গল্প থেকে পাওয়া

চট্টগ্রামে গিয়েছিলাম অফিশিয়াল কাজে। কিন্তু আমার চট্টগ্রাম যাওয়া মানেই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া। সেখানে গিয়ে মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক স্যারের সঙ্গে কিছু সময় কাটানো। এবার ঈদের পর যখন গেলাম, বৃষ্টির অঝোর ধারা থামতেই চাইছিলো না। বৃষ্টিকে উপেক্ষ করেই বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছলাম। আর নতুন কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা আমাকে দিলো সামনে এগুবার পাথেয়। এটাকে একধরণের রিচার্জ হওয়াও বলা যায়।
আলাপ হচ্ছিল, নানান বিষয় নিয়ে। এরমধ্যে স্মৃতির পাতায় যতোটা টিকে আছে আমি কেবল ততোটুকুই কলমি ভাষায় বলতে পারি।

ঈমানদার ব্যক্তি এবং শয়তানের তৎপরতা

সুরা আনফালের দ্বিতীয় আয়াতে আল্লাহ বলেছেন,
সাচ্চা ঈমানদার তো তারাই, আল্লাহকে স্মরণ করা হলে যাদের হৃদয় কেঁপে ওঠে। আর আল্লাহর আয়াত যখন তাদের সামনে পড়া হয়, তাদের ঈমান বেড়ে যায় এবং তারা নিজেদের রবের ওপর ভরসা করে।

একজন ঈমানদার কেমন হবে, এই আয়াত তার একটা চিত্র তুলে ধরে। আল্লাহর ভয়ে কখন মানুষ কেঁপে উঠে! একজন মানুষ যখন মহান রাব্বুল ইজ্জতের মহান সত্বা সম্পর্কে ধারণা লাভ করে, তার অসীম শক্তি সম্পর্কে খানিকটা বুঝতে পারে, নিজের অসহায়ত্ব আর আল্লাহর প্রতি নির্ভরতা সম্পর্কে জানতে পারে, জানতে পারে পরকালে সেই সত্বার মুখোমুখি তাকে হতে হবে যিনি তাকে সৃষ্টি করেছেন, সৃষ্টি করেছেন এ মহাবিশ্ব, কেবল জানাই শেষ কথা নয়, এই বিষয়গুলোকে যে অন্তর দিয়ে অনুধাবন করতে পারে কেবল তার অন্তরই আল্লাহর স্মরণে কেঁপে উঠে।
স্যারের সঙ্গে আয়াতটা নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। এই আয়াতের আলোচনার মধ্যেই শুরু হয়, শয়তানের ধোঁকায় পড়ার বিষয়টা। একজন মানুষ যত বড় আলেমই হোক না কেন, সে শয়তানের ধোঁকা থেকে বাঁচার জন্য নিজের জ্ঞানের উপর কখনোই নির্ভর করতে পারে না। কেবলমাত্র আল্লাহর উপর পূর্ণাঙ্গ আস্থাই একজন মানুষকে শয়তানের ধোঁকা থেকে বাঁচতে পারে। কারণ, শয়তানের চেয়ে বেশি জ্ঞান অর্জন কীভাবে সম্ভব হতে পারে! সে তো আল্লাহ, জান্নাত আর জাহান্নাম সম্পর্কে পৃথিবীর যে কোনো সাধারণ মানুষের চেয়ে বেশি জানে। শয়তানকে সকল ক্ষমতা দেওয়ার পরও আল্লাহ কিন্তু বলেছেন,

অবশ্যি যারা আমার প্রকৃত বান্দা হবে তাদের ওপর তোমার (শয়তান) কোন জোর খাটবে না। তোমার জোর খাটবে শুধুমাত্র এমন বিপথগামীদের ওপর যারা তোমার অনুসরণ করবে। সূরা হিজর. আয়াত ৪২

আল্লাহ আরও বলেছেন,
যারা ঈমান আনে এবং নিজেদের রবের প্রতি আস্থা রাখে তাদের ওপর তার (শয়তান) কোন আধিপত্য নেই। সূরা নাহল, আয়াত ৯৯

এ আয়াত গুলোতে আল্লাহ সরাসরিই শয়তানের তৎপরতা থেকে প্রকৃত ঈমানদার বান্দা যারা আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা রাখে তাদেরকে মুক্ত ঘোষণা করেছেন।

আল্লাহ ঈমানদারের আরো অনেক গুণের কথা উল্লেখ করেছেন কুরাআনুল কারীমে। এরমধ্যে সুরা মুমিনুনের প্রথম কয়েকটা আয়াতের কথা উল্লেখ করা যায়। এসব গুণাবলী একজন ঈমানদার যখন অর্জন করবে কেবল তখনই সে আনুগত্যকারী (মুসলিম) হতে পারে।

দায়ীর প্রয়োজনীয়তা এবং তার বৈশিষ্ট্য
বর্তমান সময়ে দায়ীর প্রয়োজনীয়তা নিয়েও অনেকটা সময় আলোচনা হলো। বাংলাদেশে উপযুক্ত দায়ীর বড় অভাব। ইসলামী সংগঠনগুলো যেসব নেতৃত্ব সমাজের উপর চাপিয়ে দিচ্ছে নিজস্ব নীতিমালার আলোকে তা কতোট যৌক্তিক? প্রশ্নটা নিয়ে বেশ খানিকটা সময় আলোচনা হলো।
নেতা কেবল তিনিই হতে পারেন যাকে জনগণ পছন্দ করবে। যার পিছনে কাতারবন্দী হয়ে কেবল নামাজ পড়াই নয়, কাতারবন্দী হয়ে সমাজের কল্যাণের জন্য যে কোনো কাজ করতে সোৎসাহে এগিয়ে আসবে। এমন নেতাই কেবল প্রকৃত দায়ীর ভূমিকা পালন করতে পারেন। দায়ীর বৈশিষ্ট্য কী কী থাকতে হবে! প্রথমত, তাকে অবশ্যই একজন চরিত্রবান হতে হবে। যাকে সমাজের সকল শ্রেণীর মানুষ যে কোনো কাজে বিশ্বাস করবে। তাকে হতে হবে একজন প্রকৃত মুসলমান। অন্তত পক্ষে কুরআন-হাদীসের আলোকে যে কোনো বিষয়ে ব্যাখ্যা দেওয়ার ক্ষমতা তার থাকতে হবে। একজন দায়ী হবে সাধারণ মানুষের জন্য আনন্দের। যখন মানুষ তাকে দেখতে হাসিমুখে স্বাগত জানাবে। যখন তার কাছ থেকে দূরে সরে যাবে তার মন খারাপ হবে। আর চাপিয়ে দেওয়ার দায়ীর ক্ষেত্রে পুরো উল্টো চিত্রই চোখে পরে। এ নিয়ে বেশ কয়েকটা উদাহরণও আমাদের সামনে এসেছে। কিন্তু সেগুলো আর উল্লেখ করলাম না।

মুসলিমদের মধ্যে ঐক্যপ্রচেষ্টা
মুসলমানদের মধ্যে মত-পথের ভিন্নতা নিয়ে আলোচনা হলো। এক্ষেত্রে উঠে এলো শাহ ওয়ালীউল্লাহ রহ. এর কথাও। তার ‘আল ইনসাফ ফী বয়ানি আসবাবিল ইখতিলাফ’ নামক মূল্যবান বইটি নিয়েও আলোচনা হলো। মতবিরোধ বর্তমানে তো থাকবেই রাসুল স. এর জীবীতাবস্থায় সাহাবাদের কোনো সমস্যা হয়নি। কারণ, যে কোনো বিষয় তারা রাসুলের কাছে জেনে নিয়েছেন। এমনকি রাসুল যা করেছেন, যেভাবে করেছেন বিনাবাক্য ব্যয়ে ঠিক সেভাবেই সাহাবারা তা করেছেন। কিন্তু রাসুলের (স.) ইন্তেকালের পরই সমস্যার শুরু। সাহাবাদের মধ্যে অনেকেই অনেক হাদীস জানতেন না। এ কারণে, ইজতিহাদ করার সময় মাঝে মধ্যেই তাদের ভুল হয়েছে। আবার সেই ভুল তারা সত্যিটা জানার সঙ্গে সঙ্গেই শোধরে নিয়েছেন। এসব কথা আলোচনা করেছেন শাহ ওয়ালীউল্লাহ রহ.। তাহলে সাহাবারা এবং পরবর্তীতে তাবেয়ী ও তাবে তাবেয়ীগণ কীভাবে নিজেদের মধ্যে মতবিরোধ দূর করেছেন! এ ব্যাপারে তারা প্রথমেই কুরআনুল কারীমের দিকে দৃষ্টি দিয়েছেন। এরপর সহীহ হাদীসের দিকে। এরপর উম্মাতে মুহাম্মদীর ইজমার দিকে। বিভিন্ন সাহাবাদের দেওয়া মামলা-মোকদ্দমার রায় থেকেও নিজেদের মতের সমর্থন খুঁজেছেন। এভাবেই সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করেছেন। মুসলমানদের মধ্যে মৌলিক বিষয়াদি ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে মতবিরোধ হওয়াটা খারাপ নয়। যেমন আল ফারাবীর সমালোচকের অভাব নেই। কিন্তু তিনি ভুল করেছিলেন (যদি করে থাকেন) বলেই অন্যরা সঠিক করার সুযোগ পেয়েছিলো।

বর্তমানের মতবিরোধ নিরসনের উপায় নিয়ে যে আলোচনা হলো তা ছিলো: আমাদেরকে সাধারণ বিষয়গুলোর দিকে মনোযোগী হতে হবে। যেমন, আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা, রাসুল স. এবং কুরআনের উপর অটল থাকার ব্যাপারে পৃথিবীর সকল মুসলমানই একমত। এভাবে সাধারণ বিষয়গুলোকে সামনে এনে বিতর্কের বিষয়গুলোকে যতোটা সম্ভব এড়িয়ে যেতে হবে। তবে ইসলামের মৌলিক শিক্ষার ব্যাপারে কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না। এক্ষেত্রে মতপার্থক্য মেনে নিলে তো ঈমানি শর্তই পূরণ হবে না।

স্কলারদের স্বীকৃতিদান;
বিষয়টা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হলো। মুসলমানদের মধ্যে একধরণের ইসলামভীতি রয়েছে। রয়েছে হীনমন্যতাবোধও। এটাকে দূর করতে হবে। এক্ষেতে ইসলাম সম্পর্কে একটা সুস্পষ্ট ধারণা জনমণে দিতে হবে। এজন্য প্রয়োজন হবে একদল মুবাল্লেগের। মুসলমানদের মধ্যে হীনমন্যতার সৃষ্টি কেন হয়েছে, এই নিয়েও বেশ কিছু আলাপ হয়েছে। যেমন স্কলারদের স্বীকৃতি না দেওয়ার বিষয়টা মুসলিম সমাজে ব্যধির মতো দাঁড়িয়ে গেছে। ওমুকের সাহিত্য পড়া যাবে না। ওমুক ভুল বলে। ওমুক তো ভুল পথে চলেছে। এই বিষয়টাকে বাদ দিতে হবে। সমালোচনা যদি গঠনমূলক হয় তবেই কেবল করা যাবে। নাহলে এই বিতর্ক এড়িয়ে যেতে হবে। মোটকথা স্কলারদের নিজেদের দলভূক্ত না ভাবার যে প্রবণতা এটাকে বাদ দিতে হবে।

বি. দ্র. স্যারের সঙ্গে আড্ডা দিয়েছিলাম তিনদিন আগে। মানব প্রকৃতির বৈশিষ্ট্য বলে, তিনদিনে অনেক কিছুই ভুলে যাওয়াটা স্বাভাবিক। মৌলিক কোনো ভুল হলে শোধরে দিবেন। আর স্মৃতির প্রতারণায় কিছু ভুল হলে ক্ষমা করবেন।

Leave a Reply