আগের পোষ্ট :শরিয়াহঃ ইবনে তাইমিয়া প্রসঙ্গে আলাপ
বর্তমান পৃথিবীতে যেসব প্রশ্ন আমাদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে এবং নতুন রাজনীতি নির্মাণে প্রধান প্রশ্ন আকারে সামনে এসেছে এর মধ্যে ‘শরিয়াহ’ অন্যতম। কিন্তু শরিয়া নিয়ে আলোচনা সহজ নয়। এর বাস্তব প্রয়োগ যেমন বিতর্ক তৈরি করে তেমনি ইসলামকে দানবীয় বর্বর ধর্ম হিসাবে হাজির করবার জন্য পাশ্চাত্য শরিয়ার বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রপাগাণ্ডা চালায়। ঐতিহাসিক ভাবে শরিয়ার উৎপত্তি ও বিবর্তন বোঝা এবং শরিয়াকে কেন্দ্র করে ইসলামে আইন, রাষ্ট্র, শাসন ব্যবস্থা, ক্ষমতা ইত্যাদি ধারণার উৎপত্তি ও বিবর্তন কিভাবে ঘটেছে সে সম্পর্কে বুদ্ধিবৃত্তিক নিষ্ঠার সঙ্গে শরিয়া পাঠ ও বিশ্লেষন ছাড়া গত্যন্তর নাই। সেই পাঠ একই সঙ্গে আধুনিক রাষত্রের পর্যালোচনাতেও সহায়ক হতে পারে। চিন্তা পাঠচক্র বিষয়টিকে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করে এবং এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে পাঠচক্র চলছে। পাঠচক্রে যে কেউই স্বাগতম।
শরিয়া নিয়ে দুনিয়া জুড়ে নতুন আলাপ আবার শুরু হয়েছে। এটা ঘটছে বিশেষ করে ৯/১১ পরবর্তী দুনিয়ায় সাধারণ ভাবে ধর্ম এবং বিশেষ ভাবে ইসলাম প্রশ্ন সামনে চলে আসার কারনে। ধর্ম, দর্শন, রাষ্ট্র ইত্যাদি নতুন করে পর্যালোচনার অধীন হচ্ছে আবার, বিশেষত তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক বিচার জরুরী হয়ে উঠেছে। এই তাগিদে নতুন উৎসাহে ধর্ম নিয়ে নতুন পঠনপাঠন শুরু হয়েছে। টুইন টাওয়ার ও পেন্টাগনে উড়োজাহাজ হামলার পর থেকে ইসলাম সেই পঠন পাঠনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। ‘আধুনিকতা’, ‘প্রগতি’ ইত্যাদি ধারণা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠার মধ্য দিয়ে তার ছেদ ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে গিয়ে ‘উত্তর আধুনিক’ নামে নতুন ভাবে চিন্তার যে চেষ্টা শুরু হয়েছিল, সেটাও বাস্তব ও ব্যবহারিক প্রশ্নের কোন কার্যকর মীমাংসার প্রস্তাব করতে পারে নি। ব্যাক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক ও ব্যবাহারিক প্রশ্নের উত্তর তারা দিতে পারবে বলে সন্দেহ তৈরি হয়েছে অনেক আগেই। সেটা প্রকট ভাবে ধরা পড়ে ইসলাম নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে। সেটা দর্শন, রাজনীতি, আইন, সংস্কৃতি ইত্যাদি নানান দিক থেকে যেমন সত্য। শরিয়া নিয়ে আলোচনায় সেটা আরও প্রকট ভাবে ধরা পড়ে।
যে সকল জনগোষ্ঠির ধর্ম ইসলাম তাদের জন্য এই অভাব নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে হাজির হয়েছে। ধর্ম, দর্শন, সংস্কৃতি, রাজনীতি ইত্যাদির পর্যালোচনাকে সকলের জন্য প্রাসঙ্গিক করে তুলতে হলে ইসলাম নিয়ে আন্তরিক পঠন পাঠনের কোন বিকল্প নাই।
এই তাগিদ থেকে গত এপ্রিল মাস থেকে চিন্তা পাঠচক্রে আমরা ধারাবাহিকভাবে কিছু বই পড়ছি। তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, ইয়াসের আওদার ‘মাকাসেদে শরিয়াহ’ (Auda, 2007), ইবনে তাইমিয়ার ‘সিয়াসা শারিয়া’ (Taymiyyah, 2006), হাশিম কামালির ‘শারিয়া ল’ (Kmali, 2008), বাবের জোহানসেনের ‘A Perfect Law in an Imperfect Society’ (Johansen, 2008), তালাল আসাদের ‘রিলিজিয়ন, ন্যাশন স্টেইট এন্ড সেক্যুলারিজম’ (Asad, 2003) ও ‘মুহাম্মাদ আসাদ ‘বিটুইন রিলিজিয়ন এন্ড পলিটিক্স’, ওয়ায়েল হাল্লাকের ‘ইম্পসিবল স্টেইট’ (B.Hallaq, 2013) ও ‘Can shariyah be restored?’, Mohammad Fadel এর ‘A tragedy of politics or an apolitical tragedy’, ওভামির আঞ্জুমের ‘Politics, law and community in Islam: Ibn Taimiyan Moment’ (Anjum, 2012) , ইত্যাদি। শরিয়া নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনা ও তর্ক বিতর্কগুলো ঘনিষ্ঠ ভাবে অনুসরণ করাই আমাদের ইচ্ছা। সেসব আলোচনার কিছু সারসংক্ষেপ ধারাবাহিক তুলে ধরার চেষ্টা হিসাবে দ্বিতীয় কিস্তি পেশ করছি। আজকের কিস্তিতে থাকছে ওয়ায়েল হাল্লাকের ‘ক্যান দ্যা শরিয়াহ বি রিস্টরড? (শরিয়াহকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব কিনা)’ নিয়ে পর্যালোচনা। আশা করি চিন্তার পাঠকদের কাজে লাগবে, এবং আগ্রহীরা চিন্তা পাঠচক্রে নিয়মিত যোগ দিতে আগ্রহ বোধ করবেন।
ওয়ায়েল হাল্লাকের পরিচিতিঃ
ইসলামী শরিয়াহর স্কলারদের মধ্যে যাদেরকে অথরেটি মনে করা তাদের মধ্যে ওয়াহেল হাল্লাক একজন। গত পঞ্চাশ বছরে মধ্যে প্রাচ্যে আধুনিক এবং পশ্চিমা চিন্তার জগতে যারা যথেষ্ট সক্ষমতার সাথে পশ্চিমা চিন্তাকে প্রশ্ন করেছেন, তাদের মধ্যে দুইজন ব্যক্তি আসছেন ফিলিস্তিন থেকে। একজন এডওয়ার্ড সাঈদ, তিনি রোমান ক্যাথলিক ছিলেন। আরেকজন ওয়াহেল বি হাল্লাক। ফিলিস্তিনের প্রশ্নকে রাজনৈতিক প্রশ্ন আকারে প্রতিষ্ঠা করবার লড়াইয়ের মধ্যে এডওয়ার্ড সাঈদের প্রজন্মটা তৈরি হয়েছে। তার ইন্টেলেকচুয়াল কাজের প্রধান জায়গা এটাই। এরপর ‘পলিটিকাল ইসলাম’ কথাটা যখন চালু হয়েছে, তখন আরেকটি প্রশ্ন উঠেছে, শরিয়াহ এবং ইসলামের রাজনৈতিক বয়ানটা কি? ফিলিস্তিনে এটা আশি নব্বই দশকের দিকে প্রধান হয়ে ওঠে। এই ফেনোমেনার সাথে দেখা গেল আরেকজন ব্যক্তির নাম চলে আসে, তিনি ওয়াহেল হাল্লাক। বর্তমানে কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে পড়াচ্ছেন।
ওয়ায়েল হাল্লাকের ‘ক্যান দ্যা শরিয়াহ বি রিস্টরড?’ নিয়ে আলোচনাঃ
গত কয়েক দশকে আমরা দেখছি, বিভিন্ন ইসলামি রাজনৈতিক দল ও তাদের সংগঠন শরিয়াহকে ফিরিয়ে আনার একটা চেষ্টা করেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা মনে করতেন, শরিয়াহ জিনিসটা ‘ওয়েল ডিফাইন্ড’ এবং এটাকে পিছনে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। ফলে এটা আর আমাদের সামনে হাজির নাই। শরিয়াহ নিয়ে কয়েক দশক ধরে অনেকগুলো লেখা হয়েছে। এরকম একটা সংকলন হচ্ছে ‘নেসেসিটি টু এপ্লাই শরিয়াহ’। সেখানে দেখা যাচ্ছে শরিয়াহর প্রয়োজনীয়তা বর্ণণা করতে গিয়ে একজন লেখক বলছেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব স্বার্থের জন্য শরিয়াহ প্রয়োজন।
হাল্লাক বলছেন, তাদের এমন বক্তব্যে বিষয়টির পূর্ণাঙ্গ ও বিস্তারিত আলোচনা আসে নাই। তাদের অনেকের চেষ্টা ছিল যে, শরিয়াহর বিষয়টাকে শুধু ঐসমস্ত মানুষের কাছে তুলে ধরা, যারা আধুনিক আইনি কাঠামোর মাধ্যমে নিজেদের একটা অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে। হাল্লাকের বক্তব্য হল তারা এমনভাবে বিষয়টাকে উপস্থাপন করতে পারেন নাই, যার ফলে আমরা বুঝতে পারি, মর্ডানিটির মধ্যে শরিয়াহর বিষয়টা কতটা সমর্থনযোগ্য? তারা বরং শরিয়াহকে এমনভাবে পাঠ করে, যেখানে মনে হয়, শরিয়াহ ইতোমধ্যে মৃত হয়ে গিয়েছে। কিভাবে শরিয়াহ মৃত এটা নিয়ে তিনি অনেকগুলো তর্ক তুলেছেন।
তার প্রথম তর্ক হল, আধুনিক রাষ্ট্র হওয়ার সময় মুসলমানদের মধ্যে ন্যাশনালিজমের উত্থান ঘটে। তখন শরিয়াহ বিষয়টা মৃত হয়ে গেছে। কারণ আধুনিক রাষ্ট্রের আগে যিনি শাসক ছিলেন, তিনি বিচারক নিয়োগ বা বহিস্কার ছাড়া বিচারকার্যের আর কোন বিষয় ডিল করতেন না। ঐসময়ের যারা রিলিজিয়াস অথরেটি ছিলেন তারা বিষয়গুলো ডিল করতেন। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্র তৈরি হওয়ার পর সে নিজেই একটা লেজিসলেশন হয়ে গেল। আর যারা শরিয়াহ বিষয়টা দেখভাল করতেন তাদের বিষয়টা চাপা পড়ে যায়। আধুনিক রাষ্ট্র এরপর বিভিন্ন ল এর কোডিফিকেশন তৈরি করেছে। ইসলামেও কোডিফিকেশন হয়েছে, কিন্তু ইসলামে যখন কোডিফিকেশন করা হচ্ছিল তখন সে নিশ্চিত ফলপ্রদভাবে এমন কিছু কার্যপ্রণালী তৈরি করছে এরমাধ্যমে সমাজের উপকারার্থে একটা প্র্যাকটিস তৈরি করা যায় এরকম সিস্টেম দাঁড় করিয়েছে।
আরেকটা কারণ হচ্ছে কেন্দ্রীয়করণ। সুলতান মাহমুদের সময় তিনি যত ওয়াকফের সম্পদ আছে এগুলাকে একত্রিত করার জন্য একটা মন্ত্রনালয় করলেন। ফলে আগে যারা ওয়াকফগুলো দেখাশুনা করতেন আস্তে আস্তে তারা বাদ পড়ে যায়। সুলতান মাহমুদ দ্বিতীয়’র সময় আরেকটা জিনিস দেখা গেল। অনেকগুলো আধুনিক স্কুল তৈরি করা হল। এগুলার মাধ্যমে মানুষজন আধুনিক আইন কানুন পড়ত এবং এগুলোর প্রয়োগ করত। তখন দেখা গেল, যে সমস্ত মাদ্রাসা ওয়াকফের দানের ওপর নির্ভরশীল ছিল, সিস্টেমিটিকালি এগুলো পিছন পড়ে গেল। এর ফলে যারা আগে বিচারক ছিলেন বা লিগাল এডমিনিস্ট্রেটর ছিলেন, তারা তাদের কর্মক্ষেত্রগুলা হারাতে শুরু করলেন। মাদ্রাসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে ওয়েস্টার্ণ ল স্কুল, ইউরোপিয়ান আইন, ইউরোপিয়ান কাঠামো মুসলমান দেশগুলোতে এসে হাজির হল। ফলশ্রুতিতে তারা একটা আধুনিক আইনি কাঠামোর মধ্যে হাজির হয়। আগের প্রয়োজনীয় আইনগুলো মুলোৎপাটন করে কিছু কিছু ক্ষেত্রে শরিয়ার বিষয়গুলোকে নিয়ে আসা হল। বিভিন্ন স্কুল থেকে তারা তাদের সুবিধামত আইন তৈরি করল। যেমন জর্ডানে বৃটিশরা শাসন ক্ষমতা নেওয়ার পর একটা ফ্যামেলি ল করে। এটি ছিল ওসমানী সাম্রাজ্যের ম্যারেজ ল এর মত। পরবর্তীতে ১৯৪১ সালে সেটা আবার চেঞ্জ করে শরিয়াহ ল করল। পরে আবার চেঞ্জ করল। দেখা গেছে, তিন দশকের মধ্যে ঐ আইনটা তিন থেকে চারবার চেঞ্জ করা হয়েছে। যদিও সেখানে শরিয়াহর কিছু কিছু বিষয় ছিল কিন্তু আদতে আইনগুলো মডার্ণ স্টেটের ধারণা থেকে এসছে। তাদের প্রয়োজনমত কাটাছেড়া করে জিনিসগুলোকে রেখেছে।
ইসলামে কিভাবে আইনের বিষয়গুলো আসল এটা একটু বলি। আমরা তাকলিদের একটা ধারণা জানি, তাকলিদ মানে হচ্ছে একজন ইমামকে অনুসরণ করা। যেমন ইমাম আবু হানিফা এভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, ইমাম শাফি এভাবে করেছেন আমি শুধু তাঁকে অনুসরণ করব। অন্য কোন ইমাম এটা সম্পর্কে কি বলছেন আমি সেটা অনুসরণ করব না। এটা ছিল তাকলিদ। এরপর ইসলামে আইনী কাঠামোয় একটা মাজহাবের ধারণা নিয়ে আসল। ইসলামের প্রথম দুই তিন শতকে এভাবে আইনের কাঠামোগুলো তৈরি হচ্ছিল।
হালাকের ব্যাখ্যার মৌলিক জায়গা হচ্ছে যে তিনি বলছেন ট্রাডিশনাল জুরিস্টরা ইসলামের দুই তিন শতকের মধ্যে ইসলামের শরিয়াহর কম্প্রিহেনসিভ একটা নোশন নিয়ে আসল। প্র্যাকটিস, তাফসীর, আইনি মতবাদ সবগুলো মিলে বারশ বছর ধরে একটা আইনি সংস্কৃতি গড়ে ওঠছিল। এর মাধ্যমে মুসলমানদের একটা আলাদা আইনি জগত তৈরি হয়েছিল। যখন একজন কাজী কোন একটা রায় দিতেন তিনি ঐসময়কার এবং ঐতিহাসিক যে সিলসিলা সব কিছুর তিনি তখন প্রতিনিধিত্ব করতেন।তারা একটা আইনি তত্বের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের পুর্বানুমান দিতেন এবং তারা পরিশোধন এবং বিবর্তনের মাধ্যমে অসংখ্যা আইনের সমাধান দিয়েছন। তারপর তারা আইনের কিছু সুস্পষ্ট মৌলিক নীতিমালা তৈরি করেছিলেন। বিভিন্ন স্কুলের অথরেটীভ ফিগাররা ইসলামের একটা বিশাল জ্ঞানভান্ডার তৈরি করছেন এবং তাদের যে ইন্টারপ্রিটেশনগুলো পরবর্তীতে জুরিস্টরা রিসিভ করেছেন।
কাজী বা মুফতিদের আবার কিছু সিস্টেম ছিল তারা কিভাবে বিষয়গুলোকে ব্যাখ্যা করতেন। তাদের কিছু স্কুল ছিল যেগুলোকে আমরা মাদ্রাসা বলি যার মধ্যে শরিয়াহর বিষয়গুলোকে পড়াতেন। তারপর তারা সেখানে জিনিসগুলো প্র্যাকটিস করতেন। পুরো বিচারিক ব্যবস্থা তখন অর্থনৈতিকভাবে এবং প্রশাসনিকভাবে ছিল স্বয়ংসম্পুর্ণ স্বাধীন একটা প্রতিষ্ঠান। তারা এক্সক্লুসিভলি এবং ইনডুভিজুয়ালি এ বিষোয়গুলোর রায় দিতেন। ইসলামী আইনকে প্যাকটিস করার যে কায়দা ছিল আধুনিক সময়ে এগুলো কিছুই দেখছি না। বরং বর্তমান সময়ে কিছু কিছু আইনকে কাঁটাছেড়াভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
হালাক প্রশ্ন তুলেছেন ট্রাডিশিওনাল সিস্টেমগুলোর প্রিন্সিপাল, ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এগুলোর ভিতর থেকে ইসলামী আইনকে আবার নতুন করে মানুষের সামনে হাজির করা সম্ভব কিনা। তিনি বলছেন আগে ইসলামের বিষয়গুলোকে প্র্যাকটিস করা হোত ঐগুলোকে এই সময়ে আবার হাজির করা অনেক কষ্ট হবে।আগের যে সিস্টেম ছিল এটার ধ্বংসস্তুপ থেকে কি নতুন কোন ইসলামের আইন বর্তমানে নিয়ে আসা যায় কিনা। তিনি বলছেন যে আমি যদি তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নিই বর্তমান মুসলমানরা মনে করে যে তাদের একটা রিলিজিয়াস ল দরকার। কেননা ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে মুসলমানরা এক ধরনের আইডেনটিটি ক্রাইসিস দেখছে। এবং তাদের জীবন যাপনের আগে যে ইসলামিক প্যাক্টিস ছিল এগুলো আস্তে আস্তে গরহাজির হয়ে গেছে। বর্তমান যে ওয়ার্ল্ড ভিউ এতে মুসলমানরা দেখতেছে যে এটা হচ্ছে সেকুলারিজমের ওপর ভিত্তি করা এর মধ্যে মুসলমানদের এথিকসের যে বয়ান এগুলা মর্ডানিটির সরাসরি বিপরীত। এবং সামাজিক কাঠামোর মাধ্যমে ইসলামের এথিকসের বয়ানের সাথে পশ্চিমের যে বয়ান তা খাপ খায় না। এজন্য ইরানী বিপ্লবের সময় মুসলমানরা যখন দেখল যে পশ্চিমা চিন্তা থেকে মোহমুক্তি হয়ে ইসলামের দিকে ফিরার একটা বয়ান তৈরি হয়েছে। ইসলামের পুনর্জাগরণের মাধ্যমে তারা এটার সমাধান চাচ্ছে।
জোসেফ শাট আবার এখানে আর্গু করলেন যে মুসলমানরা বর্তমানে যে প্রবলেমটা ফেস করছে এই সমস্যাটা তারা ইসলামের প্রাথমিক সময়েও ফেস করেছে। প্রাথমিক সময়ে ইসলামের বয়ানগুলো যখন আস্তে আস্তে তৈরি হচ্ছিল তখন তারা কোরআনকে মৌলিক বিষয় ধরে নিয়ে বিভিন্ন বিষয়ের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে একটা আইনি কাঠামো তৈরি করে নিয়েছে। পরবর্তীতে এ আইনী কাঠামোগুলো এমন পর্যায়ে চলে যায় মানুষ মনে করে যে এগুলো ইসলামিক। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এগুলো কোরাআনের বাইরের অনেক বিষয় ডিল করেছে। তিনি বলছেন ইসলামী আইন তৈরি করতে কিছু কিছু উপাদান তারা জিউসদের থেকে, রোমান এবং অন্যান্য যে আইনি কাঠামো ছিল তাদের কাছ থেকে নিয়ে একটা কাঠামো তৈরি করেছিল। দেখা যাচ্ছে মুসলমানদের আইন তৈরি করার সময় তাদের মৌলিক উপাদান যেটা ঐটার সাথে তাদের প্র্যাকটিসের এক ধরনের গ্যাপ ছিল। জোসেফ প্রশ্ন করছে যে তাহলে আধুনিক যামানায় মুসলমানরা একইভাবে আধুনিকতা থেকে কেন নিচ্ছে না?
কিন্তু হাল্লাক বলছেন জোসেফের প্রশ্নটা আপত্তিজনক, কারণ শাট দুইটা সময়কে যেভাবে সমানভাবে দেখছে এর মধ্যে কিছু বিপদ আছে। প্রথম শতাব্দীতে মুসলিম চিন্তাবিদ যখন চিন্তা করত তার কোন ধরনের বাধা ছিল না। কিন্তু বর্তমান ক্ষেত্রে এটা কঠিন কাজ। দ্বিতীয় মুসলমান আলেমরা সে সময় যখন ফতোয়া দিত তখন মুসলমানরা ছিল ক্ষমতায় ফলে তাঁরা দৃঢ়তার সাথে কাজ করতে পারত। কিন্তু আধুনিক যামানায় তাদের ঐরকম কোন ক্ষমতা না থাকায় তাঁরা কোন কাঠামো তৈরিও করতে পারবে না। দুইটা সময় সম্পুর্ণ ভিন্ন। তৃতীয় হচ্ছে যে সব বিশেষজ্ঞ তৎকালে আইন তৈরি করতেন ঐরকম বিশেষজ্ঞ বর্তমানে আর নাই এবং বিশেষজ্ঞ তৈরি করার জন্য কোন ধরনের প্রতিষ্ঠানও মুসলমানদের মধ্যে গড়ে ওঠে নাই।
তো এরকম পরিস্থিতে সমাধান কি? হাল্লাক উসুলে ফিকাহকে নিয়ে আসছেন। উসুলে ফিকাহর আগের যে বিধান ছিল বর্তমানে মুসলমানদের জন্য কম্প্রিহেনসিভ আইনি একটা কাঠামো তৈরি করা অসম্ভব। এরপরো তিনি বলছেন যে যদি কন্ডিশনকে চেঞ্জ করা যায় অর্থাৎ আমাদের প্রাত্যহিক জীবন থেকে পুরোপুরি পশ্চিমকে খারিজ করে দেওয়া যায়।হাল্লাক বলছেন এটা খুবই কঠিন কাজ। হাল্লাক দেখাইছেন যে কোন দিক থেকে শরিয়াহর পুনর্জাগরণ একটা অসম্ভব ব্যাপার। মুসলিম ইন্টেলেকচুয়ালরা যারাই এ বিষোয়গুলো নিয়ে চিন্তা ভাবনা করছেন তাঁরা আসলে মারজিনালাইজ হয়ে যাবে।
সর্বশেষ তিনি বলছেন শরিয়াহ নিয়ে আসা যাবে তবে সেটা পারবে স্টেট, কিন্তু স্টেট সেটা একা একা পারবে না। স্টেটের সাথে ইন্টেলেকচুয়াল যে ফোর্স তাদের সাহায্য করতে হবে। শুধু তাতেও হবে না; তাকে শরিয়াহর জন্য স্কুল তৈরি করতে হবে, শরিয়াহর বিষয়ে জ্ঞানী ব্যাক্তিদের জুরিস্ট হিসেবে নিয়োগ দিতে হবে, তাদের ওইররক পদমর্যাদা দিতে হবে, প্রশাসনিকভাবে তাদের সকল ধরনের সহায়তা করতে হবে। এরপরো বিভিন্ন সমস্যা থেকে যায়, আধুনিক যামানায় শরিয়াহ আইন করতে গিয়ে বিভিন্ন কর্পোরেট আইন করলেন কিন্তু একটা ভয় থেকে যায় যে সুদের ফাঁদ থেকে কি বের হতে পারবেন? আবার যারা সংখ্যালঘু থাকবে তাদের বিষয়টা কিভাবে ডিল করবেন, এরপর আছে নারী প্রশ্ন। আধুনিক সোসাইটিতে নারী যে নতুন ধরনের একটা রোল প্লে করছে সেক্ষেত্রে ইসলামের বয়ানটা কিরকম হবে? এসবগুলো বিষয় আলোচনা করে হাল্লাক বলছেন যে স্টেট আসলেই সফলকাম হবে কিনা একটা প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।
হাল্লাকের আলোচনা নিয়ে ‘চিন্তা’র পর্যালোচনাঃ
হাল্লাকের কথা হচ্ছে শরিয়াহ প্রয়োগ করতে হলে একটা সোশাল কন্ডিশন তৈরি করতে হবে, এটা তো রাষ্ট্র না চাইলে কখনোই হবে না। রাষ্ট্র এরকম একটা পরিস্থিতি ক্রিয়েট করলে শরিয়াহকে পুনর্জীবিত করার একটা সম্ভবনা হতে পারে। কিন্তু তারপরেও অনেকগুলো প্রবলেম থেকে যাবে যেটা আদৌ সম্ভব হবে কিনা এটা হাল্লাকের ওপেন কোশ্চেন আর কি।
তার মুল আলোচনার জায়গাটা হচ্ছে ইসলামীক চিন্তা এবং আন্দোলনের মধ্যে শরিয়াহ বাস্তবায়ন করার যে চেষ্টাগুলো দেখা যায় অথবা বাস্তবায়নের সম্ভবনা আছে মনে করে এগুলা যথেষ্ট ওয়েল থট আউট না। তার বক্তব্য হল এখনকার যামানায় এসে অনেক কিছুই আর আগের মত নাই। সিম্পল সে ইন্টেলেকচিয়াল ফোর্সটাই তো নাই। যে কালচারাল সোশাল ইন্টেলেকচুয়াল ফোর্স তৈরি হওয়ার মধ্য দিয়ে এটা সামাজিক স্তরে চর্চা হতে পেরেছে সেটা আর নাই। এখানে আরেকটা জিনিস আপনি মিস করেছেন সেটা হল শরিয়াহর প্র্যাকটিসটা তো ল এর প্র্যাকটিস না। কাজীর একটা নির্ধারিত ভূমিকা আছে, এখানে মুফতিরা থাকবেন, ওলেমারা থাকবেন। এ মুফিত ওলেমারা কোত্থেকে আসবে, তাদের সামাজিক মর্যাদা সে প্রতিষ্ঠান তৈরি করা সে চর্চাগুলোর মধ্য দিয়ে সক্ষমতায় যাওয়া। যাওয়ার পরে যে প্রশ্নটা সেটা হল যে এখল ওসুলে ফিকাহকে নতুন করে রিকন্সট্রাক্ট করতে হবে। হিউজ বুক আছে, অনেক ইন্টারপ্রিটেশন আছে, ইজতেহাদের অনেকগুলো উদাহরণ আছে, স্কুল আছে এগুলোর মধ্যে দিয়ে একটা নরমেটিভ স্ট্রাকচার দাঁড় করানো সহজ কাজ না। এবং করতে গেলে একটা রেডিকাল চেঞ্জ আসবে। আগে তো এরকম সেন্ট্রালাইজ, কোন একটা জুরিস্প্রুডেন্সিয়াল দ্বারা তো চলে নাই এটা। আগে অনেক বেশি লোকেলাইজ ছিল, কনসেনসাসের ধারনার মধ্যে দিয়ে চলছে। এমন কোন কোদিফিকেশন তো ছিল না।
যেমন ফোতোয়ার সংকলন হয়েছে কোন কাজীর সিদ্ধান্ত তো সংকলন হয় নাই। ফলে রুলের তো কালেকশন ঘটে নাই। এই যে প্লুরাটি, মাল্টিপ্লিসিটি এখন ডিফারেন্ট কন্ডিশনের কারণে এটার আর কোন বাস্তবায়ন সম্ভবনা নাই এই আলোচনায় অনেকে গিয়ে শেষ করেন। সমস্যাটা সেটা না। আপনি এক্সপেরিয়েন্সগুলোকে নরমেটিভেনাইজ করার দরকার নাই। এ প্র্যাকটিসগুলোর মধ্যে ইনসাইট এবং প্রপোজিনগুলো কি যেটা এখনকার বাস্তবতায় রিকন্সটিটিউট করতে চান তাহলে কিভাবে করবেন। চ্যালেঙ্গের জায়গা হল সেটা। সে বলছে যে , এটা সোশাল কালচারাল কন্ডিশন আকারে এক্সিস্ট করে না। যে ম্যাসিভ ইন্টেলেকচুয়াল প্র্যাকটিস হলে পরে সোশাল কন্ডিশন ক্রিয়েট হয়, শর্ত প্রস্তুত হয়; সে শর্ত প্রস্তুত হবে কিভাবে এটা তো সামাজিকভাবে আসলে হবে না। যদি আসলে কোন রাষ্ট্র এরকম কোন এনাবলিং কন্ডিশন তৈরি করে এবং তার মধ্যে দিয়ে সে এ স্কোপগুলো দেয় তাহলে একটা সম্ভবনা তৈরি হতে পারে। কিন্তু সে সম্ভবনা তৈরি করার ক্ষেত্রে প্রথম কাজ যেটা হবে সেটা হল শরিয়াহর একটা নতুন ব্যাখ্যা, নীতি এবং বাস্তবতা তৈরি করা। এটা আগেরগুলোকে বাদ দিয়ে না, আগেরগুলো থেকে কিভাবে সেটা তৈরি হবে এবং তৈরি করা গেলেও কিছু কিছু চ্যালেঞ্জ আছে যেটা আদৌ মোকাবিলা করা যাবে কিনা এটা নিয়ে হাল্লাক সন্দিহান।
Source: Facebook
প্রাসংগিক পোষ্টঃ The Impossible State: Islam, Politics, and Modernity’s Moral Predicament by Wael Hallaq (with E-book)





