অবহেলায় মাতৃত্ব, সন্তান হলো বোঝা= তথাকথিত আধুনিক সমাজ

mother_by_yana8nurel6bdkbaik-d5068i7

পত্রিকার ছোট একটা কলামে চোখ পড়লো। লেখা- “বিকল্প শিশুখাদ্য আইন- ফাঁকফোকরে কারণে প্রয়োগ হয় না। এদিকে ২০১৩ সালে শিশু খাদ্য আইন মতে- মাতৃদুগ্ধের বিকল্প শিশু খাদ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বিক্রির জন্য কোনো ধরণের সেমিনার সিম্পোজিয়াম করা যেমন নিষিদ্ধ তেমনি এ পণ্যের বিক্রি বাড়ানোর উদ্দেশ্যে শিশুদের নিয়ে কোনো প্রতিযোগিতাও আয়োজন করা যাবে না”। যদিও যত্রতত্র এই আইন আমান্য হচ্ছে এবং শাস্তি প্রয়োগ হচ্ছে না। যেমন মার্কস ( মাতৃদুগ্ধের বিকল্প দুধ প্রস্তুতকারী কোম্পানী) শিশুদের নিয়ে প্রতিযোগিতায় নেমে নিজের পণ্যের প্রচার করছে। এদিকে ডাক্তারসহ সচেতন মা-বাবা জানে শিশুর জন্য মাতৃদুগ্ধের বিকল্প নেই। বোতলজাত দুধ শিশুর জন্য যেনো নিরব ঘাতক (স্লো পয়জন)। তাই শিশু জন্মের পর মা একেবারে অসুস্থ থাকলে, অন্য কোনো মহিলাকে দিয়ে হলেও সেই প্রয়োজনটা মেটানো পিতার কর্তব্য। এদিকে বিজ্ঞ চিকিৎসকেরা শিশুকে বোতলজাত দুধ  না দেয়ার কথা বললেও- সমাজে একটা কথা প্রচলিত যে- প্রথম ৪০ দিনের মধ্যে শিশুর মুখে বোতলের দুধ না দিলে সে আর বাইরের দুধ খেতে চাইবে না, কান্নাকাটি করবে, তাকে রেখে কাজে যাওয়া কিংবা কোনো প্রোগ্রামে যাওয়া যাবে না।

এসব কথার মধ্যে প্রথম যে ভুলটা হচ্ছে তাহলো- ৪০ দিনের মধ্যে শিশুর মুখে বোতলের দুধ না দিলে নয় বরং মায়ের দুধ ছয় মাস ঠিক মতো না খাওয়ালে শিশু বেশি কান্নাকাটি করে ও অধিক রোগে ভুগে। তাছাড়া বুকের দুধ খাওয়ানো- মা এবং শিশু উভয়ের জন্য কতটা উপকারী এটা হয়ত ছোট একটি লেখায় শেষ হবে না, তবে সংক্ষেপে বলতে- এতে শিশুরা যেমন ডায়রিয়া, পেটের পীড়া, অ্যালার্জি, নিয়োমনিয়া-ইত্যাদি রোগ থেকে মুক্ত থাকে, তেমনি কান্নাকাটিও কম করে। অপরদিকে স্তন পান করানোর মাধ্যমে মা’র  স্তন ক্যান্সার, জরায়ু ক্যান্সার, অস্টিওপোরোসিস সহ বিভিন্ন মেয়েলী রোগ হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়। তাছাড়া বুকের দুধ পান- গর্ভকালীন সময়কার মা’র বাড়তি ভরকে কমাতে এবং প্রাকৃতিকভাবেই জন্ম নিয়ন্ত্রণেও ভূমিকা রাখে। কারণ- প্রায় দুই বছর শিশুকে দুধ পান করানোর ব্যস্ততায় মা আরেকটা সন্তান নেয়ার চিন্তায় থাকেন না। সুতরাং  মাতৃদুগ্ধের বিকল্পের প্রশ্নই উঠে না। তাছাড়া জানা দরকার- শিশু জন্মের প্রথম ছয় মাস মায়ের বুকের দুধ ছাড়া আর কিছু তো খাওয়ানো দরকারই নেই। আর ছয় মাস পর মায়ের দুধের পাশাপাশি স্বাভাবিক খাদ্যগুলো শিশুর জন্য সিদ্ধ করে খাওয়ালেই হবে- এতে শিশুর শারিরিক ও মানসিক বিকাশ সুষ্ঠ ও স্বাভাবিক হবে। (তথ্যসূত্রঃ বইটির নাম- Parent-child relations, written by Hisham Al Talib, Abdul Hamid Abu Sulaiman and Omar Altalib)

এবার আসি বাইরে যাওয়া তথা চাকরিতে যাওয়া প্রসঙ্গে- প্রথমত, আমরা জানি বিভিন্ন অফিসে মাতৃত্বকালীন ছুটি রয়েছে ছয় মাস। যদিও আমার কাছে  ৬ মাসের ছুটিটা  যেনো মা ও শিশু- উভয়ের সাথে বলতে গেলে বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের সাথে পরিহাস তুল্য। ছয় মাসের মধ্যে ছোট্ট শিশুটির মা’র প্রয়োজন ফুরিয়ে যায় না। তাছাড়া শিশুর দুধ ছাড়তে সর্বোচ্চ দুই বছর লেগে যায়। সুতরাং, এবার আমি যদি বলি- মাতৃত্বকালীন ছুটি দুই বছর করা হোক- তবে স্বাভাবিকভাবেই চাকরিদাতা  প্রতিষ্ঠানগুলো এটাই বলবে- “দুই বছরের (!!!) জন্য একটা পদ খালি থাকবে? যেখানে বেকার সমস্যা বিদ্যমান”? তাই  সুস্থ আগামী প্রজন্মের চিন্তায় ও মা’ হতে যাওয়া নারীরা যাতে মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা থেকে দূরে থাকে- তাই আমি মাতৃত্বকালীন ছুটির বিপক্ষে। বরং গর্ভধারণের শুরুতেই মা’র উচিত অফিস প্রধানকে নিজের অপারগতার কথা আগে থেকে জানানো- যাতে সঠিক সময়ে সেই পদের জন্য ভিন্ন কাউকে নেয়ার সার্কুলার দেয়া যায়। আর মা’ও যাতে চাকরি রক্ষার টেনশান ও প্রতিদিনকার বাড়তি পরিশ্রম থেকে মুক্ত হয়ে নিজের দিকে খেয়াল রাখতে পারে। পরবর্তীতে মা’র ইচ্ছা হলে চার বা পাঁচ বছর পর না হয় উপযুক্ত চাকরিতে ঢুকতে পারে। চার-পাঁচ বছর পর বললাম, কারণ একটা শিশুর মানসিক বিকাশ ঘটে প্রথম চার থেকে পাঁচ বছরেই আর এই সময়ে তার উপযুক্ত যত্নের প্রয়োজন। এদিকে মা’র এটা খেয়াল রাখা উচিত- চাকরি ছেড়ে দিলে ইনশাআল্লাহ পরবর্তীতে নিজের পরিস্থিতি বুঝে ভালো আরেকটাও পাওয়া যেতে পারে তবে, গর্ভে আসা শিশুটির সঠিক যত্ন না নিলে সেই সুযোগ আর কখনো ফিরে আসবে না। আর অবশ্যই আমরা একটা  মজবুত জাতিই কামনা করি।

 

এদিকে কর্মজীবী মহিলাদের যখন হঠাৎ করে চাকরি ছেড়ে দিতে হয়- তখন লাইফ স্ট্যাইলে একটা পরিবর্তন আসে। এই মুহূর্তে স্বামীর উচিত স্ত্রীকে মানসিক সাপোর্ট দেয়া। এদিকে বিয়ের পরেও আর্থিক প্রয়োজনে যদি নারীকে বাধ্য হয়েই চাকরি করতে হয় তখন সন্তান নেয়ার এবং পরবর্তী কয়েক বছরগুলো যেসময় একটা শিশুকে সার্বক্ষণীক তত্ত্বাবধায়ক হিসাবে মা’র প্রয়োজন হয়- সে সময়টাতে স্বামী যাতে স্ত্রীকে চাকরি করার জন্য চাপ না দেয়- সেই বোধটা স্বামীর মাথায় রাখা উচিত। আরেকটা বিষয় যেটা না বললেই নয়- আজকাল বিভিন্ন মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানী ‘ডে-কেয়ার সেন্টার’ খুলছে, অফিসে কর্মজীবী নারীদের শিশু দেখভালের জন্য। তবে এটা আমাদের নারীজাতির বুঝা উচিত- মা’র প্রয়োজন কখনো কাজের মেয়েকে দিয়ে হবে না। কারণ শিশুটি আপনার, কাজের মেয়ের নয়।

এবার কষ্টের পর কষ্ট সহ্য করে সন্তানের জন্য যখন একটি মা’কে বিভিন্ন কিছু বিসর্জন দিতে হয়- হোক সেটা চাকরি থেকে ইস্তফা দেয়া, কিংবা কোনো প্রোগ্রামে উপস্থিত না হতে পারা কিংবা যেমন এক পরিচিতের কাছে শুনেছি- বিদেশে পিএইচডি’র সব হয়ে গেছে অথচ দুই মাসের শিশুকে নিয়ে উনার পক্ষে যাওয়াটা অনিশ্চিত হয়ে দাঁড়িয়েছে-ইত্যাদি বিভিন্ন ধরণের বিসর্জন একটা মা’কে দিতে হয়। আর এই বিসর্জনের ফলে যখন স্বামীর দিক থেকে সাপোর্ট না আসে কিংবা  সামাজিকভাবে অবহেলার শিকার হতে হয় তখন নারী রেগে গিয়ে বলে- “সন্তান নিলে ইত্যাকার কষ্ট সহ্য করতে হয়, অথচ পুরুষকে সেটা করতে হয় না”। কিন্তু এসব কথার অর্থ অনেক সময় এমনটা হয়ে যায় যেনো-“ছেলেরা কেনো গর্ভ ধারণ করে না?”- আর তখন যেনো প্রকৃতির ওপর এক হাত নেয়ার মতো অবস্থা হয়ে যায়। আর এসব প্রশ্নগুলো একটা সময় সেই পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়ায় যখন আমাদের মুখ থেকে বের হয় –“আমি কেনো মেয়ে হলাম”? যেসব উক্তি বের হওয়া ঠিক না। মূলত স্বামীর দিক থেকে অবহেলা, প্রতিষ্ঠিত নারী সংগঠন থেকে শুরু করে সমাজের সব জায়গায় মাতৃত্বকে ছোট করে দেখা এবং নিজেকে নিয়ে আমাদের অবহেলার কারণেই এসব উক্তি কিংবা রাগের বহিঃপ্রকাশ- হয়ে যায়। এটা সত্য, বর্তমান তথাকথিত আধুনিক সমাজে মাতৃত্বকে ছোট করে দেখা হচ্ছে, সন্তানকে বোঝা হিসাবে দেখা হচ্ছে, পরিবারের দিক থেকে সাপোর্ট নেই, স্বামীর দিক থেকে শিশুর দেখভালে সহায়তা নেই আর নারীবাদীরাও মাতৃত্ব নিয়ে কিছু বলেন না। দিন দিন আমাদেরকে আত্মকেন্দ্রিক করে তোলা হচ্ছে। আমরা আগামী প্রজন্ম নিয়ে ভাবছি না। পড়াশুনা শেষ করে একটা চাকরি ধরবো যেন এটাই হয়ে পড়ছে জীবনের লক্ষ্য। বার বার আমাদেরকে বলা হচ্ছে আর্থিক স্বাবলম্বি হওয়ার কথা। নিজের পায়ে দাঁড়ানো কিংবা কারো প্রতি নির্ভরশীল না হওয়া-সেটা তো বুঝলাম। কিন্তু  পুরুষদের আর্থিক দায়িত্বের কথা বলবে কে? শুধু একপক্ষীয় ভাবে নারীদের স্বাবলম্বি হওয়ার কথার ছলে পুরুষদের দায়িত্বকে শিথিল করার পাঁয়তারা চলছে কি?  আজকাল এমনভাবে আর্থনৈতিক মুক্তির কথা বলা হচ্ছে যেনো নিজের আর্থিক দায়িত্ব নেয়ার বোঝা আমাদের নিজেদেরই। উল্লেখ্য, আজকাল আর্থিক সঙ্কটের কারণে নারীরা চাকরি করছে না বরং বিয়ের পরেও অধিকাংশ নারী চাকরি করছে কারণ- সেটা না করলে সমাজে তাদেরকে হেয় করে দেখা হচ্ছে। এদিকে তাদেরকে বুঝানো হচ্ছে- “শিক্ষিত হয়ে তুমি চাকরি করছো না কেনো? সমাজের প্রতি তোমার কি দায়িত্ব নেই? তোমার পড়াকে কাজে লাগাও”। হ্যা, আমি তাদের কথার বিরোধীতা করছি না। সুযোগ হলে কাজে লাগাও, কিন্তু নিজের ওপর বাড়তি চাপ নিয়ে নয় বরং নিজের পড়াশুনার সাথে মিলে যায় এমন কিছু কাজে শখের বশে কিংবা অবসর সময়কে কাজে লাগানোর জন্য। লক্ষ্যণীয়, আজকাল একটা শিক্ষিত মা’কে তার সন্তান পড়ানোর দায়িত্বের কথা কেউ বলে না। তাই দেখা যায়- শিক্ষিত মা’র সন্তানেরা বাইরের প্রাইভেট টিউটরের কাছে পড়ে, অথচ প্রশ্ন হলো – তাদের মা কি পারতো না নিজের সন্তানদের শিক্ষক হতে? আসলে নারীরা এমনটি করছে না, কারণ এমনটি করলে এই সমাজে মূল্য পাওয়া যায় না। এখানে পরিবার তুচ্ছ, বাইরের জগত মুখ্য। আবার অনেক নারীদের মধ্যে এমন ধারণাও আছে বা তাদেরকে এমন ধারণা দেয়া হচ্ছে- “অনার্স, মাস্টার্স করে শুধু শিশুদের পড়ালে, তোমার পড়ার দাম থাকলো কই”? আমি আবারও বলছি সুযোগ পেলে নিজের পরিবারকে সামলে একটা নারী যদি বাইরে সময় দিতে পারে তাহলে ভালো, তবে নিজের ছোট ছোট সন্তানকে পড়ানোর ক্ষেত্রে কখনো হীনমন্যতায় ভোগা উচিত নয় বরং গৌরবের সাথে প্রচার করার উচিত- আমি আমার সন্তানদের শিক্ষিকা। তাছাড়া আপনি যত বেশি শিক্ষিত হবেন, আপনার পড়ানোর স্টাইল অন্য মা’দের থেকে ব্যতিক্রম ও সুন্দর হবে। সুতরাং, মা’দের উচিত নিজের সন্তানকে সময় দেয়া, সুশিক্ষায় শিক্ষিত করা। আর হ্যা, সন্তানের ওপর যে শুধু মা’র দায়িত্ব তা নয়, বরং মা-বাবা উভয়ের উচিত সুষ্ঠভাবে সন্তানকে বেড়ে তোলা। আর যেসব বাবারা সন্তানদের প্রতি কর্তব্য পালন করেন না, তারা মূলত দায়িত্বহীন পুরুষেরই পরিচয় দেন।

এবার চাকরিদাতা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তাকালে আমরা দেখি- ওখানে অবিবাহিত বা সন্তান ছাড়া নারীর মূল্য বেশি। আর তাই এসব কোম্পানীর চাকরিতে যুক্ত থেকে, সমাজে সবার সামনে শিক্ষিত হওয়ার  মূল্য দিতে (তা নাহলে কেউ দাম দিবে না) গিয়ে  অনেক মেয়েরা বছরের পর বছর এসব কোম্পানীতে শ্রম দিয়ে যাচ্ছে। এদিকে তাদের বয়স হয়ে যায়, দিন দিন মানসিক ও দৈহিক চাহিদা ফুরিয়ে যেতে থাকে, কোনো ছেলের বিয়ের প্রস্তাব আসা বন্ধ হয়ে যেতে থাকে, বিপথে পা দেয়ার সম্ভাবনা বাড়তে থাকে, পরবর্তীতে অধিক বয়সে বিয়ে হওয়ার পর সন্তান নিতেও শারিরিক কষ্ট সহ্য করতে হয় মা’কে। তাই আমি মনে করি- আমাদের দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে মেয়েদের কর্মঘন্টায় পরিবর্তন আনা উচিত। যারা আর্থিক প্রয়োজনে বা শখের বসে বা  অবসর সময়কে কাজে লাগাতে চাকরি করতে চায়, তারা বিবাহিত হোক বা অবিবাহিত, সন্তান থাকুক বা না থাকুক সেসব নারীর জন্য বিভিন্ন শিফটে  কর্মসময় তিন বা চার ঘন্টা করা দরকার। এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে- তাহলে তো পুরুষেরা মাসে যত টাকা পাবে- আমরা তার চেয়ে কম পাবো। হ্যা, কম সময়, টাকা কম-তবে তাতে কি? পরিবারের আর্থিক দায়িত্ব তো আমাদের ওপর নয়। নারীর মৌলিক চাহিদা পূর্ণ করার দায়িত্ব পুরুষের। তাছাড়া মাস শেষে একটা পুরুষ, হাত খরচের জন্য তার উপার্জনের ১০শতাংশও যদি স্ত্রীর হাতে দেয়- তাহলে আমার মনে হয় না- সেটা কোনো স্বামীর জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো কত শতাংশ পুরুষ স্ত্রীর হাত খরচের খেয়াল রাখে? এদিকে দিন দিন নারীর ওপর আর্থিক দিক দিয়ে বাড়তি চাপ দেয়া হচ্ছে, অথচ নারীকে তার স্বামীর  উপার্জনে সন্তুষ্ট থাকার কথা বলা হচ্ছে না।  তবে হ্যা,  কোনো নারী যদি একান্তই সন্তুষ্ট থাকতে না পারে, তাহলে সে না হয় কয়েক ঘন্টার জন্য  বাইরে চাকরি করুক। তার উপার্জিত টাকা নিজের একান্ত প্রয়োজনে আর অপচয় না করে বেঁচে যাওয়া টাকাগুলো ভালো কাজে খরচ করুক। এটাই হলো আর্থিক বোঝা না থাকায় নারীদের সুবিধা। উপার্জনের মতো কষ্টকর চিন্তা (যেটা ছেলেদের মাথায় থাকে) সেটা না থাকায়,  মেয়েরা শখের বসে বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজ করার, কিংবা সমাজ নিয়ে চিন্তা করার একটা উন্মুক্ত পরিবেশ পায়। যে বিষয়গুলো নিয়ে মেয়েদের ভাবা উচিত। এদিকে, কর্মঘন্টা কম হলে মেয়েরাই লাভবান হবে- এতে তারা বিয়ের আগে মা-বাবা ও বিয়ের পরে নিজের পরিবারকে সময় দিতে পারবে। সুতরাং সব সময় নারীদের পারিবারিক দায়িত্বকে মূল্য দেয়া উচিত, পরিবারের কথা চিন্তা করে প্রয়োজন হলে চাকরি করা উচিত, তা নাহলে না। আর তাদের প্রতি খেয়াল রাখা উচিত পরিবারের পুরুষদের, তাহলে হয়ত একটা পরিবার থেকে ভালো সন্তানের জন্ম হবে।

তাছাড়া, আজকাল নারীর মাতৃত্বকে পূর্ণ মর্যাদা না দেয়ার কারণেই নারীরা হতাশ হচ্ছে, সন্তান নিতে চাচ্ছে না। তাই তাদেরকে পরকালের শান্তির বার্তা পৌছানোর পাশাপাশি আমাদের উচিত পার্থিব স্বীকৃতি দেয়া। একটা বিষয় লক্ষ্য করে দেখুন- যখন আমরা মাতৃগর্ভ থেকে এই পৃথিবীতে আসি, সেই সময়ে আমরা কোথায় আছি- সেই জ্ঞানটাও থাকে না, কান্না ছাড়া কিছুই করতে পারি না, বলতে পারি না, চলতে পারি না- সেই সময় আমাদের মা আমাদের সব প্রয়োজন পূর্ন করে, কষ্ট সহ্য করে, রাতের পর রাত জেগে যেভাবে লালন-পালন করেছেন- সেটার প্রতিদান হয়ত সারা জীবন মা’কে কাঁধে নিয়ে ঘুরলেও শোধ হবে না। মা’র মর্যাদা হয়ত পৃথিবীর কোনো কিছু দিয়েই মূল্যায়ন করা যাবে না, তাই আল্লাহও মা’কে দিয়েছেন পরকালীন এমন মর্যাদা যেটা উপলব্ধির বিষয়- তাদের জন্য যারা চিন্তা করে। মা’র পায়ের নিচে সন্তানের জন্নাত রেখেছেন- সেটার অর্থই হলো যাতে আমরা মা’র সাথে ভালো ব্যবহার করি। পৃথিবীতে হক আদায়ের ক্ষেত্রে বাবার চেয়ে মা’ কে তিন গুণ মর্যাদা দেয়া হয়েছে- কারণ মা শিশুকে গর্ভে ধারণ করে, বাবা নয়-তাই যারা বলেন- ‘ছেলেদের তো সেই কষ্ট সহ্য করতে হয় না’। দেখুন ছেলেদের সেই কষ্ট সহ্য করতে হয় না বলেই আল্লাহ কিভাবে সমতা করেছেন! কষ্ট আপনি সহ্য করছেন বলেই সেই কষ্টের জন্য আপনাকে আল্লাহ পুরুষের চেয়ে অধিক মূল্য দিয়েছেন। তাই কেউ কি কল্পনা করতে পারে- সেই আল্লাহ প্রদত্ত মর্যাদার মহত্ত্বের কথা? না, আজ আমরা সন্তানেরা এবং মা’রা সেই মর্যাদার মহিমা বুঝছে না। আজ অভিভাবক থেকে শুধু করে সন্তানরা যদি এই মর্যাদা বুঝতো- তাহলে শিশুর প্রতি অবহেলা না করে, তাকে বোতলজাত দুধ না খাইয়ে, সুষ্ঠভাবে লালন পালন করে বড় করতো। আর সন্তানেরাও  অভিভাবকদের প্রতি দায়িত্ব পালন করতো যেমনটি আল্লাহ তা’য়ালা কু’রআনে বলেছেন-

“আর আমি মানুষকে তার পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহারের জোর নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট করে গর্ভে ধারণ করেছে। তার দুধ ছাড়ানো দুই বছরে হয়। নির্দেশ দিয়েছি যে, আমার প্রতি ও তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। অবশেষে আমার নিকটই ফিরে আসতে হবে” (সূরা লুকমান, আয়াত-১৪)

সুতরাং, আগামীতে সন্তানরা যখন অভিভাবকদের কষ্টের স্বীকৃতি দিবে- তখন মা-বাবারাও সন্তানকে নিয়ে গর্ব করতে পারবে। আর বলবে- আমরা এমন সন্তানদের পৃথিবীতে রেখে যাচ্ছি যারা সত্যের প্রতিনিধিত্ব করবে, সুন্দর জাতি গড়বে। সুতরাং তেমন জাতি গঠনে বর্তমান মা-বাবা আর আগামীতে যারা বা-বাবা হবেন- তাদেরকে এখন থেকেই চিন্তা করা উচিত।

মাতৃদুদ্ধ পান করানো নিয়ে লেখাটা শুরু করে যৌক্তিক কারণেই নারীদের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করতে হলো। তবে মাতৃদুদ্ধের প্রয়োজনীয়তার প্রসার ঘটনার জন্য ব্র্যাক এনজিওকে ধন্যবাদ জানাতে হয়। বিভিন্ন জেলায় তারা ক্যাম্পিং করে মহিলাদেরকে তারা এ বিষয়ে সজাগ করছে, তবে পুরো বাংলাদেশের দায়িত্ব কি তাদের ওপর?  বরং তাদের কাছ থেকে এখন আমাদের শিখা উচিত। মাতৃত্বের  আধ্যাত্মিক স্বীকৃতির প্রচারণা সহ এবার আমাদের জাগতিক স্বীকৃতি দানের কথা  ভাবতে হবে। মাতৃদুগ্ধ থেকে শুধু করে শিশু লালন পালন, সুষ্ঠ মাতৃত্ব-পিতৃত্বের পাশাপাশি  পরিবারের প্রত্যেক চরিত্র যাতে তাদের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করে, তাই তাদেরকে দায়িত্ব জ্ঞান দিতে হবে, লেখালেখি, সেমিনার, আলোচনা সভা, ক্যাম্পিং কিংবা প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে হবে। যাতে মানুষ পরিবারকে গুরুত্ব দিতে শিখে। তা নাহলে হয়ত ডে-কেয়ার’ হবে সন্তানের জায়গা আর পরবর্তীতে বৃদ্ধাশ্রম হবে বৃদ্ধ মা-বাবাদের ঠিকানা।

Leave a Reply