বাংলায় মুসলিম সমাজের গঠন প্রক্রিয়া: ইসলাম থেকে বিচ্যূতির দুঃখজনক সূচনা

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের একজন সিনিয়র প্রফেসরের (দক্ষিণ এশিয়ান ইতিহাসে বিশেষজ্ঞ) সঙ্গে কথা হচ্ছিল, বাংলার মুসলিম সমাজের গঠন নিয়ে। আলোচনা গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছিল। হঠাৎ করেই কথা উঠল, বাংলার মুসলমানরা কি কখনোই ইসলামকে ইসলামের রূপে বুঝার চেষ্টা করেছে? ইসলামকে ইসলামের মতো করে গ্রহন করেছে? যুক্তি তর্কের এক পর্যায়ে আলোচনা চলে গেল অনেকটা দূরে। স্যারের সঙ্গে আলোচনায় একটা বিষয়ে একমত হতে পারলাম, উত্তর ভারতের সঙ্গে বাংলার যে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ছিল, তা পরবর্তীতে বাংলায় প্রকৃত মুসলিম সমাজ গঠন প্রক্রিয়ায় বড় ধরণের বাধা হয়ে উঠে। এই প্রবন্ধটা কোন গবেষণা প্রবন্ধ নয়। একটা হাইপোথিসিস বলা যায়।

রাসুলুল্লাহ স. কিংবা খোলাফায়ে রাশিদিনের সময় যুদ্ধগুলোতে মুসলিম সেনাদলের সঙ্গে প্রচুর পরিমাণে মুবাল্লিাগ থাকতেন। তারা কোন অঞ্চল জয়ের সঙ্গে সঙ্গেই সেই এলাকায় ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার জন্য ছড়িয়ে পরতেন। এভাবে নও মুসলিমদের টেনিং দিয়ে ‌’প্র্যাকটিসিং’ মুসলিম হিসেবে গড়ে তুলতেন। এই ধারায় পরবর্তীতে ভিন্নতা আসে। বিশেষ করে উপমহাদেশের ক্ষেত্রে এই চিত্রটা পুরোপুরিই বদলে যায়। এখানে একজন সৈনিককেই নও মুসলিমদের ট্রেনিং দেওয়ার দায়িত্ব পালন করতে হতো। কখনো কখনো এই দায়িত্ব তারা যথাযথ পালনও করেছেন। আবার কখনো পালন করতে ব্যর্থ হয়েছেন। ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যান্য অঞ্চল সম্পর্কে একথা বলা যায়, আরবে যে ইসলামের আবির্ভাব হয়েছিল, তা তুর্কী এবং পারসিয়ানদের মাধ্যমে ভারতীয় উপমহাদেশে পৌঁছেছিল। এর মধ্যে অনেক পারসিয়ান সংস্কৃতির মিশ্রণ থাকলেও প্রকৃত ইসলামের আহবান অন্তত উত্তর ভারত পর্যন্ত পৌঁছেছিল। এর কারণ ছিল, সাহাবাদের আমল থেকেই আরব সাগর দিয়ে আরবীদের ব্যবসায়িক অভিযাত্রা। মালাবার এলাকায় প্রচুর মুসলমান ছিল। এ কারণে, ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যান্য অঞ্চল (বাংলা ছাড়া) প্রকৃত ইসলামের দাওয়াত থেকে বঞ্চিত হয়নি। বাংলার ক্ষেত্রে যে ঘটনাটা ঘটেছে তা ছিল পুরোপুরিই রাজনৈতিক ঘটনার ফল।

উত্তর ভারতের সঙ্গে বাংলার সম্পর্ক খারাপ হতে থাকে চৌদ্দ শতকে। বিশেষ করে স্বাধীন সালতানাত হিসেবে ইলিয়াস শাহী বংশের গোড়াপত্তনের পর। হোসেনশাহী বংশের আমলে দিল্লি সালতানাতের সঙ্গে সম্পর্ক বলতে গেলে একেবারেই শেষ হয়ে যায়। স্বাধীন সালতানাত প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর উপমহাদেশের ‌’ইসলামী কেন্দ্র’ দিল্লির ছায়া থেকে বেরিয়ে আসে বাংলা। এর ফলে বাংলার মুসলমানদের আধ্যাত্বিক শিক্ষায় ভাটা পড়ে। এর মধ্যে প্রবেশ করে স্থানীয় অসংখ্য কৃসংস্কার। আরবী এবং ফার্সি ভাষার গুরুত্ব কমে যায়। বাংলা ভাষার গুরুত্ব বেড়ে যায়। ঘটনাটা যে এমন ছিল, তা বাংলা সাহিত্যের কথিত ‌’অন্ধকার যুগ’ নিরসনে বাংলা সালতানাতের ভূমিকার কথা পরলেই বুঝা যায়। রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে বাংলার বিকাশ সাধিত হয়েছিল সেসময়। এটা বাংলা সাহিত্যের জন্য শুভকর হলেও আরবী এবং ফার্সি (যা মূলত মুসলমানদের প্রকৃত ইসলাম জানার মাধ্যম ছিল) ভাষার জন্য ছিল অশনি সঙ্কেত। তবে এটা মানতে হবে, তখনো রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদায় অভিষিক্ত ছিল ফার্সিই। কিন্তু আম জনতার মধ্যে এই ভাষা দুটির গুরুত্ব চরমভাবে কমে যায়।

দিল্লি সালতানাতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে ইসলামী ছত্র ছায়ার বাইরে স্বাধীন এসব সুলতানরা নিজেদের ইচ্ছেমতো কাজ করেছেন। রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলামকে আর পালন করার কথা তেমনভাবে সামনে আসেনি। এর মধ্যে নতুন নতুন যেসব জনগোষ্ঠী ইসলামে প্রবেশ করছিল তাদের জন্যও রাষ্ট্রীয় কোন কর্মসূচী ছিল না। অবশ্য ব্যক্তিগতভাবে অনেক শায়েখরাই ইসলাম প্রচারের চেষ্টা করেছেন। তবে এর মধ্যেও ভ্রান্ত মত ও পথের কমতি ছিল ণা। মওলানা আকরম খাঁর ‘মোছলেম বঙ্গের সামাজিক ইতিহাস’ বইটা পরলে এসব বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠে। কিভাবে মুসলিম সংস্কৃতিতে হিন্দু সংস্কৃতি প্রবেশ করল। বাংলায় যেমন হিন্দু এবং যোগীদের দর্শন মুসলমানরা গ্রহন করেছে ভারতীয় উপমহাদেশের আর কোথাও এমনটা নাই। অন্তত এতটা তীব্র তো নয়ই।

বাংলায় যে মুসলিম সমাজ গঠিত হয়েছে, তা কখনোই ইসলামের পূর্ণ রূপটা অনুধাবন করতে পারেনি। বিচ্ছিন্নভাবে যে সকল মুবাল্লেগ বাংলায় কাজ করেছেন পরবর্তীতে তাদের উপরও একরকম হিন্দু ধর্মের মত ‘দেবত্ব’ আরোপ করা হয়েছিল।

বাংলার মুসলিম সমাজের গঠন নিয়ে কাজ না করে এখান কার মুসলমানদের জন্য কোন কার্যকর পদ্ধতি উপস্থাপন করা সম্ভব নয়। আগে বুঝতে হবে এখানকার মুসলমানদের মন শত শত বছর ধরে ভুলকেই সত্য জেনে এসেছে। কিছুটা ব্যতিক্রম বাদ দিলে পুরো সমাজের ক্ষেত্রেই বিষয়টা সত্য। এই বিষয়টা নিয়ে সিরিয়াস স্টাডির প্রয়োজন রয়েছে।

Leave a Reply