২৮/০৫/২০১৩ তারিখে সাপ্তাহিক লিখনীতে শিবিরের সাবেক সভাপতি ও যুব শিবিরের প্রতিষ্ঠাতা আহমেদ আব্দুল কাদেরের একটি সাক্ষাতকার প্রকাশিত হয়েছিল। সাক্ষাতকারটি শিরোনাম ছিল “হেফাজত যে ত্যাগ ও কুরবানি করেছে এটার রেজাল্ট অবশ্যই আসবে”। বাংলাদেশে ইসলামি রাজনীতির অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ, হেফাজতে ইসলাম, চারদলীয় জোট, তৃতীয় শক্তিসহ নানা বিষয় নিয়ে সাক্ষাতকারটি সাজানো হয়েছিল।লিখনীর পক্ষ থেকে কয়েকটি প্রশ্নের জবাবে আহমেদ আব্দুল কাদের ৮২ সালের শিবিরের ঐতিহাসিক ক্রান্তিকাল ও যুব শিবির গঠনের প্রেক্ষাপট নিয়েও আলোচনা করেছেন। এই পোষ্টে যুব শিবির গঠন ও বিলপ্তি নিয়ে আহমেদ আব্দুল কাদেরের বক্তব্যর অংশটুকু শুধু তুলে ধরা হল। কেউ পুরো সাক্ষাতকারটি পড়তে চাইলে পোষ্টের নিচে দেয়া লিংকটি অনুসরন করতে পারে।
লিখনী : অতীত থেকে শুরু করি। আপনি তো প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকে ছাত্রশিবিরের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। সক্রিয় কর্মী থেকে একপর্যায়ে আপনি সভাপতিও নির্বাচিত হয়েছিলেন।…
আহমদ আবদুল কাদের : হ্যাঁ, আপনি ঠিকই বলেছেন। ১৯৭৭ সালে ছাত্রশিবির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই আমি ছাত্রশিবিরের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম। ১৯৮২ সালের মার্চে আমি ছাত্রশিবিরের সভাপতি নির্বাচিত হই। কিন্তু আগস্ট মাসে পদত্যাগ করি।
লিখনী : পদত্যাগের পর আপনি যুবশিবির নামে আরেকটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। ছাত্রশিবির থেকে পদত্যাগের কারণ কী?
আহমদ আবদুল কাদের : ছাত্রশিবিরের পলিসিতে কয়েকটা বিষয় স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল- এটা কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্ব করবে না, ইসলামের পক্ষে তারা কাজ করবে। প্রথমদিকে পাঁচ-ছয় বছর এটা মানা হলেও পরে এটা ঠিক থাকেনি। জামায়াতে ইসলামের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বাড়াতে থাকে।
লিখনী : শিবির কি জামায়াতের অঙ্গসংগঠন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি?
আহমদ আবদুল কাদের : না, জামায়াত-শিবির দুটো আলাদা সংগঠন ছিলো এবং দুটোর গঠনতন্ত্র, মতাদর্শ ও কর্মপরিকল্পনাও ভিন্ন ছিল। ছাত্রশিবির স্বাধীনভাবে তাদের কর্মকা- পরিচালনা করতো। তবে জামায়াত সম্পৃক্ত কিছু নেতা এতে ছিলেন। মাঝখানে শিবিরের কিছু কর্মকাণ্ডে তারা আপত্তি প্রকাশ করে। তবুও আমরা যারা শিবিরকে স্বাধীন সংগঠন হিসেবে পরিচালনা করতে বদ্ধপরিকর ছিলাম তারা কখনও জামায়াতের সম্পৃক্ততা মেনে নিতে পারিনি। এতে জামায়াত ধীরে ধীরে আমাদের কর্মকাণ্ডে ক্ষিপ্ত হয়ে যায়। আমি সভাপতি হওয়ার পর যখন কিছু কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে যাই তখন এই ক্ষিপ্ততা আরও বাড়ে।
লিখনী : আপনার প্রতি জামায়াতের ক্ষিপ্ত হওয়ার কারণ কী?
আহমদ আবদুল কাদের : ’৮১ সালে রমনা গ্রিনে একটি বড় সম্মেলন করা হয়। সেখানে অনেককে অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হলেও জামায়াতের নেতাদের কাউকে ডাকা হয়নি। সে কারণে তারা আমাদের প্রতি ক্ষিপ্ত হতে শুরু করে। এখানে স্বাভাবিকভাবে ’৭১-এর প্রসঙ্গটা আসে। আমি ’৭১-এ জামায়াতের অবস্থানের ব্যাপারে আমাদের নেতাদের পর্যালোচনা করতে বলি। কারণ ৭১-এ জামায়াতের যে ভুল ছিল সেই ভুলের খেসারত ছাত্রশিবিরকেও দিতে হচ্ছিলো।
লিখনী : ’৭১-এর বিষয়ে আপনাদের এই বোধটা কেনো এলো?
আহমদ আবদুল কাদের : সেটা আমার না, শিবিরে আমার আগে যারা সভাপতি ছিলেন তাদের অনেকেই প্রশ্নটা তুলেছেন। কারণ আমরা মনে করতাম ’৭১ বিষয়ে অবস্থান পরিষ্কার না করে রাজনীতি করা সম্ভব নয়। যেহেতু এই সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা হয়েছে স্বাধীনতার পর এবং এটি একটি স্বাধীন ছাত্র সংগঠন। জামায়াত বা অন্যকোনো রাজনৈতিক দলের প্রভাবে যদি এটি প্রশ্নবিদ্ধ হয় তাহলে আমাদের পুরো কার্যক্রমই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যেতো। অথচ ছাত্রশিবির ততোদিনে সারা বাংলাদেশে একটি আদর্শ ছাত্র সংগঠন হিসেবে পরিচিত হয়েছিলো। এমনকি শিক্ষক-অভিভাবকরা ছাত্রদের এই সংগঠন করার ব্যাপারে উৎসাহ দিতেন। সুতরাং জামায়াতের ব্যাপারে আমাদের অবস্থান পরিষ্কার করা আবশ্যক হয়ে পড়েছিলো।
লিখনী : ছাত্রশিবির থেকে পদত্যাগ করে আপনি যুবশিবির প্রতিষ্ঠা করলেন। যুবশিবিরের ব্যাপ্তিটা কতোটুকু ছিলো?
আহমদ আবদুল কাদের : শিবিরের সঙ্গে সম্পৃক্ত সাবেক অনেক নেতাই যুবশিবিরে ছিলেন এবং সারা দেশের প্রায় প্রতিটি জেলায় আমরা কমিটি গঠন করেছিলাম। শিবিরের তখনকার যারা উপরের লেবেলে ছিলেন তারাও অনেকে আমাদের সাপোর্ট দিয়েছিলেন।
লিখনী : যুবশিবির থেকে একসময় আপনি হাফেজ্জি হুজুরের সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদ এবং খেলাফত আন্দোলনে যোগ দেন। সেই প্রেক্ষাপটটা কী ছিল?
আহমদ আবদুল কাদের : ‘৮৩ সালে হাফেজ্জি হুজুর আন্দোলনে নামলেন। তখনকার সম্মিলিত প্লাটফর্ম প্রয়োজন ছিল। সে কারণে সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে ১১টি দল যুক্ত হয়ে নতুন আন্দোলন তৈরি করে। বৃহত্তর ইসলামি ঐক্যের ডাকে যুবশিবিরও সেখানে ছিল।
লিখনী : ১১ দলে জোটভুক্ত হলেন, কিন্তু যুবশিবির বিলুপ্ত হলো কখন?
আহমদ আবদুল কাদের : ৮৫ সালের শেষদিকে কয়েকটি বিষয় নিয়ে খেলাফত আন্দোলনে সমস্যা দেখা দেয়। দুইভাবে বিভক্ত হয়ে পড়ে দলের শীর্ষ কয়েকজন নেতা। তখন পরিস্থিতি অন্যরকম হয়ে যায়। আমরা আরেকটা জোটের উদ্যোগ নেই। শাসনতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। এটা মূলত মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী সাহেব উদ্যোগ নেন। সেটা ছিল ১৯৮৭ সাল। কমলাপুরে এক ওয়াজ মাহফিল থেকে ১৩ মার্চ ইসলামি শাসনতন্ত্রের দাবিতে শাপলা চত্বরে এক মহাসমাবেশ করার ঘোষণা দেন। এ বিষয়ে আলোচনা করার জন্য মরহুম মাওলানা আবদুর রহীম সাহেবের বাসায় একটা মিটিং ডাকা হলো। মাওলানা আবদুর রহীম সাহেব সাঈদী সাহেবের সঙ্গে জামায়াতের সম্পৃক্ততার বিষয়টি উত্থাপন করলেন। তখন তিনি জামায়াতের সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়টি স্বীকার করেননি।
পরবর্তী সময়ে ফার্মগেটে অবস্থিত বায়তুশ শরফ মসজিদে বৃহত্তর পরিসরে আরও একটি সভা ডাকা হলো। সেখানে মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ছাড়াও অন্যান্য যারা বিশেষভাবে উপস্থিত হন চরমোনাইর পীর হজরত মাওলানা ফজলুল করিম, চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লা মসজিদের খতিব, শায়খুল হাসিদ আল্লামা আজিজুল হক, ঐক্য আন্দোলনের চেয়ারম্যান মাওলানা আবদুর রহীম, বায়তুশ শরফের পীর মাওলানা আবদুল জব্বার, নোয়াপাড়ার পীর, ঐক্য আন্দোলনের সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার মাওলানা কোরবানী আলী প্রমুখ। আমিও সেই সভায় উপস্থিত ছিলাম। নেতারা সাঈদী সাহেবের সঙ্গে জামায়াত সম্পৃক্ততার বিষয়টি তুললে সাঈদী সাহেব অত্যন্ত আবেগী ভাষায় কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে জামায়াতের সঙ্গে সব ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন করে আসবেন বলে ওয়াদা করেন। সেখানে সিদ্ধান্ত হলো যে ১৩ মার্চের প্রোগ্রামের পূর্বে নেতৃস্থানীয় আলেমদের নিয়ে একটা চূড়ান্ত মিটিং করা হবে এবং কর্মসূচি নির্ধারণ করা হবে ।
হঠাৎ করে সাঈদী সাহেবের পক্ষ থেকে সমস্যা তৈরি হলো। মিটিংয়ের আগে আমি এ ব্যাপারে তার সঙ্গে কথা বলতে গেলে তিনি বলেন, আমার মা অসুস্থ, আমাকে ওমরায় যেতে হবে। আপনারা প্রোগ্রাম করেন। আমি বললাম, আপনি উদ্যোগ নিলেন, আপনিই না থাকলে কেমন হয়? তিনি তার মতে অটল রইলেন।
এমন অবস্থায় আমরা চিন্তা করলাম মিটিং যেহেতু ডাকা হয়েছে তা হবেই।
বৈঠকের দিন সাঈদী সাহেবের সঙ্গে যোগাযোগ করার বহু চেষ্টা করা হলো। কিন্তু তাকে কোথাও পাওয়া গেলো না। শেষ পর্যন্ত তাকে ছাড়াই বৈঠক শুরু করা হলো। আলোচনা করে সিদ্ধান্ত হলো যে মাওলানা সাঈদী সাহেব ছাড়াই আন্দোলন ও ঘোষিত প্রোগ্রাম হবে। চরমোনাইর পীর মাওলানা ফজলুল করিম সাহেবকে আন্দোলনের আহ্বায়ক করা হয়। সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে শাসনতন্ত্র আন্দোলন শুরুর ঘোষণা ও ১৩ তারিখের সমাবেশের কথা ঘোষণা করা হয়। বেশ কিছু দিন যাবৎ শাসনতন্ত্র আন্দোলন জোরদারভাবে চললেও শেষ পর্যন্ত আন্দোলন স্তিমিত হয়ে আসে । তখন আমরা যুবশিবিরের লোকেরা অনুভব করতে থাকি, একটা সুশৃঙ্খল জাতীয় সংগঠন গড়ে তোলা প্রয়োজন।
শেষ পর্যন্ত যুবশিবির আর খেলাফত আন্দোলন একটি নতুন দল করার সিদ্ধান্তে আসে। এভাবে ৮৯ সালের ৮ ডিসেম্বর খেলাফত মজলিস গঠিত হয়।
উপরোক্ত সাক্ষাতকারটি ছাড়াও জনাব আহমেদ আব্দুল কাদেরের আরেকটি সাক্ষাতকার ছাপা হয় খেলাফত মজলিসের ২৫ তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী সম্মেলন উপলক্ষে প্রকাশিত স্মারকে।সেটি প্রকাশিত হয় লন্ডন মহানগর খেলাফত মজলিশের উদ্যেগে ২০১৪ সালের ডিসেম্বর মাসে।পাঠকের জ্ঞ্যাতার্থে বিশাল বড় সাক্ষাতকারের ছাত্র শিবির ও যুবশিবির সম্পর্কিত অংশটুকুর ইমেজ কপি এখানে তুলে ধরা হল;







