ইমাম খোমেনী

ইমাম খোমেনীর জীবন : এক ইসলামী বিপ্লবের ইতিহাস (১)

রুহুল্লাহর গল্প

ইমাম খোমেনী
ইমাম আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ আল মুসাভী আল খোমেনী।

বিশ্ব ইমাম খোমেনীকে প্রথমবারের মত চিনেছে ১৯৭৮ সালের শেষাশেষি, যখন ইরানের রাজতন্ত্রের বিরোধিতা করার কারণে তিনি ফ্রান্সে নির্বাসিত ছিলেন। প্যারিসের অদূরে বসে ইরানের শাহ মুহাম্মদ রেজা পাহলভীর বিরুদ্ধে ইমাম খোমেনীর ঘোষিত যুদ্ধ এবং আমেরিকা বিরোধী কঠোর বক্তব্য এক অভূতপূর্ব মিডিয়া কাভারেজ এনে দিলো, এবং ইমামকে বিংশ শতকের অন্যতম বিপ্লবী চরিত্র হিসেবে পরিচিত করলো। পত্রপত্রিকা আর নিউজ বুলেটিনে তাঁর ছবি ভরে উঠলো। এই ছবি বিশ্বের অসংখ্য মানুষের কাছে, বিশেষতঃ পশ্চিমা বিশ্বের কাছে নিতান্তই অপরিচিত ছিলো। সাদা দাড়ি এবং কালো পাগড়িধারী এই মানুষটিকে দেখে মনে হতো যেনো ইতিহাসের পাতা থেকে সময় অতিক্রম করে বর্তমানে চলে এসেছেন। তাঁর সমস্তকিছুই ছিলো নতুন আর অপরিচিত। এমনকি তাঁর নামটিও : রুহুল্লাহ। আর দুনিয়ার অসংখ্য পলিটিশিয়ান ও সাংবাদিকদের মনে যে প্রশ্নটি নাড়া দিয়ে যাচ্ছিলো, তা ছিলো : কী ধরণের বিপ্লবী মানুষ এই খোমেনী ?

আব্রাহাম লিঙ্কন, লেনিন, চার্চিল, হিটলার, মুসোলিনির মত বিপ্লবী থেকে শুরু করে আবদুল নাসের, নেহেরু, ক্যাস্ট্রো হয়ে এমনকি চে গিভারার কথায় মুখর দুনিয়ার মাঝে খোমেনী ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি এমন এক ইসলামী বিপ্লবের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, যার বিজয় ছিলো অবধারিত। তিনি কমিউনিস্ট ছিলেন না, ছিলেন না ক্যাপিটালিস্ট কিংবা ন্যাশনালিস্ট। প্রথমত তিনি ছিলেন একজন ইসলামী নেতা, দ্বিতীয়ত ইরানের জনগণের নেতা। তাঁর শ্লোগান ছিলো : পশ্চিমের মতও নয়, পূর্বের মতও নয়, শুধু ইসলামী প্রজাতন্ত্র চাই।

ইরানের ম্যাপ
ইরানের ম্যাপ

ইমাম খোমেনীর পিতার নাম ছিলো সাইয়্যেদ মোস্তফা মুসাভি আল খোমেনী। তিনি ছিলেন অত্যন্ত উঁচুদরের আলেম। ইরাকের নাজাফ ও সামেরায় পড়াশুনা করে একজন বিশিষ্ট মুজতাহিদ হিসেবে পরিচিত হন তিনি। খোমেইন প্রদেশে অত্যন্ত প্রভাবশালী ইসলামী নেতা ছিলেন তিনি। কিন্তু তৎকালীন অত্যাচারী জমিদার শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর কারণে তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। আর এসময়েই জন্ম হয় তাঁর তৃতীয় সন্তানের : সাইয়্যেদ রুহুল্লাহ আল মুসাভি আল খোমেনী। যিনি কালক্রমে হয়ে ওঠেন আয়াতুল্লাহ খোমেনী, এবং একপর্যায়ে ইরানসহ সারাবিশ্বের অসংখ্য মুক্তিকামী মানুষের বিপ্লবের চেতনা : ইমাম খোমেনী।

ইমাম খোমেনীর জীবন ও ইরানের ইসলামী বিপ্লবের বিস্ময়কর ইতিহাস বিশ্বের বহু মুক্তিকামী মুসলমানের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে নিঃসন্দেহে।

জন্ম ও শৈশব

শৈশবে ইমাম খোমেনী।
শৈশবে ইমাম খোমেনী।

ইরানের খোমেইন প্রদেশে এক সম্ভ্রান্ত আলেমের গৃহে জন্ম নেয়া রুহুল্লাহ খোমেনী জন্মের পর পিতার মুখ দেখার সুযোগ পাননি। অত্যাচারী শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে জিহাদে তাঁর পিতা শহীদ হন। এতিম রুহুল্লাহ খোমেনী তাঁর জীবনের মাধ্যমে ইতিহাস গড়তে শুরু করেন। তার জীবন ছিলো বিস্ময়কর, যেনো ইসলামী এক বিপ্লবের জন্যই আল্লাহ তায়ালা তাকে প্রস্তুত করছিলেন। সাত বছর বয়সে কুরআনের হাফেজ, পরবর্তী কয়েক বছরে গণিত শিক্ষা সমাপ্ত, সহপাঠীদের পড়া বুঝতে সাহায্য করার মাধ্যমে শিক্ষকতার আরম্ভ, খেলাখুলা, সাঁতার, দৌড়, ঘোড়ায় চড়া, এমনকি অস্ত্র পরিচালনা পর্যন্ত – সবকিছুতেই অপ্রতিদ্বন্দ্বী এবং অত্যন্ত দক্ষ হয়ে বেড়ে ওঠেন ইমাম খোমেনী। সেসময়ে ইরানকে সম্মিলিতভাবে শাসন করতো ব্রিটেন ও সোভিয়েত রাশিয়া। রাশিয়ান বাহিনী আক্রমণ করলে আত্মরক্ষার জন্য ১২ বছর বয়সে বড় ভাইয়ের সাথে অস্ত্রও ধরেন তিনি।

তরুণ রুহুল্লাহ খোমেনী।
তরুণ রুহুল্লাহ খোমেনী।

১৫ বছর বয়সে মা মারা যান। ইতোমধ্যেই তিনি আরবী সাহিত্য অধ্যয়নসহ বড়ভাই আয়াতুল্লাহ পসন্দিদাহ এর কাছে যুক্তিবিদ্যা, আরবী ব্যাকরণ, ইত্যাদি শিক্ষা করেন। এরপর ১৭ বছর বয়সে আরাকে গমন করে শেখ মুহাম্মদ গোলপায়গানীর কাছে উচ্চতর যুক্তিবিদ্যা ও আব্বাস আরাকীর কাছে শরহে লুময়া নামক ফিকাহর বই অধ্যয়ন করেন।

কোম নগরীতে গমন

ইমাম খোমেনী
১৮ বছর বয়সে কোমে অধ্যয়ন শুরু।

১৮ বছর বয়সে ইরানের ধর্মীয় নগরী কোম এ গমন করেন ইমাম খোমেনী, যেখানে তাঁর বিপ্লবী জীবনের সূচনা হয়। সেখানে তিনি ফিকাহ শাস্ত্রে উচ্চতর শিক্ষা লাভ করেন। কিন্তু অপরাপর আলেমদের মত তিনি কেবল ফিকাহ শিক্ষাতে সন্তুষ্ট ছিলেন না। তিনি যুক্তি ও দর্শন শাস্ত্রের পাশাপাশি ইসলামের ইরফানী (আধ্যাত্মিক) শাখায় জ্ঞান অর্জন করতে শুরু করেন। তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিলো এই বিষয়ে। দর্শন ও ইরফানী ধারায় তিনি প্রায় সাত বছর শিক্ষা নেন কোমের আলেম শেখ মুহাম্মাদ আলী ইসফাহানী শাহ আবাদীর কাছে। এভাবে বিভিন্ন নামকরা আলেমের কাছে বিশেষায়িত শিক্ষায় দীক্ষা নেন তিনি।

তবে কোমের বেশিরভাগ আলেমই পলিটিক্স থেকে সচেতন দূরত্ব বজায় রেখে চলতেন। এর কারণও ছিলো বটে। অত্যাচারী শাসকের বিরোধিতা করলে সে সময়ে গোটা মাদ্রাসাই বন্ধ হয়ে যাবার আশঙ্কা ছিলো। সুতরাং পণ্ডিতগণ কৌশলগত কারণে শরিয়া শিক্ষা দেবার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন। তবে ইমাম খোমেনী মাঝে মাঝে তেহরানে যেতেন এবং আয়াতুল্লাহ হাসান আল মুদাররেস এর পলিটিকাল বিষয়ের লেকচার শুনতেন। আয়াতুল্লাহ হাসান আল মুদাররসে ছিলেন এ ব্যাপারে সমসাময়িক আলেমগণের ব্যতিক্রম।

রেজা পাহলভীর ক্ষমতা গ্রহণ

রেজা শাহ পাহলভী।
রেজা শাহ পাহলভী।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জয়লাভের পর ইরানে নতুন সরকার নিয়োগ করলো ব্রিটেন। সমর এবং অর্থ মন্ত্রণালয় সরাসরি ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হবার আইনী বৈধতা লাভ করলো। আয়াতুল্লাহ মুদাররেস, যাঁর পলিটিকাল লেকচার শুনতে ইমাম খোমেনী মাঝে মাঝে তেহরান গমন করতেন, তিনি রাজা আহমদ শাহকে চাপ প্রয়োগ করলেন অপমানজনক আইন প্রত্যাহার করতে। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য, সেসময়ের শাসকেরা আলেমগণকে সমীহ করতেন একারণে যে সাধারণ মানুষের মাঝে আলেমগণের অত্যন্ত সম্মান ও গ্রহণযোগ্যতা ছিলো। যাহোক, ব্রিটেনকে নির্লজ্জভাবে সমর ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ দেবার কারণে মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়লো। শায়খ মুহাম্মাদ আল খায়বানি ও মির্জা কুজাক খান সরকারের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করলেন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ব্রিটেন এক ইরানি সাংবাদিককে প্রাইম মিনিস্টার নিয়োগ করলো। আর এই নতুন প্রাইম মিনিস্টারের সাথে ষড়যন্ত্র করে আর্মি অফিসার রেজা শাহ ক্ষমতা দখল করে নিলো। ক্ষমতায় এসেই শুরু করলো বিরোধীমতের সকলকে গণগ্রেফতার।

১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দে শুরু হলো রেজা শাহ এর শাসন – রেজা শাহ, ইমাম খোমেনীর বিপ্লব যার ছেলের পতনের মাধ্যমে সাফল্য লাভ করে আরো প্রায় অর্ধশত বছর পরে। শুরু হলো ইরানে পাহলভী রাজবংশের শাসন। আর প্রায় একইসময়ে কোম নগরীর সুবিশাল ফায়জিয়া মাদ্রাসায় শুরু হলো ইমামের প্রাথমিক বিপ্লব, আর তা ছিলো তৎকালীন সর্বোচ্চ আলেমগণের কাছে তাঁর চিন্তাভাবনা প্রকাশ করা এবং আলেমগণকে তাঁর মতের সপক্ষে একত্রিত করা।

জনগণ ও ইসলামের উপর সর্বাত্মক আক্রমণ

২৯ বছর বয়সে তিনি বিয়ে করেন সম্ভ্রান্ত আলেম সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ আল তাক্বাফীর মেয়েকে। কোমেই জীবন যাপন করতে থাকেন তিনি। ওদিকে রেজা শাহ দেশের মোট কৃষিজমির অর্ধেক নিজের নামে রেজিস্ট্রি করে নিয়ে সাধারণ কৃষকদের দাসে পরিণত করলো। এছাড়াও নানাভাবে চলতে থাকলো জনগণের উপর অত্যাচার নির্যাতন। তুরস্ক থেকে ঘুরে এসে সেক্যুলার কামাল আতাতুর্কের অনুকরণে ইরানেও ইসলামকে মুছে ফেলার ষড়যন্ত্র করলো এই শাহ। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে হিজাবের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলো, নিষিদ্ধ হলো জুমার খুৎবা ও কারবালার শোকসভা। আলেমগণের পাগড়ি পরার উপরেও জারি হলো নিষেধাজ্ঞা। দাড়ি রাখলে ট্যাক্স দিতে হতো। বাতিল হলো হিজরী ক্যালেন্ডার। স্কুলগুলোয় বন্ধ করা হলো ইসলামী শিক্ষা। কোথাও কুরআন শিক্ষা দেয়া যেত না। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের বাংলাদেশে এখন অনেকটা উপরোক্ত অবস্থারই সৃষ্টি হয়েছে। যাহোক, এসবের মাঝেই রেজা শাহ তার ছেলে মুহাম্মাদ রেজা পাহলভীকে শাসনভার গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত করছিলো। একইসময়ে যার ভবিষ্যৎ শত্রু ইমাম খোমেনী তখন জিহাদের এক নীরব প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন ধর্মীয় নগরী কোমের এক মাদ্রাসায়। আলেমগণের মাঝে সীমাবদ্ধ সেই বিপ্লব ছিলো ইরানের ইসলামী বিপ্লবের প্রথম ধাপ।

কোমে ইমামের জীবন

ইমাম খোমেনী

রেজা পাহলভীর শাসনকাল থেকেই কোমের আলেমগণ অত্যাচারনির্যাতন ও গ্রেফতারের সম্মুখীন হতে থাকেন। গ্রেফতার এড়াতে তাঁরা প্রায়ই ভোরে পালিয়ে যেতেন মাদ্রাসা থেকে, আবার সন্ধ্যায় ফিরে আসতেন। রেজা পাহলভীর বাহিনী মাঝে মাঝে আলেমদের থানায় নিয়ে যেত। পাগড়ি পরায় তো নিষেধাজ্ঞা ছিলোই, উপরন্তু আলেমগণের জোব্বা ছিঁড়ে তাদেরকে অপমান করা হতো। এর মাঝেই ইমাম খোমেনী যুবক বয়সে শিক্ষকতা শুরু করেন। অত্যন্ত মেধাবী ইমাম খুব দ্রুত সেখানে উচ্চস্তরের শিক্ষা গ্রহণ করে নিজেই ক্লাস নেয়া শুরু করেন। একইসাথে তিনি তাঁর ওস্তাদগণের কাছেও শিক্ষা নিতে থাকেন তাঁদের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত।

ইমামের আগমণের আগ পর্যন্ত ফায়জিয়া মাদ্রাসায় শরীয়তের শিক্ষাদানই চলতো বেশি। কিন্তু ইমামের বিশেষ আগ্রহ ছিলো নৈতিক শিক্ষার দিকে। বিশেষতঃ ডিসিপ্লিনের শিক্ষা, আত্মিক পরিশুদ্ধি, আধ্যাত্মিকতা – ইত্যাদি নিয়ে তিনি প্রতি বৃহস্পতিবার ক্লাস নিতে শুরু করেন। এই ক্লাস বেশ অনেক বছর ধরে চলে। ৩০ জন ছাত্র থেকে শুরু করে তাঁর ক্লাসের জনপ্রিয়তা এতই বেড়ে যায় যে, হাজারের উপরে সিনিয়রজুনিয়র আলেম তাঁর ক্লাসে অংশগ্রহণ করতে শুরু করেন। ইমাম তাঁর ক্লাসে বলতেন :

আমরা কি কোনো শোক অনুষ্ঠানে এসেছি নাকি ? আপনারা আমাকে জটিল প্রশ্ন করুন। বিরোধিতা করুন। যেখানে শিক্ষককে কোনো জটিল প্রশ্ন উত্থাপন করা হয় না, সেটা রিসার্চের জায়গা নয়, সেটা হয় শোক অনুষ্ঠান।”

ইমাম খোমেনী
ডিসিপ্লিন, আত্মিক পরিশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিকতা বিষয়ক শিক্ষক।

এভাবে রুহুল্লাহ খোমেনী হয়ে ওঠেন আলেমগণের মাঝে সবচেয়ে কমবয়েসী কিন্তু গভীর প্রজ্ঞাসম্পন্ন শিক্ষক। আত্মার পরিশুদ্ধি শিক্ষা দেবার পাশাপাশি ইমাম দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজ খবর রাখতেন। তিনি ইরান ও ইরানের বাইরের তৎকালীন ইসলামী বিপ্লবীদের সাথে দেখা করেন। তাদের বিপ্লবের অব্স্থা ও প্রতিকূলতা সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেন। এসময়ে ইমাম সাধারণ মানুষের মাঝে ইসলামী নেতৃবৃন্দ ও আলেমগণের প্রভাব বৃদ্ধি করতে তৎপর হন। যদিও সেটা ছিলো এমন এক সময়, যখন ইসলামী প্রতিষ্ঠানগুলো সবচেয়ে বেশি প্রতিকূলতার সম্মুখীন।

সেসময়ে, অর্থাৎ প্রথম পাহলভী রাজা, রেজা পাহলভীর শাসনামলে আলেমদের নেতৃত্বে ইসলামী বিপ্লব করার মত দৃঢ় ভিত্তি ছিলো না। সুতরাং ইমামের প্রথম বিপ্লবটা ছিলো আলেমগণকে শক্তিশালী করা; নিজেদের ভিতরে এবং জনগণের মাঝেও। আলেমগণের এক সভায় ইমাম বলেছিলেন :

আপনাদের খুৎবায় অবশ্যই রাজনৈতিক বিষয়ের আলোচনা থাকতে হবে। কারণ জুমার নামাজ হলো সম্পূর্ণরূপে একটি পলিটিকাল ইবাদত। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে দেখতে পাচ্ছি যে, আমাদের জুমার খুৎবাগুলোর সাথে মানুষের চাহিদার কোনো সম্পর্ক নেই। মুসলিম সমাজের চাহিদার প্রতিফলন নেই। মসজিদই হলো সেই জায়গা যেখানে পলিটিকাল ইস্যু উত্থাপিত হবে। কিন্তু দূর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা মসজিদকে মুসলমানদের স্বার্থ থেকে অনেক দূরে সরিয়ে ফেলেছি।…”

কথাগুলো আমাদের দেশসহ বহু জায়গায় এখনও প্রযোজ্য।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও রেজা শাহের ছেলের ক্ষমতা গ্রহণ

মুহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভী ও রানী ফারাহ দিবা।
মুহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভী ও রানী ফারাহ দিবা।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলো। ইরানের শাহ রেজা পাহলভী নাৎসি জার্মানির পক্ষ নিয়ে করুণভাবে পরাজিত হলো। শত্রুপক্ষ ইরানের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়তে শুরু করলো। তখন ১৯৪১ সাল। ব্রিটেন সিদ্ধান্ত নিলো রেজা শাহকে সরিয়ে ফেলতে হবে। তাদের পরিকল্পনা ছিলো রেজা শাহকে ইটালিতে নির্বাসনে পাঠিয়ে তার ছেলে মুহাম্মাদ রেজা পাহলভীকে রাজক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করা। সেমতো তারা মুহাম্মাদ রেজা শাহকে ক্ষমতায় নিয়ে এলো। প্রসঙ্গতঃ বলতে হয়, বিশ্বের অন্যান্য দেশের আভ্যন্তরীন ব্যাপারে নাক গলানোর এই স্বভাব ব্রিটেনের এখনো যায়নি, এবং ব্রিটেনসহ বড় বড় অন্যান্য শক্তি আজো বিশ্বের বহু দেশের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে চলেছে।

শুরু হলো ইরানের সর্বশেষ শাহ মুহাম্মাদ রেজা পাহলভীর শাসন। তরুণ শাহ তখন ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করতে পারেনি যে তারই শত্রু ইমাম খোমেনী ততদিনে ২৫০০ বছরের রাজতন্ত্র উৎখাতের বিপ্লব অর্ধেকটা শেষ করেছেন: আলেমগণ ইমামের নেতৃত্বে ভবিষ্যৎ বিপ্লবের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তখন।

ইমামের বই প্রকাশিত হলো : কাশফআলআসরার (রহস্য উন্মোচন)। এখানে তিনি শাহের তীব্র সমালোচনা করেন। সেইসাথে ইসলাম প্রতিষ্ঠায় আলেমগণের ভূমিকা নিয়ে কথা বলেন। এই বইয়ে তিনি বলেন :

“(ইসলাম) ধর্ম ও রাজনীতি (পলিটিক্স) আলাদা নয়। যারা ধর্ম থেকে রাজনীতিকে আলাদা করতে চায়, তারা না বোঝে পলিটিক্স, আর না তাদের আছে ধর্মের জ্ঞান।

ধর্ম থেকে রাজনীতিকে আলাদা করা পশ্চিমাদের ইচ্ছা বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

বেলায়েতে ফকীহ

ইমাম খোমেনী তাঁর বইয়ে তুলে ধরেন তাঁর যুগান্তকারী ধারণা : বেলায়েতে ফকীহ – ফিহাহবিদদের শাসন – Governance of jurists. তৎকালীন ইরানী আলেমগণকে এই ধারণায় আশ্বস্ত করা ছিলো তাঁর বিপ্লবের প্রথম সাফল্য। আগেই উল্লেখ করেছি যে তৎকালীন আলেমগণ পলিটিকাল কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের বিরোধী ছিলেন নানা কারণে। সরকারী অত্যাচার ও হুমকি ছাড়াও তাঁদের পলিটিক্সে অংশগ্রহণ না করার আরেকটি বড় কারণ ছিলো চিন্তাগত। তাঁদের অধিকাংশই বলতেন যে, ইসলামী হুকুমত প্রতিষ্ঠা করবেন ইমাম মাহদী (.)। এটি আমাদের কাজ নয়। আমাদের কাজ কেবল মানুষকে শরীয়তসহ ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা দেয়া।

ইমামের প্রথম বিপ্লব ছিলো আলেমগণকে এই ধারণা থেকে বের করে এনে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জানানো। বেলায়েতে ফকীহনামক আলোচনায় তিনি ধর্মীয় নেতৃবৃন্দকে শাসনক্ষমতা অধিগ্রহণ করার আহবান জানান। তিনি বলেন যে, ইসলামী আইনসমূহ শুধুমাত্র পাঠ করার জন্য দেয়া হয়নি, বরং ইসলামী আইনসমূহ আল্লাহ তায়ালা দিয়েছেন কার্যকর করার জন্য। আর ইসলামী আইন কার্যকর ও প্রতিষ্ঠা করতে একটি ইসলামী সরকারের অপরিহার্য। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন লেকচারে ইসলামী রাষ্ট্র কেনো প্রতিষ্ঠা করতে হবে ও ইসলামী রাষ্ট্রের রূপরেখা ও স্বরূপ কী, তা আলোচনা করেন। তাঁর এই বক্তব্যগুলো এতই বিখ্যাত হয়ে ওঠে যে, এগুলো পরবর্তীতে মুসলিমঅমুসলিম বিভিন্ন চিন্তাবিদের গবেষণার বস্তু হয়ে ওঠে। ইমাম বলেন :

বর্তমানে আমাদের মাঝে যে ইসলাম আছে, তা থেকে পলিটিক্সকে সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। তারা ইসলামের মূল ভিত্তিকে বাদ দিয়ে দিয়েছে, আর বাকিটুকু আমাদেরকে দিয়েছে। একারণেই ইসলাম সম্পর্কে আমাদের (সমাজের) এই অজ্ঞতা। আমরা জানিই না ইসলামের মৌলিক অংশটা কী। যতদিন পর্যন্ত না মুসলমানরা ইসলামকে খুঁজে পাবে, ততদিন পর্যন্ত আমরা গৌরব অর্জন করতে পারবো না।…”

কমিউনিস্টদের উত্থান

ইমাম খোমেনী
মাদ্রাসার সিলেবাসে দর্শন ও যুক্তিশাস্ত্র অন্তর্ভুক্ত করেন।

১৯৫০ সালের দিকে ইরানে কমিউনিস্টদের উত্থান ঘটলো। মার্কসবাদের প্রচার চলতে লাগলো ব্যাপকভাবে। তথাকথিত জাতীয়তাবাদী পার্ট, তুদা পার্টি ইত্যাদি বামপন্থী দল নাস্তিক্যবাদী ধ্যান ধারণাকে প্রতিষ্ঠা করার কাজে লেগে পড়লো। আর বিপরীতে ইরানের ইসলামপন্থী মহল লেগে পড়লেন তাদেরকে মোকাবিলা করতে। এটা অস্ত্রের যুদ্ধ ছিলো না, এ যুদ্ধ ছিলো মানুষের মস্তিষ্ক দখলের। এসময়ে ইমাম খোমেনী হাওজাগুলোতে (ধর্মশিক্ষা কেন্দ্রে) এক ইন্টেলেকচুয়াল বিপ্লব শুরু করেন। তিনি আলেমগণের পাঠ্যসূচীতে যুক্তিশাস্ত্র ও দর্শনকে অন্তর্ভুক্ত করেন। উদ্দেশ্য : মার্কসবাদী ও নাস্তিক্যবাদী দর্শনকে মোকাবিলা করা ও দূরীভুত করা। প্রসঙ্গত, ইরানের ধর্মীয় নগরী কোমএর হাওজাগুলোতে আলেমগণ বছরের পর বছর ইসলাম নিয়ে জ্ঞান গবেষণা করে থাকেন। সেখানের সর্বশেষ পাঠ্যসূচী নিম্নরূপ, যা সমাপ্ত করতে ব্যক্তিভেদে ৩০৪০ বছর লেগে যায়। . যুক্তিবিদ্যা, . উসুলে ফিকাহ, . ফিকাহ, . তাফসিরএ কুরআন, . উলুমএ কুরআন, . ইলমআল হাদীস, . ইলমআর রিজাল, . ইতিহাস, . ধর্মতত্ত্ব (কালামশাস্ত্র), ১০. ল্যাঙ্গুয়েজ স্টাডিজ, ১১. ইসলামী দর্শন, ১২. ইরফান (ইসলামী আধ্যাত্মিক ধারা)

অপরাপর আলেমগণের তুলনায় দর্শন ও যুক্তিশাস্ত্রে ইমামের অবস্থান ছিলো অনেক উঁচুতে। এছাড়াও ইরফানী শাখায় তিনি যে উচ্চ স্তরের জ্ঞানলাভ করেন, তা সমসাময়িক আলেমগণকে বিস্মিত করে। দর্শন সম্পর্কে ইমাম বলেন :

দর্শন সার্বিকতা নিয়ে কথা বলে। যেমন, আল্লাহর কাছে বস্তুর আপেক্ষিকতা। পুরনো এবং নতুনের সম্পর্ক। আধ্যাত্মিক মানুষেরা এর কিছু বিষয় আমাদের সামনে এনেছেন। কিন্তু সেই মাত্রার সম্পর্কে পৌঁছানো। যেটা এই আয়াতে বলা হয়েছে : “তোমরা যেখানেই থাকো তিনি তোমাদের সাথে আছেন” – এর অর্থ কী ? এই আয়াতের অর্থ কী যে আমি তোমাদের ঘাড়ের রগের চেয়েও নিকটবর্তী” ? এই কাছে থাকা, নিকটবর্তী থাকার মানে কি এই যে দুজন মানুষ যেভাবে পরস্পরের কাছে থাকে ? নাকি এটা অন্যকিছু, যা আমাদের বোঝার ক্ষমতার বাইরে ?”

ইমাম খোমেনী
ইরফান বিষয়ে ইমামের ছিলো বিশেষ আগ্রহ।

হাওজার সিলেবাসে দর্শন ও যুক্তিবিদ্যার অন্তর্ভুক্তি ইমামের এমন একটি অবদান, যা থেকে মুসলিম বিশ্ব বহুকাল উপকৃত হতে থাকবে। এভাবে তিনি নাস্তিক্যবাদী দর্শনকে ইসলামী দর্শন ও যুক্তিশাস্ত্র দিয়ে মোকাবেলা করেন।

যদিও ইমাম ইরফানের উপর বই লিখেছিলেন, কিন্তু তাঁর ইরফান (আধ্যাত্মিক ধারা) ক্লাসের লেকচারগুলো ছিলো অত্যন্ত গোপন, এবং তাঁর এই ক্লাসে দুইজনের বেশি ছাত্র থাকতো না একসাথে। এই গোপনীয়তার একটি কারণ সম্ভবতঃ এই যে, উচ্চস্তরের আধ্যাত্মিক ধ্যানধারণা সাধারণ মানুষের কাছে বিভ্রান্তিকর মনে হতে পারে। এছাড়া উচ্চস্তরের আধ্যাত্মিক চর্চা সকলের জন্য প্রয়োজনীয়ও নয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন কারণে ইমাম খোমেনী ইরফানের উপর ক্লাস নেয়া বন্ধ করে দেন।

তবে ইমাম আভ্যন্তরীণ বিরোধিতার সম্মুখীন যে হননি, তা নয়। অনেক আলেম তাঁর বিরোধিতা করেন এই যুক্তিতে যে, ইমাম খোমেনী ঐতিহ্য ভঙ্গ করছেন। দর্শন শিক্ষা ও পলিটিক্সে অংশগ্রহণ হাওজার (দ্বীনি শিক্ষাকেন্দ্র) কাজ নয়। হাওজার কাজ শুধু উসুলে ফিকাহ শিক্ষা দেয়া। আসলে ইমাম খোমেনী বহির্বিশ্বে যেমন প্রতিরোধের সম্মুখীন হন, তেমনি তাঁকে অনেক সময় মুখোমুখি হতে হয় আলেমগণেরও। এভাবেই চড়াই উৎরাই পেরিয়ে ইমামের বিপ্লব অগ্রসর হতে থাকে। এর মাঝে ১৯২৮ থেকে ১৯৪২ সাল পর্যন্ত ১৪ বছরে দর্শন, ইরফান, আত্মশুদ্ধি ও নৈতিকতার উপর ইমামের তেরটি বই প্রকাশিত হয়।

হাওজার সর্বোচ্চ নেতা

আয়াতুল্লাহ আবদুল করিম আল হায়েরী আল ইয়াজদি ছিলেন ইমামের আধ্যাত্মিক গুরু এবং কোমের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা। ১৯৪৭ সালে তাঁর মৃত্যুর পর নতুন নেতার সন্ধান শুরু হলো। ইমাম খোমেনীর কার্যকরী ভূমিকার ফলে আয়াতুল্লাহ বুরুজারদী হাওজার পরবর্তী সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা হওয়ার অনুরোধ মেনে নেন। আয়াতুল্লাহ বুরুজারদী ছিলেন সে অঞ্চলের মুসলমানদের অবিসংবাদিত সর্বোচ্চ নেতা। ইমাম খোমেনী তাঁরও একজন ছাত্র ছিলেন। আর এই সময়ে বিভক্তির আশঙ্কা করে ইমাম খোমেনী পলিটিকাল বিষয়ে কাজকর্ম বন্ধ রাখেন। আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ বুরুজারদী না বললে তিনি কোনো ধরণের পলিটিকাল কাজকর্ম করা থেকে বিরত থাকেন। তাঁর চিন্তা ছিলো যে আগে আলেমগণের ঘাঁটি হাওজাকে যথেষ্ট শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, এরপর পলিটিকাল ফিল্ডে প্রবেশ করতে হবে। এছাড়াও পলিটিকাল বিষয়ে হাওজা অংশগ্রহণ করলে আয়াতুল্লাহ বুরুজারদী বিতর্কিত হতে পারেন, এই আশঙ্কায় তিনি পলিটিকাল ব্যাপারে কার্যতঃ নীরব হয়ে যান সেসময়। কিন্তু প্রাজ্ঞ আয়াতুল্লাহ বুরুজারদী ইমাম খোমেনীকে নিয়োগ করলেন তাঁর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে। এছাড়াও তাঁকে দায়িত্ব দিলেন হাওজার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পেয়ে ইমাম খোমেনী হাওজার সিলেবাসে প্রয়োজনীয় সংশোধন আনতে সক্ষম হন।

এসমস্ত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ফায়জিয়া মাদ্রাসায় তাঁর শিক্ষকতা চলতে থাকে। সেইসাথে চালু রাখেন বই লেখা। ১৯৪৯ থেকে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত আরবী ভাষায় তিনি ফিকাহ শাস্ত্রের উপর আরো কিছু বই প্রকাশ করেন।

ইসরাঈল রাষ্ট্রের জন্ম : মুসলিম বিশ্বে শয়তানের প্রাণভোমরা

ইসরাইলের ম্যাপ
অবৈধ যায়নবাদী রাষ্ট্র ইসরাঈল।

১৯৪৮ সালে ব্রিটেনসহ শয়তানি শক্তিগুলোর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ফিলিস্তিনের একটা বড় অংশ জবরদখল করে ইহুদী রাষ্ট্র ইসরাঈল প্রতিষ্ঠা হলো। বিতাড়িত হলো ফিলিস্তিনিরা তাদের জন্মভূমি থেকে। শুরু হলো মুসলিম বিশ্বের এক নতুন ঈমানী পরীক্ষা : ফিলিস্তিন মুক্ত হবে কী ? প্রথম কিবলা বায়তুল মুকাদ্দাস ফিরে পাবো কি ?

ইমাম খোমেনী প্রায়ই তাঁর লেকচারে ফিলিস্তিন মুক্ত করার সক্ষমতা অর্জনের কথা বলতেন। শাহাদাতে অনুপ্রেরিত করে ইমাম বলেছিলেন :

প্রতিটি কাজকেই আগে গভীর পর্যবেক্ষণ ও চিন্তা থেকে শুরু হতে হয়। আর যদি আমাদের ভিতরে দুর্বলতা থাকে, তাহলে আমরা কিছুই করতে পারবো না। নিজেদেরকে শক্তিশালী করুন। অন্তরকে দৃঢ় করুন। আল্লাহর রাহে নিজেকে উৎসর্গ করে দিন। সকল প্রার্থনাই আল্লাহর কাছে করা হয়, কারণ তিনিই শক্তির কেন্দ্র। দোয়াসমূহে বলা হয় আল্লাহর নিকটবর্তী হতে, কারণ তা আপনাকে শক্তি দেবে, যেহেতু সর্বশক্তিমান আল্লাহ আপনার সাহায্যকারী। যে আল্লাহকে আঁকড়ে ধরে, কীসে তার ভয় ! আপনারা যারা আল্লাহর নিকটবর্তী হতে চান, (দুনিয়ার) কোন শক্তিকে আপনারা ভয় করবেন ! আপনারা কি শহীদি মৃত্যুকে ভয় করেন ?? শাহাদাৎ কি ভয়ের বিষয় ?? আপনারা কি বন্দী হওয়াকে ভয় করেন ?? আল্লাহর রাহে জেলবন্দী হওয়া কি ভয়ের বিষয় ?? আপনারা নির্যাতনকে ভয় করেন ?? আল্লাহর রাহে নির্যাতিত হওয়ায় কোনো সমস্যা আছে ?”

শাহ মুহাম্মদ রেজা পাহলভীর স্বৈরশাসক হয়ে ওঠা

নিয়াভারান প্রাসাদ
নিয়াভারান প্যালেস : আটটি প্রাসাদের মাঝে এটিতেই সর্বশেষ বসবাস করতো শাহ।

কোনো শাসক যতই একনায়কতন্ত্র ও স্বৈরতন্ত্র কায়েম করতে থাকে, ততই তার পতন ঘনিয়ে আসে – এটাই ইতিহাসের অলঙ্ঘনীয় নিয়ম। আর সেই নিয়তির দিকে এগিয়ে যেতে রেজা শাহ সংবিধান সংশোধন করে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতা অধিগ্রহণ করলো, পার্লামেন্ট ইলেকশানে হস্তক্ষেপ করলো এবং এভাবে গোটা রাষ্ট্রক্ষমতাকে কার্যতঃ এক স্বৈরাচারী রাজার অত্যাচারের হাতিয়ারে পরিণত করলো। এর তীব্র বিরোধিতা এলো আলেমগণের পক্ষ থেকে, আর হাওজা হয়ে পড়লো শাহের প্রধান শত্রু। এ প্রসঙ্গে ইমাম বলেন :

যখন শাহ সংবিধান বিকৃত করে ইসলামী কর্মকাণ্ডে হস্তক্ষেপ করতে শুরু করলো, আমরা তার বিরোধিতা করলাম। সকল ধর্মীয় নেতৃত্বই এর বিরোধিতা করলো। এর ফলে ইরানে অনেককিছু ঘটে গেলো শান্তিপূর্ণভাবেই। প্রোটেস্ট করা এবং ধর্মীয় নেতৃবৃন্দকে সমর্থন দেবার জন্য সারা ইরান থেকে মানুষ কোমের দিকে আসা শুরু করলো। আমি এই (পলিটিকাল) ইস্যুগুলো খুব সাবধানতার সাথে মোকাবিলা করতাম।”

কোমের দিকে ইসলামপ্রিয় গণমানুষের স্রোত দেখে ইরানের শাহ তার প্রধানমন্ত্রীকে পাঠালো কোমের শীর্ষস্থানীয় আলেমদের সাথে আলোচনা করতে। আয়াতুল্লাহ বুরুজারদী এবং আয়াতুল্লাহ কাশানি উভয়েই ইমাম খোমেনীকে আলোচনার কাজে নিযুক্ত করলেন। শাহের প্রধানমন্ত্রী ইমামকে বুঝ দেয়ার চেষ্টা করলো যে তারা শুধু সিনেটের মতামতের ভিত্তিতে শাহের ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য সংবিধান সংশোধন করছে, তারা ইসলামবিরোধী কিছু করছে না। ইমাম জবাবে বললেন : আমরা এটা হতে দেবো না।” প্রধামন্ত্রী জিজ্ঞাসা করলো, কেনো ? ইমাম জবাব দিলেন :

কারণ ভবিষ্যতে তোমরা এই প্ল্যাটফর্মকে ব্যবহার করবে ইসলামী আইনকে নিষিদ্ধ করতে। তোমরা একটার পর একটা ইসলামী আইন নিষিদ্ধ করবে।”

ব্যর্থ প্রধানমন্ত্রী ফিরে গেলো তেহরানে।

শাসনভার গ্রহণ করার পর প্রথমদিকে শাহ জনগণকে ক্ষেপাতে চাইতো না, কারণ তখন সে নতুন গদিলাভ করেছে। এজন্যে কাজকর্মে সাবধানতা অবলম্বন করার চেষ্টা করতো। সুতরাং সংবিধান ইস্যুতে পিছু হটলো শাহ। তাছাড়া সে সময়ে ইরানের তীব্র অর্থনৈতিক সঙ্কট চলছিলো, যদিও তাদের ছিলো বড় বড় সব তেলকূপ। কিন্তু সেগুলো ছিলো সরাসরি ব্রিটেন ও রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে। সুতরাং জনগণ দরিদ্র থেকে আরো দরিদ্র হচ্ছিলো, আর শাহ ও তার ঘনিষ্ঠজনেরাসহ সমাজের এলিট” শ্রেণী আরো ধনী হচ্ছিলো। রাজধানী তেহরানে শাহের প্রাসাদের বাইরেই দেখা যেত দারিদ্র্যের দৃশ্য। সাধারণ মানুষ রাস্তায় তাঁবু খাটিয়ে থাকতো, আর শাহ তার বিলাসবহুল সব প্রাসাদকে আরো বিলাসী করে তুলছিলো। এর ফলে গণঅসন্তোষের কারণে বিক্ষোভবিদ্রোহ দানা বেঁধে উঠতে লাগলো।

শাহ কর্তৃক বিদ্রোহ দমন

নবাব সাফাভি
নবাব সাফাভিকে কোর্ট মার্শালের মাধ্যমে শহীদ করা হয়।

শাহ মিথ্যা সংবাদ ও ছবি প্রচার করলো যে, তাকে হত্যাচেষ্টা করা হয়েছে। এই ছুতায় ইরানে শাহের বিরোধী দল, কমিউনিস্ট তুদা পার্টিসহ বিরোধী সকল মতের বড় বড় নেতাদের গ্রেফতার করা হলো। গ্রেফতার হলেন আয়াতুল্লাহ কাশানিও। কিন্তু বিরোধীদের একটি গ্রুপ সশস্ত্র বিদ্রোহ চালিয়ে গেলো। তখন প্রেসিডেন্ট ছিলো সেক্যুলারপন্থী মোহাম্মদ মোসাদ্দেক। এই সরকারের প্রধামন্ত্রীকে হত্যা করা হয় সে বিদ্রোহে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সেনাশাসন জারি করে আমেরিকায় পালিয়ে গেলো শাহ। দেশে ফিরে এসে নিজের আর্মির এক কমান্ডারকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দিলো সে। এটা ছিলো ১৯৫৩ সালের ঘটনা, যার দায় সম্প্রতি আমেরিকা স্বীকার করে নিয়ে বলেছে যে, ‘৫৩ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মোসাদ্দেক সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার পিছনে মার্কিন গোয়েন্দা বাহিনীর প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিলো।

যাহোক, আমেরিকার ইচ্ছায় শাহ পুনরায় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলো এবং মোটামুটিভাবে বিদ্রোহ দমন করতে সক্ষম হলো। সেক্যুলার মোসাদ্দেককে জেলবন্দী করা হলো এবং আয়াতুল্লাহ নবাব সাফাভিকে অ্যারেস্ট করে কোর্ট মার্শালের মাধ্যমে শহীদ করা হলো। পিতা রেজা শাহের মতই আলেমদের উপর জুডিশিয়াল কিলিংসহ সবধরণের অত্যাচার চালিয়েছিলো মুহাম্মাদ রেজা শাহ পাহলভী।

তবে ১৯৫৩ সালের এই অভ্যুত্থান, যাতে গনতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত মোসাদ্দেক সরকারকে উৎখাত করা হয়, তা ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিলো। এই ঘটনায় ইরানের সাথে মার্কিন বন্ধুত্ব দৃঢ় হলো, এবং শেষমেষ ইরানের আর্মি হয়ে উঠলো মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী ও অপ্রতিরোধ্য বাহিনী। বিশ্বের মধ্যে পঞ্চম শক্তিশালী আর্মি। আর এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নিয়ন্ত্রণ হলো আরো দৃঢ়।

ইমামের পর্যবেক্ষণ

ইমাম খোমেনী
অনেক বিপ্লবকে ব্যর্থ হতে দেখছিলেন।

তৎকালীন ইরানের প্রায় সকল বিপ্লবী আন্দোলনই ইমাম তাঁর জীবনে প্রত্যক্ষ করেছেন। এগুলো প্রত্যক্ষ ও পর্যবেক্ষণ করা, সেইসাথে ইরানের বাইরের বিভিন্ন বিপ্লবী নেতার সাথে যোগাযোগ ও তাঁদের অভিজ্ঞতাপর্যবেক্ষণ, ইত্যাদি ইমামের নিজস্ব বিপ্লবী চিন্তাধারাতে সহায়তা করেছিলো।

আয়াতুল্লাহ কাশানিকে বন্দী করা, আয়াতুল্লাহ নবাব সাফাভিকে শহীদ করা এবং এমনকি সেক্যুলার মোসাদ্দেকের বন্দী হওয়া – তিনটি বিপ্লব প্রচেষ্টার ব্যর্থতা সম্পর্কে ইমাম তাঁর পর্যবেক্ষণ প্রকাশ করেন।

তাঁর মতে এসব বিপ্লবের ব্যর্থতার কারণ ছিলো জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত ব্যাপক অংশগ্রহণ, যা বিপ্লবকে রক্ষা করে – তার অভাব। একটা দেশের প্রায় শতভাগ মানুষ যদি অর্জিত বিপ্লবকে রক্ষা করার জন্য প্রস্তুত না থাকে, তবে অর্জিত বিপ্লব রক্ষা করা সম্ভব হয় না। নিরঙ্কুশ মুসলিম গণভিত্তিই হলো সফল ইসলামী বিপ্লবের ভিত্তি।

বিপ্লব ছড়িয়ে পড়লো এক মাদ্রাসা থেকে

ষাটের দশকে ইমামের বিপ্লব প্রকাশ্য হতে শুরু করলো। অর্থাৎ কোম নগরীর সর্ববৃহৎ মাদ্রাসা, ফায়জিয়া মাদ্রাসা থেকে বিপ্লব আত্মপ্রকাশ করলো। এটাকে বিপ্লবের দ্বিতীয় ধাপ বলা যেতে পারে। প্রথম ধাপ ইমাম তাঁর বিচক্ষণতা, প্রজ্ঞা ও জ্ঞানের মাধ্যমে সম্পন্ন করেছিলেন ইতোমধ্যেই : আলেমগণের কাছে ইসলামী রাষ্ট্র কায়েমের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব তুলে ধরে তাঁদের অধিকাংশকে একত্রিত করেছিলেন। এছাড়াও গুরু আয়াতুল্লাহর বুরুজারদীর অনুসরণে শিয়াসুন্নি বৃহত্তর মুসলিম ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্যও কাজ করেছিলেন আলেমগণের মাঝে।

যাহোক, ইমামের হাজার হাজার ছাত্রের মাঝে বিপ্লবে যাঁদের নাম অগ্রভাগে ছিলো, তাঁরা ছিলেন আয়াতুল্লাহ মুর্তাজা মোতাহারি, আয়াতুল্লাহ বেহেশতি, আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী এবং হুজ্জাতুল ইসলাম হাশেমী রাফসানজানি। ইমামের নেতৃত্ব ও পরিচালনায় শাহের বিরুদ্ধে বিপ্লব পরিণত হলো ইসলামী জিহাদে। যখন দুনিয়ার অন্যান্য জায়গায় বামপন্থি আন্দোলন চলছে এবং বিজয়ীও হচ্ছে, তখন ইরানে ইমাম খোমেনীর পরিচালিত ইসলামী বিপ্লব ছিলো সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম।

১৯৬১ সাল। দেশের বড় বড় তেলকূপগুলো সব আমেরিকার নিয়ন্ত্রণে চলে গিয়েছে। ৫০ বছরে ব্রিটেন যতটা চুরি করতে পারেনি, মাত্র দশ বছরে তার বহুগুণে তেল চুরি করে নিয়ে গেলো আমেরিকা। ৩৪০ মিলিয়ন টন অপরিশোধিত তেল। সেইসাথে আর্মিকে শক্তিশালী করতে যে বিপুল অর্থব্যয় করে শাহ, তাতে দেশের আর্থিক রিজার্ভ অত্যন্ত কমে আসে। ইমাম বললেন :

যদি এটা ত্রিশ বছর ধরে চলে, তাহলে আমাদের আর কোনো তেলকূপই অবশিষ্ট থাকবে না। আমাদের জনগণের কোন তেল থাকবে না, কৃষিও থাকবে না। জনগণ ভিক্ষুকে পরিণত হবে। অর্ধেক জনগণ এখন পথে বসেছে, আর বাকিরাও বসবে, তাদের কোনো রিজার্ভ থাকবে না। আমরা যদি এই লোককে (শাহকে) আরো সময় দিই, তাহলে সে আমাদের গৌরবমর্যাদাকে শেষ করে ছাড়বে।”

………………………………………….

(চলবে)

(অখণ্ডভাবে মূল লেখাটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন।)

ফেইসবুকে নোট আকারে দেখুন : ( প্রথম খণ্ড।) ( দ্বিতীয় খণ্ড।) ( তৃতীয় খণ্ড।) ( চতুর্থ খণ্ড।)

সম্পূর্ণ লেখাটি ডাউনলোড করুন (ওপেন হবার পর Ctrl+S চাপতে হবে) : ( Complete PDF (15 MB) ) ( Text-only PDF )

Leave a Reply