Nure Alam Masud

ধর্মব্যবসা: মুসলমানদের হাতে ইসলাম ধ্বংসের অতীত-বর্তমান (২)

ভূমিকা

যদিও পলিটিকাল-রিলিজিয়াস ইস্যুতে নিশ্ছিদ্র আর্গুমেন্ট উপস্থাপন করে আলোচনা করার অভ্যাস আমার, কিন্তু এখানে বিস্তারিত ইতিহাস তুলে ধরে আর্গুমেন্ট করার প্রথমতঃ ইচ্ছা নেই, দ্বিতীয়তঃ সময় ও সুযোগ নেই। আমি যা সত্য বলে জানি, তা সংক্ষেপে তুলে ধরছি। যারা আমার উপর আস্থা রাখেন তাদের জন্য এই লেখাটি সোর্স অব ইনফরমেশান, উন্মুক্ত হৃদয়ের মানুষদের জন্য সত্য অনুসন্ধানের নতুন কিছু টপিক, আর প্রেজুডিসড ধর্মান্ধ রোগগ্রস্ত অন্তরের জন্য রোগ বৃদ্ধির উছিলা।
শেষ পর্যন্ত আর্গুমেন্ট ও ডায়লগের দুয়ার উন্মুক্ত রাখার পক্ষপাতী আমি, কিন্তু সেই আর্গুমেন্ট অবশ্যই সত্য উন্মোচনের নিয়তে হওয়া উচিত, নিজের দীর্ঘদিনের লালিত বিশ্বাস ও ধ্যান ধারণাকে প্রতিষ্ঠা করবার উদ্দেশ্যে নয়।
(পর্ব-১ পড়ুন এখানে। আলোচিত বিষয়: মক্কা-মদীনা: মুহাম্মদ (সা.) থেকে আলে-সৌদ (৬২৯-১৯২৪) [মুহাম্মদ (সা.), প্রথম চার খলিফা, উমাইয়্যা শাসন থেকে রাজতান্ত্রিক সৌদি আরব প্রতিষ্ঠা, মজলুম আহলে বাইত থেকে ইসলামী ইরান প্রতিষ্ঠা, সৌদি আরবের যে ইতিহাস কখনো বলা হয় না, “ইসলামপন্থীদের” নীরবতা])

শিয়া-সুন্নি পার্থক্য: কেবল রাজনৈতিক মতপার্থক্য নয়

মুসলমানদের শিয়া-সুন্নি পার্থক্যকে অনেকে কেবল রাজনৈতিক পার্থক্য হিসেবে উল্লেখ করে থাকেন (যেমন, জাকির নায়েক)। কিন্তু এটি কেবল রাজনৈতিক মতপার্থক্য নয়, বরং এই পার্থক্যটা মূলতঃ ধর্মীয়, আর রাজনৈতিক অংশটুকু এসেছে ধর্মের অংশ হিসেবে। যারা এই বিষয়ে বিস্তারিত পড়াশুনা করেননি অথবা জানেন না, তাদের সাধারণ দৃষ্টিতে এটি হলো হযরত আলীকে মানা-না মানাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা পার্থক্য, কিংবা হযরত আবু বকরের খেলাফত মানা-না মানাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা পার্থক্য।
শিয়া-সুন্নি পার্থক্যকে অনেকে অনেকভাবে দেখেন, এবং এটাকে অনেক দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করা যায়। বিষয়টাকে আমি Levels of guidance, অর্থাৎ “হেদায়েতের বিভিন্ন স্তর” হিসেবে দেখি। এক বছর আগে “বর্তমান সময়ের ইসলাম সংক্রান্ত সমস্যার উপর সংক্ষিপ্ত আলোকপাত” শিরোনামে যে লেখাটি লিখেছিলাম, সেখান থেকে নিচের অংশটুকু তুলে ধরলাম। লেখাটি পাওয়া যাবে এখানে।)

Levels of Guidance

মানুষের দুনিয়ার জীবনটা হলো উৎস থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা এক অবস্থা। দুনিয়ার যাত্রা শেষ হলে সে আবার তার উৎসের কাছে ফিরে যাবে। দুনিয়ার এই জার্নিটা যেনো আমরা সঠিকভাবে পার করতে পারি, সেজন্যে আল্লাহ তায়ালা বিভিন্ন স্তরের গাইডেন্স দান করেছেন। একটা দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টাকে এভাবে দেখা যেতে পারে:
মৌলিক / সর্বজনীন স্তরের গাইডেন্স : এই গাইডেন্স সকল মানুষের মাঝে সহজাত। যে কেউ এই গাইডেন্সকে অনুসরণ করবে ও সৎকর্ম করবে, পরকালে সে মুক্তি পাবে, তার কোনো ভয় থাকবে না (২:৬২)। আর সর্বজনীন এই গাইডেন্স হলো তাওহীদ ও আখিরাতের অনুভুতি, এবং বিবেক ও বিচারবুদ্ধি। কোনো মানুষ ইসলামের সাথে পরিচিত না হলেও সে যদি শুধু এই চারটি অনুভুতিকে যথাযথভাবে অনুসরণ করে পথ চলে, তবে সেটাই তাকে পরকালে উৎরে দেবে। এটা আল্লাহরই ওয়াদা। তাওহীদ ও আখিরাতের অনুভূতি এবং বিবেক ও বিচারবুদ্ধি – এই চারটি বিষয় যে সকল মানুষের মাঝে সর্বজনীন, সহজাত – কুরআনে সেকথার প্রমাণও বিদ্যমান।
[বিবেক [৭৫:২ (নফসে লাওয়ামা), ৯১:৮ (তাক্বওয়া)], বিচারবুদ্ধি (আক্বল ৮:২২), স্রষ্টার ব্যাপারে স্পিরিচুয়াল ইনস্পিরেশান (৪১:৫৩)]
কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তাঁর অসীম দয়ার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে মানুষের এই যাত্রাকে সহজ করতে আরো তিনটি স্তরের গাইডেন্স দান করেছেন। পরবর্তী এই তিনটি স্তরের মাঝে যে ব্যক্তি যত বেশি স্তরে পৌঁছতে পারবে, তার সিরাতুল মুস্তাকিমে চলা ততই সহজ হবে। আর এই তিনটি স্তর হলো :
১. ঐশী কিতাব (আমাদের জন্য কুরআন মজীদ)
২. রিসালাত (আমাদের জন্য মুহাম্মদ (সা.))
৩. ইমামত (ইমাম আলী (আ.) হতে ইমাম মাহদী (আ.) পর্যন্ত ১২ ইমাম)
কোনো ধর্মেরই অনুসারী নয়, এমন ব্যক্তি গাইডেন্স এর মৌলিক স্তরে রয়েছে।
ইসলাম, খ্রিষ্ট ধর্ম ও ইহুদী ধর্মের অনুসারীরা পরবর্তী তিনটি স্তরের মাঝে দুটি স্তরের গাইডেন্স পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছে:
ঐশী কিতাব (ইহুদিদের তওরাত, খ্রিষ্টানদের ইঞ্জিল, মুসলমানদের কুরআন)
ও রিসালাত (ইহুদিদের মূসা (আ.), খ্রিষ্টানদের ঈসা (আ.), মুসলমানদের মুহাম্মদ (সা.))।
আর সর্বশেষ স্তরের গাইডেন্স, ইমামত পর্যন্ত যারা পৌঁছাতে পেরেছে, মুসলমানদের মাঝে তারা শিয়া বা আহলে বাইতের অনুসারী বলে পরিচিত।
মুহাম্মদ (সা.) এর মৃত্যু: নেতৃত্বকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সঙ্কট
গাদীরে খুম এর ঘটনা
বিদায় হজ্জ্ব শেষে মুহাম্মদ (সা.) মদীনায় ফিরে যাবার পথে গাদীরে খুম নামক জায়গায় পৌঁছানোর পর সবাইকে থামতে আদেশ করেন, এবং পিছিয়ে পড়া সাহাবীদের জন্য অপেক্ষা করেন ও এগিয়ে যাওয়া সাহাবীদেরকে ফিরে আসার জন্য খবর পাঠান। সকলে একত্রিত হলে দুপুর রৌদ্রের ভিতরে একটি মঞ্চ তৈরী করেন, এবং হযরত আলীকে সাথে নিয়ে মঞ্চে উঠে একটি ভাষণ দেন। ভাষণের শেষে তিনি হযরত আলীর হাত উঁচু করে ধরে বলেন যে, “আমি যার মওলা, অতঃপর এই আলী তার মওলা।” শিয়ারা এটিকে মুহাম্মদ (সা.) কর্তৃক হযরত আলীর মনোনয়ন হিসেবে দেখেন। অপরদিকে সুন্নি আলেমগণ বলেন যে, এখানে মওলা বলতে বন্ধু বুঝানো হয়েছে। কিন্তু শিয়াদের মতে এখানে মওলা বলতে অভিভাবক ও শাসক বুঝানো হয়েছে। একারণে শিয়ারা হযরত আলীকে মুহাম্মদ (সা.) এর পরবর্তী বৈধ নেতৃত্ব হিসেবে গ্রহণ করে, মধ্যবর্তী তিন খলিফাকে (হযরত আবু বকর, হযরত ওমর ও হযরত উসমান) তারা অনুসরণযোগ্য মনে করে না।
সুন্নিদের এই দাবীটি আসলে যৌক্তিক নয় যে, মুহাম্মদ (সা.) মওলা বলতে শুধু বন্ধু বুঝিয়েছেন। প্রথমতঃ, হযরত আলী মুহাম্মদ (সা.) অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন একদম প্রথম থেকেই, এমনকি তিনি ইসলাম গ্রহণকারী প্রথম পুরুষ। শুধুমাত্র বন্ধু ঘোষণা দেবার জন্য বিশেষভাবে হযরত আলীকে নিয়ে মঞ্চে ওঠা — এটাকে স্বাভাবিক বলে মনে হয় না।
দ্বিতীয়তঃ, মওলা শব্দের অনেক অর্থ আছে: বন্ধু, শাসক, অভিভাবক ইত্যাদি। যেহেতু মুহাম্মদ (সা.) বলে যাননি যে মওলা বলতে তিনি শুধু বন্ধু বুঝিয়েছেন, তাহলে কেন আমরা মওলা শব্দের সীমাকে সঙ্কুচিত করে এনে “বন্ধুতে” সীমিত করব? বরং এটাই যুক্তিসঙ্গত যে, এক্ষেত্রে নবীজি যেহেতু নিজে মওলা শব্দটির অর্থকে সঙ্কুচিত করে যাননি, সেহেতু মওলা শব্দটিকে আমরা সকল অর্থেই গ্রহণ করব এবং মুহাম্মদ (সা.) যেই যেই অর্থে মুসলমানদের মওলা ছিলেন ও আছেন, হযরত আলীকেও মওলা শব্দের সেই সেই অর্থেই গ্রহণ করবো। কিন্তু এই যুক্তির বিপরীতে সুন্নিদের কোনো গ্রহণযোগ্য জবাব নেই।
তো, যারা মওলা শব্দটিকে এর সার্বিক অর্থে গ্রহণ করেছিলো, তারা স্বাভাবিকভাবেই ইমাম আলী (আ.) ছাড়া ‘চার খলিফার’ অন্য তিন খলিফাকে (হযরত আবু বকর, হযরত ওমর, হযরত উসমান) মেনে নেয়নি। এবং মুহাম্মদ (সা.) কে তারা যেভাবে ধর্মীয়, রাজনৈতিক, আধ্যাত্মিকসহ সব বিষয়ে আল্লাহ কর্তৃক নিযুক্ত নেতা ও আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছিলো, ঠিক একইভাবে ইমাম আলী (আ.) কেও তারা আল্লাহর পক্ষ থকে মনোনীত ধর্মীয়, রাজনৈতিক, আধ্যাত্মিকসহ সব বিষয়ে নেতা ও আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছিলো। এখনও যারা গাদীরে খুমে নবীজির দেওয়া ভাষণের মওলা শব্দটিকে এর সার্বিক অর্থে গ্রহণ করে, তারা প্রথম তিন খলিফাকে অনুসরণযোগ্য মনে করে না।
তো, সেই থেকে দুটি ভাগ হয়ে গেলো। যারা সেই যুগে ইমাম আলী (আ.) কে অনুসরণ করেছিলো, তাদেরকে অন্যরা আলীর শিয়া বা আলীর অনুসারী/দল বলে উল্লেখ করত। পরবর্তীতে ইসলামী পরিভাষায় এটি “শিয়া” হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। আরও পরে “শিয়ারা নবীজির সুন্নাহর প্রকৃত অনুসারী নয়” এমন দাবী থেকে নিজেদেরকে শিয়াদের থেকে আলাদা করতে সুন্নি শব্দটার প্রচলন ঘটে, অর্থাৎ যারা নবীর সুন্নাহর (নবীর পথের) অনুসারী।
যারা মওলা শব্দকে এর সার্বিক অর্থে গ্রহণ করেছিলো/ করে, তাদের দৃষ্টি থেকে শিয়া সুন্নি পার্থক্যটি শুধু রাজনৈতিক নয়, বরং সার্বিকভাবে ধর্মীয়। কেননা তারা ইমামতের কনসেপ্টে বিশ্বাস করে, যা একটি ধর্মীয় কনসেপ্ট। মুহাম্মদ (সা.) কর্তৃক এই ইমামতের ধারার প্রথম ইমাম নিযুক্ত হন (অর্থাৎ ইমাম আলী (আ.)), এবং তিনি পরবর্তী ইমাম মনোনীত করে যান। এভাবে করে ইমাম আলী (আ.) থেকে শুরু করে ইমাম হাসান (আ.), ইমাম হোসেন (আ.) ও ইমাম হোসেন (আ.) এর বংশধারায় আগত ইমাম মাহদী (আ.) পর্যন্ত মোট বারো জন ইমামকে মুহাম্মদ (সা.) এর পর নিষ্পাপ ও নির্ভুল ইমাম হিসেবে তারা শতভাগ অনুসরণযোগ্য মনে করে, এবং অনুসরণ করা ফরজ বলে মনে করে।
এখন, ইমামতের পক্ষে কুরআন থেকে বিভিন্ন নিদর্শন পাওয়া যায়, এবং এর সপক্ষে শিয়া-সুন্নি ইলমী বাহাসে (তাত্ত্বিক বিতর্ক) আরো অনেক হাদীস ও ইতিহাস আসতে পারে। আমি মৌলিক বিষয়টি উল্লেখ করলাম।
“দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি: কুরআন ও আহলে বাইত…”
বিদায় হজ্জ্বের ভাষণে মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, “তোমাদের মাঝে আমি দুটি ভারী বস্তু রেখে যাচ্ছি, কুরআন ও সুন্নাহ…”। এমনটিই আমরা সবসময় জেনে এসেছি। কিন্তু যখন ইসলামী টেক্সট একটু ঘাঁটাঘাঁটি করে দেখলাম, তখন দেখতে পেলাম যে (সুন্নীদের মান্যকৃত সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ছয়টি হাদীস গ্রন্থ) সিহাহ সিত্তাহ-তে বহুবার বিভিন্নভাবে ভাষণটির ঐ অংশটি এভাবে এসেছে, যার মূল কথাটি এই:
“আমি তোমাদের মাঝে দুটি ভারী (অর্থাৎ ওজনদার, মূল্যবান) বস্তু রেখে যাচ্ছি, প্রথম বস্তু আল্লাহর কিতাব, যাতে রয়েছে হেদায়েত ও নূর। দ্বিতীয় বস্তু, আমার আহলে বাইত। যতদিন তোমরা এই দুটিকে (কুরআন ও আহলে বাইত) আঁকড়ে ধরে থাকবে, ততদিন তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না, এবং হাউজে কাউসারে আমার সাথে মিলিত হবার আগ পর্যন্ত এই দুটি (অর্থাৎ কুরআন ও আহলে বাইত) পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হবে না। আমি তোমাদেরকে আহলে বাইতের ব্যাপারে সতর্ক করে যাচ্ছি, তোমরা আহলে বাইতের হক ও অধিকারের ব্যাপারে সতর্ক থাকবে।”

ধর্মব্যবসা: আলেমগণ কর্তৃক তথ্য, সত্য ও ইতিহাস গোপন করা

আহলে বাইত সংক্রান্ত উপরিউক্ত হাদীসটিকে হাদীসে সাকালাইন বলে। শিয়া-সুন্নি উভয় সূত্রে বহুবার বর্ণিত হয়েছে এই হাদীস। অথচ ইচ্ছাকৃতভাবে আমাদের মাঝে হাদীসটিকে প্রচার হতে দেওয়া হয়নি। স্বাভাবিকভাবেই আমরা সাধারণ মানুষেরা হাজার হাজার পৃষ্ঠার হাদীস বইগুলো অধ্যয়ন করি না। কুরআনই অধ্যয়ন করি না, সেখানে হাদীস তো দূরের কথা। আর সমাজে “আলেম” বলে পরিচিত যারা, তাদের অধিকাংশই ইচ্ছাকৃতভাবে এই হাদীসটি আমাদের থেকে গোপন করেছে, এবং এখনও করে যাচ্ছে। তারা নিজেদের পছন্দ ও সুবিধামত সত্য-মিথ্যা হাদীস প্রচার করে, এবং কিছু অংশ গোপন করে। এমনকি কুরআন থেকেও সেসব আয়াতই প্রচার করে, যেগুলো নিজেদের পক্ষে যায়, নিজের স্বার্থ হাসিল হয়; আর সেইসব আয়াত গোপন করে, যা নিজেদের বিপক্ষে যায়। ধর্মব্যবসার ইতিহাস তো বহু পুরনো! এতো শুধু মুহাম্মদ (সা.) এর উম্মতের আলেমরা করছে তা নয়, ইহুদী-খ্রিষ্টানরাও করত, এবং এখনও করে। ওদের আলেমরা যেমন মুহাম্মদ (সা.) এর আগমণ সংক্রান্ত বাণীগুলোকে গোপন করেছে ও এখনও করে, সাধারণ মানুষের কাছে বলে না; তেমনি আমাদের আলেমরাও আহলে বাইত, ইমাম আলী (আ.) ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন তথ্য, সত্য, ইতিহাস, আয়াত ও হাদীস গোপন করেছে, করছে। মাটির টুকরায় সেজদা দেওয়া কিংবা মহররম পালন নয়, বরং শিয়া সুন্নি পার্থক্যের গোড়ায় রয়েছে এই বিষয়গুলি, রয়েছে প্রতারণার ইতিহাস, ধর্মব্যবসার ইতিহাস। শিয়া সুন্নি পার্থক্যের যে সামগ্রিক চিত্র আমি ব্যক্তিগত পড়াশুনার মাধ্যমে জানতে পেরেছি, তার সবটা এখানে সংক্ষিপ্ত পরিসরে উপস্থাপন করা সম্ভব নয়। মৌলিক বিষয়টুকু আমি উপস্থাপন করলাম।
শেষকথা
তবে শেষে বলতে চাই যে, সবকিছুর ঊর্ধ্বে আমি বিষয়টাকে Levels of guidance হিসেবে দেখি, এবং ধর্মীয় জ্ঞানকে দুই ভাগে দেখি: এক. সহজাত জ্ঞান, যেটাকে মৌলিক/সর্বজনীন/basic গাইডেন্স হিসেবে উল্লেখ করেছি। এটি সবার মাঝেই সমান। দুই. অর্জিত জ্ঞান। এটি সময়ের সাথে পরিবর্তিত হতে পারে, এবং এক একজনের কাছে ধর্মের জ্ঞান এক একভাবে পৌঁছাতে পারে। কারো কাছে হয়ত ইমামতের কনসেপ্ট পৌঁছায়নি, তাই সে “শিয়া” নয়, “সুন্নি”। আমি এতে কোনো দোষ দেখি না। তেমনি কারো কাছে হয়ত নামাজ-রোজা-কুরআন-মুহাম্মদ ইত্যাদি বিষয় পৌঁছায়নি, তাই সে “অমুসলিম”, কিন্তু এতেও আমি কোনো দোষ দেখি না। যতক্ষণ পর্যন্ত সে নিজের সহজাত বিবেক-বুদ্ধি দিয়ে পথ চলছে, কারো উপর জুলুম করছে না, এবং বিবেক-বুদ্ধি থেকে উৎসরিত সৎকাজ করছে, তার সাথে আমার কোনো বিরোধ নেই, এবং আল্লাহর কাছে পুরস্কৃত হতে তার কোনো বাধা নেই। এজন্যে সমাজে মুসলিম বলে পরিচিত হওয়া বাধ্যতামূলক নয়। তাই হ্যাঁ, মাদার তেরেসার মতন কেউ যদি আজীবন সৎকাজ করে যান, এবং হৃদয় থেকে আল্লাহকে এক আল্লাহ হিসেবে জানেন, তবে খুবই সম্ভব যে তিনি আল্লাহর কাছে পুরস্কৃত হবেন / হয়েছেন।
শিয়া-সুন্নি কারো সাথেই আমার বিরোধ নেই। এবং শিয়াইজম/সুন্নিইজম/সুফিজম, ক্রিশ্চিয়ানিটি — কোনোটাতেই আমি দোষের কিছু দেখি না, যতক্ষণ পর্যন্ত না সেটা মানুষের সহজাত জ্ঞান, অর্থাৎ বেসিক গাইডেন্সের সাথে contradict না করে, মুখোমুখি না হয়। সুন্নিদের দৃষ্টিতে শিয়া-সুন্নি পার্থক্য রাজনৈতিক, কেননা তারা ইমামতের কনসেপ্ট পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেনি, আর শিয়াদের দৃষ্টিতে শিয়া-সুন্নি পার্থক্য রাজনৈতিকের চেয়েও বেশি ধর্মীয়, কেননা তারা এই পার্থক্যের ধর্মীয় দিকটি জানতে পেরেছে। ইমামত আদতে নবুওয়াতের মতই একটি ধর্মীয় কনসেপ্ট, ধর্ম-বিচ্ছিন্ন কোনো সেকুলার রাজনৈতিক কনসেপ্ট নয় (যেভাবে অনেক non-shia বিষয়টাকে উপস্থাপন করে থাকেন)। সৌভাগ্যক্রমে ব্যক্তিগত পড়াশুনার মাধ্যমে আমি ইমামতকে সঠিক বলে জানতে পেরেছি। তবে আমি মুসলিম পরিচয়ের ঊর্ধ্বে শিয়া/সুফি ইত্যাদি কোনো পরিচয় দেয়াকে সঙ্গত মনে করি না, এবং তা দাবীও করি না।

Leave a Reply