকে লক্ষ্য করে নয়, সিস্টেমকে লক্ষ্য করে বলা হয়েছে । ]

2 Responses

  1. ABUSAIF
    ABUSAIF at |

    জাযাকাল্লাহ… পয়েন্ট আকারে জবাব/ব্যাখ্যা দিয়েছেন!

    আরো অনেক কথাই বলা যায়, কিন্তু শেষ কথা সেটাই- পানি তো নিচের দিকেই গড়ায়!

    আর পানিকে যদি উপরে যেতে হয়/চায় তবে বাষ্প হওয়া ছাড়া সম্ভব নয়!!

    Reply
  2. আবু সুলাইমান
    আবু সুলাইমান at |

    ধন্যবাদ ভ্রাতা মুহসিন আব্দুল্লাহ কে। যুক্তি দিয়ে সবিস্তারে পূর্ব পোস্টের পর্যালোচনার দূর্বল দিকগুলো তুলে ধরার জন্য।

    Reply

Leave a Reply