আল কোরানের কাঠগড়ায় বিভক্তিবাদ- নকীব আরসালান

বর্তমান বিশ্বে মুসলিম জাতি নির্যাতিত, নিপীড়িত, শোষিত, পদদলিত মানবাধিকার বঞ্চিত এক সর্বহারা জাতি। বাস্তবতায় মনে হয় মুসলমানরা যেন এ ভূ-গ্রহের উদ্বাস্তু জাতি। পৃথিবীর এমন কোন ভূখণ্ড নেই যেখানে বন্য প্রাণীর মত মুসলিম গণহত্যা চলছে না, নির্যাতন হচ্ছে না। খৃষ্টানরা বিশ্বময় মুসলিম জাতিকে হত্যা করছে, শোষণ করছে। আঙ্গুলে গোনা কিছু ইহুদী মুসলিম জাতিকে শোষণ করে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছে- সেই সম্পদে মুসলমানদের দাসত্ব নিগড়ে আবদ্ধ করে নিধনযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে। মুসলিম জনসংখ্যা ও সম্পদের তুলনায় অতীব নগণ্য হিন্দু বৌদ্ধরা মুসলিম হত্যার উৎসব পালন করে চলেছে। পশ্চিমের দাজ্জাল শান্তিপূর্ন মধ্যপ্রাচ্যকে আগ্নেয়গিরিতে রূপান্তরিত করেছে। মুসলিম দেশগুলিকে নিকৃষ্টতম দাসে পরিণত করেছে। অমুসলিমরা তো মারছেই সেই সাথে মুসলমানরাও ইহুদী-খৃষ্ট সৃষ্ট ষড়যন্ত্রের ফাঁদে পা দিয়ে জাতির ধ্বংস ত্বরান্বিত করছে। কাফেরের হাতে যে পরিমাণ মুসলিম নিহত হচ্ছে প্রতিটি মুসলিম দেশে ভ্রাতৃঘাতি আত্মহননে তার চেয়েও অধিক মানুষ মারা পড়ছে। আফগানিস্তানে প্রথমে রাশিয়া হত্যাযজ্ঞ চালাল, তারপর নিজেরা নিজেরা মরল, তারপর আমেরিকা মারল, এখন আবার নিজেরা নিজেরা মরছে। মধ্যপ্রাচ্যে সাদ্দাম শিয়াদের মারল, তারপর আমেরিকা দুই বারে সুন্নিদের মারল, এখন আবার সুন্নিরা শিয়াদের মারছে। আমাদেরকে প্রথমে ইংরেজরা মারল, তারপর হিন্দুরা মারল, তারপর পাকিস্তানিরা মারল, এখন কোন ঘাতক না পেয়ে নিজেরাই শুরু করেছি। হেফাজত, জামাত, আওয়ামী লীগ নাম ধারন করে আত্মঘাতি খেলায় মেতে উঠেছি। তাছাড়া তালেবান, আইসিস, বোকু হারাম জাতীয় কিছু ভুইফোড় সংগঠন মুসলিম হত্যায় সিংহের বিক্রম দেখায় কিন্তু আরাকান, ফিলিস্তিন, জিংজিয়াং ইত্যাদি মজলুম মুসলমানদের বেলায় মুশিকের গর্তে আত্মগোপন করে। তারা মুসলিম হত্যায় বিধর্মিদের সাথে প্রতিযোগিতায় নেমেছে এবং ডিঙ্গিয়ে যাচ্ছে। কাজেই পৃথিবীর বাস্তবতা বলছে, মুসলিম জাতি যেন পশুর জাতি, তাদেরকে বিধর্মিরা মেরে কেটে যা থাকবে–বাকীরা কুকুরের মত কামড়া কামড়ি করে নিঃশেষ হয়ে যাবে। হায় কষ্ট, কেন এই পতন, আমরা কি এভাবেই নিঃশেষ হয়ে যাবো ? আমাদের কি মুক্তি ও উত্থানের কোন পথ নেই ? রাসুল (সাঃ) তো বলে গেলেন- ‏ ‏ عن مالك ‏ ‏أنه بلغه ‏ ‏أن رسول الله ‏ ‏صلى الله عليه وسلم ‏ ‏قال ‏ ‏تركت فيكم أمرين لن تضلوا ما تمسكتم بهما كتاب الله وسنة نبيه (রাসুল সাঃ বলেন, আমি তোমাদের মধ্যে দুটি জিনিস রেখে গেলাম, তোমরা কখনই পথভ্রষ্ট হবে না যতক্ষন সে দুটি আঁকড়ে ধরে থাকবে, তা হল কোরান ও সুন্নাহ)। তাহলে কি আমরা কোরান ও সুন্নাহর সঠিক অনুসরণ করছি না? আমরা তো নামায, রোযা, হজ্ব, যাকাত, ইবাদত, বন্দেগি, তাসবীহ-তাহলীল ইত্যাদিতে পূর্ববর্তীদের চেয়ে পিছিয়ে নেই বরং এগিয়ে। আমরা তো মসজিদে চিল্লার পর চিল্লা বছরের পর বছর কাটিয়ে দিচ্ছি। মাদ্রাসায় তালিম-তায়াল্লুমে জীবন যৌবন উৎসর্গ করছি, রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য অকাতরে প্রাণ বিসর্জন দিচ্ছি, শাহাদাত বরন করছি। এরপরেও কি কোরান সুন্নাহর সঠিক অনুসরণ হচ্ছে না? যদি হতোই তাহলে রাসুল (সাঃ) আল্লাহ্‌র দরবারে এ অভিযোগ কেন করবেন –

(٣٠ ( وَقَالَ الرَّسُولُ يَا رَبِّ إِنَّ قَوْمِي اتَّخَذُوا هَٰذَا الْقُرْآنَ مَهْجُورًا ﴿الفرقان:আর রাসূল(সাঃ) বলছেন — ”হে আমার প্রভু! নিঃসন্দেহ আমার স্বজাতি এই কুরআনকে পরিত্যাজ্য বলে ধরে নিয়েছিল।(২৫: ৩০) ইসলামি চিন্তাবিদগণ বারেহা বলছেন, মুসলমানরা কোরান পরিত্যাগ করার কারণে এই অধঃপতনের শিকার হয়েছে আর কাফেরদের লক্ষবস্তুতে পরিণত হয়েছে। যেমন আল্লামা ইকবাল বলে গেছেন “ওহ যমানে মে মোয়াযযাজ থে হামেলে কোরআন হো কর, হাম যলীল ও খার হুয়ি তারেকে কোরআন হো কর”। অর্থাৎ তারা যুগের প্রতাপান্বিত ছিল কোরানের অনুসারী হয়ে, আমরা লাঞ্চিত দলিত হয়েছি কোরআন পরিত্যাগ করে। এখন প্রশ্ন হল এতসব ইবাদাত বন্দেগী করা সত্ত্বেও আমরা কিভাবে কোরআন পরিত্যাগ করলাম ? হ্যা বাস্তবতা বলছে আমরা কোরানের অর্ধেক গ্রহণ করেছি আর অর্ধেক বর্জন করেছি। কারণ মানব জাতির ইহলৌকিক ও পারলৌকিক সকল সমস্যা সমাধানের সংবিধান গ্রন্থ হিসাবে কোরআন অবতির্ন হয়েছে, যেমন আল্লাহ্‌ তা’লা বলেন. مَّا فَرَّطْنَا فِي الْكِتَابِ مِن شَيْءٍ – অর্থাৎ মানব জীবনে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সকল সমস্যার সমাধান কোরানে রয়েছে। সর্বক্ষেত্রে কোরানের বিধান মেনে চললে উম্মাহর ইহলৌকিক ও পারলৌকিক সফলতা অনিবার্য। আর তজ্জন্য আল্লাহ্‌র নির্দেশ হচ্ছে, “ তোমরা ঐক্যবদ্ধভাবে দ্বীন প্রতিষ্ঠা কর, কখনো বিভক্ত হইয়ো না”। কিন্তু আমরা ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পরিমণ্ডলে কোরানকে সম্পূর্ন বর্জন করে শুধু পারলৌকিক নামায, রোযা ও এজাতীয় কিছু আচার অনুষ্ঠানের মাসয়ালা গ্রন্থ হিসাবে গ্রহন করেছি। হ্যা পার্থিব জীবনে অবশ্য একটি মোক্ষম কাজে কোরানকে ব্যবহার করছি। তাহলো ছোট খাট মাসয়ালা বা শরীয়ত বহির্ভূত কোন বিষয়ের উপর এখতেলাফ সৃষ্টি করে উম্মাহর মধ্যে বিভক্তি-বিভাজনের প্রাচীর তৈরি করে পরস্পর কামড়া কামড়িতে লিপ্ত হয়ে জাতি ধ্বংসের রাজপথ তৈরি করার কাজে কোরআনকে ব্যবহার করছি। অথচ কোরআনের যে চির শ্বাশত সাম্যবাদ, ইসলামি অর্থ ব্যবস্থা ও বিচার ব্যবস্থা- যার মাধ্যমে বিশ্ব নেতৃত্বের আসনে এ জাতির চিরস্থায়ী অধিষ্ঠান হতে পারত, তা বর্জন করে ভ্রাতৃঘাতি ফিরকাবাজিতে লিপ্ত হয়ে দ্রুত ধ্বংসের পথে ধাবিত হচ্ছি। অথচ সর্বসম্মত অভিমত হচ্ছে ভ্রাতৃঘাতি ফিরকাবাজি ও কেন্দ্রহিনতাই মুসলিম জাতি ধ্বংসের কারণ। আর সাধারণ মানুষ বা আধুনিক শিক্ষিতরা এসব ফিরকার জন্ম দেয় নি, এসবের প্রসূতি আলেম সমাজ। কিন্তু আলেম সমাজের উচিত ছিল ফিরকা বিভক্তি সম্পর্কে কোরআনের নির্দেশ অনুসরণ করা, দলাদলি না করে উম্মাহকে রক্ষা করা। কিন্তু তারা সে দায়িত্ব পালন করেননি বিধায় এখন আমাদের উপর, উম্মাহর উপর ফরয হয়ে গেছে এ সর্বনাশা বিভক্তিবাদ সম্পর্কে কোরআনের নির্দেশনা অনুসন্ধান করা। আল্লাহ্‌ তো বলেছেন- .مَّا فَرَّطْنَا فِي الْكِتَابِ مِن شَيْءٍ.(আমি কোরানে কোন কিছুই বাদ দেইনি) কাজেই বিভক্তিবাদ সম্পর্কেও অবশ্যি কোরআনে সমাধান পাওয়া যাবে। চলুন অনুসন্ধান করি।

দ্রষ্টব্যঃ আলেম সমাজের গোরামি, সংকীর্নতা, অপারগতা ও অপরিনামদর্শিতার কারনে বাংলাদেশের সুন্নী হানাফী মুসলমানরা ধর্ম-দর্শনের ক্ষেত্রে হেফাজতী, জামায়াতী ও আওয়ামী লীগ- বিপরীতমুখী এ তিনটি ধারায় বিভক্ত হয়ে যায়। ফলে গত কয়েক বছর ধরে আওয়ামী লীগ কর্তৃক হেফাজত ও জামায়াতের উপর হত্যা-নির্যাতন দেখে এবং মুসলিম বিশ্বের অবস্থা অবলোকন করে চরম নৈরাশ্যাবস্থায় গ্রন্থটি রচনা শুরু করেছি। সংশ্লিষ্ট প্রতিটি আয়াতের সাথে তাফসীর কারকদের মতামতসহ আমার ব্যাখ্যা ও বাস্তব প্রয়োগ সংযোজন করেছি, ফিরকা ও ফিরকাবাজ আলেমদের কঠোর সমালোচনা রয়েছে। একমাত্র উম্মাহর মধ্যে ঐক্য স্থাপনের লক্ষেই গ্রন্থটি রচনা করছি। কাজেই আমার বক্তব্যে কারো আপত্তি থাকলে আল্লাহর ওয়াস্তে অনুরোধ, বৃথা বিতর্ক সৃষ্টি না করে আমার কথা বর্জন করুন, বিজ্ঞ আলেমদের মতামত গ্রহণ করুন বা আয়াত ও তাফসীর থেকে নিজেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুন, আমার ব্যাখ্যার সাথে আপনার চিন্তা তুলনা করুন। ফিরকাবাজি সম্পর্কে কোরআন সুন্নাহর হুশিয়ারিতে সতর্ক হউন, নিজে বাঁচুন, উম্মাহকে বাঁচান। নিজে ঐক্যের পথে এগিয়ে আসুন উম্মাহর মধ্যে ঐক্য স্থাপন করুন।

গ্রন্থটি অল্প অল্প করে পোষ্ট দিতে থাকব। তারপর ফিরকাবাজি সম্পর্কিত হাদিস, আছার ও সাহাবায়ে কেরামের ঘটনাবলি সংকলনের কাজ শেষ হলে চূড়ান্ত পরিমার্জন করে গ্রন্থাকারে প্রকাশ করা হবে ইনশা-আল্লাহ।

One Response

  1. ABUSAIF
    ABUSAIF at |

    আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ….

    আপনার শুরুটা পড়ে অন্যদের চেয়ে ভিন্ন কিছু মনে হচ্ছে- আশাবাদী হয়ে থাকলাম!!
    কিন্তু অন্তরটা আশংকিত, শেষে আবার এমন না হয় যে, এ আয়াতটি স্মরণ করতে হয়–
    কুল্লু হিজবিম বিমা লাদাইহিম ফারিহুন….

    নিচের এ লেখাটিতে হয়তো আপনার লেখার খোরাক মিলতে পারে-

    আহলে হাদিস ১৬৪টি ফেরকায় বিভক্ত হওয়ার তালিকা
    লিখেছেন এম আবদুল্লাহ ভূঁইয়া ০৯ জানুয়ারি, ২০১৬, ০৪:৩৩:৫১

    তথা কথিত আহলে হাদিস নামধারিদের দল-উপদল মিলে ১৬৪টি ফেরকায় বিভক্ত হওয়ার তালিকা দেখে আমি বিস্মিত না হয়ে পারিনাই, একটী ওয়্যেবসাইট থেকে পাঠকদের জন্য উপস্হাপন করলাম
    আজকে তারা ৪ মাযহাবকে না মানার কারণে ১৬৪ দলে বিভক্ত হয়েছে। কারণ তারা সকলেই নিজে নিজে মুজতাহিদ হওয়ার দাবী করার কারণে এই আবস্হার সৃষ্টি হয়েছে ।
    পূরোটা এখানে-
    http://www.bd-first.net/blog/blogdetail/detail/2300/salamat/73305#.VpJdALZ97IU

    Reply

Leave a Reply