জনাব গণতন্ত্র সাহেব কেমন আছেন।

এক)
৫ জানুয়ারী। সাল বা সন বলার কোন প্রয়োজন নেই। জনাব গণতন্ত্র সাহেবের ইন্তিকালের দিন। এই দিন বিনা চিকিৎসায় – অনাদর আর অপমানে আপন গৃহে মারা গেলেন মহান গণতন্ত্র। এক বছর পর আবার সেই দিন আসলো।
১৯৭১ সালে পাওয়া সাধের পাওয়া গণতন্ত্র। জনাব গণতন্ত্রকে কাছে পাওয়ার জন্য অনেক মূল্য দিতে হয়েছে। মূল্য দিতে হয়েছে তার ভক্তদের, হারাতে হয়েছে অনেক কিছু।
১৯৭২ এর ১০ জানুয়ারী থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত জনাব গণতন্ত্রকে হত্যা করে এক কাপড়ে কবর দেবার সকল আয়োজন করা হয়েছিল। চেষ্টার কমতি করা হয়নি। মুজিবাদ নামক এক দানব তৈরী করা হয়েছিল। যাকে আদর করে নাম রাখা হয়েছিল ‘বাকশাল’।
মহান গণতন্ত্র হত্যাকারীদেরকে এক রাতে চলে যেতে হল নিজেদের তৈরী করা কবরে। এটা ছিল তখনকার বাস্তবতার দাবী। তখকার সাত কোটি বাংলাদেশীদের প্রত্যাশা ছিল এমনই। তাই দেখা যায় গণতন্ত্র নামক পিতার বড় সন্তান নিহত হলে ৫৬ হাজার বর্গমাইলে কোথাও কোন প্রতিবাদ মিছিল হয়নি। কেউ আহাজারী করেনি।
কারন ছিল স্পষ্ট –
মহান গণতন্ত্রকে ব্যবহার করে যিনি গণতন্ত্র রক্ষার ওয়াদা করেছিলেন জাতির কাছে – তিনি নিজেই গণতন্ত্রকে গলাটিপে হত্যা করার জন্য বাকশাল নামক অভিশাপ চাপিয়ে দিয়েছিলেন।ফলাফল হয়েছিল – যা হবার তাই। বড় মিয়াকে গণতন্ত্রের মানসপুত্রদের হাতেই নিহত হতে হল। গণতন্ত্র মুক্তি পেল, গণতন্ত্রের হাত ধরলেন বড় মিয়ার বালেগ সন্তানরা।
দুই)
হাত ভাঙ্গা, মাঝা ভাঙ্গা অবস্থায় চলছিল আমাদের গণতন্ত্র। প্রিয় গণতন্ত্রকে ভাল করে শক্তিশালী করার জন্য অনেক কিছু করা হল। আমাদের জীবনে আসলো অনেক ঘটনা। উপ ঘটনার জন্ম হল অনেক। ১৯৯০ সালে জনাব গণতন্ত্রকে বিশ্ববেহায়া থেকে মুক্তি করা হল। শুরু হল নতুন করে জনাব গণতন্ত্র সাহেবের পথচলা।
আগামীতে কেউ যেন নির্বাচনের মাধ্যমে জনাব গণতন্ত্রকে বাইপাস / হাইজ্যাক না করতে পারেন তার জন্য কেয়ারটেকার সরকারের রূপরেখা দেয়া হল। নাম করা এক অধ্যাপক যিনি ভাষা আন্দোলনের সৈনিক ছিলেন। আবার তিনি ডাকসুর জিএস ও ছিলেন। সবাই মিলে জনাব গণতন্ত্রকে সহী সালামত রাখার জন্য আন্দোলন করলেন। এই সময় হরতাল হল ২৩৪টি। জনাব গনতন্ত্রকে টিকসই করার জন্য আন্দোলনের মহাযজ্ঞ পরিচালনা হল। তখন সঙ্গী ছিল আজকের জঙ্গীরা। ৭১ এর চেতনার এজেন্ট সম্প্রদায় সবাই এক কাতারে ছিলেন। তখন চেতনার ব্যবসায়ীদের রাজপথের সঙ্গী ছিল আজকের জঙ্গী জামায়াত।
২১ বছর পর ক্ষমতায় যাবার জন্য প্রকাশ্যে মাফ চাওয়ার দৃশ্য ছিল গণতন্ত্রের জন্য। মাথায় পট্রি – মোনাজাতরত ছবি – ধর্মকে ব্যবহার করা ছিল গণতন্ত্র। তারপর গণতন্ত্রকে যাত্রা করতে হল পিছনে।গণতন্ত্রের বড় মিয়াকে প্রতিষ্ঠা করার সময়। ঐ সময় নামকরণ করণের মহা আযাব থেকে পাবলিক টয়লেট শুধু বাদ পড়ে। চরম নিন্দিত,গণতন্ত্রের দুশমনকে ঐ সময় গণতন্ত্রের ত্রাতা হিসাবে প্রতিষ্ঠার কসরত করা হয়। অবশ্য সংবিধানে কিছুটা তালি দেয়া হয়। ৭৫ উত্তর প্রজন্ম নতুন এক গণতন্ত্রকে দেখতে পায়।
তিন)
৬০ জনের মধ্যে দুই জন। ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত গণতন্ত্র সাহেব চলছিলেন জাতীয়তাবাদি আর ইসলাম পন্থীদের হাত ধরে। হঠাৎ করে কিছু গণতন্ত্রের মানসপুত্রদের আগমন হল বাংলার আকাশে, যারা নিজেদেরকে পরিচয় দিতেন সুশীল নামে। তাদের জন্য ভাড়া করা হল কম হাইটের একজন জেনারেলকে, গঠিত হল উদ্দিনদের সরকার। দেশের সুশীল সমিতির সভাপতি জনাব রেহমান সোবহান নামকরণ করলেন ‘হাইফেন সরকার’। কেউ তাদেরকে বলল – আইএমএফ সরকার।
রক্ষী বাহিনীর বাছাই করা জেনারেল মঈন – জনাব গণতন্ত্রকে উদ্ধার করতে ক্রেইন নিয়ে হাজির হলেন। লাইনচ্যুত গণতন্ত্রকে দুই বছর লালন পালন করলেন। ১৪ কোটি মানুষের পয়সায় লালিত পালিত সেনাবাহিনী জাতিসংঘের এক আন্ডার সেক্রেটারীর পত্রে কুপোকাত হয়ে গেলেন। যাদের পয়সায় আর যাদের জন্য পাহারাদার নিযুক্ত হযেছিল -সেই বাহিনী তাদের বিরুদ্ধে দাড়াঁলো। ভারতের ঘোড়া উপহার আর বস্তাভরা অর্থ নিয়ে জনাব গণতন্ত্রের খাদেম হাইফেন সরকার চুক্তি করলো সেই বাকশালীদের উত্তরসুরীদের সাথে। অবশ্য এ ছাড়া কোন উপায় ছিল না।
১৪টি মামলার আসামী বাকশাল নেত্রী বাম কানের চিকিৎসা করার জন্য গণতন্ত্রের মায়া ছেড়ে বিদেশে চলে গেলেন। মিডিয়ার কল্যাণে বুঝা গেল! ডান না বাম কানের চিকিৎসা করতে গিয়েছিলেন প্যারোলে মুক্তির ছাড়পত্র নিয়ে। তারপর সাজানো গোছানো নির্বাচন। গণতন্ত্রের জন্য বাংলার মানুষ এত পাগল হল – কোথাও তারা ভোট দিলেন ৮০% কোথাও পড়ল ৯০%। আবার কোথাও ভোট পড়ল ১০৫%। গণতন্ত্র মুক্তি পেল বিজি প্রেসে ছাপানো ব্যালেট পেপারে। বেহুদা নির্বাচন কমিশনার সাহেব যেহেতু সুশীল বান্ধব ছিলেন তাই তাকে জনাব গণতন্ত্র সাহেবের কাছে দাঁড়াতে হল না। এখন সেই ডাক্তার হুদা সাহেব টিআইবির মত সুশীল প্রতিষ্ঠানের বড় নেতা। গণতন্ত্রের জয় হল। আবার গণতন্ত্র পিছনে যেতে হল। কারণ – গণতন্ত্র প্রথম নয় – প্রথম হল একটি পরিবার – একজন মানুষ – একটি দেশের আনুগত্য – এগুলো প্রথম। শুরু হল নতুন যাত্রা। যাত্রা পথে ডর ভয় যেন না থাকে তাই প্রয়োজন জনাব গণতন্ত্রকে চিকিৎসা করা।
চার)
২০০৮ সালের নির্বাচনের পর থেকে শুরু হল গনতন্ত্র সাহেবের উত্তম চিকিৎসা। ১৪ টি দুর্নীতি মামলার আসামী হয়ে গেলেন দেশের প্রধানমন্ত্রী। তিনি নিজেই দায়িত্ব নিলেন জনাব গণতন্ত্রকে পরিচর্যা করার। এ পর্যন্ত বেচারা গনতন্ত্রকে কথিত গনতন্ত্রের মানসকন্যার খেদমতের উদাহরন।
এক) মহান গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবার জন্য সেইফগার্ড সেনাবাহিনীর ৫৭ জন অফিসারকে জীবন দিতে হয়েছে। এটা ছিল চার তারকা জেনারেল মঈন উদ্দিনের শেষ কর্ম। এভাবে তিনি গণতন্ত্রকে বাকশালী বগির সাথে জুড়ে দেন।
দুই) গনতন্ত্রকে মজবুত করার জন্য আদালতের বিচারক হিসাবে নিয়োগ দেয়া হয় – খুনের মামলার আসামী, আদালত পাড়ায় মাস্তান হিসাবে পরিচিত সব মহান গণতন্ত্রের মানসপুত্রদের। গত তিনশত বছরের ইতিহাসে এত বিচারপতি নিয়োগ দেয়া হয়নি। গুম, হত্যা আর রিমান্ডের গনতান্ত্রিক সাংস্কৃতি চালু হল। আদালতের চেয়ারে বসে ইতিহাস চর্চার সিদ্ধান্ত দেয়া শুরু হল। মান সম্মান যায় – আদালতের এখতিয়ারে নয় এমন সব বিষয়ে ও মহান আদালত থেকে রায় আসা শুরু হল।
তিন) গণতন্ত্রকে ডিজিটাল গণতন্ত্র করার জন্য সংবিধান সংশোধন করা প্রয়োজন হল। মহড়া চলল গণতন্ত্র আর গণতন্ত্রের। আমাদের গণতন্ত্রের বড় মিয়া শেখ মুজিব সাহেবের সকল প্রকার হাসি, কান্না, ভেংচি সবই সংবিধানের অর্ন্তুভুক্ত করা হল। বাদ পড়লো কেয়ারটেকার পদ্ধতি। এতিমের ফান্ড খাওয়া বিচারপতি রায় দেবার ১৬ মাস পর আবার নতুন করে ফরমায়েসি রায় লিখলেন। গণতন্ত্রকে তিনি একেবারে এনালগ থেকে ডিজিটাল করে দিলেন। বর্তমানে তিনি আইন কমিশনের চেয়ারম্যান। জেনারেল মঈনের মতই তিনি জেনারেল বিচারপতি। নাম তার খায়রুল হক। তার হাত ধরে ই-গণতন্ত্র নামক ডিজিটাল বাকশালের জন্ম হল আদালত পাড়ায়। ৬৯ এর নেতা তোফায়েল সাহেবের ভাষায় – মানসিক বিকারগ্রস্থ চৌধুরীর ছেলে মানিক সাহেব এখন প্রধান বিচারপতি হতে যাচ্ছেন। গণতন্ত্রের বলা যায় এটা ডিজিটাল বিজয়
চার) গণতন্ত্রকে প্রগতিশীল করতে গিয়ে সকল প্রকার নৈতিকতার শিক্ষা থেকে মাহরুম করা হয়। শিক্ষা ব্যবস্থার দায়িত্ব নাস্তিকদের হাতে ছেড়ে দেয়া হয়। এখন পাঠশালা পার করে পড়তে হয় কিভাবে প্রেম করতে হয়। নিরাপদ সম্পর্ক স্থাপনের জন্য অনেক শিখতে হয়। রাজনৈতিক অঙ্গনে যারা নীতির রাজনীতি করতেন, যারা বাংলাদেশের জন্য রাজনীতি করেতেন, যারা দুর্নিতিমুক্ত রাজনীতি চর্চা করতেন- তাদের সবাইকে আদালতের মাধ্যমে কারারুদ্ধ করা হয়েছে। ৬ কিলোমিটার দুর থেকে দেখা সাক্ষ্যদাতাদের সাক্ষীতে ফাঁসির আদেশ দেয়া হচ্ছে।
৫ তারিখ গণতন্ত্র মুক্তি দিবস। তিনবারের প্রধানমন্ত্রী তার অফিসে বন্দী। রাজধানী সহ দেশের মহানগর এলাকায় ১৪৪ ধারা। গণতন্ত্রকে মুক্তি দিতেই এত আয়োজন।বালির ট্রাক,পেপার স্প্রে হল সঙ্গী জনাব গণতন্ত্রের।
দুর্যোগ কমানোর দায়িত্বে মন্ত্রী বলেছেন – ৫ তারিখ বালির ট্রাক গিয়েছে মেরামত করার জন্য। গণতন্ত্রের মানসকন্যার সুযোগ্য মানসপুত্র।
প্রস্তাব।
এ বছর ভাষার মাস ফ্রেব্রুয়ারীতে বাংলা ডিকশনারী থেকে অসত্য,মিথ্যা,অসভ্য যত শব্দ আছে সেগুলো বাদ দেয়ার পরিকল্পনা নেয়া উচিত। নতুবা আগামী প্রজন্ম আমাদের গণতন্ত্রের মনসকন্যা সম্পর্কে ভুল ধারণা নেবে। মিথ্যার সাথে যাদের প্রতিদিন তাদের সাথে জনাব গণতন্ত্র কেমন আছেন – তা বছরের প্রথম মাসের ৫ তারিখ একটা হিসাব নিকাশ করা যাবে।
আমরা জনাব গণতন্ত্র সাহেবের জন্য সাহয্যের আবেদন করছি। আবেদন করছি তাকে রক্ষা করার। নতুন ডিজিটাল বাকশালী ফ্যাসিষ্টদের হাত থেকে। নতুবা তিনি চিরদিনের জন্য বিদায় নিবেন।
ওম শান্তি – ওম শান্তি। ওম শান্তি – ওম শান্তি।

Leave a Reply