আল কোরআনের সম্মোহনী শক্তি ও আমাদের বিচারক সমাজ – পর্ব – ১

পর্ব – ১
ফারুকে আযম হযরত উমর ইবনূল খাত্তাব (রাঃ) এর ইসলাম গ্রহন সম্পর্কে ইতিহাসে দুটি ঘটনা পাওয়া যায়। এই দুটি বর্ণনার মূল বক্তব্য একটি। তা হচ্ছে হযরত উমর (রাঃ) কুরআনের কিছু অংশ পড়ে অথবা শুনে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেন। এটা আল কোরআনের মোজেজা। মোজেজা হল – যা সমকালীন অবস্থাকে একেবারে আজীজ (তা’জব) করে দেয়। এটা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে তার প্রেরিত নাবী রাসূলদের মিশন বাস্তবায়নের জন্য সহকারী শক্তি হিসাবে দেয়া হত। নাবী রাসূল ছাড়া পৃথিবীর কাউকে এই শক্তি দান করা হয়নি। অবশ্য প্রত্যেক নাবী রাসূলকে তিনটি বিষয় সমান ভাবে দেয়া হয়েছিল।
এক হল – হুসনে খুলক বা সমকালীন সময়ে সবচেয়ে উত্তম চরিত্র।
দ্বিতীয় হল – ওহী যা রুহুল আমীনের (জিব্রাইল আঃ) মাধমে আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের জন্য জীবন ব্যবস্থা। বা সৃষ্টির জন্য সৃষ্টার পক্ষ থেকে জীবন পরিচালনার বিধি বিধান।
তৃতীয়টি হল – মোজেজা।
মানবতার বন্ধু বিশ্ব নবী মুহাম্মদকেﷺ (সাঃ) প্রায় তিন হাজার মোজেজা দেয়া হয়েছিল। এটা ইমাম গাজ্জালী (রঃ) এর মত। তবে তিনি তার তথ্য সুত্র দেননি। অতীতের সকল নবী রাসূলদেরকে যে সমস্ত মোজজা দেয়া হয়েছিল। তা তাঁদের জীবদ্দশায় ইসলাম প্রতিষ্ঠার কাজে লাগাতে পেরেছেন। কিন্তু তাঁদের ইন্তিকালের পর উম্মতরা আর সেই মোজেজা কখনো ব্যবহার করতে পারেননি। যেমন হযরত মুসা (আঃ) এর লাঠি। অথবা হযরত ঈসা (আঃ) এর জন্মান্ধ ব্যক্তির চিকিতসা। এই দুই নবী ও রাসূলের যত উম্মতের দাবীদার আছেন। তারা এখন সে সমস্ত মোজেজা ব্যবহার করতে পারেন না।
পৃথিবীতে একমাত্র ব্যতিক্রম হল আল কোরআন। আল কোরআন নাযিলের সময় যেমন মোজেজা ছিল ঠিক অবিকল আজ ও আছে। এটা থাকবে চিরকাল তথা কিয়ামত পর্য়ন্ত। এই চ্যালেন্জ আল কোরআন নিজেই দিয়ে রেখেছে।
আল কোরআন মানুষের হৃদয়কে সরাসরি আলোড়িত করে। আল কোরআনের পাঠক শ্রোতা উভয়কে সমান ভাবে সত্যের কাছে নিয়ে আসে। এই সত্যকে পাওয়া এবং সে অনুযায়ী আ’মাল করার বিষয়টা হল মূল বিবেচ্য। আমরা যারা মুসলমান তাদের সমস্যা হল – কোরআনের সাথে বাস্তব আচরণ। আজ প্র্যাকটিক্যাল এবং থিওরিটিকাল মুসলমানদের সমান চরিত্র। নিয়মিত কোরআন পড়েন অথবা শুনেন এমন মুসলমানরা আল্লাহর এই আখেরী কালামের বাস্তবতা নিয়ে নানা মত – নানান চিন্তা।বিতর্ক তো আছেই।
আমরা ফারুকে আযমের ইসলাম গ্রহনের ঘটনা জীবনে কতবার শুনেছি। আমরা নিজেরাও বলি। কিন্তু হযরত ওমর (রাঃ)এর পরিবর্তন কি কারণে হল, তা কারোর দৃষ্টি আকর্ষন করে না। অথবা আমাদের সম্মানিত ওয়াজিন অথবা আলোচক কখনো এই পয়েন্ট অব ভিউতে ওয়াজ নসিহত করেন না।
আল কোরআনের আকর্ষণও অপ্রতিরোধ্য, সম্মোহনী শক্তি আমাদের বাস্তব জীবনে আলোচিত, চর্চিত হয় না। এর ফল হল – আল কোরআন থেকে ব্যক্তি ও সামাজিক উপকার পাই না। আল কোরআনকে আমরা একটি পঠিত ধর্মগ্রন্থ হিসাবে গ্রহন করেছি। কখনো এর সামাজিক বাস্তবতা এবং তার বাস্তবায়ন নিয়ে চিন্তা করিনি। আর যারা এর চিন্তা করেন তারা যত না থিওরিটিকাল ততটা প্রাকটিকাল নয়। এটা বাস্তবতা।
আমাদের এই লেখায় দুটি ঘটনা আলোচনা করতে চাই। যা সম্পুর্ণ বিপরীত ফলাফল। দুইজনই সমাজের নেতা। দুইজনের চিন্তাধারা স্যেকুলার। দুইজনই তাদের সময় সমাজের আলোচিত এবং বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব ছিলেন। দুইজনই কোরআন শুনেছেন। কিন্তু এর বাস্তবায়ন, আ’মাল সম্পূর্ণ বিপরীত।
একজন হলেন ফারুকে আযম হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ)। আরেক জন হলেন – ওয়ালিদ বিন মুগীরা।
# হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) =
ফারুকে আযম (রাঃ) এর ইসলাম গ্রহণ প্রসঙ্গে হরযত আতা ও মুজাহিদ এর রিওয়ায়েত বর্ণনা করেছেন, ইবনে ইসহাক আব্দুল্লাহ বিন আবু নাজীহ থেকে সংকলন করেছেন, যা ফারুকে আযম (রাঃ) নিজে বলেন –
‍‍‌আমি সেদিনও ইসলাম থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছিলাম, শরাব পানে মত্ত থাকতাম। আমাদের এক অডিটরিয়াম ছিলো, যেখানে কুরাইশগণ এসে জমায়েত হতো। সেদিন আমি তাদের সন্ধানে গেলাম কিন্তু কাউকে সেখানে পেলাম না। চিন্তা করলাম অমুক শরাব বিক্রেতার নিকট যাবো, হয়তো সেখানে তাদেরকে পেয়েও যেতে পারি। কিন্তু সেখানেও তাদের কাউকে আমি পেলাম না। তখন আমি সিন্ধান্ত নিলাম, মসজিদে হারামে গিয়ে তাওয়াফ করিগে। সেখানে এলাম। দেখলাম হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) সালাতে মশগুল। তিনি সিরিয়ার দিকে মূখ করে সালাতে দাঁড়িয়েছেন। কা’বা তাঁর ও সিরিয়ার মাঝামাঝি অবস্থিত। তাঁকে দেখে আমি ভাবলাম, আজ আমি চুপি চুপি শুনবো যে, তিনি কি পড়েন। আবার এটিও মনে হলো, যদি শোনার জন্য কাছে চলে যাই তবে তো আমি ধরা পড়ে যাবো। এজন্য আমি হাতিমের দিক থেকে এসে খানায়ে কা’বার গেলাফের নিচে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। আমার ও তাঁর মাঝে একমাত্র কা’বার গেলাফ ছাড়া অন্য কোনো আড়াল ছিলো না। যখন আমি নবী করীম (সাঃ) এর তিলাওয়াত শুনলাম তখন আমার মধ্যে এক ধরনের ভাবান্তর পরিলক্ষিত হলো। আমি কাঁদতে লাগলাম। এরি পরিণতিতে ইসলাম সৌভাগ্য আমার হয়।
==============================
আগামী পর্ব – ২

Leave a Reply