আল- কোরানের কাঠগড়ায় বিভক্তিবাদ- ৬

ইহুদী-খৃষ্টান সম্প্রদায়ের ন্যায় বিভক্তি হারামঃ

(وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ تَفَرَّقُوا وَاخْتَلَفُوا مِن بَعْدِ مَا جَاءَهُمُ الْبَيِّنَاتُ وَأُولَٰئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ ﴿آل‌عمران: ١٠٥﴾ আর তাদের মতো হয়ো না যারা বিচ্ছিন্ন হয়েছিল আর মতভেদ করেছিল তাদের কাছে সুস্পষ্ট নির্দেশাবলী আসার পরেও। আর এদেরই জন্য আছে কঠোর শাস্তি (৩: ১০৫)

যোগসুত্র ও ব্যাখ্যাঃ- পূর্বের আয়াতে আল্লাহ্‌ তা’লা নির্দেশ দিয়েছেন –উম্মাহর মধ্যে একটি দল আমরে বিল মারুফ ও নেহি আনিল মুনকার- এর দায়িত্ব পালন করবে, অন্যান্য কাজের সাথে তাদের প্রধান কাজ হবে উম্মাহকে বিভক্তির হাত থেকে বাচিয়ে ঐক্যের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখা। কিন্ত এরপরেও যারা জাতির মধ্যে ইহুদী- খৃষ্টানের ন্যায় ফিরকা বিভক্তির সৃষ্টি করবে তাদের জন্য আল্লাহ্‌ তা’লা কঠোর হুসিয়ারি প্রদান করেছেন। তিনি বলেন ইহুদী- খৃষ্টানরা কিতাব প্রাপ্ত হওয়ার পরও নিজেদের হিংসা বিদ্বেষের ((بغيا بينهم কারণে বিভক্ত হয়েছিল তদ্রুপ কোরান প্রাপ্তির পরও তোমরা বিভক্ত হলে কঠিন শাস্তির যোগ্য হবে। এখানে- وَأُولَٰئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ- ফিরকাবাজ মুসলমানদেরকে বলা হয়েছে, ইহুদী-খৃষ্টান সম্পর্কে বলা হয়নি। অর্থাৎ ফিরকাবাজরা মুসলমান থাকবে না, তারা কাফের হয়ে যাবে।

বিভিন্ন তাফসীরের মতামতঃ এখানে – وَلَا تَكُونُوا – নাহীর সীগা বা শব্দ রূপ যা দ্বারা হারাম সাব্যস্থ হয়।অর্থ তোমরা ইহুদী খৃষ্টানের ন্যায় বিভিন্ন ফিরকায় বিভক্ত হয়োনা। ইমাম ইবনে কাছির বলেন- يَنْهَى هَذِهِ الْأُمَّةَ أَنْ تَكُونَ كَالْأُمَمِ الْمَاضِيَةِ فِي تَفَرُّقِهِمْ وَاخْتِلَافِهِمْ، وَتَرْكِهِمُ الْأَمْرَ بِالْمَعْرُوفِ وَالنَّهْيَ عَنِ الْمُنْكَرِ مَعَ قِيَامِ الْحُجَّةِ عَلَيْهِمْ. – অত্র আয়াতে আল্লাহ তা’লা এ উম্মতকে নিষেধ করেছেন যে, তোমরা অতীতের জাতিগুলির ন্যায় দলীল প্রমাণ থাকা সত্বেও মতভেদ করে বিভক্ত হয়ো না এবং আমরে বিল মা’রুপ ও নেহি আনিল মুনকার পরিত্যাগ করো না। – كَالَّذِينَ- দ্বারা ইহুদী খৃষ্টান উদ্দেশ্য, তবে কেউ কেউ বলেন এর দ্বারা – اهل بدعة- অর্থাৎ যারা ইসলামের মধ্যে নতুন মতবাদ সৃষ্টি করে মুসলিম জামাত থেকে পৃথক হয়ে গেছে তারা উদ্দেশ্য। ইবনে আব্বাস বলেন, অত্র আয়াতে আল্লাহ তা’লা মুমিনদেরকে জামাতবদ্ধ থাকার নির্দেশ দিয়েছেন, এখতেলাফ ও বিভক্তি থেকে নিষেধ করেছেন এবং জানিয়ে দিয়েছেন-দ্বীনের ব্যাপারে ঝগড়া ও বিরোধ করে পুর্ববর্তীরা ধ্বংস হয়ে গেছে। এ অবস্থায় বিভক্তি বাদী প্রতিটি ফিরকা সরাসরি অত্র আয়াতের প্রতিপাদ্য এবং তাদেরকে সরাসরি মর্মন্তুদ শাস্তির সংবাদ দেয়া হয়েছে- وَأُولَٰئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ )

মুসনাদে আহমদে এসেছে, عن أَبِي عَامِرٍ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ لُحَيٍّ قَالَ: حَجَجْنَا مَعَ مُعَاوِيَةَ بْنِ أَبِي سُفْيَانَ، فَلَمَّا قَدِمْنَا مَكَّةَ قَامَ حِينَ صَلَّى [صَلَاةَ] الظُّهْرِ فَقَالَ: إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: “إنَّ أهْلَ الْكَتَابَيْنِ افْتَرَقُوا فِي دِينِهِمْ عَلَى ثنتيْنِ وَسَبْعِينَ مِلَّةً، وإنَّ هذِهِ الأمَّةَ سَتَفْتَرِقُ عَلَى ثَلاثٍ وَسَبْعِينَ مِلَّةً -يَعْنِي الْأَهْوَاءَ-كُلُّهَا فِي النَّار إِلَّا وَاحِدَةٌ، وَهِيَ الْجَمَاعَةُ، وَإِنَّهُ سَيَخْرُجُ فِي أُمَّتِي أَقْوَامٌ تُجَارى بِهِمْ تِلْكَ الأهْواء، كَمَا يَتَجَارى الكَلبُ بصَاحِبِهِ، لَا يَبْقَى مِنْهُ عِرْقٌ وَلا مَفْصِلٌ إِلَّا دَخَلَهُ. واللهِ -يَا مَعْشَر العَربِ-لَئِنْ لَمْ تَقُومُوا بِمَا جَاءَ بِهِ نَبِيُّكُمْ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَغَيْرُكم مِن النَّاسِ أحْرَى أَلَّا يَقُومَ بِهِ”. – অর্থাৎ হযরত মোয়াবিয়া (রাঃ) হজ্বের উদ্দেশ্যে মক্বায় আগমন করেন। যহুরের নামাজের পর তিনি দাঁড়িয়ে বলেন, রাসূল (সাঃ) ইরশাদ করেন, আহলে কিতাব তাদের ধর্মের ব্যাপারে মতভেদ সৃষ্টি করে ৭২ ফিরকায় বিভক্ত হয়ে গেছে। আর আমার উম্মত ৭৩ ফিরকায় বিভক্ত হবে। অর্থাৎ সবাই প্রবৃত্তির বশীভুত হয়ে পড়বে। তাদের একটি দল ব্যতীত সবাই জাহান্নামী হবে। আর সেই দলটি হল জামাত।(অর্থাৎ যারা নিজেরা ঐক্যের উপর থাকবে এবং অন্যদেরও রাখার চেষ্টা করবে)। আমার উম্মতের মধ্যে এমন লোকও হবে যাদের শিরায় শিরায় কুপ্রবৃত্তি এমনভাবে প্রবেশ করবে যেমন কুকুরে কাটা ব্যক্তির শিরায় শিরায় বিষক্রিয়া পৌছে যায়। হে আরববাসীগণ। তোমরাই যদি তোমাদের নবীর দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত না থাক, তাহলে অন্যরা তো আরো দূরে সরে পড়বে।

ব্যাখ্যাঃ- ফিরকা সংক্রান্ত উক্ত হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে যে, একমাত্র নাজাত প্রাপ্ত দল তারাই-যারা আমরে বিল মা’রুপ ও নেহি আনিল মুনকার-এর আওতায় নিজেরা ফিরকা বিভক্তি না করে ঐক্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে এবং অন্যদেরও রাখার চেষ্টা কর। কাজেই হাদীসের আলোকে বুঝা যাচ্ছে, মুসলমানদের বিভিন্ন ফিরকা যেমন শিয়া, সুন্নী, বেরেলভী, দেওবন্দী, তাবলীগী, জামাতী, সালাফী ইত্যাদি প্রতিটি ফিরকা নিজেদেরকে নাজি বা নাজাত প্রাপ্ত দল মনে করে আর অন্যদেরকে ৭২ দলের অন্তর্ভুক্ত গণ্য করে- তাদের এ দাবী ভ্রান্ত। হাদীসের মধ্যেই এর জবাব নিহিত আছে। কারণ অত্র হাদীসে ফিরকাবাজি ও বিভক্তিকে জাহান্নামের কারণ দর্শানো হয়েছে।কাজেই যারা ফিরকাবাজি করবে না বরং ঐক্যের চেষ্টা করবে, বিভক্তিতে বাধা দিবে তারাই মুক্তি প্রাপ্ত দল হিসাবে গণ্য হবে। সুতরাং আমরে বিল মারুফ ওয়া নেহি আনিল মুনকার এর আওতায় মুসলমানদের প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে-উম্মাহকে ঐক্যের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখা, বিভক্তিতে বাধা প্রদান করা, প্রয়োজনে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা।

বিধানঃ মুসলমানদের মধ্যে ভ্রান্ত অথবা সঠিক যে কোন একটা মতবাদ সৃষ্টি করে মুসলিম জামাত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পৃথক দল গঠন করলেই তা বাতিল ফিরকা বলে গন্য হবে, তারা যতই কোরআন হাদীসের ভিত্তির উপর প্রতিষ্টিত থাকুক না কেন। এভাবে পৃথক ফিরকায় বিভক্ত হয়ে যাওয়া হারাম। যারা বিভিন্ন ফেরকায় বিভক্ত হয়ে আছে তারা কবিরা গুনায় লিপ্ত রয়েছে। আর যদি কেউ ফিরকা বাজীকে জায়েয মনে করে তাহলে সে মুরতাদ।

বাস্তব প্রয়োগঃ শিয়া সুন্নীসহ মুসলমানের মধ্যে যতগুলি ফিরকা রয়েছে সবগুলি ভ্রান্ত ফিরকা। যেমন, রেজাখানী, দেওবন্দী, জামাতী, তাবলীগী, সালাফী ইত্যাদি প্রত্যেকটি ফিরকা কবিরা গুনায় লিপ্ত রয়েছে। কিন্তু তারা যদি নিজেদের অবস্থানকে অর্থাৎ বিভক্তি জায়েয মনে করে তাহলে তারা মুরতাদ বা কাফের বলে গণ্য হবে- দলীল সামনে আসছে।

আমাদের আহবানঃ আমাদের আহ্বান হচ্ছে দল মত ফিরকা নির্বিশেষে সকল মুসলমান বাধ্যতামূলক ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এবং খিলাফত প্রতিষ্ঠার পর নিজেদের এখতেলাফি বিষয়াদি এবং অন্যান্য সমস্যার সমাধান করে নেয়া যাবে। কাজেই কেউ যদি ঐক্যের ডাকে সাড়া না দেয়, বরং বিরোধিতা করে তাহলে সে কোরআনের বিধান অনুসারে কাফের মুরতাদ বলে গন্য হবে। সে বাহ্যিক যত বড় আলেম, যত বড় বুজুর্গই হউক না কেন মুরতাদ হিসাবে তার মৃত্যু দণ্ড কার্যকর করা উম্মতের উপড় আবশ্যক হবে। কারণ সে আল্লাহ্‌ ও রাসূল(সাঃ) এর শত্রু, উম্মাহর দুশমন, কোরআন হাদীস অমান্যকারী, উম্মাহ ধ্বংসকারী নিকৃষ্ট ও ঘৃনিত ইতর প্রানী। যেমন –أُولَٰئِكَ كَالْأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ أُولَٰئِكَ هُمُ الْغَافِلُونَ ﴿الأعراف: ١٧٩﴾       (ধারাবাহিক)।

Leave a Reply