Nure Alam Masud

মিনা ট্র্যাজেডি, ইয়েমেনে আগ্রাসন ও আলে সৌদের ইতিহাস

১. ক্রেন দুর্ঘটনা

১১ সেপ্টেম্বর ২০১৫, জুমাবার।

মসজিদুল হারাম সম্প্রসারণের কাজে নিয়োজিত বিন লাদেন গ্রুপের প্রায় ১০০টি বিশালায়তন ক্রলার ক্রেন মসজিদের চতুর্দিকে বসানো। বিকেল পাঁচটা বিশের দিকে ঝোড়ো আবহাওয়ায় এর একটি ক্রেন ভেঙে মসজিদের পূর্ব পাশের ছাদের উপর পড়ে, এবং ছাদ ভেঙে কংক্রিটের স্তুপের নিচে চাপা পড়ে শহীদ হন শতাধিক হাজী। সোশ্যাল মিডিয়ায় এই সংবাদ ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ছবি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই সৌদি সরকারের হজ্জ্ব ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যেখানে সাধারণ নির্মানকাজেই ক্রেনের আশপাশ থেকে মানুষ সরিয়ে নেয়া হয়, সেখানে হজ্জ্ব মওসুমে লক্ষ লক্ষ হাজীর আগমণ হবে জেনেও সৌদি সরকার কেন হাজার কেজি ওজনের ক্রেনগুলোকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে রাখলো না, এই অভিযোগ মুসলিম অমুসলিম নির্বিশেষে সকল বিবেকবান মানুষের। সৌদি রাজা বা সৌদি প্রিন্সদের কেউ কি অমন অনিরাপদ কনস্ট্রাকশন সাইটে যেতেন? এই মর্মান্তিক ক্রেন দুর্ঘটনায় আল্লাহর মেহমান হাজীদের প্রতি সৌদি সরকারের এই উদাসীনতাই ফুটে উঠেছে যে, আল্লাহর মেহমানদের জীবনের কোনো মূল্য আলে সৌদের কাছে নেই।

২. হোটেলে অগ্নিকাণ্ড

এক সপ্তাহ যেতে না যেতেই ১৭ সেপ্টেম্বর, এবং তার তিনদিন বাদে ২১ সেপ্টেম্বর দুটি হোটেলে পৃথক অগ্নিকাণ্ডে বেশ কয়েকজন হাজী আহত হন, সহস্রাধিক হাজীকে সরিয়ে নেয়া হয়। প্রথমে সৌদি সরকারের উদাসীনতার ফলস্বরুপ ক্রেন দুর্ঘটনায় শতাধিক হাজীর মৃত্যু এবং তার কিছুদিন পর একাধিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা হাজীদেরকে অনিরপত্তায় ফেলেছে, একইসাথে প্রায় ২০ লাখ হাজীর আত্মীয় স্বজনসহ গোটা মুসলিম উম্মাহকে উদ্বিগ্ন করেছে। এই অনিরাপত্তাকে চরম মাত্রায় নিয়ে গেল ২৪ সেপ্টেম্বরের হত্যাকাণ্ড।

৩. মিনা ট্র্যাজেডি

২৪ সেপ্টেম্বর ২০‌‌১৫, ঈদুল আযহা।

হজ্জ্বের নিয়মানুযায়ী সকালবেলা মুজদালিফা থেকে মিনার জামারাতের (শয়তানের প্রতিকৃতি হিসেবে তৈরী পাথরের স্তম্ভ) উদ্দেশ্যে হাজীরা যাত্রা শুরু করবেন এবং সেখানে পৌঁছে শয়তানের প্রতিকৃতিতে পাথর নিক্ষেপ করবেন। এখানে বলে রাখা ভালো যে, হাজীদের সুবিধার্থে এই পথে বেশ কয়েকটি রাস্তা তৈরী করা হয়েছে এবং গোটা হজ্জ্ব কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের জন্য কয়েক হাজার ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরাও ইনস্টল করা হয়েছে। সেভাবেই গত ২৪ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার হাজীরা যাত্রা শুরু করেন। কিন্তু সকাল নয়টার দিকে জামারাতে পৌঁছবার কয়েক কিলোমিটার আগে হঠাতই কোনো এক কারণে কাফেলার সামনের দিকে হাজীরা থেমে যান, আর পিছন থেকে হাজীদের স্রোত অব্যাহত থাকায় প্রায় দুই হাজার হাজী পদপিষ্ট হয়ে, অত্যধিক চাপে ও দম বন্ধ হয়ে মারা যান, যদিও সৌদি প্রেস নিহতের সংখ্যা ৭১৭ বলে দাবী করছে।

(সৌদি প্রিন্স আল ওয়ালিদ বিন তালাল আল সৌদ এর আংশিক মালিকানাধীন) লেবানিজ দৈনিক আদ-দিয়ার অভিযোগ করেছে যে, সৌদি প্রিন্স মুহাম্মদ বিন সালমান আল সৌদ শতাধিক নিরাপত্তারক্ষীর গাড়িবহর নিয়ে ঐ রাস্তা দিয়ে যাবার সময় প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পথ বিনা নোটিশে আটকে দেয়ায় এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটেছে। অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ হিসেবে সম্প্রতি প্রকাশিত একটি ভিডিও ফুটেজ অভিযোগটিকে দৃঢ়তা প্রদান করেছে। এদিকে সৌদি সরকারের কেন্দ্রীয় হজ্জ্ব কমিটির খালেদ আল ফয়সাল “আফ্রিকান হাজীরাই এজন্য দায়ী” – বলে বর্ণবাদী মন্তব্য করায় সোশাল মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছেন। মাত্র দুটি রাস্তা খোলা রেখে বাকিগুলো কেন বন্ধ করা হলো, এবং ঠিক কী কারণে কিভাবে এই ঘটনা ঘটলো তার কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা সৌদি সরকার দিতে পারে নাই; এমনকি কোনো ভিডিও ফুটেজও প্রকাশ করে নাই, যদিও এলাকাটি সার্বক্ষণিক ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার অধীনে ছিল।

সৌদি সরকার বলছে যে তদন্ত কমিটির রিপোর্ট পেলেই কারণ জানা যাবে, অথচ এরই মাঝে তারা হাজীদের দোষ দিয়ে বসে আছেন, বর্ণবাদী মন্তব্যও করেছেন। আর দরবারী আলেম সৌদি গ্র্যান্ড মুফতি শেখ আব্দুল আজিজ বিন আবদুল্লাহ আল শেখ তার প্রিন্সকে রক্ষা করতে এই হত্যাকাণ্ডকে “ভাগ্য” বলে আখ্যায়িত করে বলেছেন যে, এতে মানুষের কোনো হাত নেই, এবং তার প্রিন্স মোটেও দোষী নন। তদন্ত কমিটির রিপোর্ট প্রকাশের আগেই নিজেদেরকে অভিযোগ থেকে রক্ষা করতে কখনো আফ্রিকান হাজীদের দোষ দিয়ে আর কখনো আল্লাহকে দোষ দিয়ে দেয়া সৌদি সরকারের রেডি বক্তব্য দৈনিক আদ-দিয়ার এর অভিযোগকেই আরো দৃঢ় করেছে।

যে গৃহকে আল্লাহ তায়ালা নিরাপদ করেছেন (সূরা কুরাইশ, ১০৬:৪), সহস্রাধিক হাজীর এই হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে তার নিরাপত্তাকে লঙ্ঘিত করেছে আলে সৌদ। অবশ্য হাজীদের রক্তে আলে সৌদের হাত আজ নতুন করে রঞ্জিত হয়নি, বরং এর ইতিহাস আরো পুরনো।

 

৪. ১৯৮৭ সালের হত্যাকাণ্ড

৩১ জুলাই ১৯৮৭, জুমাবার।

জুমার নামাজের আগ দিয়ে লক্ষাধিক ইরানী হাজীসহ অন্যান্য দেশের হাজীরা মক্কায় এক মিছিলের আয়োজন করেন। তারা ‘আল্লাহু আকবার’, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’, ‘আমেরিকা আল্লাহর দুশমন’, ‘ইসরাইল আল্লাহর দুশমন’ ‘বিশ্বের সকল মুসলিম এক হও’, ‘আমরা ফিলিস্তিনি জনগণের পক্ষে’ ইত্যাদি বলে শ্লোগান দেন। মিছিলে এমনকি সৌদি আরব কিংবা সৌদি রাজ পরিবার আলে সৌদের বিরুদ্ধে একটি শ্লোগানও দেয়া হয়নি, তবুও সৌদি পুলিশ হাজীদের উপর চড়াও হয়। মিছিলকারীদের কেউ কেউ পবিত্র কা’বা ঘরে আশ্রয় নিতে চাইলেও পুলিশ তাদেরকে সেখানেও যেতে দেয়নি। এসময় আল্লাহর মেহমান প্রায় পাঁচশত হাজীকে গুলি করে হত্যা করে সৌদি সরকার। যে গৃহকে আল্লাহ তায়ালা নিরাপদ করেছেন, যে হারাম শরীফে রক্তপাত নিষিদ্ধ করেছেন, সেখানে আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ অমান্য করে আল্লাহরই মেহমানদের নির্মমভাবে হত্যা করলো আলে সৌদ।

এহেন জঘন্য অপকর্মের ইতিহাস ঘাঁটলে আলে সৌদকে ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়া ছাড়া আর সাথে তুলনা করা যেতে পারে? যে কিনা তার তিন বছরের অবৈধ শাসনামলে কারবালায় হযরত ইমাম হুসাইন (আ.) কে শহীদ করে, মক্কা আক্রমণ করে গোলা বারুদ নিক্ষেপ করে কাবাগৃহের ক্ষতিসাধন করে এবং মদিনার জনগণ তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলে সেনাবাহিনীকে তিনদিনের জন্য অবাধে খুন, ধর্ষণসহ যেকোনো ধরণের অপরাধের অনুমতি দিয়ে প্রেরণ করে; এবং তার সেনাবাহিনী সেই নিকৃষ্ট অপরাধগুলি সংঘটিত করে। মক্কা-মদীনার উপর চেপে বসেছিলো অভিশপ্ত ইয়াজিদ, আর এখন চেপে বসেছে আলে সৌদ। ইসলামের রীতিনীতির কোনো তোয়াক্কা যেমন ইয়াজিদ করেনি, তেমনি তোয়াক্কা করে না এই আলে সৌদ। ইসলামের চারটি সম্মানিত মাসে যুদ্ধ বিগ্রহ ও রক্তপাত নিষিদ্ধ যার মাঝে জিলহজ্জ্ব একটি। ইসলামের দুটি পবিত্র স্থানে রক্তপাত নিষিদ্ধ, মদীনা ও বিশেষভাবে মক্কার হারাম শরীফ। ১৯৮৭ সালে হাজীদের হত্যা করে ইসলামের এই দুটি নিষেধাজ্ঞাই লঙ্ঘন করেছিল আলে সৌদ। আর ২০১৫ সালেও তারা তা লঙ্ঘন করছে।

৫. ইয়েমেনে সৌদি আগ্রাসন

২৫ মার্চ, ২০১৫।

ইয়েমেনে সৌদি তাঁবেদার প্রেসিডেন্ট মানসুর হাদির ২২ জানুয়ারির পদত্যাগের পর জনপ্রিয় হুসি বিপ্লবীরা সরকারের দখল নিয়ে নিলে হুসি বিপ্লবীদের অগ্রযাত্রা শুরু হয়। এর ধারাবাহিকতায় ২৫শে মার্চ মানসুর হাদি পালিয়ে যান সৌদি আরব। আর তাঁবেদার প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতায় পুনর্বহাল করতে একই দিনে সৌদি আরব ইয়েমেনে বোমা হামলার মাধ্যমে আগ্রাসনের সূচনা করে, যা আজ অবধি চলছে। ইসলামে যে চারটি মাসে যুদ্ধ বিগ্রহ ও রক্তপাতকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, সে মাসগুলির তোয়াক্কা না করেই রজব ও যিলক্বদ মাসে সৌদি আরব আগ্রাসন চালিয়ে গিয়েছে। এবং এই হজ্জ্বের মাস যিলহ্জ্জ্ব এও তা থেমে নেই; যদিও এই মাসটিও নিষিদ্ধ মাস। ১৯৮৭ সালে যেমন তারা আল্লাহর মেহমানদের হত্যা করেছিলো নিষিদ্ধ মাসের তোয়াক্কা না করেই, এই ২০১৫ সালেও তারা সেটি করে যাচ্ছে ইয়েমেন। বেসামরিক এলাকায় হামলা করে এ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ হাজার ইয়েমেনীকে হত্যা করেছে সৌদি জোট, যার অধিকাংশই নারী-শিশু।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লজিস্টিক সাপোর্টে সৌদি আরবের নেতৃত্বে মিশর, বাহরাইন, কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ আরো কয়েকটি দেশ একত্রে দরিদ্র রাষ্ট্র ইয়েমেনে হামলা চালিয়ে আসছে গত মার্চ মাস থেকে। এমনকি রমজান মাসেও তারা হামলা চালিয়ে গিয়েছে। উপরন্তু দরবারী আলেম সৌদি গ্র্যান্ড মুফতি ফতোয়া জারি করে আগ্রাসনে অংশ নেয়া সৌদি যোদ্ধাদের জন্য রোজা মওকুফ করে দিয়েছেন!

 

৬. সৌদি গ্র্যান্ড মুফতি ও সৌদি ইসলাম

সৌদি সংবিধান অনুযায়ী সৌদি আরবের শাসনক্ষমতা সর্বদা আলে সৌদের (অর্থাৎ আবদুল আজিজ আল সৌদ এর বংশধর) হাতে থাকবে। (অতএব স্বাভাবিকভাবেই এখানে নিজেদের নেতা / শাসক বেছে নেয়ার কোনো সুযোগ জনগণের নেই।) এরপর বলা হয়েছে যে, কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে এদের মাঝে সবচে’ নীতিবান ব্যক্তি রাজা হবে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, প্রধানতঃ অলিখিত সংবিধানের এই রাজতন্ত্রে রাজা ও রাজবংশের সবাই কার্যতঃ আইনের ঊর্ধ্বে থাকেন। গ্র্যান্ড মুফতিকে রাজা নিজে নিয়োগ দেন ও পদচ্যুত করার ক্ষমতা রাখেন। আর এই গ্রান্ড মুফতির প্রভাবের অধীনেই দেশের বিচারকার্য পরিচালিত হয়। যেকারণে আমরা কখনও সৌদি গ্র্যান্ড মুফতিকে আলে সৌদের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলতে দেখি না, কোনো শাস্তি প্রদান করতে দেখি না। যদিও সৌদি রাজবংশের ব্যাপারে বহুসংখ্যক রক্ষিতা রাখাসহ অস্বাভাবিক রকম নিষিদ্ধ ভোগ বিলাসে মত্ত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়, তবুও সৌদি গ্র্যান্ড মুফতি ও শরিয়া বোর্ড নীরব! ইসলামের স্বর্ণযুগে বায়তুল মালের খরচের ব্যাপারে খলিফাকে একজন সাধারণ মুসলমান পর্যন্ত প্রশ্ন করার সুযোগ পেত, কিন্তু সৌদি গ্র্যান্ড মুফতি আলে সৌদের বিলিয়ন ডলারের বিলাসিতার কাছে এসে নীরব! বরং সৌদি গ্র্যান্ড মুফতি ও শরিয়া বোর্ড যত উদ্ভট ফতোয়া দিতে ব্যস্ত। যেমন, ইসরাইলের বিরুদ্ধে মিছিল করা হারাম, সিটবেল্ট বাঁধা শিরক, ইদে মিলাদুন্নবী পালন করা হারাম, আরবের সকল গির্জা ধ্বংস করতে হবে, দশ বছরের মেয়েদেরকে বিবাহে বাধ্য করা যাবে, নবীজির অবমাননার প্রতিবাদে মিছিল করা হারাম, মেয়েরা কলা স্পর্শ করতে পারবে না, দেয়ালের দিকে মুখ করে শু’তে পারবে না…। এবং এমন আরো অনেক কিছু। আর সম্প্রতি হাজীদের হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে তো বলেই দিয়েছে যে, এটা হলো ভাগ্য, এখানে হজ্জ্ব কমিটির প্রধান সৌদি প্রিন্সকে দোষারোপ করা যাবে না।

এরপরও যদি কেউ মনে করেন সৌদি আরবে ইসলামী শাসন কায়েম রয়েছে, তবে সে ব্যক্তির ন্যুনতম বিচারবুদ্ধিও লোপ পেয়েছে। বরং সেখানে জারি আছে নিপীড়নমূলক শাসনব্যবস্থা, ইসলামের নামে মানুষের মৌলিক অধিকার পর্যন্ত হরণ করে নেয়া, আর সৌদি বাদশাহসহ আলে সৌদের হাজার হাজার প্রিন্সকে আইনের ঊর্ধ্বে রেখে বিলিয়ন ডলারের ভোগ বিলাসে মত্ত থাকবার বৈধতা। আর তাইতো ১৯৮৭ সালের পাঁচশত হাজীর হত্যাকাণ্ডের কোনো বিচার হয়নি, বিচার হবে না ২০১৫র এই হত্যাকাণ্ডের, বিচার হবে না ইয়েমেনে অবৈধ আগ্রাসনের, বিচার হবে না আলে সৌদের কোনো অন্যায় অপকর্মেরই! সকল আইনের ঊর্ধ্বে থেকে দরবারী আলেমদের দিয়ে ইসলামের নামে নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা তৈরী করে রেখেছে এই আলে সৌদ। আর তাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে যেন মুসলিম বিশ্ব কোনো প্রশ্ন না তোলে, সেজন্যে দুটি অস্ত্র তারা ব্যবহার করছে: এক. মক্কা মদিনার জিম্মাদার হওয়া, দুই. তেলের টাকায় বিশ্বব্যাপী বিকৃত ওহাবী ইসলাম প্রচার করা।

৭. ওহাবী ইসলাম, সৌদি আরব ও ইসরাইল প্রতিষ্ঠার ইতিহাস

অস্ত্রের দ্বারা একের পর এক রাজ্য জয় করে “মুসলিম সাম্রাজ্যের সীমানা বৃদ্ধি” করাটা প্রকৃতই ইসলামের পন্থা, নাকি ইসলামের মূল স্পিরিট থেকে বিচ্যুতি, তা ভিন্ন আলোচনার দাবী রাখে। তবে মুহাম্মদ (সা.) এর জীবদ্দশায় ইসলামের রাজনৈতিক (অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনা) ও ধর্মীয় দিকে নানান মতের অস্তিত্ব ছিল না। ইসলামের রাষ্ট্রীয়, ধর্মীয় ও ধর্মীয়-রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডের পথ কেমন হবে সে বিষয়ে নবী-পরবর্তী চার খলিফার মাঝে গুরুত্বপূর্ণ মতপার্থক্য লক্ষ্য করা যায়, যার ঐতিহ্য ধরে আজকে ইসলামের শত মত ও পথের উদ্ভব ঘটেছে। তবে নবী-পরবর্তী মুসলমানদের বিগত প্রায় চৌদ্দশ’ বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, অল্প কয়েক বছর বাদে অধিকাংশ সময়েই রাজনৈতিকভাবে মুসলমানেরা সাম্রাজ্য বিস্তার ও নানান রূপের রাজতন্ত্রের চর্চা করেছে, তা সেটার যে নামই তারা দিয়ে থাকুক না কেন (খিলাফত অথবা সাম্রাজ্য)। যাহোক, রাজনৈতিকভাবে মুসলিম সাম্রাজ্য খুব দ্রুত বিস্তার লাভ করে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক অঞ্চলকে নিজেদের অধীনে নিয়ে আসে, তবে মোটামুটিভাবে তা কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অধীনেই ছিল, কেবল সময় সময় শাসনকর্তা / রাজার পরিবর্তন হয়েছিল মাত্র। সর্বশেষ “ওসমানী খিলাফতের” পতন ও খণ্ড খণ্ড হয়ে যাবার পিছনে খিলাফতের ভিতরের ও বাইরের নানান ষড়যন্ত্র কাজ করেছিল। ইউরোপ ও রাশিয়া এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, তবে ব্রিটিশ ষড়যন্ত্র ছিল সবচে’ জটিল ও কার্যকরী। যেই জ্ঞানচর্চায় মুসলিম জাতি একদা আলোর দিশারী ছিল, সেই বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা ছেড়ে দেবার কারণে তারা পিছিয়ে পড়লো, নানামুখী সামরিক আক্রমণ ও ষড়যন্ত্রে কাবু হয়ে পড়লো।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটেন ছিল ওসমানী খিলাফতের বিরুদ্ধে। ওসমানী খিলাফতকে খণ্ডিত করে দুর্বল করার উদ্দেশ্যে হিজাজের শাসক শরিফ হোসাইনকে খিলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে উস্কানি দেয় ব্রিটেন। ইরান ও আফগানিস্তান ছাড়া গোটা আরব তখন তুর্কি খিলাফতের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯১৬ সালে নিজেকে আরবের সুলতান বলে ঘোষণা করেন শরিফ হোসাইন। ১৯১৮ সালে ওসমানীরা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে হেরে যায়। কিন্তু ব্রিটেন একইসাথে নজদ অঞ্চলের আবদুল আজিজ বিন সৌদকেও ইন্ধন দিয়ে যাচ্ছিলো। ১৯২৪ সালে ব্রিটেন তার এক সেবাদাস শরিফ হোসাইনের প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করে অপর সেবাদাস আবদুল আজিজ বিন সৌদকে হেজাজের ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করে। ১৯২৭ সালে “জেদ্দা চুক্তিতে” আবদুল আজিজ আল সৌদ ব্রিটেনকে এই মর্মে দাসখত লিখে দেয় যে, সে অত্র অঞ্চলে ব্রিটেনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোথাও যুদ্ধ পরিচালনা করবে না, বিনিময়ে ব্রিটেন তার সাম্রাজ্যকে স্বীকৃতি দেবে। ১৯০২ সাল থেকে আরবের একটু একটু করে দখল করতে শুরু করা আবদুল আজিজ বিন সৌদ ১৯৩২ সালে তার সাম্রাজ্য বৃদ্ধি সমাপ্ত করে, এবং হিজাজসহ দখলীকৃত সংলগ্ন অঞ্চলের নাম পরিবর্তন করে তার নিজ বংশের নামে “সৌদি আরব” নাম রাখে। এভাবেই মুসলিম জাতির পবিত্র আবেগের স্থান হিজাজ (মক্কা ও মদীনা) ব্রিটিশ প্রভাবের অধীন হয়ে গেল। এটাই হলো বর্তমান সৌদি আরবের রাজনৈতিক ইতিহাস। আর ধর্মীয় দিক থেকে আবদুল আজিজ বিন সৌদ ওয়াহাবী মতবাদকে তার দখলীকৃত এলাকার (বর্তমান সৌদি আরবের) মুসলমানদের উপর চাপিয়ে দেয়।

প্রসিদ্ধ চার সুন্নি মাযহাব ও শিয়া মাযহাবের বহু বিষয়কে শিরক, বিদআত ইত্যাদি ফতোয়া দেয়া ইবনে তাইমিয়া (১২৬৩-১৩২৮) ইসলামের আধ্যাত্মিকতা বিবর্জিত এক রুক্ষ ইসলামের প্রচার করেন, এবং শিয়াদের বিরুদ্ধে একপ্রকার ধর্মযুদ্ধ ঘোষণা করেন। আবদুল ওয়াহহাব নজদী (১৭০৩-১৭৯২) ইবনে তাইমিয়ার মতবাদকে পুনরুজ্জীবিত করেন ও সেইসাথে নিজস্ব কিছু চিন্তাধারাও প্রচার করেন। এভাবেই প্রসিদ্ধ সুন্নি চার মাযহাব ও শিয়া মাযহাবের বিপরীতে ওহাবী মতবাদ দাঁড়িয়ে যায় (যদিও তারা নিজেদেরকে সালাফি বলতেই বেশি পছন্দ করে)। এই ওহাবী মতবাদের বাইরের যে কাউকে (মূলতঃ শিয়া ও সূফিদেরকে) কাফির আখ্যা দেয়া হয় ও হত্যা করা বৈধ ঘোষণা করা হয়। আজকের ISIS এর ধর্মীয় ভিত্তিও এটা। (তাদেরকে তাকফিরি গোষ্ঠী একারণেই বলা হয় যে, তারা মানুষকে তাকফির করে, অর্থাৎ কাফির ঘোষণা করে।) আধ্যাত্মিকতা বিবর্জিত ওহাবী-সালাফি এই রুক্ষ ইসলাম আল্লাহ তায়ালাকে শরীরি সত্ত্বা হিসেবে গণ্য করে, এবং তাদের মতবাদের সাথে পার্থক্য থাকা যেকোনো মুসলিম গ্রুপকে কাফির ও হত্যাযোগ্য গণ্য করে। (আজকে মধ্যপ্রাচ্যে ISIS কেবল শিয়াদেরই যে হত্যা করছে তা নয়, তারা বহু সুন্নি মুসলমানকেও হত্যা করেছে।)

মুসলিম বিশ্বে ব্রিটিশ গুপ্তচর হ্যামফার এর স্মৃতিকথা থেকে জানা যায় যে, উদ্ধত অস্থিরমনা যুবক আবদুল ওয়াহহাব নজদীকে মুসলিম বেশধারী ব্রিটিশ গুপ্তচর হ্যামফার বিকৃত ইসলাম প্রচারে উদ্বুদ্ধ করে। এই মতবাদ প্রচারের জন্য ১৭৪৪ সালে সৌদি রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ বিন সৌদের (যার বংশধারায় আধুনিক সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতার জন্ম) সাথে আবদুল ওয়াহহাব নজদী চুক্তিবদ্ধ হন এই শর্তে যে, মুহাম্মদ বিন সৌদ যুদ্ধের মাধ্যমে বিভিন্ন অঞ্চল দখল করে রাজ্য সম্প্রসারণ করবেন, আর আবদুল ওয়াহহাব নজদী ধর্মীয় নেতা হিসেবে সর্বদা তাকে সমর্থন দেবেন ও দখলীকৃত অঞ্চলের মানুষদের উপর “ওয়াহাবী ইসলাম” প্রয়োগ করবেন। আজকের সৌদি গ্র্যান্ড মুফতি কিভাবে সৌদি বাদশাহ ও প্রিন্সদের অনুগত দাসের ন্যায় আচরণ করেন, তা বুঝতে হলে এই ইতিহাস কাজে লাগবে।

এই হলো সংক্ষেপে বর্তমান সৌদি আরব প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক ইতিহাস ও আরবে রুক্ষ তাকফিরি ওহাবী ইসলামের শিকড় গেড়ে বসবার ইতিহাস। এরপর বিগত প্রায় একশত বছর ধরে ব্রিটিশ মার্কিন সেবাদাস এই আলে সৌদ তেলের টাকায় বিশ্বব্যাপী তাকফিরি ওহাবী ইসলামের প্রচার করেছে যা সুন্নি মাযহাবগুলোকে ক্রমশঃ গ্রাস করছে। ১৯১৭ সালের “ব্যালফোর ঘোষণায়” আবদুল আজিজ বিন সৌদ এর কাছ থেকে ব্রিটেন লিখিত সম্মতি আদায় করে যে, ফিলিস্তিন দখল করে ব্রিটেন যদি ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে, তবে তাতে সে আপত্তি জানাবে না। পরবর্তীতে ১৯২৪ সালে এই আবদুল আজিজ বিন সৌদকেই তারা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করে। ১৯৪৮ সালে প্রত্যক্ষ্য ব্রিটিশ সহযোগীতায় ফিলিস্তিন দখল করে জন্ম হয় যায়নবাদী ইসরাইলের।

সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা আবদুল আজিজ বিন সৌদ ব্রিটেনকে যে দাসখত লিখে দিয়েছিলেন, তা ছিল এই:

“আমি বাদশাহ আবদুল আজিজ ইবনে আবদুর রহমান – ফয়সলের বংশধর ও সৌদের বংশধর – হাজারবার স্বীকার করছি ও জেনেশুনে বলছি যে, মহান ব্রিটিশ সরকারের প্রতিনিধি স্যার কুকাস-এর সামনে স্বীকারোক্তি করছি এই মর্মে যে, গরিব ইহুদিদেরকে বা অন্য কাউকে ব্রিটিশ সরকার যদি ‘ফিলিস্তিন’ দান করে দেন তাহলে এতে আমার কোনো ধরনের আপত্তি নেই। বস্তুতঃ আমি কিয়ামত পর্যন্ত ব্রিটিশ সরকারের অভিমতের বাইরে যাব না।” (নাসিরুস সাইদ প্রণীত ‘আলে সৌদের ইতিহাস’)

কেন সৌদি গ্র্যান্ড মুফতি ইসরাইলের বিরুদ্ধে মিছিল করা হারাম ফতোয়া দেন, কিংবা তাকফিরি ISIS কেন শুধু মুসলমানদের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করে যাচ্ছে, অথচ জুলুমবাজ ইসরাইলের বিরুদ্ধে একটি গুলিও ছুঁড়ছে না, তা বুঝতে হলে এই ইতিহাসটি কাজে লাগবে। ১৯৮৭ সালে ফিলিস্তিনের পক্ষে আর ইসরাইল-আমেরিকার বিপক্ষে শ্লোগান দেয়া হাজীদের কেন তারা হত্যা করেছিল, তা বুঝতে হলেও এই ইতিহাস জানতে হবে।

৮. মুসলিম বিশ্ব নীরব

দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বিগত একশত বছর যাবত সৌদি পেট্রোডলার দেশে দেশে ইসলামপন্থীদের কিনে নিয়েছে। একারণেই বাংলাদেশসহ বিশ্বের সিংহভাগ মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় ইসরাইল প্রতিষ্ঠার ইতিহাস খুব কমই আলোচিত হয়, খুব কম মানুষই জানে হিজাজের নাম পরিবর্তন করে সৌদি আরব প্রতিষ্ঠার ইতিহাস। আজকে যখন মক্কায় হাজীদের হত্যাকাণ্ডে সৌদি সরকার ব্যাপকভাবে আলোচিত সমালোচিত হচ্ছে, তখন ইসলাম ও মুসলিমের মুখোশধারী শত্রু আলে সৌদের ইতিহাস জানানোর দায়বদ্ধতা অনুভব করছি।

সৌদি পেট্রোডলার এদেশের বড় বড় ইসলাপন্থী দল ও ব্যক্তিদের কিনে নিয়েছে, তাইতো আজকে আলে সৌদ যখন ইয়েমেনী ও সিরীয়দের হজ্জ্ব করতে বাধা দিচ্ছে, মসজিদুল হারামে রক্তপাত করছে, নিষিদ্ধ জিলহজ্জ্ব মাসে ইয়েমেনীদের হত্যা করছে, তখন আমাদের আলেম উলামা ও ধর্মীয় দলগুলো নীরব হয়ে রয়েছে! সৌদি পেট্রোডলারের কল্যাণে সোশ্যাল মিডিয়াতেও আমরা সৌদি অপকর্মের অনেক প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সমর্থক দেখতে পাচ্ছি; তারা বিশ্বের আর সব বিষয়ে উচ্চকিত কণ্ঠ হলেও ইহুদি-মার্কিন সেবাদাস আলে সৌদ যে হিজাজ দখল করে রেখেছে, এ বিষয়ে নীরব। তারা নীরব সৌদি রাজতন্ত্রের ব্যাপারেও, নীরব সৌদি বাদশাহদের অবৈধ ভোগবিলাসের ব্যাপারেও। তারা নীরব মজলুম ইয়েমেনীদের ব্যাপারে, নীরব তাকফিরি ISIS এর ব্যাপারে…। আজকে মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্র, ধর্মীয় দল ও ধর্মীয় ব্যক্তির “সিলেক্টিভ সচেতনতা” ও “সিলেক্টিভ অ্যাক্টিভিজম” এর কারণ কি, তা বুঝতে হলে সৌদি আরবের এই ইতিহাস জানতে হবে।

ইমাম খোমেনীর (র.) নেতৃত্বে স্বতঃস্ফূর্ত গণবিপ্লবের মাধ্যমে ১৯৭৯ সালে ইসলামী ইরান প্রতিষ্ঠা হলে ইহুদি-মার্কিন সেবাদাস সৌদি আরব নিজের অস্তিত্বের প্রতি হুমকি অনুভব করতে শুরু করে। একারণেই শিশুরাষ্ট্র ইসলামী ইরানকে ধ্বংস করতে পশ্চিমা বিশ্বের সহায়তায় সাদ্দাম হোসেন ১৯৮০ সালে ইরান আক্রমণ করলে সৌদি আরব অন্যান্য আরব রাষ্ট্রগুলোকে সাথে নিয়ে সাদ্দামকে সহায়তা করেছিল।

আজকে যখন ইয়েমেনে বিপ্লবী হুসিদের নেতৃত্বে স্বতঃস্ফূর্ত গণআন্দোলনে সৌদি তাঁবেদার সরকার উৎখাত হয়েছে, তখন সৌদি আরবের পেট্রোডলারে পুষ্ট ইসলামপন্থীরা বিশ্বব্যাপী একে “শিয়া ইরানের প্রভাব বিস্তার কৌশল” হিসেবে প্রচার করে আলে সৌদের আগ্রাসনকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সমর্থন দিচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি বুঝতে হলে এই বিষয়গুলো জানতে হবে। যদিও পেট্রোডলারের কাছে নিজেদেরকে বিক্রি করে দিয়ে মুসলিম বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্র/ ইসলামী দল/ ইসলামী ব্যক্তিত্ব নীরব হয়ে রয়েছে, তবুও ইরানের মত কিছু দেশ ও তাদের আলেমগণ নিজেদেরকে বিক্রি করে দেয়নি, ইহুদি-মার্কিন সেবাদাস হয়ে দাসখত লিখে দেয়নি। একারণেই বিপ্লবের অব্যবহিত পর থেকে ইসলামী ইরান ফিলিস্তিন ইস্যুতে সোচ্চার, প্রতিরোধ যোদ্ধা হামাসকে সর্বাধিক সাহায্য তারাই করে আসছে, এবং আলে সৌদের পেট্রোডলারে প্রচারিত বিকৃত, রুক্ষ ওহাবী ইসলামের বিপরীতে সত্যিকার ইসলামের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। তাই দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ইসলামপন্থী ব্যক্তি ও দলকে যখন “শিয়া শিয়া” ধুয়া তুলে ইরানের বিরোধিতা করতে দেখি, তখন এর পিছনে পেট্রোডলারের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ হাতটি দেখতে অসুবিধা হয় না।

সাম্প্রতিক হাজী হত্যাকাণ্ডে সৌদি সরকারের মুখোশ যখন উন্মোচন হতে শুরু করেছে, হজ্জ্ব পরিচালনায় আলে সৌদের অযোগ্যতার কথা যখন মানুষের মুখে মুখে উঠে আসছে, তখন এটাকেও “শিয়া ইরানের মক্কা দখলের ষড়যন্ত্র” হিসেবে চিত্রায়িত করে সত্যকে ধামাচাপা দেবার চেষ্টা করা হচ্ছে। দুঃখজনক যে, এই কাজে লিপ্ত আমাদেরই ভাই, বন্ধু, আলেম-ওলামা ও ইসলামী ব্যক্তিত্বগণ।

 

৯. প্রতিক্রিয়া

সাম্প্রতিক হাজী হত্যাকাণ্ডের বিপরীতে ইরান সোচ্চার হয়েছে। সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ী তিনদিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছেন। অন্যান্য মুসলিম দেশগুলোতেও রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা প্রত্যাশিত ছিল, যদিও তা আসেনি। ইরানে আলে সৌদের এই হাজী হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে। আর বিবেকের দায় থেকে অপ্রত্যাশিত অনেকেও প্রতিবাদ করছেন। ইরান এই হত্যাকাণ্ডের আন্তর্জাতিক বিচার দাবী করেছে। দাবী উঠেছে হজ্জ্ব পরিচালনাকে অযোগ্য আলে সৌদের হাত থেকে নিয়ে মুসলিম বিশ্বের হাতে সমর্পন করার।

নিঃসন্দেহে এটি যৌক্তিক দাবী। সৌদি আরবের মত বিলিয়ন ডলার ব্যয় না করেও বাংলাদেশে বিশ্ব ইজতেমায় প্রতি বছর ২৫-৩০ লাখ লোক-সমাগম ঘটে, এবং খুব সুষ্ঠুভাবেই তা সম্পন্ন হয়। প্রতি বছর ইরাকের কারবালায় এর কয়েক গুণ বেশি মানুষের সমাগম ঘটে, সেটাও সুষ্ঠুভাবেই পরিচালিত হয়। ইজতেমা ও কারবালার লোক-সমাগম হলো বড় বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠান সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার দুটি নজির মাত্র। এগুলি যখন সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হচ্ছে বছরের পর বছর, তখন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেও সৌদি আরব কেন হজ্জ্ব পরিচালনায় ব্যর্থ হচ্ছে, তা একটি যৌক্তিক প্রশ্ন। আল্লাহর মেহমান হাজীদের প্রতি তাদের উদাসীনতা ও রক্তপাতের ইতিহাসকে সামনে আনলে বরং এটা গোটা মুসলিম উম্মাহর প্রাণের দাবী হওয়া উচিত যে, শুধু হজ্জ্ব পরিচালনা নয়, বরং মক্কা মদীনাকে আমেরিকা-ব্রিটেনের অনুগত আলে সৌদের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করে গোটা মুসলিম বিশ্বের হাতে সমর্পন করা উচিত। আমি জানি এই যৌক্তিক দাবীকে অনেকেই “শিয়া ইরান কর্তৃক মক্কা মদীনা দখলের ষড়যন্ত্র” হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করবে, দেখবে। কিন্তু সেটা পেট্রোডলারের নেশার ঘোর।

তথ্যপ্রযুক্তির যুগে মানুষ সচেতন হবার সাথে সাথে এই নেশার ঘোর কেটে যাবে, মানুষ সচেতন হবেই, এবং আল আকসা মুক্ত করার মত করেই মক্কা মদীনা মুক্ত করার দাবী একদিন উঠবে, ইনশাআল্লাহ।

নূরে আলম মাসুদ

সেপ্টেম্বর ২৭, ২০১৫।

Leave a Reply