নয়া যমানার ডাক-২ (অনেক হয়েছে, আর নয়)।

কী অনেক হয়েছে ? অনেক হয়েছে ইসলামের খেদমত। এত বেশি হয়েছে যে, আজ ইসলাম ও উম্মাহ অস্তিত্ব সঙ্কটের মুখে পতিত হয়েছে। ইসলামের প্রত্যেকটি মাযহাব, মাশরাব, দ্ল, শাখা, ফেরকা ইসলামের জন্য নিজেদেরকে এতটাই বেশি উৎসর্গ করছে, ত্যাগ স্বীকার করছে যে, সম্ভবত পূর্ববর্তীরাও এত বেশি করেননি। এতদসত্ত্বেও হিসাবের খাতায় ফল দাঁড়াচ্ছে শূন্য নয়, মাইনাস। আমাদের খিদমতের স্বরুপ হচ্ছে যেমন দেওবন্দীরা ইসলামী শিক্ষার প্রচার-প্রসারে জীবন উৎসর্গ করছে। তারা একনিস্টভাবে ইসলামী খিদমতের জন্য সরকারি চাকরি-নকরিসহ পার্থিব সকল সুযোগ সুবিধা বর্জন করছে। তাবলিগীরা তৃনমুল থেকে বিশ্বময় ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দিচ্ছে। নিজের কাজ-কর্ম, চাকরি, ব্যবসা-বানিজ্য ফেলে, গাঁটের পয়সা খরচ করে জনপদে জনপদে ঘুরছে, দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছে দিচ্ছে, মসজিদ্গুলোকে ইবাদাত বন্দেগির মাধ্যমে জীবন্ত করে তুলছে। জামাত শিবির রাস্ট্রিয়ভাবে ইসলাম প্রতিষ্ঠার লক্ষে আন্দোলন করে যাচ্ছে। রাজপথে বুকের তাজা খুন ঢেলে দিচ্ছে, জেল, যুলুম, নির্যাতন, তিরস্কার, গালাগালির তো কোন সীমা পরিসীমাই নেই। পীর মাশায়েখরা মসজিদ মাদরাসা ও খানকায় বসে তাযকিয়ায়ে নফসের সবক দিয়ে যাচ্ছেন। দ্বীনের খেদমত করছেন। অবশ্য এ সুযোগে মাযার পন্থীরা জমজমাট ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তারাও ব্যবসার স্বার্থেই হউক বা আন্তরিকভাবেই হউক কিছুটা হলেও ইসলামের খিদমত করে যাচ্ছে। হিজবুত তাহরির খিলাফত প্রতিষ্ঠার আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে বিশ্বময় তাদের উপর নেমে আসছে নির্যাতনের স্টিম রুলার। তারা নিষিদ্ধ হচ্ছে এবং তাদের দেওয়া হচ্ছে সন্ত্রাসবাদের বরমাল্য। হিযবুত তাওহীদ, তালেবান, আল কায়েদা, আইসিস, বুকো হারাম, হিযবুল্লাহ, ব্রাদার হুড ইত্যাদি জানা অজানা, খ্যাত, অখ্যাত, কুখ্যাত শত শত এমনকি হাজার হাজার সংগঠন ইসলামের খেদমত করে যাচ্ছে, নিজেদের ধন সম্পদ জীবন যৌবন উৎসর্গ করছে, রক্ত মাংস পরমাত্না বাতাসে উড়ছে। কিন্তু ফলাফল আমরা কি পাচ্ছি? ফলাফল পাচ্ছি মুসলিম বিশ্ব আজ আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখে পতিত হয়েছে। আজ ইসলাম হলো পৃথিবীর একমাত্র সন্ত্রাসী ধর্ম, আর অন্যান্য গুলি শান্তির ধর্ম। মুসলিম হলো পৃথিবীর ঘৃনিত, ধিকৃত, পদদলিত, সন্ত্রাসী এক দাস জাতি। মুসলিম জাতি পৃথিবীর মূল ভূখণ্ড ও মূল সম্পদের মালিক হয়েও আজ যে ধ্বংস গহ্বরে পতিত হয়েছে- সম্ভবত সৃষ্টির সূচনা থেকে দিবসের সূর্য আর রাতের নক্ষত্ররাজি এমন লাঞ্চনাদায়ক পতন অন্য কোন জাতির মধ্যে দেখে নি। আজ মুসলিম জাতি এ ভূ-পৃষ্টের এক উদ্ভাস্তু ও সর্বহারা জাতি। এখন প্রশ্ন হল, ইসলামের জন্য বহুমুখি ধারায় বিভিন্ন মুখী পন্থায় আমাদের এতসব কোরবানির পরও কেন এই পতন? পূর্ববর্তীরা তো আমাদের মত বহুমুখি ধারায় খিদমত করেন নি, তারা মসজিদে নামায পড়তেন কিন্তু চিল্লার পর চিল্লা সালের পর সাল মসজিদে কাটান নি। তারা জিহাদ করেছেন কিন্তু ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য মিটিং মিছিল আন্দোলন সংগ্রাম করেন নি, পথে-ঘাটে, মাঠে-প্রান্তরে, রাজপথে বুলেট বোমায় ঝাঁজরা হয়ে জীবন উৎসর্গ করতে হয়নি। মসজিদ, মাদরাসা ও খানকায় তালিম, তারবিয়্যত, তাযকিয়াকে একমাত্র ব্রত হিসাবে গ্রহণ করেননি। এতদসত্ত্বেও তারা ছিলেন পৃথিবীর শাসক। এ বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে জ্ঞান-বিজ্ঞান, ধনে-জনে, সৌর্যে-বির্যে, নৈতিক চরিত্র আদর্শবাদিতা ও ক্ষমতায় একমাত্র তারাই ছিলেন সুসভ্য জাতি। অথচ আমাদের এত কিছুর পরও আমরা নিকৃষ্টতম দাস জাতিতে পরিণত হয়েছি। আমরা নিজেরা নিজেরা কুকুরের মত কামড়া কামড়ি করে তো মরছিই, সেই সুযোগে কাফেররা আমদের অস্তিত্ব মুছে ফেলার সর্বাত্বক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। যেমন বাংলাদেশের শাপলা চত্বরে চিন,ভারত,মার্কিন থেকে কাফেররা এসে হত্যাকান্ড ঘটায়নি। পথে-ঘাটে, মাঠে-প্রান্তরে, আদালতে নির্বিচারে জামাতকে কাফেররা এসে হত্যা করছে না-আমরা মুসলমানরাই একে অপরকে হত্যা করছি। জেহাদের নামে তালেবানরা নির্বিচারে মুসলিম হত্যা করছে, এমনকি পেশোয়ারের স্কুলে প্রায় ১৫০ শিশুকে তারা হত্যা করেছে। আইসিল, বুকো হারাম, মুসলিম হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে কখনো সুন্নিরা শিয়াদের মারছে, কখনো শিয়ারা সুন্নিদের মারছে। মিসরের ফিরাউন (সিসি) ব্রাদার হুডের রক্তকে হালাল করে নিয়েছে। মুসলিম বিশ্বে ভ্রাতৃঘাতি হানাহানিতে মুসলমানরা কুকুরের মত কামড়া কামড়ি করে ধ্বংস হচ্ছে। সেই সুযোগে কাফেররাও হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে। আর অমুসলিম দেশগুলিতে মুসলমানদের অবস্থা তো ইতর প্রাণীর চেয়েও শোচনীয়। আজ ফিলিস্তিন, আরাকান, কাশ্মীর, ভারত, জিংজিয়াং ইত্যাদি দেশগুলিতে মানবতার শেষ ফোটা বিন্দু রক্তাশ্রু ঝড়ে পড়ছে। মুসলমান আজ প্রাণী জগতের নিকৃষ্টতর এক প্রাণী। এখন প্রশ্ন হল, ইসলামের এত এত খেদমত করার পরও কেন আমাদের এ করুণ পরিণতি।

এখানে, ঠিক এখানেই কথাটা। বস্তুত আমাদের এই লাঞ্চনাদায়ক পরিণতির কারণ আমরা সবাই জানি কিন্তু মানিনা। বলি কিন্তু বাস্তবায়ন করি না। তা হল সর্বনাশা,সর্বগ্রাসি বিভক্তিবাদ। মুসলিম,অমুসলিম, নির্বিশেষে সকলেরই জানা এই সর্ববিধ্বংসি বিভক্তিবাদই আমাদের ধ্বংসের মূল কারণ। আলেমগণ, ইসলামী স্কলারগণ বারবার একথা বলছেন কিন্তু ঐক্য প্রচেস্টায় কেউ এগিয়ে আসছেন না। সর্বোপরি কোরান-হাদিসে ঐক্য ফরয ও বিভক্তিকে হারাম করা হয়েছে। অথচ আমরা সেসব নির্দেশ উপেক্ষা করে নিজ নিজ ফিরকার চেতনা ফেরি করে বেড়াচ্ছি। এ কারণেই প্রত্যেকটি দল ইসলামের খিদমত করা সত্ত্বেও পরস্পরকে মানা ও স্বীকৃতি দেয়া তো দুরের কথা ইসলামী দল হিসেবেই স্বীকার করছে না।

বস্তুত রাসূল (সাঃ) এর কর্ম পরিধির একেকটা খন্ডাংশকে অবলম্বন করে আমরা দিনের খিদমত করছি এবং নিজেরটাকেই একমাত্র নবী ওয়ালা কাজ, ইসলামের কাজ বলে গন্য করছি, কিন্তু অন্যান্য কাজগুলিকে দ্বীনের কাজ হিসাবে স্বীকৃতি দিচ্ছিনা। যেমন রাসূল (সাঃ) চার প্রকার কর্মধারায় ইসলাম প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। তিনি তা’লীম-তরবিয়্যতের কাজ করেছেন। এখন দেওবন্দিরা এ মহান কাজের দায়িত্ব পালন করছে। কিন্তু অন্যেরা বিশেষতঃ সালাফি ও সুফিবাদীরা এ আজিমুশ্বান খিদমতের স্বীকৃতি দিচ্ছে না। রাসুল(সাঃ) দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ করেছেন, এ কাজ করতে গিয়ে তিনি তায়েফে রক্তাক্ত হয়েছেন। এখন এ মহান দায়িত্ব পালন করছে তাবলীগ জামাত। কিন্তু জামাত ও সুফিবাদীরা এর স্বীকৃতি দিচ্ছে না। তিনি রাজনীতি ও যুদ্ধ করেছেন-যা এখন জামাত শিবির করছে। কিন্তু দেওবন্দি, তাবলীগী ও সুফীবাদী কেহই তাদের এ বিরাট কোরবানীর স্বীকৃতি দিচ্ছে না। রাসূল (সাঃ) তাযকিয়ায়ে নফসের কাজ করেছেন-যা এখন পীর মাশায়েখরা করছেন-কিন্তু অন্যেরা তাদের খিদমতের স্বীকৃতি দিচ্ছে না। রাসূল (সাঃ) এর এ চারটি কর্ম ধারার উপড় ভিত্তি করে উম্মাহ চার ভাগে বিভক্তি হয়ে দ্বীনের খিদমত আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছে। মূলতঃ এ চারটি বিষয়ই হলো ইসলামের মূল খুটি। সাহাবায়ে কেরাম এবং সলফে সালেহিনের যুগে তারা এ চারটি খুটিকে একত্রে রেখেছিলেন অর্থাৎ বিভক্ত না হয়ে ঐক্যবদ্ধ ছিলেন বিধায় তখন ইসলাম প্রতিষ্ঠিত ছিল, তারাও সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন। কিন্তু আমরা এ চারটি খুটিকে ছিন্ন ভিন্ন করে চারটি ধারায় বিভক্ত হয়ে গেছি। ফলে খুটিবিহীন ইসলামের ছাঁদটি মুখ থুবড়ে পড়েছে। কাজেই এখন যতক্ষন পর্যন্ত না এ চারটি খুটি একত্র হচ্ছে অর্থাৎ এ চারটি ধারা ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে-ততক্ষন পর্যন্ত ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হবে না, আর মুসলমানরা পশ্চিমের দাজ্জালের হাতে এভাবে মার খেতে খেতে এক সময় নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। কাজেই এখন কালের দাবী হচ্ছে প্রত্যেক দল মত ও ফিরকা ভিত্তিক ইসলামী কার্যক্রম বন্ধ করে ঐক্যবদ্ধভাবে ইসলাম প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করা। দল ও ফিরকা ভিত্তিক কার্যক্রম বন্ধের কারণ হচ্ছে, রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে এতটুকু উদারতা দেখা যায় যে, আওয়ামী ঘরানার বুদ্ধিজীবিরাও আওয়ামী লীগের দোষ ত্রুটির সমালোচনা করে বক্তৃতা দেয়, প্রবন্ধ লিখে। আর তখন বিরুধিদলের লোকেরাও তা শুনে, পাঠ করে এবং সমর্থন করে । তদ্রুপ বিএনপির বুদ্ধিজীবিরাও দলীয় সমালোচনা করে, আর বিরোধি পক্ষরা তা শুনে, পড়ে ও সমর্থন করে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো ইসলামী দলগুলোর কেউ স্বপক্ষের সমালোচনা তো করবেই না ,এমনকি জানা দোষ-ত্রুটি,শিরক, বিদআত সম্পর্কেও সমালোচনা করবে না বরং সাফাই গাইবে। সমালোচনা করলেও লাভ নেই। কারণ ইসলামপন্থীরা যখন কোন বক্তব্য শুনে বা বই/প্রবন্ধ পাঠ করে-তখন তার সচেতন বা অবচেতন মন কোন ক্লু খুজতে থাকে যে,বক্তা বা লেখক কোন দলের। যদি কোনভাবে বুঝতে পারে, সে তার স্বদলের নয় ভিন্ন দলের, তাহলে সেই বক্তব্য বা লেখা যতই সত্যনিষ্ঠ হউক না কেন, যতই কোরআন হাদিস ভিত্তিক হউক না কেন-পাঠক তা পড়েই না, পড়লেও তা গ্রহণ করে না, মেনে নেয় না। অর্থাৎ রাজনৈতিক দলগুলোর উদারতাটুকুও তাদের মধ্যে নেই। কাজেই বুঝা যাচ্ছে আমরা দলগত বা ফিরকাগতভাবে যতই ইসলামের খিদমত করছি ততই ইসলামী দলগুলির মধ্যে দুরত্ব সৃষ্টি হচ্ছে, কেউ কাউকে সমর্থন করছে না বরং উল্টো শত্রুতা পোষণ করছে, একে অন্যকে ধ্বংসের চূড়ান্ত প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এমনকি প্রতিপক্ষ ভাইকে ধ্বংস করার জন্য শত্রুর সাহায্য নিচ্ছে। সুতরাং আমরা বলতে বাধ্য হচ্ছি, ইসলামের খিদমত অনেক হয়েছে আর নয়। এখন মুক্তির একটাই পথ। আর তা হল দলগত ও ফিরকাগত ইসলামী চেতনার ফেরী বন্ধ করে একটাই চেতনা জলে-স্থলে, অন্তরিক্ষে-নিরিক্ষে, ইথারে ছড়িয়ে দাও, তা হল মুসলিম জাতীয় ঐক্য, ঐক্য, ঐক্য।

সুতরাং এখন মহাকালের দাবী হচ্ছে এসব ব্যর্থ খেদমত বন্ধ করে ইসলামের মৌলিক বিষয়, কোরআন সুন্নাহর মূল হুকুমের দিকে অগ্রসর হওয়া। তা হলো ‘তোমরা ঐক্যবদ্ধভাবে দ্বীন প্রতিষ্ঠা কর কখনো বিভক্ত হয়ো না’। কাজেই ভাইটি/বোনটি আমার, তুমি দেওবন্দী, তাবলিগি, জামাতী, তাহরিরী, তাওহিদী, ব্রাদার হুড যেই হও না কেন, যতক্ষন ইসলামের মূল নির্দেশ ঐক্যের পথে ফিরে না আসবে ততক্ষণ ইসলাম ও উম্মাহর মুক্তির কোন উপায় নেই। কাজেই ভাই-বোনেরা দৌড়াও, উল্কার গতিময়তা ও টনের্ডোর ধ্বংসলীলা নিয়ে ঐক্যের পথে ধাবিত হও। অন্যথায় (বিভক্তির কারণে) ইসলাম ও উম্মাহ ধ্বংসের দায়ে আল্লাহ্‌র দরবারে জবাবদিহি করতে হবে। সুতরাং আওয়াজ বুলন্দ কর, আমরা ঐক্যবদ্ধ হব পৃথিবীর কোন হিমালয় অথবা আটলান্টিক ঐক্যের পথে বাধার সৃষ্টি করতে পারবে না। করলে হিমালয় ধুলিস্মাত হবে, আটলান্টিক শুকিয়ে যাবে, ইংশাল্লাহ। (ধারাবাহিক)

Leave a Reply