একাত্তরের দায়ভার লেখা থাকুক ‘ইতিহাসে’, কর্মীদের শরীরে নয়

এটা সত্য যে পশ্চিশ পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠি পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি অর্থনৈতিক বৈষম্য করেছিল । সেই সাথে এ বিষয়গুলোও সত্য যে, আওয়ামী লীগ এসব বিষয়কে কাজে লাগিয়ে গণআন্দোলন তৈরি করতে পেরেছিল । জনগনের সমর্থন আদায় করতে পেরেছিল । আগরতলা ষড়যন্ত্রও সত্য ছিল বলে বছর দুয়েক আগে স্বীকার করেছেন ঐ মামলার আসামী সাবেক ডেপুটি স্পিকার কর্নেল অবঃ শওকত আলী । অর্থাৎ এটাও সত্য যে, আওয়ামী লীগ পাকিস্তান ভাঙার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল আগে থেকেই ।

মুসলিম জাতীয়তাবোধ এবং এক উম্মাহর ধারণা থেকে পাকিস্তান ভাঙ্গার পক্ষ নেয়া কোন ইসলামপন্থি ধর্মীয় দল বা গোষ্ঠির পক্ষে হয়তো সম্ভব ছিলনা । ফলে অন্যান্য সকল ইসলামপন্থি দল ও গোষ্ঠির মত জামায়াতও পাকিস্তানের অখণ্ডতার পক্ষে অবস্থান নেয় । কিন্তু পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদেরকে সহযোগিতাকারী বাহিনীগুলো যুদ্ধের বাইরে বেসামরিক মানুষের ওপরও অত্যাচার চালায় । নির্বিচার হত্যা, বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়া, ধর্ষণের মত অপরাধ করে । এবং শেষমেষ পরাজিত হয় পাকিস্তান । যুদ্ধ শেষে ওইসব অপরাধের দায় এসে পড়ে জামায়াতের ওপরও ।

৭১ এখন ইতিহাস । সেই ইতিহাসের পুরোপুরি সুফল ভোগ করছে আওয়ামী লীগ । একাত্তরে জামায়াতের ভূমিকা কতটুকু সঠিক বেঠিক ছিল তা নিয়ে আজও বিতর্ক রয়ে গেছে । যদিও জামায়াতের কোন নেতা এ পর্যন্ত প্রকাশ্যে বলেননি যে ৭১ এর ভূমিকা ভুল ছিল, কিন্তু সাহস করে একথাও কেউ বলেননি যে ৭১ এ জামায়াতের ভূমিকা সঠিক ছিল । মাওলানা নিজামী একবার বলেছিলেন যে ৭১ এর সিদ্ধান্ত ছিল আবেগতাড়িত । আর জামায়াতপন্থি হিসেবে পরিচিত বুদ্ধিজীবি সাবেক সচিব শাহ আব্দুল হান্নান একবার ৭১ কে গৃহযুদ্ধ এবং গন্ডগোলের সময় বলে অভিহিত করেছিলেন । এছাড়া লিখিত আকারে খন্দকার আবুল খায়ের এর ‘একাত্তরে কী ঘটেছিল, রাজাকার কারা ছিল’, আলীম আল হোসেন মিতুল- এর ‘রক্তাক্ত ৭১ঃ ঘাতক কে?’, আবুল আসাদ এর ‘কালো পঁচিশের আগে ও পরে’, আসাদ বিন হাফিজের ‘দৃশ্যপট ৭১ঃ একুশ শতকের রাজনীতি ও আওয়ামী লীগ’, অধ্যাপক গোলাম আযমের ‘জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক ভূমিকা’ এই গুটিকয়েক বইয়ে কিছু বিক্ষিপ্ত তথ্য ছাড়া একাত্তরে জামায়াত কিংবা অন্যান্য ইসলামী দলগুলোর ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত কিছু পাওয়া যায় না ।
ফলস্বরুপ উপসংহারে এটাই দাঁড়ায় যে, একাত্তরের জামায়াতের ভূমিকা গৌরবোজ্বল ছিল, অন্তত এখন পর্যন্ত তা বলার কোন সুযোগ নেই । জামায়াতের যে আশঙ্কা ছিল, ‘বাংলাদেশ ভারতের অঙ্গরাজ্য হয়ে যাবে’ তা সত্য না হওয়া পর্যন্ত একাত্তরে জামায়াতের ভূমিকাকে কেউ গৌরবোজ্বল বলতে পারবে না ।

‘৭৯ তে জামায়াত পুনরায় নিজ নামে আবির্ভাবের পর থেকে একাত্তর বিতর্ক কখনোই জামায়াতের পিছু ছাড়েনি । সবসময় একাত্তরকে ঘাড়ে নিয়েই জামায়াতকে পথ চলতে হয়েছে । আজ অবধি তার কোন ব্যতিক্রম নেই । এবং এই মুহূর্তে সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছে জামায়াত । কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কেন একাত্তরকে আঁকড়ে ধরে থাকা হচ্ছে? ইসলামের দাওয়াত দিতে গিয়ে একাত্তর পরবর্তীতে জন্ম নেয়া কর্মীদের কেন একাত্তর নিয়ে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে? জবাব দিতে হবে?

যৌক্তিক অবস্থান এটাই যে, একাত্তরে কী ঘটেছিল, কার ভূমিকা কী ছিল, তা ইতিহাসে লেখা থাকুক । কর্মীদের শরীরে নয় । ইসলামী আন্দোলন করতে হলে- ‘একাত্তরে জামায়াতের ভূমিকা সঠিক মেনে নিয়ে তবেই আসতে হবে’- কেন? একাত্তর কি ইসলামী আন্দোলনে অংশগ্রহণের কোন শর্ত? হলে সেটাই বা কেন হবে?

এখন ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব কিংবা ইসলামী আন্দোলনের গুরুত্ব বোঝানোর আগে একাত্তরকে ডিফেন্ড করতে হয় । যে ছাত্র ছাত্রশিবিরের হয়ে দাওয়াতি কাজ শুরু করে, তাকে প্রত্যেক নতুন ছাত্রের কাছে অস্বীকার করতে হয় যে ‘শিবির আর জামায়াত এক নয়’ । এটা ব্যাখ্যা করতে হয় যে, ‘শিবির জামায়াতের অঙ্গ সংগঠন নয়’ । অর্থাৎ একাত্তরকে অস্বীকার করে অথবা ডিফেন্ড করে তবেই এগোতে হয় । যা তার করার কথা ছিলনা তা করতে করতে ছাত্রজীবন শেষ করার সময় তার ভেতর এক ধরণের বিরক্তি এসে ভর করে ।
এটা তো অস্বীকার করার উপায় নেই যে, জামায়াতের বর্তমান যে গ্রোথ (Growth) তার পেছনে সিংহভাগ অবদান- ‘জামায়াতের সাথে প্রকাশ্য সম্পর্ক অস্বীকার করা’ ছাত্রশিবিরেরই । আর এই ব্যাপারে মিলিয়ন ডলারের প্রশ্নটা হলোঃ ছাত্রসংঘ যদি নাম পাল্টে শিবির নাম না নিত, তাহলে কি এত ছাত্র এই সংগঠনে আসার সুযোগ পেত?

সুতরাং আন্দোলনের সফলতার স্বার্থে ইসলামী সংগঠনের রুপ হতে হবে এমন- যেখানে ইসলামকে ভালোবেসে ইসলাম প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনে সবাই আন্দোলনে অংশ নেবে । একাত্তর সেখানে কোন বাধা হয়ে দাঁড়াবে না । সন্দেহ সংশয় সৃষ্টি করবে না । একাত্তর সেখানে থাকবে শুধু ইতিহাস হিসেবে । আমরা এখন যেভাবে ইখওয়ানের ইতিহাস পড়ি, যেভাবে ব্রিটিশ ও পাকিস্তান জামানার জামায়াতের ইতিহাস পড়ি, যেভাবে তিতুমীর-বেরেলভীর ইতিহাস পড়ি, একাত্তরও সেভাবে ইতিহাসে লেখা থাকবে । ইসলামী আন্দোলনের নতুন প্রজন্মের কর্মীরা ইতিহাস পড়ে জানবে একাত্তরে কী ঘটেছিল । প্রত্যেকে নিজে নিজে সিদ্ধান্ত নেবে কার ভূমিকা কতটুকু সঠিক বা বেঠিক ছিল সে সম্পর্কে । কিন্তু একাত্তর নিয়ে কোন প্রশ্ন বা সংশয় তাঁর ইসলামী সংগঠনে অন্তর্ভূক্তির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না ।

সেই সময়ের দায়িত্বশীলদের লিখে যাওয়া উচিত সে সময়ের ইতিহাস, পূর্ব পাক জামায়াতের ভূমিকার কথা । তারা তাঁদের নিয়ত ও কর্ম অনুযায়ী আল্লাহর কাছে পুরস্কৃত হবেন । ভবিষ্যত হয়তো তাদেরকে একসময় দেশপ্রেমিকের আসনে বসিয়ে পার্থিবভাবেও সম্মানিত করবে । ততক্ষণ পর্যন্ত ইতিহাসের গতিধারায় অপেক্ষা করা ছাড়া কোন বিকল্প নেই । সেসময়ের দায়িত্বশীলরা ইসলামী আন্দোলনের জনশক্তির কাছে সম্মানিত হবেন এই অঞ্চলে ইসলামী সংগঠনের অগ্রপথিক হিসেবে । কিন্তু এখন যেহেতু ৭১ ইস্যু আন্দোলনের পথে বাধা তৈরি করে চলেছে- সুতরাং দায় কিংবা গৌরব যাই হোক, আন্দোলনের সফলতার স্বার্থে অনাবশ্যক এই বিষয়কে দা’ঈ দের শরীর থেকে মুছে ফেলা জরুরি । আন্দোলনের পথ হোক এমন, যেখানে দা’ঈ দের প্রতি পদে পদে একাত্তরের সাফাই গাইতে হবে না, একাত্তরকে ডিফেন্ড করতে হবে না ।

একাত্তরের ইতিহাস লেখা থাকুক ‘ইতিহাসে’, কর্মীদের শরীরে নয় ।

One Response

  1. ABUSAIF
    ABUSAIF at |

    আসসালাম… বারাকাতুহ

    কিন্তু “বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে” কে??
    “একে একে নিভিছে দেউটি”
    হয়তো জামায়াত এ কাজটি স্বেচ্ছায় করবেনা….

    তাহলে আর তেমন কে আছেন- যাঁর লেখা বিশ্বাসযোগ্যতা পেতে পারে??

    Reply

Leave a Reply