আল-কোরানের কাঠগড়ায় বিভক্তিবাদ-৮

বহুমত- বহুপথ গুমরাহির কারণ

﴿وَأَنَّ هَٰذَا صِرَاطِي مُسْتَقِيمًا فَاتَّبِعُوهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعُوا السُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِكُمْ عَن سَبِيلِهِ ۚ ذَٰلِكُمْ وَصَّاكُم بِهِ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ﴾

এ ছাড়াও তাঁর নির্দেশ হচ্ছে এইঃ এটিই আমার সোজা পথ৷ তোমরা এ পথেই চলো এবং অন্য পথে চলো না৷ কারণ তা তোমাদের তাঁর পথ থেকে সরিয়ে ছিন্নভিন্ন করে দেবে৷ এ হেদায়াত তোমাদের রব তোমাদেরকে দিয়েছেন, সম্ভবত তোমরা বাঁকা পথ অবলম্বন করা থেকে বাঁচতে পারবে৷  (আনআম/১৫৩)

ব্যাখ্যাঃ- আল্লাহ তা’লা দোয়ার পদ্ধতি শিখিয়েছেন. ﴿اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ﴾ প্রভু তুমি আমাদেরকে সরল-সোজা পথ দেখাও) এবং ( ﴿رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَاঈমান গ্রহনের পর তুমি আমাদের অন্তর বক্র করে দিওনা) বক্র হৃদয় বা প্রবৃত্তির বশবর্তি হয়ে সিরাতে মুস্তাক্বীম-এ বিভিন্ন পথ ও মতের সৃষ্টি করা যাবে না। সরল সোজা পথ হচ্ছে কোরআন ও সুন্নাহর পথ, এর বাইরে যা আছে সবই বক্র পথ, গুমরাহী। কাজেই মুসলিম সমাজে প্রচলিত যত পথ-মত ও বিদাত রয়েছে- সেগুলি বর্জন করতে হবে। কোরআনের উপর ভিত্তি করে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

বিভিন্ন তাফসীরের উদ্ধৃতিঃ ইমাম ইবনে জরীর তাবারি বলেন, অত্র আয়াতে আল্লাহ তা’লা মানব জাতিকে নির্দেশ দিচ্ছেন- তারা যেন সেই সিরাত বা দ্বীনের উপর অটল থাকে যা আল্লাহ তাদের জন্য মনোনীত করেছেন। এই দ্বীন মুস্তাকিম-যার মধ্যে কোন বক্রতা নেই, হক থেকে বিচ্যুতির কোন আশংকা নাই। তিনি বলেন, এ দ্বীনকে তোমরা সংবিধান হিসাবে গ্রহণ করে সে অনুযায়ী জীবন যাপন কর। কিন্তু ইহুদী, নাসারা, মজুসি, মূর্তিপূজক ইত্যাদির ন্যায় বিদাত তথা নতুন সৃষ্ট পথ ও মতের অনুসরণ করলে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে যাবে। কাজেই সিরাতে মুস্তাকিমের উপর প্রতিষ্ঠিত থাক, বিভেদ সৃষ্টি করো না।

ইমাম ইবনে কাছির বলেন – ইরশাদ হচ্ছে তোমরা এদিক ওদিক অন্যান্য পথগুলোর উপর চলো না, নতুবা আল্লাহর পথ থেকে সরে পড়বে। তোমরা দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত রাখ এবং তাতে বিচ্ছেদ সৃষ্টি করো না। এই প্রকারের আয়াতসমূহে আল্লাহ তা’লা মুমিনদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তারা যেন জামাত বা দল ছেড়ে না দেয় এবং দলে বিভেদ সৃষ্টি করা থেকে তারা যেন বেঁচে থাকে। পূর্ববর্তী লোকেরা দ্বীনের ব্যপারে ঝগড়া- ফাসাদ ও যুদ্ধ- বিগ্রহে লিপ্ত হয়ে পড়েছিল এবং মতানৈক্য সৃষ্টি করেছিল। ফলে তারা ধবংস হয়ে গিয়েছিল।

এখানে কুরতুবির তাফসীর তুলে ধরা হল,

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ قَالَ:خَطَّ لَنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمًا خَطًّا، ثُمَّ قَالَ: (هَذَا سَبِيلُ اللَّهِ) ثُمَّ خَطَّ خُطُوطًا عَنْ يَمِينِهِ وَخُطُوطًا عَنْ يَسَارِهِ ثُمَّ قَالَ (هذه سبل على كل سبيلمِنْهَا شَيْطَانٌ يَدْعُو إِلَيْهَا) ثُمَّ قَرَأَ هَذِهِ الْآيَةَ. -হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাঃ হতে বর্নিত আছে যে, একদা রাসূল সাঃ মাটিতে একটি রেখা টানেন। তারপর বলেন, এটা হচ্ছে সীরাতে মুস্তাকীম। অতঃপর তিনি ডানে ও বামে আরো কতগুলি রেখা টানেন এবং বলেন, এগুলো হচ্ছে ঐসব রাস্তা যেগুলির প্রত্যেকটার উপর একজন করে শয়তান বসে রয়েছে এবং ঐ দিকে (মানুষকে) আহ্বান করছে। অতঃপর তিনি . وَأَنَّ هَٰذَا صِرَاطِي مُسْتَقِيمًا فَاتَّبِعُوهُ ۖ.এই আয়াতটি পাঠ করেন।

وَأَخْرَجَهُ ابْنُ مَاجَهْ فِي سُنَنِهِ عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ قَالَ: كُنَّا عِنْدَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَخَطَّ خَطًّا، وَخَطَّ خَطَّيْنِ عَنْ يَمِينِهِ، وَخَطَّ خَطَّيْنِ عَنْ يَسَارِهِ، ثُمَّ وَضَعَ يَدَهُ فِي الْخَطِّ الْأَوْسَطِ فَقَالَ: (هَذَا سَبِيلُ اللَّهِ- ثُمَّ تَلَا هَذِهِ الْآيَةَ-” وَأَنَّ هَذَا صِراطِي مُسْتَقِيماً فَاتَّبِعُوهُ وَلا تَتَّبِعُوا السُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِكُمْ عَنْ سَبِيلِهِ”. – হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্নিত, তিনি বলেন, আমরা নবী (সাঃ) এর কাছে উপবিস্ট ছিলাম, এমন সময় তিনি এভাবে তাঁর সামনে একটা রেখা টানেন এবং বলেনঃ” এটা হচ্ছে আল্লাহ্‌র পথ।“অতপর ডানে ও বামে দুটি করে রেখা টানেন এবং বলেনঃ এগুলো হচ্ছে শয়তানের পথ। তারপর মধ্যভাগের রেখার উপর স্বীয় হাতটি রাখেন এবং উক্ত আয়াতটি পাঠ করেন। হযরত জাবির রাঃ হতে আরো বর্ণিত আছে, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি রেখা টানেন। তারপর ডান দিকে একটি রেখা টানেন এবং বাম দিকে একটি রেখা টানেন। অতঃপর স্বীয় হস্ত মুবারক মধ্যবর্তী রেখাটির উপর রেখে এই আয়াতটি পাঠ করেন।

এই সুবুল বা বহু পন্থা-পন্থির মধ্যে ইহুদী, নাসারা, অগ্নিপূজক, অন্যান্য সম্প্রদায়, বিদাতি, প্রবৃত্তির অনুসারী, শরয়ী বিষয়ে চুলছেরা বিশ্লেষণকারী, বিতর্ককারী ইত্যাদি সবাই অন্তর্ভুক্ত হবে এবং গুমরাহ বলে গণ্য হবে।

عَنْ أَبَانٍ أَنَّ رَجُلًا قَالَ لِابْنِ مَسْعُودٍ: مَا الصِّرَاطُ الْمُسْتَقِيمُ؟ قَالَ: تَرَكَنَا مُحَمَّدٌ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي أَدْنَاهُ وَطَرَفُهُ فِي الْجَنَّةِ، وَعَنْ يَمِينِهِ جَوَادٌ «1» وَعَنْ يَسَارِهِ جَوَادٌ، وَثَمَّ رِجَالٌ يَدْعُونَ مَنْ مَرَّ بِهِمْ فَمَنْ أَخَذَ فِي تِلْكَ الْجَوَادِ انْتَهَتْ بِهِ إِلَى النَّارِ، وَمَنْ أَخَذَ عَلَى الصِّرَاطِ انْتَهَى بِهِ إِلَى الْجَنَّةِ، ثُمَّ قَرَأَ ابْنُ مَسْعُودٍ:” وَأَنَّ هَذَا صِرَاطِي مُسْتَقِيمًا” الْآيَةَ. – হযরত আবান ইবনে উসমান (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক হযরত ইবনে মাসঊদ (রাঃ) কে জিজ্ঞেস করেন সিরাতে মুস্তাক্বীম কি? তিনি উত্তরে বলেনঃ” একদা রাসুলুল্লাহ (সঃ) আমাদেরকে তাঁর নিকটে স্থান দিয়েছিলেন এবং তাঁর চক্ষু যেন জান্নাতের দিকে। তাঁর ডান দিকে একটা পথ ছিল এবং বাম দিকে একটা পথ ছিল। পথগুলোর উপর কতগুলো লোক অবস্থান করছিল এবং যারা তাদের পার্শ্ব দিয়ে গমন করছিল তাদেরকে তারা নিজেদের দিকে আহ্বান করছিল। সুতরাং যারা তাদের ডাকে সাড়া দিয়ে তাদের পথ ধরলো তারা জাহান্নামে প্রবেশ করলো। আর যারা সরল সোজা পথ ধরলো তারা জান্নাতে প্রবেশ করলো। অতঃপর তিনি এই আয়াতটি পাঠ করলেন।( উল্লেখ্য যে, এখানে সরল-সোজা পথ হচ্ছে কোরআন-সুন্নাহর পথ, আর ডানে বামের বক্র পথগুলি হচ্ছে আলোচ্য বর্তমান যুগের ফিরকা গুলি- যারা বিভিন্ন মতবাদ সৃষ্টি করে বিভক্ত হয়েছে)।

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ বলেন, তোমরা বর্ণচোরা, অতিবিশ্লেষণ ও বিদাত থেকে বিরত থাকবে। মুজাহিদ বলেন, সুবুল অর্থ বিদাত।

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: (مَا أَمَرْتُكُمْ بِهِ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَيْتُكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا). وَرَوَى ابْنُ مَاجَهْ وَغَيْرُهُ

রাসূল (সাঃ) বলেন, আমি তোমাদেরকে যা আদেশ দিয়েছি-তা গ্রহণ কর আর যা নিষেধ করেছি তা বর্জন কর।

عَنِ الْعِرْبَاضِ بْنِ سَارِيَةَ قَالَ: وَعَظَنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ موعظة ذرفتمِنْهَا الْعُيُونُ، وَوَجِلَتْ مِنْهَا الْقُلُوبُ، فَقُلْنَا: يَا رَسُولَ اللَّهِ، إِنَّ هَذِهِ لَمَوْعِظَةُ مُوَدِّعٍ، فَمَا تَعْهَدُ إِلَيْنَا؟ فَقَالَ: (قَدْ تَرَكْتُكُمْ عَلَى الْبَيْضَاءِ لَيْلُهَا كَنَهَارِهَا لَا يَزِيغُ عَنْهَا بَعْدِي إِلَّا هَالِكٌ مَنْ يَعِشْ مِنْكُمْ فَسَيَرَى اخْتِلَافًا كَثِيرًا فَعَلَيْكُمْ بِمَا عَرَفْتُمْ مِنْ سُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِينَ الْمَهْدِيِّينَ بَعْدِي عَضُّوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِذِ وَإِيَّاكُمْ وَالْأُمُورَ الْمُحْدَثَاتِ فَإِنَّ كُلَّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ وَعَلَيْكُمْ بالطاعة وإن عبد احبشيا فَإِنَّمَا الْمُؤْمِنُ كَالْجَمَلِ الْأَنِفِ حَيْثُمَا قِيدَ انْقَادَ) أَخْرَجَهُ التِّرْمِذِيُّ بِمَعْنَاهُ وَصَحَّحَهُ.

হজরত ইরবাজ বিন সারিয়া থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সাঃ) আমাদেরকে উপদেশ দিলেন, তাতে চক্ষু প্রবাহিত হল অন্তর বিগলিত হল। আমরা বললাম হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) মনে হচ্ছে ইহা বিদায়ী উপদেশ !               আমাদেরকে কী নির্দেশ দেন? তখন রাসূল (সাঃ) বললেন, আমি তোমাদেরকে শুভ্র আলোকবর্তিকার (কোরআন) উপর রেখে গেলাম- যার রাত্রও দিনের ন্যায় আলোকময়। একমাত্র ধ্বংস প্রাপ্ত ব্যক্তি ছাড়া কেউ উহার বক্র পথে চলবে না। যারা বেঁচে থাকবে অনেক এখতেলাফ দেখতে পাবে। তখন তোমাদের কর্তব্য হবে, আমার পড়ে যা আমার এবং হেদায়েত প্রাপ্ত খোলাফায়ে রাশেদার সুন্নত বলে বুঝতে পারবে-তা আঁকড়ে ধরবে, এমনকি দাঁত দিয়ে কামড়ে পরে থাকবে। সাবধান, নতুন সৃষ্ট-বিদাত থেকে বেচে থাকবে, কারণ প্রত্যেক বিদাত গুমরাহী। আনুগত্য করবে, যদিও আমীর হাবশি গোলাম হউক না কেন। মু’মিন হল বরা লাগানো (নাক ছেঁদা) উটের ন্যায়- যে দিকেই চালানো যায় সে দিকেই চলে।

وَفِي مُسْنَدِ الدَّارِمِيِّ: أَنَّ أَبَا مُوسَى الْأَشْعَرِيَّ جَاءَ إِلَى عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ فَقَالَ: يَا أَبَا عَبْدِ الرَّحْمَنِ، إن رَأَيْتُ فِي الْمَسْجِدِ آنِفًا شَيْئًا أَنْكَرْتُهُ وَلَمْ أَرَ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ إِلَّا خَيْرًا، قَالَ: فَمَا هُوَ؟ قَالَ: إِنْ عِشْتَ فَسَتَرَاهُ، قَالَ: رَأَيْتُ فِي الْمَسْجِدِ قَوْمًا حِلَقًا حِلَقًا جُلُوسًا يَنْتَظِرُونَ الصَّلَاةَ، فِي كُلِّ حَلْقَةِ رَجُلٌ وَفِي أَيْدِيهِمْ حَصًى فَيَقُولُ لَهُمْ: كَبِّرُوا مِائَةً، فَيُكَبِّرُونَ مِائَةً. فَيَقُولُ: هَلِّلُوا مِائَةً، فَيُهَلِّلُونَ مِائَةً. وَيَقُولُ: سَبِّحُوا مِائَةً، فَيُسَبِّحُونَ مِائَةً. قَالَ: فَمَاذَا قُلْتَ لَهُمْ؟ قَالَ: مَا قُلْتُ لَهُمْ شَيْئًا، انْتِظَارَ رَأْيِكَ وَانْتِظَارَ أَمْرِكَ. قَالَ أَفَلَا أَمَرْتَهُمْ أَنْ يَعُدُّوا سَيِّئَاتِهِمْ وَضَمِنْتَ لَهُمْ أَلَّا يَضِيعَ مِنْ حَسَنَاتِهِمْ. ثُمَّ مَضَى وَمَضَيْنَا مَعَهُ حَتَّى أَتَى حَلْقَةً مِنْ تِلْكَ الْحِلَقِ، فَوَقَفَ عَلَيْهِمْ فَقَالَ: مَا هَذَا الَّذِي (أَرَاكُمْ «2») تَصْنَعُونَ؟ قَالُوا: يَا أَبَا عَبْدِ الرَّحْمَنِ، حَصًى نَعُدُّ بِهِ التَّكْبِيرَ وَالتَّهْلِيلَ وَالتَّسْبِيحَ. قَالَ: فَعُدُّوا سَيِّئَاتِكُمْ وَأَنَا ضَامِنٌ لَكُمْ ألا يضيع من حسناتكم شي، وَيْحَكُمْ يَا أُمَّةَ مُحَمَّدٍ! مَا أَسْرَعَ هَلَكَتَكُمْ. أو مفتتحي «3» بَابَ ضَلَالَةٍ! قَالُوا: وَاللَّهِ يَا أَبَا عَبْدِ الرَّحْمَنِ، مَا أَرَدْنَا إِلَّا الْخَيْرَ. فَقَالَ: وَكَمْ مِنْ مُرِيدٍ لِلْخَيْرِ لَنْ يُصِيبَهُ.

رَافِعُ بْنُ خَدِيجٍ أَنَّهُ سَمِعَ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: (يَكُونُ فِي أُمَّتِي قَوْمٌ يَكْفُرُونَ بِاللَّهِ وَبِالْقُرْآنِ وَهُمْ لَا يَشْعُرُونَ كَمَا كَفَرَتِ الْيَهُودُ وَالنَّصَارَى). قَالَ فَقُلْتُ: جُعِلْتُ فِدَاكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ! كَيْفَ ذَاكَ؟ قَالَ: (يُقِرُّونَ بِبَعْضٍ وَيَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ). قَالَ قُلْتُ: جُعِلْتُ فِدَاكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ! وَكَيْفَ يَقُولُونَ؟ قَالَ: (يَجْعَلُونَ إِبْلِيسَ عَدْلًا لِلَّهِ فِي خَلْقِهِ وَقُوَّتِهِ وَرِزْقِهِ وَيَقُولُونَ الْخَيْرُ مِنَ اللَّهِ وَالشَّرُّ مِنْ إِبْلِيسَ (. قَالَ: فَيَكْفُرُونَ بِاللَّهِ ثُمَّ يَقْرَءُونَ عَلَى ذَلِكَ كِتَابَ اللَّهِ، فَيَكْفُرُونَ بِالْقُرْآنِ بَعْدَ الْإِيمَانِ وَالْمَعْرِفَةِ؟ قَالَ: (فَمَا تَلْقَى أُمَّتِي مِنْهُمْ مِنَ الْعَدَاوَةِ وَالْبَغْضَاءِ وَالْجِدَالِ أُولَئِكَ زَنَادِقَةُ هَذِهِ الْأُمَّةِ).

রাফে’ বিন খাদিজ শুনেছেন, রাসূল (সাঃ) ইরশাদ করেন, আমার উম্মতের একদল লোক ইহুদি-নাসারাদের ন্যায় আল্লাহ ও কোরানের সাথে কুফুরি করবে অথচ এটা তারা বুঝতেও পারবে না। রাবী বলেন, আমি বললাম, আমার জীবন আপনার উপর কোরবান হে আল্লাহর রাসূল, এটা কিভাবে হবে ? উত্তরে রাসূল (সাঃ) বললেন, তারা কিছু মানবে আর কিছু মানবে না। রাবী বলেন, আমি আবার বললাম, আমার জীবন আপনার উপর কোরবান হে আল্লাহর রাসূল, তারা কী বলবে ? রাসূল (সাঃ) উত্তর দেন, ইবলিস আল্লাহর সমকক্ষ দাড় করবে তার সৃষ্টি, শক্তি ও রিযিকের মধ্যে। তারা বলবে, ভাল আল্লাহর পক্ষ থেকে আর মন্দ শয়তানের পক্ষ থেকে, এভাবে আল্লাহর সাথে কুফুরি করবে। তারপর এর ভিত্তিতে কোরআন পড়বে এবং কোরানের সাথে কুফুরি করবে ঈমান ও মা’রেফাতের পর। আমার উম্মত তাদের থেকে পাবে শুধু ঝগড়া-ফাসাদ, হিংসা-বিদ্বেষ ও শত্রুতা, এরাই হল এ উম্মতের যিন্দিক-নাস্তিক।

অন্যান্যদের মতামতঃ- আবু দাউদ বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তি তাকদির সম্পর্কে জানতে উমর বিন আব্দুল আজিজের কাছে লিখে পাঠাল। তিনিও উত্তর লিখে পাঠালেন-যার প্রধান অংশ ছিল “সুন্নাতে রাসূল (সাঃ) এর ইত্তেবা করবে, বিদাতীরা নতুন যা সৃষ্টি করে – বর্জন করবে, মুসলিম জামাত আঁকড়ে ধরে থাকবে। এটাই তোমার জন্য আল্লাহ্‌ প্রদত্ত নিরাপত্তার অবলম্বন”। সহল বলেন.. قَالَ سَهْلٌ: إِنَّمَا ظَهَرَتِ الْبِدْعَةُ عَلَى يَدَيْ أَهْلِ السُّنَّةِ لِأَنَّهُمْ ظَاهَرُوهُمْ وَقَاوَلُوهُمْ فَظَهَرَتْ أَقَاوِيلُهُمْ وَفَشَتْ فِي الْعَامَّةِ فَسَمِعَهُ مَنْ لَمْ يَكُنْ يسمعه، فلو تركوهم وَلَمْ يُكَلِّمُوهُمْ لَمَاتَ كُلٌّ وَاحِدٍ مِنْهُمْ عَلَى ما في صدره ولم يظهر منه شي وَحَمَلَهُ مَعَهُ إِلَى قَبْرِهِ. – তিনি আরো বলেন, তোমাদের কেউ বিদআত সৃষ্টি করলে শয়তান তা ইবাদত হিসেবে পেশ করে। সে অনুযায়ী ইবাদাত করা হয়। তারপর তা বিদআত হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে। তিনি আরো বলেন বিদাতের ব্যাপারে এর চেয়ে কঠোর কোন হাদীস আমার জানা নেই = (حَجَبَ اللَّهُ الْجَنَّةَ عَنْ صَاحِبِ الْبِدْعَةِ) – আল্লাহ তা’লা বিদাতীদের থেকে জান্নাত আড়ালে রাখবেন)। তিনি আরো বলেন, যে নিজের দ্বীনকে সম্মানিত করতে চায় সে যেন রাজা বাদশাহর সাথে উঠাবসা না করে, নারীদের সাথে নিভৃত্তে সময় না কাটায় এবং বিদাতি ও প্রভৃত্তির অনুসারীদের সাথে বিতর্কে না জড়ায়। তিনি আরো বলেন আনুগত্য কর, বিদআত সৃষ্টি করো না। এক ব্যক্তি দ্বিতীয় উমরকে বিদআত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করল, উত্তরে তিনি বলেন– عَلَيْكَ بِدِينِ الْأَعْرَابِ وَالْغُلَامِ فِي الْكُتَّابِ، ( বেদুঈনদের রীতি-নীতি এবং পাঠশালার বালকদের থেকে দূরে থাক)। ইমাম আওযায়ি বলেন, ইবলিশ তার বাহিনীকে জিজ্ঞেস করে বনী আদমকে কিভাবে ধোকা দাও ? তারা বলে সর্ব দিক দিয়ে। সে আবার জিজ্ঞেস করে ইস্তিগফারের দিক দিয়েও ? উত্তরে তারা বলে, অসম্ভব এটা তো তাওহীদের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়। তখন ইবলিশ বলে, আমি তাদের মধ্যে এমন বিষয় ছড়িয়ে দিব যা থেকে তারা তওবা করবে না, আর তা হল আহওয়া বা প্রবৃত্তির অনুসরণ (এজন্যই ফিরকাবাজরা ফিরকাবাজির কারণে তওবা করে না)। মোজাহিদ বলেন, আমি জানি না কোনটা আমার জন্য বড় নিয়ামাত, ইসলাম নাকি বিদআত থেকে বেঁচে থাকা। শা’বি বলেন, বিদাতিদের আসহাবে আহওয়া নাম করণের কারণ তারা জাহান্নামের আগুনে ভাসবে।

ফুজাইল বিন ইয়াজ বলেন-যে বিদাতীকে ভালবাসবে আল্লাহ্‌ তার আমল বরবাদ করে দিবেন এবং তার অন্তর থেকে ঈমানের নূর ছিনিয়ে নেবেন। সুফিয়ান সাওরী বলেন, অন্যান্য গুনাহের চেয়ে বিদআত শয়তানের কাছে অধিক প্রিয়, কারণ গুনাহর তওবা আছে, বিদাতের তওবা নেই অর্থাৎ কবুল করা হয় না। ইবনে আব্বাস বলেন, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের নিদর্শন হলো সুন্নাতের প্রতি আহবান করা, বিদাতে বাধা প্রদান করা। মুহাক্কিক আলেমগণ বলেছেন-উম্মতে মুহাম্মদির মধ্যে যখন ফিরকা বাজি বেড়ে যাবে তখন ফিরকাবাজরা উলামা ফুকাহাদের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ ও শত্রুতা পোষণ করবে উম্মতের মধ্যে পূর্বে কখনো এ অবস্থা ছিল না।(এর বাস্তবতা হচ্ছে, প্রত্যেক ফেরকা অন্য ফেরকার আলেমদের ঘৃণা করে ও শত্রু ভাবে। যেমন দেওবন্দীরা জামাতী, তরিকতী আলেমদের ঘৃণা করে, তরিকতীরা দেওবন্দী, জামাতী আলেমদের ঘৃণা করে।) সুরা নিসা এবং অত্র সুরায় বিদাতী ও প্রভৃত্তির অনুসারীদের সাথে উঠা বসা সম্পর্কে নিষেধ করা হয়েছে। যে তাদের সাথে উঠা বসা করবে সে তাদের অন্তর্ভুক্ত বলে গন্য হবে। যেমন = وَإِذَا رَأَيْتَ الَّذِينَ يَخُوضُونَ فِي آيَاتِنَا فَأَعْرِضْ عَنْهُمْ حَتَّىٰ يَخُوضُوا فِي حَدِيثٍ غَيْرِهِ وَإِمَّا يُنسِيَنَّكَ الشَّيْطَانُ فَلَا تَقْعُدْ بَعْدَ الذِّكْرَىٰ مَعَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ ﴿الأنعام: ٦٨﴾ = আর তুমি যখন দেখতে পাবে তাদের যারা আমাদের আয়াতসমূহে নিরর্থক তর্ক করে তখন তাদের থেকে সরে যাবে যে পর্যন্ত না তারা অন্য কোনো প্রসঙ্গে প্রবেশ করে। আর যদি শয়তান তোমাকে ভুলিয়ে দেয় তবে মনে পড়ার পরে বসে থেকো না অন্যায়কারীদের দলের সঙ্গে। (৬: ৬৮)

উম্মতের একদল সুরা নিসার ১৪০ নং আয়াত এবং অত্র সুরার ভিত্তিতে সীদ্ধান্ত দিয়েছেন যে, যারা বিদাতী ও প্রবৃত্তির অনুসারীদের সাথে উঠা বসা করবে তারা বিদাতীদের অন্তর্ভুক্ত বলে গন্য হবে। যেমন ইমাম আহমদ বিন হাম্বল, আওযায়ি ও ইবনে মুবারক বলেন, বিদাতীদের সাথে উঠা বসাকারীকে নিষেধ করা হবে। যদি সে না মানে তবে তার উপরেও বিদাতীদের বিধান প্রযোজ্য হবে। যেমন উমর বিন আব্দুল আজিজ মদ্যপের সাথে উঠা বসা কারীকে শাস্তিদানের কথা বলেছিলেন এবং দলীল হিসেবে   ” إِنَّكُمْ إِذاً مِثْلُهُمْ” (তোমরাও তাদের মত) এ আয়াত পেশ করেছিলেন।

ইবনে কাছির বলেন, নাওয়াস ইবনে সাময়ান (রাঃ) হতে বর্নিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ আল্লাহ তা’লা সিরাতে মুস্তাকীমের দৃষ্টান্ত পেশ করেছেন। এর দু’দিকে দুটি প্রাচীর রয়েছে এবং তাতে খোলা দরজা রয়েছে। দরজাগুলোর উপর পর্দা লটকান রয়েছে। সোজা রাস্তাটির দরজার উপর আল্লাহ্‌র দিকে আহ্বানকারী একটি লোক বসে আছে এবং বলছেঃ হে লোক সকল তোমরা সবাই এই সরল সোজা পথে চলে এসো। এদিক ওদিক যেয়ো না। আর একটি লোক রাস্তার উপর থেকে ডাক দিকে রয়েছে। যখনই কোন লোক ঐ দরজাগুলোর কোন একটি দরজা খোলার ইচ্ছা করছে তখনই সে তাকে বলছে- সর্বনাশ ওটা খোলো না। কারণ যদি তুমি দরজাটি খুলে দাও তবে তুমি ওর মধ্যে প্রবেশই করে যাবে। এখন এই সরল সোজা পথটি হচ্ছে ইসলাম। আর প্রাচীরগুলো হচ্ছে আল্লাহ্‌র হুদুদ। এই খোলা দরজাগুলো হচ্ছে আল্লাহ্‌র নিষিদ্ধ বস্তুসমূহ। রাস্তার মাথায় যে বসে আছে ওটা হচ্ছে আল্লাহ্‌র কিতাব। আর রাস্তার উপর থেকে যে ডাক দিচ্ছে সে হচ্ছে আল্লাহ্‌র উপদেশ দাতা যা প্রত্যেক মুসলমানের অন্তরে রয়েছে। অন্তর যেন খারাপ কাজ থেকে বাধা দিচ্ছে।

হযরত উবাদা ইবনে সামিত (রাঃ) হতে বির্নিত, তিনি বলেন যে, রাসূল (সাঃ) বলেছেন, তোমাদের মধ্যে কে আমার কাছে এই তিনটি আয়াতের উপর দীক্ষা গ্রহণ করতে পারো? অতঃপর তিনি -{قُلْ تَعَالَوْا أَتْلُ مَا حَرَّمَ رَبُّكُمْ عَلَيْكُمْ} এখান থেকে শুরু করে তিনটি আয়াত পাঠ করলেন। পাঠ শেষে বললেন, যে ব্যক্তি এগুলোর হক আদায় করল, তার পুরস্কার আল্লাহর কাছে নির্ধারিত হয়ে গেল। আর যে ব্যক্তি এগুলোর আমলে অবহেলা করল, তাকে হয়ত আল্লাহ দুনিয়াতেই শাস্তি দিয়ে দিবেন। আর যদি আল্লাহ তাকে শাস্তি দানে বিলম্ব করেন তবে তিনি পরকালে ইচ্ছা করলে তাকে শাস্তি দিবেন অথবা ক্ষমা করে দিবেন।

বাস্তব প্রয়োগঃ- রাসূল (সাঃ) এর প্রতিটি কথাই যেন মু’জেযা। যেমন তিনি সিরাতে মুস্তাকীম বুঝাতে একটি সরল রেখা টানলেন। তারপর ডানে বামে দুটি করে রেখা টেনে বললেন, এগুলো শয়তানের পথ। এর বাস্তব চিত্র হচ্ছে বামের দুটি রেখা হল বাহায়ি ও শিয়ারা। আর ডানের দুটি রেখা হলো কাদিয়ানী ও সুন্নীরা। এতে বুঝা যাচ্ছে উম্মাহর মধ্যে এখন আর কেউ সিরাতে মুস্তাকীমের উপর নাই, সবাই বিদআতী গুমরাহ হয়ে গেছে। আর এ জন্যই উম্মাহর চূড়ান্ত পতন ঘটেছে। কিছু লোক সিরাতে মুস্তাকীমের উপর থাকলেও উম্মাহর অবস্থা অন্তত কিছুটা ভাল থাকত। তবে হ্যাঁ দলমত নির্বিশেষে যুগে যুগে কিছু লোক জামাল উদ্দীন আফগানির মত ঐক্যের প্রচেষ্টা চালিয়েছে এবং চালাচ্ছে- তাদেরকে সিরাতে মুস্তাকীমের উপর গন্য করা যায়।

অনন্তর উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম কুরতুবি বিদাতের উপর গুরুত্ব দিয়ে ব্যাপক আলোচনা করেছেন। তৎসংক্রান্ত হাদীস ও মনিষীদের অনেক উক্তি নকল করেছেন। বিদআত এমনই ভয়ঙ্কর পাপ যে, রাসূল (সাঃ) বলেছেন অন্য সকল গুনাহের তওবা আছে কিন্তু বিদাতের কোন তওবা নাই। কারণ, অন্যান্য কবিরা গুনাহ যেমন চুরি, ডাকাতি, খুন, যিনা, পিতা-মাতার অবাধ্যতা, চাদাবাজি ইত্যাদির সমাধান আছে অর্থাৎ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে দিয়ত বা ক্ষতিপূরণ দিয়ে দিলেই পার্থিব ক্ষতি পুষিয়ে যায়। কিন্তু বিদআত এমনই সর্বগ্রাসী ও সর্বনাশা বিষয় যে, এটা উম্মাহ ও মানব সভ্যতা ধ্বংস করে দেয়। যেমন উম্মাহর মধ্যে ফিরকা বিভক্তির কারণ হচ্ছে বিদআত। প্রত্যেকটা দল ইসলামের নামে ইসলামের মধ্যে একেকটা বিদআত সৃষ্টি করেছে, তারপর বিভক্ত হয়ে গেছে। এভাবে অসংখ্য ফিরকায় বিভক্ত হয়ে সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়েছে। একে অন্যের বিরুদ্ধাচরন করে পরস্পরকে হত্যা করছে, দুবর্লতর জাতিতে পরিণত হয়েছে। আর এ সুযোগে কাফেররা মহাউল্লাসে তাদের নিধনযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে। কাজেই বিদাতের পরিণতি বিভক্তির ফলে উম্মাহর যে ক্ষতি হচ্ছে তার কোন ক্ষতিপূরণ নাই বিধায় তওবা নাই। যেমন উম্মাহর দুবর্লতার সুযোগে ফিলিস্তিন, আরাকান, কাশ্মির, চীনা তুর্কিস্তানসহ আরো অন্যান্য ভূমি কাফেররা দখল করে আছে। লক্ষ লক্ষ মুসলিম হত্যা করছে। বাড়ি ঘর জ্বালিয়ে দিচ্ছে, নারীদের ধর্ষণ করছে, সম্পদ শোষণ করছে, আবার মুসলিম দেশগুলিতে ফিরকাবাজরা নিজেরাই নিজেদের ধ্বংস করছে, স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ধ্বংস করছে। এই যে বিপুল ক্ষতি এসবের কি কোন ক্ষতিপূরণ হতে পারে? ক্ষতিপূরণ সম্ভব? ক্ষতিপূরণ সম্ভব নয় বিধায় তওবাও সম্ভব নয়। এজন্যই বিদআত সৃষ্টিকারী ফিরকাবাজদের কোন তওবা নাই অর্থাৎ তাদের তওবা কবুল করা হয় না। তওবা কবুল হয় না বলেই নামায, রোযা, দোয়া কবুল হয় না। দোয়া কবুল হয় না বলেই উম্মাহর জন্য আমাদের দোয়া ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে আজ উম্মাহ অজাত, কুজাত, বেজাতের হাতে মার খেয়ে ধ্বংসের শেষ প্রান্তে উপনিত হয়েছে।

এখন ফিরকাবাজরা প্রত্যেকেই দাবী করে এবং করবে যে, না না আমরা তো বিদআত সৃষ্টি করি নি, আমরা হক পন্থি, হকের উপর আছি। তাদের এ দাবী সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। কারণ বিদাতের সংজ্ঞা হচ্ছে ধর্মের নামে এমন কোন নতুন বিষয় সৃষ্টি করা এবং সওয়াবের নিয়তে অনুশীলন করা যা রাসূল (সাঃ)ও সাহাবায়ে কেরামের যুগে ছিল না। কাজেই এখন আমরা প্রতিটি ফিরকার মতবাদে বিদআত অনুসন্ধান করব। তবে তাদের সম্পূর্ণ মতবাদ তুলে ধরা সম্ভব নয়। সংক্ষেপের খাতিরে দুয়েকটি করে পয়েন্ট উল্লেখ করব। যেমন শিয়া মতবাদে হযরত আলী (রাঃ) এর খেলাফত তত্ত্ব, সুন্নীদের মধ্যে বেরেলভীদের রাসূল (সাঃ) নূরের সৃষ্টি ও গায়েবজ্ঞান তত্ত্ব, জামাতের সাহাবাগণের মি’ইয়ারে হক তত্ত্ব, তাবলীগের জিহাদ ও খেলাফত ব্যবস্থার বিকল্প দাওয়াত তত্ত্ব, ব্রাদারহুড ও জামাতের পশ্চিমা পুঁজিবাদী- গণতন্ত্রের চাঁচে ঢেলে ইসলাম প্রতিষ্ঠা তত্ত্ব, ওহাবি-সালাফীদের তাকলিদ ও শিরক বিদআত নির্মূল তত্ত্ব, দেওবন্দীদের ধর্মীয় ও বস্তুবাদী শিক্ষা তত্ত্ব। এভাবে প্রত্যেকটি ফিরকা নতুন নতুন তত্ত্ব জন্ম দিয়ে মুসলিম জামাত থেকে খারেজ হয়ে গেল।এখন ফিরকাবাজদের কাছে প্রশ্ন হলো, এসব মতবাদ রাসূল (সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরামের যুগে ছিল কিনা ? এমনকি খায়রুল কুরুনে ছিল কিনা ? তদুপরি কোরআন হাদীসে এসব মতবাদ আছে কিনা ? যদি থাকে তাহলে বিদআত নয়, আর যদি না থাকে তাহলে বিদআত। তদুপরি এসব বিষয় পার্থিব যেমন বিয়ে, চাকরি, শিক্ষা ইত্যাদি ক্ষেত্রে এবং পারলৌকিক যেমন নামায, রোযা ইত্যাদি ক্ষেত্রে কোন উপকারে আসে কিনা। যেমন পাত্র পাত্রিকে বা ইন্টারভিউয়ে এমন প্রশ্ন করা হয় না যে, রাসূল কিসের সৃষ্টি , সাহাবাগণ অনুসরণ যোগ্য কিনা ইত্যাদি। কাজেই বুঝা যাচ্ছে এসব মতবাদ শুধুমাত্র উম্মাহর ইহকাল- পরকাল ধ্বংসের হাতিয়ার বা উপাদান, কোন কল্যাণের অবলম্বন নয়। আবার এ বিদআত সৃষ্টির মাধ্যমে দুটি ভয়ঙ্কর অপরাধ সংগঠিত হলো। ১। বিদাতীর দোয়া কবুল হয় না, সে জাহান্নামী। ২। এ বিদাতের ভিত্তিতে যখনই পৃথক ফিরকা হয়ে গেল সাথে সাথেই তারা কাফের হয়ে গেল।.. يَوْمَ تَبْيَضُّ وُجُوهٌ وَتَسْوَدُّ وُجُوهٌ ۚ.. আয়াতে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। কাজেই এখন বিদআত পরিত্যাগ করে ঐক্যবদ্ধ হওয়া ব্যতীত উম্মাহর ইহলৌকিক ও পারলৌকিক মুক্তির দ্বিতীয় কোন পথ নেই। আর ঐক্যের দায়িত্ব আলেম সমাজের উপর। (ধারাবাহিক)

Leave a Reply