ঈস্তানবুলের বিজয় এবং মুসলিম উম্মাহর করনীয়

প্রফেসর ডঃ নাজমুদ্দিন এরবাকান

আজ নতুন একটি যুগের এবং নতুন একটি বিজয়ের প্রয়োজন। যা সমগ্র মানবতা আজ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। নতুন একটি শান্তিময় দুনিয়া গঠন করার জন্য আমাদের এই মুসলিম জাতী পুনরায় নেতৃত্ব দিবে।সম্মানিত একটি জাতীর এবং সম্মানিত একটি ইতিহাসের উত্তরাধিকারীগণ এই বিজয়ের পতাকাবাহী হিসাবে কাজ করবে।
ইস্তানবুল বিজয়ের খুব বেশী আগে নয় মাত্র ৫০ বছর পূর্বে ১৪০০ সালের শুরুর দিকে তইমুর লং যখন আনাতলিয়াতে (Anatoliya) আক্রমণ করছিল তখন সবাই ভেবেছিল যে সব কিছুই ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। মুসলিম বিশ্ব সবচেয়ে বড় দুর্দশায় নিপতিত হয়েছিল। কিন্তু মাত্র ৫০ বছরের মধ্যে আমাদের এই জাতী সব কিছুকে সাজিয়ে গুছিয়ে, ইস্তানবুলের বিজয়ের মধ্য দিয়ে একটি যুগের অবসান ঘটিয়ে নতুন এক সোনালী যুগের সূচনা করেছিল। তেমনি ভাবে আজও একটি নতুন যুগের নতুন একটি বিজয়ের প্রয়োজন।
কিন্তু এর জন্য ইস্তানবুলের বিজয়কে খুব ভাল ভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
আমাদের প্রিয়নবী মানবতার মুক্তির দূত মুহাম্মাদ (সঃ) এই হাদিসের মাধ্যমে আমাদেরকে ইস্তানবুল বিজয়ের সুসংবাদ দান করেছিলেন।

لَتُفْتَحَنَّ الْقُسْطَنْطِينِيَّةُ فَلَنِعْمَ الْاَمِيرُ اَمِيرُهَا وَلَنِعْمَ الْجَيْشُ ذَلِكَ الْجَيْشُ

অর্থাৎ অবশ্যই অবশ্যই ইস্তানবুল বিজিত হবে। সেই বিজয়ের সেনাপতি কতই না উত্তম সেনাপতি আর সেই বিজয়ের সৈনিকগণ কতই না উত্তম। (মুসনাদে আহমাদ)
এই হাদীস থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। কি বলা হয়েছে এই হাদীসে? لَتُفْتَحَنَّ الْقُسْطَنْطِينِيَّةُ (লাতুফতাহান্নাল কন্সতান্তিনিয়্যাতা) এই কথা বলা হয়েছে। এখানে রয়েছে লামে তাকিদ এবং নুনে সাকিলা এর দ্বারা বক্তব্যকে জোরালো করা হয়েছে। অর্থাৎ ইস্তানবুল অবশ্যই অবশ্যই বিজিত হবে।বিজয়ের জন্য মৌলিক শর্ত হল এমন দৃড় বিশ্বাস।
অর্থাৎ যদি বিজয় করতে চাই তাহলে অবশ্যই আমাদেরকে বিশ্বাস করতে হবে। দৃড়ভাবে এবং সন্দেহাতীত ভাবে আমাদেরকে বিশ্বাস করতে হবে। মুহাম্মাদ সঃ ‘’অবশ্যই অবশ্যই বিজয় হবে’’ এই কথা বলার কারনে মুসলমানগণ এই সম্মানের অংশীদার হওয়ার জন্য বহুবার বিজয়াভিযান পরিচালনা করেছে। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাদের মধ্য থেকে এই মহান সম্মান, সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহকে নাসীব করেছে।
সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহ তার বাল্য কাল থেকেই ইস্তানবুল বিজয়ের স্বপ্ন নিয়ে বেড়ে উঠেছিলেন। এই হাদীস শরিফে বর্ণিত এই বিরল সম্মানের অংশীদার হওয়ার জন্য তিনি রাত দিন কঠোর সাধনা করেছিলেন। বলতে গেলে, ইস্তানবুল বিজয়ের জন্য সুলতান ফাতিহ পাগলপারা হয়ে গিয়েছিলেন। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ও তাঁকে এই মহান সম্মানের ভাগীদার করেছিলেন।
সুতারাং আমরা যে দাওয়াত এবং আন্দোলনকে বিশ্বাস করি সেই আন্দোলনকে তার লক্ষ্যপানে পৌঁছানোর জন্য আমাদেরকেও সেই আন্দোলনের জন্য পাগলপারা হতে হবে।
সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহ সিংহাসনে সমাসীন হওয়ার সাথে সাথেই দিন রাত কঠোর পরিশ্রম করে ইস্তানবুলের বিজয়ের জন্য সকল প্রকার প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছিলেন। দুনিয়ার সব চেয়ে সুন্দর শহর ইস্তানবুলের বিজয়ের জন্য তিনি সকল কিছুকে সুসংহত করেছিলেন। ২ লাখ সৈন্যের অংশগ্রহণে এক বিশাল সেনাবাহিনী গঠন করেন। এর পাশাপাশি তিনি প্রচুর পরিমাণে আগুনের গোলা তৈরি করেন। এগুলা ছিল সেই সময়ের সব চেয়ে উন্নত প্রযুক্তি। ‘’ঈমান খাসী ছাগল থেকেও দুধ করতে পারে’’। এই কথার উপর আস্থা রেখে পাহাড়ের উপর দিয়ে জাহাজ চালিয়েছিলেন।
যদি একটি বিজয় চাই তাহলে ঈমান, আত্মবিশ্বাস, আগ্রহের পাশাপাশি সেই এসময়ের সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তির অধিকারী হতে হবে এবং সব চেয়ে উন্নত পন্থা গ্রহন করতে হবে।
১৪৫৪ সালের ৬ এপ্রিল বাইজান্টাইন সম্রাটকে আত্মসমর্পণের আহবান জানান। এটা হল মুসলমানদের মুলনীতি। রক্তপাত যাতে না হয় এই জন্য তিনি এই আহবান জানিয়েছিলেন। কিন্তু বাইজান্টাইন গণ এটাকে গ্রহন না করে যুদ্ধ ঘোষণা করে। সুলতান ফাতিহ ও আক্রমনের নির্দেশ দান করেন। এর আগে তিনি তার সকল সেনাবাহিনীকে নিয়ে নামাজ আদায় করেন এবং বিজয়ের জন্য মহামহীম সম্রাট আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে দোয়া করেন। দোয়া করার সময় অসহায় এক বান্দার মত আকুতি মিনতি করে দোয়া করেন।দোয়া করার পর সেনাবাহিনীকে আক্রমনের নির্দেশ দিয়ে, তিনি তার ঘোড়ার পীঠে আরোহণ করার সময় পাহাড়সমূহকে কাঁপিয়ে দিচ্ছেন এমন এক নর শার্দূলের ন্যায় তাঁকে দেখা যাচ্ছিল।

49987
ইয়া আল্লাহ! কত বিশাল এক যুদ্ধ, কত বড় উদ্যম, কত মহান এক প্রয়াস…….২৯ শে মে ফজরের সময়ে প্রাচীর গুলুকে ভেঙ্গে ফেলা হয়েছিল। ইস্তানবুলের বিজয় নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল।বাইজান্টাইনের প্রাচীরে সর্বপ্রথম ইসলামের পতাকা উত্তোলন করার ভাগ্য উলুবাতলি হাসানের হয়েছিল। সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহর সেনাবাহিনী ভেঙ্গে ফেলা প্রাচীরের ভেতর দিয়ে তীব্রতার সাথে স্রোতের মত ইস্তানবুলে প্রবেশ করেছিল। এই ভাবে একটি যুগের পতন হয়ে অন্য যুগের সূচনা হয়েছিল।ইস্তানবুল বিজয় হওয়ার পর বিজয়ী সেনাপতি সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহ আল্লাহ তালার শুকরিয়া আদায় করার জন্য আয়াসুফিয়াকে (HagiaSufiya) মসজিদে রূপান্তরিত করেন এবং ২ রাকাত শুকরানা নামাজ আদায় করেন। এর পর তিনি হযরত আইয়ুব আল আনসারীর কবর যিয়ারত করতে যান। এই ভাবে সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহ এত বড় বিজয়ের পর অত্যন্ত বিনয়ী হয়ে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের শুকরিয়া জ্ঞাপনের এক অনুপম দৃষ্টান্ত পেশ করেন।
আজ আমরা মুসলিম হিসাবে, প্রাচীরের সামনে অবস্থান কারী সেনাবাহিনীর মত। আমরা আজ নতুন এক বিজয়ের সপ্নে বিভোর হয়ে আছি। আগামী দিনের বিজয়ের জন্য নতুন উদ্দমে লড়ে যাচ্ছি। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের শুকরিয়া জ্ঞাপন করছি তিনি আমাদেরকে এমন মর্যাদা সম্পন্ন একটি জাতীর উত্তরাধিকারী করেছেন। ইস্তানবুলের বিজয় থেকে আমরা যে সকল শিক্ষা নিতে পারি এর মধ্যে আমাদের জন্য সব চেয়ে বড় শিক্ষা হল হযরত আইয়ুব আল আনসারী (রা)।

জিহাদের ঘোষণা শুনার সাথে সাথে হযরত আইয়ুব আল আনসারী (রা), কুরআনে কারীম বন্ধ করে সাথে সাথে উঠে দাঁড়ান।তার সন্তানগণ তাঁকে এই বলে বাধা দেন ‘’ বাবা তুমি বস, বসে বসে কুরআন পড়, নিজেকে বিপদের মুখে ঠেলে দিও না।‘’ উত্তরে তিনি তাদেরকে বলেছিলেন ‘’ হে আমার প্রিয় সন্তানরা,তোমরা আমাকে বলছ তুমি বস বসে কুরআন পড়। কিন্তু আমি যখন কুরআন পড়ি, কুরআন তখন আমাকে বলে উঠে দাড়াও জিহাদ কর।
এই মহান সাহাবী ৯০ বছর বয়সে ইস্তানবুলের প্রাচীরের কাছে আসেন। তার বয়সের কারণে তার নিরাপত্তার জন্য সৈন্যগণ তাঁকে তাদের পেছনে রাখতে চেয়েছে কিন্তু তারা তাঁকে তা করতে পারেনি। যুদ্ধের সেই চরম মুহূর্তে আগুন এবং তীরের নিচে দাড়িয়ে তিনি সৈন্যদেরকে ‘’দুনিয়াবী কাজে মশগুল হয়ে জিহাদ থেকে দূরে থেকে নিজেদেরকে হুমকির মুখে ঠেলে দিও না’’ এই আয়াতটি স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন এবং তরুণ সৈন্যদেরকে প্রয়োজনীয় শিক্ষা দিয়েছিলেন। এত ত্যাগ তিতিক্ষার পর মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁকে বাইজান্টাইনের প্রাচীরের পাদদেশে তাঁকে শাহাদাত নাসিব করেন।

‘’ইসলাম কেমন একটি দ্বীন?’’ এই বিষয়ে যদি কেহ উৎসাহ বোধ করেন সে যেন ৯০ বছর বয়সে ইস্তানবুল বিজয়ের উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করতে আসা হযরত আইয়ুব আল আনসারী (রা) এর দিকে তাকায়। ইসলামের মূল রূপ হল এটা। দ্বীন ইসলাম হল, জিহাদের দ্বীন। এই জন্য আপনারা শুধু মাত্র নামাজ পড়বেন, তাসবিহ তাহলিল পাঠ করবেন এই কথা বলা হল মূর্খতা। যদি তাই হত এই মহান সাহাবী, রাসুল সঃ মদিনায় হিযরত করার পর যার ঘরে আশ্রয় নিয়েছিলেন, তিনি মদিনা থেকে পৃথক না হয়ে সেখানে সব চেয়ে সুন্দর পদ্ধতিতে নামাজ পড়তেন এবং তাসবিহ তাহলিলে মশগুল থাকতেন।
ইস্তানবুলের বিজয়ের জন্য হযরত আকশেমসেদ্দিন এর ভুমিকাও অনেক বিশাল। তাকেও আমাদেরকে আমাদের আদর্শ হিসাবে স্মরণ করতে হবে। তিনি ছিলেন একজন বড় আলেম ইস্তানবুলের বিজয়াভিজানে তিনি আমাদের জন্য এক অনুপম দৃষ্টান্ত। ফাতিহর একজন উস্তাদ হিসাবে, প্রতিটি গুহায় গিয়ে গিয়ে তিনি সৈন্যদেরকে উৎসাহ উদ্দীপনা জুগিয়েছিলেন। এর থেকে যাতে বর্তমানের কিছু আলেমগণ শিক্ষা গ্রহন করেন এই জন্য উনার কথা আলোচনায় নিয়ে আসলাম। কেননা এটা ধারনা করা হয়ে থাকে যে শুধুমাত্র তারা নামাজ পড়ে তাসবীহ তাহলিল করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। না, নতুন একটি দুনিয়া প্রতিষ্ঠা করার জন্য আমারা যদি সর্বাত্মক ভাবে সকল শক্তি দিয়ে প্রচেষ্টা না চালাই তাহলে নিজেদেরকে সত্যিকারের ঈমানদার বলে দাবী করতে পারব না।
সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহ যখন ইস্তানবুল বিজয় করেছিলেন তখন তিনি ছিলেন ২১ বছরের একজন টগবগে যুবক।ইস্তানবুলের বিজয় যেমন অনেক বড় এবং মহান একটি ব্যাপার ঠিক তেমনি ভাবে যারা ২১ বছর বয়সে এই বিজয়ের জন্য ঈমানের বলে বলীয়ান কাজ করেছেন তারাও তেমন মহান এবং মর্যাদাবান।
একটি দেশের আসল শক্তি ট্যাঙ্ক, ক্ষেপনাস্র এবং অর্থবিত্ত্ব নয়।
বরং একটি দেশের আসল শক্তি হল ঈমানের বলে বলীয়ান যুব সমাজ।

Leave a Reply