প্যারিস হামলাঃ পূর্বাপর ও কিছু হাইপোথিসিস

স্নায়ু যুদ্ধের ইতি ঘটার পর বিশ্বে একক সুপার পাওয়ার হিসেবে অবির্ভাব ঘটে যুক্তরাষ্ট্রের। স্নায়ু যুদ্ধের ইতি ঘটলেও যুদ্ধের ইতি ঘটেনি। স্নায়ু যুদ্ধকালীন দুটি প্রধান অক্ষে বিভক্ত ছিল পৃথিবী। একটি পক্ষে ছিল আমেরিকা ও ইউরোপের সমন্বয়ে পুঁজিবাদী দেশগুলো। অন্য পক্ষে ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক পক্ষ, যাতে আরও ছিল পূর্ব ইউরোপ, আরব ও পূর্ব আফ্রিকার কিছু দেশ। শীতল যুদ্ধ হলেও, সবক্ষেত্রে যুদ্ধের প্রকৃতি শীতল থাকেনি। বরং বিভিন্ন দেশে, বিভিন্ন ফ্রন্টে সশস্ত্র যুদ্ধও হয়েছিল। মজার বিষয় হচ্ছে, এসব সশস্ত্র যুদ্ধের ক্ষেত্র বা ‘ব্যাটলফিল্ড’ কিন্তু দুটি পক্ষের নেতৃত্বদানকারী আমেরিকা বা সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল না। যুদ্ধগুলো হয়েছিল প্রধানত আরবে অথবা উত্তর আমেরিকাতে। তবে যুদ্ধের প্রকৃতি বিবেচনা করলে মধ্যপ্রাচ্যকেই এগিয়ে রাখতে হবে। উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন দেশে সমাজতান্ত্রিক সরকার পতনের জন্য অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা তৈরি করা হয়েছিল। আরও মজার বিষয় হচ্ছে, এই দুটি অঞ্চলই খনিজ তেলে ভরপুর। ফলে লড়াইয়ের প্রধান নিয়ামক হয়ে উঠে খনিজ তেল।

সোভিয়েতের পতনের পর যুদ্ধের প্রতিপক্ষে পরিবর্তন আসল। স্যামুয়েল হান্টিংটন থিওরী দিলেন, ইসলামী সভ্যতার পূনর্জাগরণ ঘটবে। ফলে পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী অক্ষ একত্রিত হয়ে যুদ্ধ শুরু করল মুসলিম পক্ষগুলোর সাথে। এক্ষেত্রে কখনো লড়াই করেছে মুসলিম রাষ্ট্রের সাথে (ইরাক, আফগানিস্তান, সিরিয়া), কখনো তাদের প্রতিপক্ষ ছিল বিভিন্ন দল বা সংগঠন (আল-কায়েদা, তালেবান এবং সাম্প্রতিক কালের দায়েশ বা আইএস)।

এই যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা কী? পশ্চিমাদের দৃষ্টিতে যুদ্ধের প্রয়োজন বহুমাত্রিক। খনিজ তেল, অস্ত্র ব্যবসায়, ইসরাইলের নিরাপত্তা ইত্যাদি। এসব যুদ্ধের পেছনে একটা মস্তাত্বিক উন্মাদনা কাজ করেছিল। আমি ক্ষমতাবান, এটা প্রমাণ করার বিষয়, মুখে বলার নয়। তাই আমেরিকারও প্রয়োজন হলো তার ‘সুপার পাওয়ার’ হওয়ার প্রমাণ দিতে। ইতিমধ্যে সোভিয়েত এর পতন ঘটানো আমেরিকার বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল। কিন্তু পশ্চিমাদের উন্মাদনা শুধু কোল্ড ওয়ারে কেন সীমাবদ্ধ থাকবে? তাছাড়া অস্ত্রের ব্যবসায়টাকে বাচিয়ে রাখার জন্য সম্মুখ সমর শুরু করা জরুরী। অন্যদিকে খনিজ তেল, হান্টিংটনের সূত্রমতে মুসলিম বিশ্বকে দমিয়ে রাখা – এসব কার্যকারণতো ছিলই। কিন্তু যুদ্ধ শুরু করার জন্য একটা উছিলা প্রয়োজন। ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার বা টুইন টাওয়ারে হামলার নাটক তৈরি করে আফগানিস্তানে আগ্রাসন শুরু হলো। অন্যদিকে সাদ্দাম হুসেনের মজুদে প্রাণঘাতী অস্ত্র আছে, এই অজুহাতে ইরাকে; অতঃপর স্বৈরাচারীর পতন ঘটিয়ে লিবিয়া, সিরিয়ায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মহান উদ্দেশ্য (?) নিয়ে লড়াই শুরু হলো। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধের এই হলো সংক্ষিপ্ত ভূমিকা।

এবার সরাসরি ফ্রান্স প্রসঙ্গে চলে আসি। স্নায়ু যুদ্ধকালীন সময়ে ফ্রান্স পুঁজিবাদী অক্ষের অংশ ছিল। ইরাকের সামরিক শক্তি বৃদ্ধিতে ফ্রান্স বহু বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রি করেছিল। শুধু ফ্রান্স নয়, সেই সময় ব্রিটেন, আমেরিকা, বেলজিয়াম ছিল ইরাকে প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী। সোভিয়েত থেকেও ইরাক অস্ত্র কিনেছে। ইরাকের নেতৃবৃন্দকে আরবের পরাক্রমশালী হওয়ার লোভ দেখিয়ে একের পর এক অস্ত্রের চালান পাঠিয়ে পশ্চিমাদের কোষাগার ফুলে-ফেঁপে উঠেছিল। কিন্তু অস্ত্র দিলেই তো হবে না। সেই অস্ত্র ব্যবহার করার ক্ষেত্রও তৈরি করতে হবে। যাতে আরও অস্ত্রের চাহিদা তৈরি হয়। ইরাককে পরপর দুটি যুদ্ধে নামিয়ে সেই অস্ত্রের ব্যবহার করানো হলো। একটি ইরানের সাথে, অন্যটি কুয়েতের সাথে। অবশ্য এক্ষেত্রে আরব নেতাদের সীমাহীন ব্যর্থতা অনস্বীকার্য। তারা ক্রীড়ানক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

এতো গেল স্নায়ু যুদ্ধের পূর্বের ঘটনা। সাম্প্রতিক সময়েও ফ্রান্স কমপক্ষে একটি দেশে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছে। সেটি হলো লিবিয়া। মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য ফ্রান্স বিমান হামলা চালিয়েছিল। একপর্যায়ে গাদ্দাফিকে হত্যা করা হলো। কিন্তু শান্তি কি আসলো? স্বৈরাচার বিদায় করে গনতন্ত্রের দোহাই দিয়ে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করল। এছাড়াও, বিশ্বের যেখানেই পশ্চিমাদের যুদ্ধ চলছে, সিরিয়া, আফগানিস্তান, ইরাক, সবখানেই ন্যাটোর অংশ হিসেবে ফ্রান্স অংশ নিয়েছে।

প্রথম ও দ্বিতীয় বিসশ্বযুদ্ধের অন্যতম ব্যাটলফিল্ড ছিল ইউরোপ। কিন্তু এরপর যতগুলো যুদ্ধ হয়েছে, কোনটাই পশ্চিম ইউরোপের মাটিতে হয় নাই। কিন্তু এসকল যুদ্ধে সরাসরি জড়িত ছিল ফ্রান্সসহ ইউরোপের দেশগুলো। এশিয়া ও আফ্রিকার মাটিতে আগুন জ্বলেছে, লাখ লাখ মানুষ মরেছে, আর সেই যুদ্ধের অর্থনৈতিক হালুয়া-রুটি গিয়েছে পশ্চিমা দেশগুলোর কোষাগারে। তারা সুন্দর সুন্দর কথা বলেছে, ভদ্রতা শিখিয়েছে, মানবিকতা রফতানি করেছে আর গণতন্ত্রের বাণিজ্য করেছে। তাদের এই উন্মাদ যুদ্ধ যুদ্ধ খেলার চরম মূল্য দিয়েছে এশিয়া-আফ্রিকার মানুষ।

পশ্চিমারা তাদের প্রতিটা যুদ্ধের জন্য কিছু উছিলা তৈরি করেছে। যার সাম্প্রতিক সংস্করণ হলো দায়েশ (আই এস)। প্যারিসে হামলার পর ফরাসী প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কঠোরতম জবাব দেয়া হবে। অর্থাৎ আবারো ইউরোপের অস্ত্র ব্যবসায়ীদের পকেট ফুলে-ফেঁপে উঠবে, এশিয়ায় মানুষ মরবে। ফ্রান্সের এই হামলার বিষয়ে আমার কিছু হাইপোথিসিস হচ্ছে –

১। সিরিয়ায় অধিকতর সামরিক হামলা চালানোর উছিলা হিসেবে এই হামলা সংঘটিত করা হয়েছে। সেই হামলায় ফ্রান্স হয়তো এবার আরও বেশী পরিসরে অংশ নিবে।
২। ইউরোপে আরব শরনার্থীদের প্রতি বৈরি মনোভাব তৈরি এই হামলার অন্যতম উদ্দেশ্য হতে পারে।
৩। মধ্যপ্রাচ্যে একতরফা যুদ্ধ চালানোর ফলে বিশ্বব্যাপী পশ্চিমাদের ব্যপারে একটা নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়েছে। কারণ, ইতিমধ্যে টুইন টাওয়ার ও ইরাকের প্রাণঘাতী অস্ত্রের মিথ্যে অজুহাত ফাঁস হয়ে গিয়েছে। ফলে ফ্রান্সের এই হামলাকে উছিলা দেখয়ে আরও আগ্রাসন চালানো সম্ভব হবে।

এসব হাইপোথিসিস সত্য হবে কিনা, সময় বলে দিবে।

সর্বশেষ দায়েশ সম্পর্কে কিছু কথা বলি। আমরা মনে করি, দায়েশ পশ্চিমাদের মদদে গড়ে উঠেছে তাদের স্বার্থ হাসিলের জন্য। এর সাথে ইসলামের কোন সম্পর্ক নাই। এরা মুসলিমদেরও কেউ নয়। ফলে তাদের কৃতকর্মের জন্য মুসলিমদের লজ্জিত হওয়ারও কিছু নাই। আমরা কামনা করি, এই দায়েশসহ সকল সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীর পতন হবে। তবে সেটা হওয়ার জন্য পশ্চিমাদের বন্ধ করতে হবে সন্ত্রাসীদের প্রতি সহযোগিতা।

ফ্রান্সসহ পৃথিবীর সকল জায়গায় পশ্চিমা সন্ত্রাস ও দায়েশের সন্ত্রাসের ফলে যারা নিহত হয়েছে তাদের জন্য শোক ও শ্রদ্ধা রইল।

One Response

  1. ABUSAIF
    ABUSAIF at |

    আসসালামু আলাইকুম……. বারাকাতুহ

    সুন্দর লেখার জন্য মোবারকবাদ

    সংক্ষেপে যা বলেছেন তা যথার্থই মনে হয়

    তবে টার্গেট তালিকায় “তুরস্কে ইসলামী শক্তির উত্থান”কে এগিয়ে আনা হতে পারে!!

    বিশ্বরাজনীতির স্রোতের টানে ভেসে চলা ছাড়া আমাদের আর কী-ইবা করার আছে!!

    Reply

Leave a Reply