ক্রীতদাসের মুখে হাসি ফোঁটাতে তাদের উন্নয়নের গল্পের সমাহার

সময়টা ১৯৬২। তৎকালীন পাকিস্তানের স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের ফ্যাসিবাদী একনায়কতন্ত্রকে ব্যঙ্গ করে ক্রীতদাসের হাসি নামে একটি উপন্যাস লেখেন তখনকার তরুণ কথাশিল্পী শওকত ওসমান। আরব্য রজনীর চরিত্র খলিফা হারুন আর রশিদ ও তার ক্রীতদাস তাতারীর ঘটনা-পরম্পরার মাধ্যমে শওকত ওসমান রূপকার্থে আইয়ুব খানের স্বৈরশাসনকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছিলেন। সেই সময় গণতন্ত্র ছিল অনেকটাই অনুপস্থিত আর বাকস্বাধীনতা ছিল চরম সঙ্কটে। তাইতো লেখক রূপকধর্মী উপন্যাসের মাধ্যমে স্বৈরশাসনের বাস্তব অবস্থা ফুটিয়ে তুলেছিলেন।

উপন্যাসে আমরা দেখতে পাই কেন্দ্রীয় চরিত্র তাতারীর প্রেমিকার ওপর বাদশাহ হারুন আর রশিদের কুদৃষ্টি পড়ে এবং তিনি জোর করে তাতারীর প্রেমিকাকে নিজের অন্তঃপুরবাসিনী বানাতে চান, আর এই জন্য তাতারীকেও তিনি বন্দী করেন। তাতারীর বিদ্রোহী মনোভাব দমন না করতে পেরে তিনি কৌশলে নানান ভোগ-বিলাসের উপকরণ দিয়ে ভুলিয়ে তার অধীনস্থ করতে চান। কিন্তু তাতারী থাকে অবিচল। খলিফা তখন তার মুখে হাসি আনার জন্য বিরাট সব প্রলোভন থেকে শুরু করে নানা রকম অত্যাচারও করতে থাকেন। কিন্তু তাতারী উত্তর দেয়, ‘একজন ক্রীতদাস কখনো হাসতে পারে না।’ ঐ অবস্থাতেই উপন্যাসের সমাপ্তি ঘটে।

এই উপন্যাসের মাধ্যমে আরব্য রজনীর কাহিনীর আড়ালে লেখক এটাই তখন বুঝিয়েছিলেন যে, আইয়ুব খানের স্বৈরসরকার যতই দেশকে উন্নয়নে ভরিয়ে দিক, যতই উন্নয়নের দশক জাঁকজমকভাবে পালন করুক, দেশের মানুষকে যদি গণতন্ত্র, বাকস্বাধীনতা, আইনের শাসন ইত্যাদি মৌলিক বিষয় থেকে বঞ্চিত রাখা হয়, তাহলে দেশের মানুষ কখনই সুখী হবে না। তাদের মুখে কখনোই হাসি ফুটবে না। আসলেই, আইয়ুব খানের বদ্ধ ও নিপীড়নমূলক শাসনব্যবস্থায় তৎকালীন উন্নয়নের দশকের মধ্যেও মানুষ ছিল অসুখী আর ক্ষুব্ধ।

পুরো প্রেক্ষাপটটিকেই আরেকটু সামনে বর্তমান সময়ে নিয়ে আসুন। কোনো মিল কি আপনারা খুঁজে পাচ্ছেন? জবরদখলকৃত একতরফা নির্বাচন, প্রশাসনকে যেমন খুশি তেমনভাবে ব্যবহার করে বিরোধী পক্ষকে নির্যাতন, বাকস্বাধীনতার প্রতি হুমকিস্বরূপ বিভিন্ন বিতর্কিত কালো আইনের প্রবর্তন ইত্যাদির মাধ্যমে গণতন্ত্রকে হত্যা করে স্বৈরতান্ত্রিক এবং দলীয় শাসন ব্যবস্থা কায়েমের সব এন্তেজামই করে রেখেছে বর্তমান আওয়ামী সরকার। আর আওয়ামী লীগ যে দেশে একদলীয় শাসনব্যবস্থা ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে থেকেই করতে পরিকল্পনা করেছিল, তা উইকিলিকসের প্রতিবেদনেও সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে কিছু দিন আগেও।

আইয়ুব খান সরকারও যেই ষাটের দশকে দুই পাকিস্তানের মানুষকেই ‘মৌলিক গণতন্ত্র’ নামে হাস্যকর জিনিস গেলাতে চেষ্টা করেছে। তেমনি বর্তমান সরকারও ‘বেশি উন্নয়নের, কম গণতন্ত্রের’ শাসনব্যবস্থা গেলানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে দেশবাসীকে। কিন্তু মোদ্দা কথা হলো, আওয়ামী লীগের অন্ধ সমর্থকরা ছাড়া আর কেউ বর্তমানে বলবে না যে, দেশে গণতন্ত্র আছে। গণতন্ত্রের অন্যতম মূল ভিত্তি হলো সুষ্ঠু নির্বাচন ও ভোটব্যবস্থা। কিন্তু আওয়ামী লীগ ২০১৩ সালের পাঁচটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয় বরণ করার পর দেখল যে, জনগণের ভোটে আর তারা নির্বাচিত হতে পারবে না। তারপর থেকেই নির্বাচন ও ভোট ব্যবস্থাকে ম্যানিপুলেট করতে বিভিন্ন পরিকল্পনা আঁটল। তারই নগ্ন বহিঃপ্রকাশ আমরা দেখতে পাই ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি ও ২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিলের ভোটারবিহীন প্রহসনের নির্বাচনে।

শুধু নির্বাচন আর ভোট ব্যবস্থাকেই কলঙ্কিত করেনি সরকার, নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনকে দমন করার জন্য প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এমনভাবে ব্যবহার করল যে, ক্রসফায়ার, গুপ্তহত্যা তো মামুলি ব্যাপার, তারা প্রকাশ্যে সন্দেহের বশে অনেককেই দেখামাত্র গুলি করেও আহত বা নিহত করেছে। সনাতন ধর্মাবলম্বী নয়ন বাছাড়কে ‘জামায়াত শিবিরের সন্ত্রাসী’ বানিয়ে প্রকাশ্যে হাঁটুতে গুলি করে অর্ধপঙ্গু বানিয়ে দেয় পুলিশ। এ রকম উদাহরণ আছে ভূরি ভূরি।

পরিস্থিতি এমন ভয়াবহ দাঁড়িয়েছে যে, বাকস্বাধীনতাও আজকে হুমকির মুখে। প্রকাশ্যে লীগ সরকারের সমালোচনা করতেও মানুষ এখন ভয় পায়। চায়ের দোকানে বা গণপরিবহনে কেউ সরকারের বিরুদ্ধে ঝাঁঝালো বা ব্যঙ্গাত্মক কিছু বললেই তার আশপাশের সবাই তাকে থামিয়ে দেয় এবং এতে যে তার ক্ষতি হতে পারে, সেই কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়। ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ এই সরকারের আমলে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে কটু কথা প্রচার করার দায়ে এমনকি হিন্দু ধর্মাবলম্বী একজনসহ অনেকেই কারাদণ্ড ভোগ করছে। এরপরও ওই ফ্যাসিবাদী অবস্থাকে জোরদার করার জন্য প্রচলিত কঠোর আইনকেই কঠোরতর করে তোলা হচ্ছে, যেখানে বন্ধু রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের বিরুদ্ধেও আইনের ধারা রয়েছে। এমন দমবন্ধ অবস্থার মধ্যে গণতন্ত্রের সত্যিকারের সুফল ভোগ করা আসলেই অসম্ভব।

এই ফ্যাসিবাদী ও দমন-নিপীড়নমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে যাতে জনরোষ গড়ে না ওঠে সে জন্য উন্নয়নের জোয়ারকে ঢাল বানাতে সরকার খুবই সচেষ্ট। যেমন আইয়ুব খান সরকার ষাটের দশকে দেশব্যাপী উন্নয়ন দেখিয়ে গণতন্ত্রহীন শাসনের অধীনে থাকা জনগণের মুখে হাসি ফোটাতে চেয়েছিল। কিন্তু মোদ্দা কথা হলো, আইয়ুব খানের শাসনাধীনে জনগণ যেমন স্বস্তিতে আর শান্তিতে ছিল না, বর্তশান লীগ সরকারের অধীনেও তারা সেটা নেই। সরকার শুধু বাইরের দিক দিয়ে উন্নয়নের কথা বলছে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্বের চাপে দেশের মানুষ দিশেহারা। দেশে আজ কাজ নেই, নেই পর্যাপ্ত দু’মুঠো ভাতের আশ্বাস। তাইতো হাজার হাজার মানুষ জীবিকার সংস্থানে বনবাদাড় বা সাগর পাড়ি দিয়ে নিজের জীবনকে তুচ্ছ করে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে। গণতন্ত্রহীন স্বৈরশাসক আইয়ুব খান দেশে হয়তো পর্যাপ্ত উন্নয়ন নিয়ে আসতে পেরেছিলেন। কিন্তু বর্তমান লীগ সরকার না দেশবাসীকে উপহার দিতে পারছে গণতন্ত্র, না পারছে উন্নয়ন, এ কথা বলাই যায়।

অনেক কিছুর পরও বর্তমান সরকার পার পেয়ে যাচ্ছে। তবে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার, বাকস্বাধীনতা আর আইনের শাসন কেড়ে নিয়ে চাকচিক্যময় ঠুনকো উন্নয়নের বুলি দিয়ে যে তারা জনগণের মুখে শেষ পর্যন্ত হাসি ফোটাতে ব্যর্থ হবে, এ রকমই মনে হচ্ছে অবস্থাদৃষ্টে। কারণ নিপীড়নমূলক একদলীয় স্বৈরশাসনে প্রত্যেকটি মানুষই যেন নিজেকে একজন তাতারীর মতো দাস মনে করে; আর ক্রীতদাস কখনো হাসতে পারে না।

Leave a Reply