বন্দি নেতাদের স্বীয় পদে বহাল রেখেই জামায়াতের পুনর্গঠন

রাজনৈতিক অঙ্গনে বন্দি নেতাদের ফেরার আশা অনেকটা বাদ দিয়েই পুনর্গঠিত হচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। নানামুখী যাঁতাকলে কোণঠাসা দলটি এবার তরুণ নেতৃত্বের সমন্বয়ে পুনর্গঠিত হচ্ছে। এ জন্য দলের কেন্দ্র থেকে শুরু করে নগর-মহানগর এমনকি জেলা-উপজেলা পর্যায়ে তরুণ নেতাদের ধীরে ধীরে সামনে তুলে আনা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে  চল্লিশ থেকে পঞ্চাষোর্ধ্ব এবং স্বাধীনতাযুদ্ধে বিতর্কিত ভূমিকার অভিযোগ নেই- এমন নেতাদের প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে।

অবশ্য মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আটক শীর্ষ নেতাদের এ মুহূর্তে সরিয়ে দেয়া হচ্ছে না। কর্মী সমর্থক-ভক্ত অনুরাগী সর্বোপরি জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হতে পারে- এ আশঙ্কায় তাদের স্বপদে রেখেই দলকে পুনর্গঠন করা হচ্ছে। তবে বয়স এবং পারিপার্শ্বিক বিষয় বিবেচনায় তারা আগামীতে হয়তোবা রাজনীতি করতে পারবেন না- এমনটা ধরেই দলের বিভিন্ন স্তরে পুনর্গঠন হচ্ছে বলে জানায় দায়িত্বশীল সূত্র। ভবিষ্যৎ আন্দোলন-সংগ্রামের কথা চিন্তা করে দলটির ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতৃত্বেও একই ধরনের পরিবর্তন আনা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০১০ সালে যুদ্ধাপরাধ মামলায় জামায়াতের আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, নায়েবে আমীর মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ও সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ গ্রেপ্তার হন। এরপর থেকেই ধীরলয়ে পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু হয়। তবে সম্প্রতি এ প্রক্রিয়া জোরালো হয়। বিশেষ করে দশম জাতীয় সংসদ এবং চতুর্থ উপজেলা নির্বাচনের পর পুনর্গঠন কাজের গতি বাড়ে। ইতিমধ্যে ২৬টি জেলা থেকে শুরু করে সব বিভাগীয় শহর, ঢাকা মহানগর এবং কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ, নির্বাহী পরিষদ, মজলিসে শূরাসহ বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যাপক পরিবর্তন, পরিবর্ধন হয়েছে। তবে আটক সব শীর্ষ নেতা এখনও স্বপদে বহাল আছেন। তাদের বিষয়টি চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত তারা স্বীয় পদে বহাল থাকবেন বলে সূত্র জানায়। এ প্রসঙ্গে দলের এক তরুণ সদস্য বলেন, শীর্ষ নেতারা জামায়াতের আদর্শ ও অহঙ্কার। রাজনীতির ময়দানে থাকুক আর না থাকুক তাদের নীতি-আদর্শকে ধারণ করে জামায়াত এগিয়ে যাবে।

এদিকে ২০১০ সালে আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীসহ তিন শীর্ষ নেতা আটকের পর ধারাবাহিকভাবে গ্রেপ্তার হন জামায়াতের সাবেক আমীর অধ্যাপক গোলাম আযম, নায়েবে আমীর এ কে এম ইউসুফ, মাওলানা আবদুস সুবহান, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, আবদুল কাদের মোল্লা, এটিএম আজহারুল ইসলাম ও নির্বাহী পরিষদের সদস্য মীর কাসেম আলী। গত বছর আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয়েছে। বিচারাধীন অবস্থায় মারা গেছেন মাওলানা এ কে এম ইউসুফ ও নায়েবে আমীর অধ্যাপক নাজির আহমাদ। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ইতিমধ্যে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়েছে মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে। ৯০ বছরের ?জেল দিয়েছেন অধ্যাপক গোলাম আযমকে। বিচারাধীন রয়েছে আবদুস সুবহান, এটিএম আজহারুল ইসলাম ও মীর কাসেম আলীর মামলা। এ নেতাদের মধ্যে গোলাম আযম ছাড়া অন্যরা জামায়াতের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম নির্বাহী পরিষদের সদস্য।

১৫ সদস্যের নির্বাহী পরিষদের ৯ নেতা মানবতাবিরোধী অপরাধে বিচারের মুখোমুখি। বাকি চারজনের মধ্যে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আ ন ম আবদুজ্জাহের রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয়। সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক দীর্ঘ ১০ মাস বিদেশে অবস্থান করছেন। শুধু নায়েবে আমীর মকবুল আহমদ ভারপ্রাপ্ত আমীর, সহকারী সেক্রেটারি অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল (বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল) ডা. শফিকুর রহমান ও ঢাকা মহানগর আমীর মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান আত্মগোপনে থেকে দলীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয় আছেন। কিন্তু শীর্ষ নেতাদের দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে কার্যত নেতৃত্বের শূন্যতা দেখা দেয় জামায়াতে। যদিও শীর্ষ নেতাদের অনুপস্থিতিতে অপেক্ষাকৃত তরুণরা গত ৫ বছর বিভিন্ন পদে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

এ পর্যায়ে নির্বাহী পরিষদের সদস্য সংখ্যা ১৫ থেকে বাড়িয়ে ২৩-এ উন্নীত করা হয়। তুলে আনা হয় অপেক্ষাকৃত তরুণ নেতাদের। তাদের মধ্যে আছেন ঢাকা মহানগর আমীর মাওলান রফিকুল ইসলাম খান, সাবেক এমপি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরোয়ার, অধ্যাপক তাসনীম আলম, সাবেক এমপি এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ, নুরুল ইসলাম বুলবুল, মাওলানা আবদুল হালিম, মাওলানা রফিউদ্দিন আহমেদ ও মাওলানা এটিএম মাসুম। এদের বয়স ৪৫-৬০ বছরের মধ্যে এবং মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে বিতর্কিত কোন ভূমিকা রাখার অভিযোগ নেই। পরিবর্তন ও সংযোজন হয় জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ ও মজলিসে শূরাতেও।

৫৫ জনের কর্মপরিষদের মধ্যে অধিকাংশই ৮০’র দশক ও এর পরবর্তীকালের ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় নেতা। সর্বশেষ কর্মপরিষদে যোগ হন ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি মুহম্মদ সেলিম উদ্দিন, শফিকুল ইসলাম মাসুদ, এডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ, চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আজম ওবায়দুল্লাহ, সিলেট মহানগর জামায়াতের আমীর এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের ও মঞ্জুরুল ইসলাম ভূঁইয়া। এ ছাড়া কর্মপরিষদে আছেন ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের, এডভোকেট জসিম উদ্দিন সরকার, চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতের আমীর মাওলানা শামসুল ইসলাম, সাইফুল আলম খান মিলন, কক্সবাজার জেলা জামায়াতের আমীর মুহাম্মদ শাহজাহান।

এ ছাড়া কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য হিসেবে যোগ হয়েছেন রাজশাহী মহানগরী আমীর অধ্যাপক আতাউর রহমান, খুলনা মহানগরী আমীর আবুল কালাম আযাদ, বরিশাল মহানগরী আমীর এডভোকেট মোয়াজ্জেম হোসেন হেলাল ও রংপুর মহানগরী আমীর এডভোকেট মাহবুবুর রহমান বেলাল। তারা ছাত্রশিবিরের সাবেক নেতা। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরায় আনা হয় শিবিরের সাবেক সভাপতি ড. রেজাউল করিম, সাবেক নেতা এস এম আলাউদ্দিন, এডভোকেট হেলাল উদ্দিন, মোবারক হোসেনসহ অনেক তরুণ নেতাকে।

একইভাবে বিভিন্ন মহানগর, জেলা এমনকি উপজেলা কমিটিতেও অপেক্ষাকৃত তরুণদেরই স্থান দেয়া হচ্ছে। নিকট ভবিষ্যতে দলের নায়েবে আমীর ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে কয়েকজন যুক্ত হচ্ছেন বলে জানা যায়। যাদের বেশির ভাগই অপেক্ষাকৃত তরুণ এবং স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন সময়ের বিতর্কমুক্ত।

মানবজমিন, ১৩/০৯/১৪

Leave a Reply