তুরস্কে ইসলামী আন্দোলন ও ইসলামী সাহিত্য

ইসলামী খিলাফাতের সর্বশেষ রাজধানী ছিল তুরস্কের ইস্তানবুল। ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেম আবুল হাসান আলী নদভী তার এক আলোচনায় বলেছিলেন যদি পৃথিবীতে পুনরায় খিলাফাত প্রতিষ্ঠিত হয় তাহলে সেটা পুনরায় ইস্তানবুল থেকেই প্রতিষ্ঠিত হবে। তিনি তার বিখ্যাত বই ”মুসলমানদের পতনে বিশ্ব কি হারাল” এই বইয়ে ইস্তানবুলের রাজনৈতিক গুরুত্ত্বকে অত্যন্ত সুন্দর ভাবে তুলে ধরেছেন।তিনি বলেছিলেন উমাইয়াদের পতনের পর আব্বাসীদের হাতে খিলাফাত তুলে দেওয়া হয়েছিল, আব্বাসীদের পতনের পর খিলাফাত উসমানীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল কিন্তু ১৯২৩ সালে উসমানী খিলাফাতের পতনের পর খিলাফাত আর কার নিকট স্তানান্তরিত হয়নি। তাই আবারোও এটা এখান থেকেই উদয় হবে।

উসমানী খিলাফাতকে খুলাফায়ে রাশেদার পর ইসলামের সবচেয়ে স্বর্ণযুগ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। উসমানী খিলাফাতের সময়ে মুসলমানদের মধ্যে কোন যুদ্ধ হয়নি যেটা একটি অস্বাভাবিক ঘটনা। ঐতিহাসিকগণ বলেছেন উসমানী খিলাফাতের স্বপ্ন ছিল ইউরোপ জয়, রোমান সাম্রাজ্যকে সম্পূর্ণ ভাবে জয় করা। এই জন্য তারা ছোটখাট সকল ভেদাভেদ ভুলে কাধে কাঁধ মিলিয়ে রোমকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন। সর্বশেষ ১৬৮৩ সালে দ্বিতীয় ভিয়েনা বিজয়াভিযানে উসমানী খিলাফাতের সেনাপতির বিশ্বাসঘাতকতার কারণে ইউরোপ বিজয়ের সপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে যায়।এরপর থেকে উসমানী খিলাফাত আক্রমণ নয় আত্মরক্ষার নীতি অবলম্বন করে। উসমানী আমলে জনগনকে ইসলামের সাথে সম্পৃক্ত রাখার জন্য তারা হাজার হাজার ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করে এক জরিপে দেখা যায় সেই সময়ে এই সকল সংগঠনের সংখ্যা ছিল প্রায় ৫২ হাজার। পরবর্তীতে পতনের পর কামাল আতাতুরক এই সকল সংগঠন বন্ধ করে দেওয়ার পাঁয়তারা চলায় কিন্তু আলেমদের প্রবল প্রতিরোধের কারনে নানা ভাবে চাপ প্রয়োগ করে এঁর সংখ্যাকে কমিয়ে আনে।বদিউউযামান সাঈদ নুরসীর ঈমান রক্ষার আন্দোলনের পর ৬০ এঁর দশকে ইসলামী আন্দোলন রাজনৈতিক রূপ ধারণ করে এবং এই সকল ফাউডেশন সমূহকে নতুন উদ্যমে কাজের প্রেরণা দেওয়া হয়।

তুরস্কের ইসলামী আন্দোলন মুলত এই সকল ছোট ছোট সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন থেকে সাহায্য নিয়ে আন্দোলন পরিচালনা করত। জনগনের মধ্যে যাতে ভুল বুঝাবুঝি ও বিভাজন সৃষ্টি না হয় এই জন্য সর্বজন শ্রধ্যয় সকল আলেম উলামার সাহিত্য পাঠ করার ব্যাপারে জড় দেওয়া হয় অর্থাৎ রাজনতিক কারনে যাতে এই সকল ছোট ছোট সংগঠনের মধ্যে বিভাজন তৈরি না হয় এই ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়। আর এই কারণেই ইসলামী আন্দোলন অল্প সময়ের বাবধানে ক্ষমতায় আস্তে সক্ষম হয়।
বর্তমানে তুরস্কে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সংখ্যা প্রায় ৮ হাজার। এঁর অধিকাংশই যুবকদের দ্বারা পরিচালিত। যেকোন ইসলামী বা ইসলাম পন্থী দল সমূহ খুব সহজেই এই সকল সংগঠনের সাহায্য পেয়ে থাকা।
*********
তুরস্কের বিভিন্ন লাইব্রেরি ও প্রকাশনা দেখে আমার কাছে মনে হয়েছে ইসলামী সাহিত্য বা অন্যান্য সাহিত্যের ক্ষেত্রে তুরস্ক অতুলনীয় ১৯২৮ সালে আরবী বর্ণমালাকে পরিবর্তন ল্যাটিন হরফ নেওয়ার সময় আতাতুরক হয়ত স্বপ্নেও ভাবতে পারেন নাই যে এত তাড়াতাড়ি পুনরায় এরা সাহিত্য জগতে এমন বিপ্লব ঘটাবে। বলতে গেলে বিশ্ববিখ্যাত লেখকদের এমন কোন বই নেই যা তারকিশ ভাষায় পাওয়া যায় না। মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের বিখ্যাত ফতওয়ায়ে আলমগীরি খুজতে খুজতে হয়রান হওয়ার পর দেখি প্রায় ১০০০০ পৃষ্ঠার এই বইটি তারকিশ ভাষায় রয়েছে।

উপমহাদেশের বিখ্যাত মুজাদ্দিদ মুজাদ্দিদে আলফে সানী ইমাম রব্বানির মাকতুবাত সম্পর্কে আমরা না জানলেও এটা তুরস্কের প্রায় সবার ঘরে ঘরে। তাছাড়া শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলবী, ইমাম গাঁজালি, ইমাম ইবনে তাইমিয়া, সাইয়েদ কুতুব, হাসান আল বান্না, মাওলানা মওদুদীর সকল বই তারকিশ ভাষায় পাওয়া যায়।তারকিশ ভাষায় সিরাতের উপর রয়েছে এক বিশাল কালেকশন। এক কোথায় বিশ্ব বিখ্যাত যত আলেম আছেন তাদের সকল বই তারকিশ ভাষায় রয়েছে। তুরস্কে বহুল পঠিত বিদেশি লেখকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন;

১। আলিয়া ইযযেতবেগভিচ।
২। আলী শরীয়তী
৩। হাসান আল বান্না
৪। ইবনে খালদুন
৫।ঈমাম রব্বানি (মুজাদ্দিদে আলফে সানি)
৬। সায়েদ কুতুব
৭। মাওলানা মওদুদী
৮। মুহাম্মাদ হামিদুল্লাহ
৯। ইমাম গাজালী
১০।শাহ ওয়াইউল্লাহ দেহলবি
১১। মুহাম্মাদ আসাদ
১২। মেলকম এক্স
১৩। লিউ টলস্টয়
১৪। দস্তভয়েস্কি
১৫। আল্লামা ইকবাল
১৬। রজের জারাওডি

সহ আরও অনেক লেখক। তুরস্কে বই প্রকাশনা এবং বই লেখা একটি লাভজনক পেশা। আর সেটা সম্ভব মূলত বিশাল একটি পাঠক গোষ্ঠী থাকার কারনেই। তুরস্কের প্রায় সকল ঘরেই (ইসলাম পন্থীদের যাদের বাসায় দাওয়াত খেয়েছি) দেখেছি সমৃদ্ধ একটি পাঠাগার রয়েছে। অধিকাংশ ছাত্রেরই রয়েছে ব্যাক্তি গ্রন্থাগার। তুরস্কে ইসলামপন্থীরা অনেক দিক থেকেই বামদের থেকে অনেক এগিয়ে আর এটা সম্ভব হয়েছে ইসলাম পন্থী যুব সমাজের ব্যাপক কার্যক্রম এবং জ্ঞানের রাজ্যে কয়েক জন লেখকের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বিশ্ব বিখ্যাত সকল লেখকদেরকে পড়ার কারণে।

বাংলাদেশের যুব সমাজও একদিন বই পড়ার দিকে এগিয়ে আসবে এবং সকল ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করার জন্য প্রচেষ্টা চালাবে।তাছাড়া ইসলামী বিপ্লব কিংবা সোনার বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন অধরায় থেকে যাবে।

Leave a Reply