আল-কোরানের কাঠগড়ায় বিভক্তিবাদ- ৯ (মহা সতর্ক বার্তা)

বিভক্তি বাদীদের সাথে রাসূলের দায় মুক্তি / সম্পর্কচ্ছেদঃ

(إِنَّ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينَهُمْ وَكَانُوا شِيَعًا لَّسْتَ مِنْهُمْ فِي شَيْءٍ إِنَّمَا أَمْرُهُمْ إِلَى اللَّهِ ثُمَّ يُنَبِّئُهُم بِمَا كَانُوا يَفْعَلُونَ ﴿الأنعام: ١٥٩﴾

নিঃসন্দেহ যারা তাদের ধর্মকে বিভক্ত করেছে এবং বিভিন্ন দল হয়ে গেছে, তাদের জন্য তোমার কোনো দায়দায়িত্ব নেই। নিঃসন্দেহ তাদের ব্যাপার আল্লাহ্‌র কাছে, তিনিই এরপরে তাদের জানাবেন যা তারা কী করেছিল। (৬: ১৫৯)

ব্যখ্যাঃ- إِنَّ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينَهُمْ – যারা বিভিন্ন মতবাদের সৃষ্টি করে দ্বীন তথা ইসলামকে বিভক্ত করল, তারপর দলে দলে বিভক্ত হয়ে গেল। لَّسْتَ مِنْهُمْ فِي شَيْءٍ – এর সরল অনুবাদ হচ্ছে, তাদের ব্যাপারে তুমি (রাসূল) কোন কিছুর মধ্যে নেই অর্থাৎ বিভক্তি বাদীদের সাথে রাসূলের কোন সম্পর্ক বা দায় দায়িত্ব নেই। তাদের অপকর্মের বিষয়টা আল্লাহ্‌র উপর ন্যস্ত, কিয়ামতের ময়দানে আল্লাহ্‌ তা’লা তাদের অপকর্ম সম্পর্কে অবহিত করবেন অর্থাৎ বিচার করবেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে কিয়ামতে আল্লাহ্‌ তা’লা কি অবহিত করবেন? এ সম্পর্কে হাউজে কাউসার সংক্রান্ত হাদীসে এসেছে -‏.‏ يَقُولُ لاَ تَدْرِي مَا أَحْدَثُوا بَعْدَكَ= আল্লাহ রাসূল (সাঃ)কে বলবেন, আপনি তো জানেন না আপনার পরে তারা কী বিদাত সৃষ্টি করেছে অর্থাৎ নতুন মতবাদ সৃষ্টি করে বিভক্ত হয়ে গেছে।

মুফাসসীরীনে কেরামের মতামতঃ- إِنَّ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينَهُمْ = মুজাহিদ, কাতাদা, সুদ্দি, দাহহাক- তারা বলেন, অত্র আয়াত দ্বারা ইহুদি-নাসারা উদ্দেশ্য, তারা আল্লাহ ও রাসূলের মধ্যে পার্থক্য করে থাকে। কেউ বলেন এখানে মুশরিকরা উদ্দেশ্য। কেউ কেউ বলেন আয়াতটি ব্যাপকার্থক- যাতে সকল প্রকার কাফের ও বিদাতিরা অন্তর্ভুক্ত। তবে সঠিক কথা হচ্ছে এখানে বিদাতিরা উদ্দেশ্য- যারা ইসলামের মধ্যে নতুন নতুন মতবাদ উদ্ভাবন করে ফিরকা- বিভাজন সৃষ্টি করে। যেমন- وَرَوَى أَبُو هُرَيْرَةَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي هَذِهِ الْآيَةِ” إِنَّ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينَهُمْ” هُمْ أَهْلُ الْبِدَعِ وَالشُّبُهَاتِ، وَأَهْلُ الضَّلَالَةِ مِنْ هَذِهِ الْأُمَّةِ. وَرَوَى بقية بن الوليد عَنْ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لِعَائِشَةَ: (إِنَّ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينَهُمْ وَكانُوا شِيَعاً إِنَّمَا هُمْ أَصْحَابُ الْبِدَعِ وَأَصْحَابُ الْأَهْوَاءِ وَأَصْحَابُ الضَّلَالَةِ مِنْ هَذِهِ الْأُمَّةِ، يَا عَائِشَةُ إِنَّ لِكُلِّ صَاحِبِ ذَنْبٍ تَوْبَةً غَيْرَ أَصْحَابِ الْبِدَعِ وَأَصْحَابِ الْأَهْوَاءِ لَيْسَ لهم توبة وأنا برئ مِنْهُمْ وَهُمْ مِنَّا بُرَآءُ).

অর্থাৎ হযরত আবু হুরায়রা এবং হযরত উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সাঃ) হযরত আয়েশা (রাঃ)কে বলেন- إِنَّ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينَهُمْ = উক্ত আয়াত দ্বারা এ উম্মতের বিদাতী, প্রবৃত্তির অনুসারী ও গুমরাহ লোকেরা উদ্দেশ্য। হে আয়েশা, প্রত্যেক গুনাহগারের তাওবা আছে কিন্তু বিদাতী ও প্রবৃত্তির অনুসারীদের কোন তাওবা নাই অর্থাৎ তাদের তাওবা কবুল করা হয় না। আমি তাদের থেকে দায়মুক্ত তারাও আমার থেকে মুক্ত, বিচ্ছিন্ন।

সতর্ক বার্তাঃ- অত্র হাদীস ফিরকাবাজদের জন্য ভয়াবহ বিপদ সংকেত। এতে বুঝা যায়, শিয়া, সুন্নী, বেরেলভী, দেওবন্দী, জামাতী, তাবলিগী, সুফিবাদী, ব্রাদারহুড, তালেবান, আইসিস ইত্যাদির সাথে রাসূল (সাঃ) এর কোন সম্পর্ক নাই। রাসূল (সাঃ) তাদের থেকে দায়মুক্ত তারাও রাসূল (সাঃ) থেকে বিচ্ছিন্ন-সম্পর্কহীন। কারণ তারা বিদাত তথা নতুন নতুন মতবাদ সৃষ্টি করে একেকটা ফিরকা গঠন করে জামাত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। হায় আফসোস, হায় সর্বনাশ। এখনো কী তাদের হুস হবে না।

বিধানঃ উপরোক্ত আলোচনায় বুঝা গেল, দ্বীনের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি করা হারাম, যারা এমন অপকর্ম করবে তাদের সাথে রাসূল (সাঃ) এর কোন সম্পর্ক থাকবে না, কিয়ামত দিবসে রাসূল তাদের কোন দায় দায়িত্ব বহন করবেন না। ইহুদী খৃষ্টানরা নিজেদের ধর্মে এখতেলাফ করে, বিভক্তি এনে ধ্বংস হয়ে গেছে তদ্রুপ মুসলমানরাও ইসলামের মধ্যে বিভক্তি আনলে ধ্বংস হয়ে যাবে। কাজেই সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে খোদার দ্বীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে।

বাস্তব প্রয়োগঃ এ সংক্ষিপ্ত পরিসরে মুসলিম জাতির অসংখ্যা ফিরকা সম্পর্কে আলোচনা করা সম্ভব নয়। আমরা শুধু উপমহাদেশের ফিরকাগুলি সম্পর্কে আলোচনা করব। অত্র আয়াতের প্রতিপাদ্য ফিরকাবাজদের সম্পর্কে রাসূল(সাঃ) বলেছেন — عَنْ أَبِي وَائِلٍ، قَالَ قَالَ عَبْدُ اللَّهِ قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم ‏ “‏ أَنَا فَرَطُكُمْ عَلَى الْحَوْضِ، لَيُرْفَعَنَّ إِلَىَّ رِجَالٌ مِنْكُمْ حَتَّى إِذَا أَهْوَيْتُ لأُنَاوِلَهُمُ اخْتُلِجُوا دُونِي فَأَقُولُ أَىْ رَبِّ أَصْحَابِي‏.‏ يَقُولُ لاَ تَدْرِي مَا أَحْدَثُوا بَعْدَكَ ‏”‏‏.‏ = আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (সাঃ) বলেছেন : আমি হাউযে কাউসারের নিকট তোমাদের আগেই উপস্থিত থাকব। তোমাদের থেকে কিছু লোককে আমার নিকট পেশ করা হবে। কিন্তু আমি যখন তাদের পান করাতে অগ্রসর হব, তখন তাদেরকে আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হবে। আমি বলব, হে রব! এরা তো আমার সাথী। তখন তিনি বলবেন, আপনার পর তারা নতুন কী ঘটিয়েছে তা আপনি জানেন না।

অর্থাৎ এ উম্মতের বিদআত সৃষ্টি কারী ভ্রষ্টরাই হচ্ছে উক্ত আয়াতের প্রতিপাদ্য। এখন দেখতে হবে কারা বিদআত সৃষ্টি করল। আমরা জানি, ইংরেজ আমলে সৈয়দ আহমদ রেজা খান ঘোষণা দিলেন রাসূল (সাঃ) নূরের সৃষ্টি এবং তিনি গায়েব জানেন। এ বিষয় সম্পর্কে কোরান হাদীসে কোন নির্দেশনা নাই এবং তার পূর্বে উম্মতের মধ্যেও এ জাতীয় কোন মতবাদ ছিল না। তিনি শরীয়ত বহির্ভুত এমন একটি বিষয় তৈরি করে, নতুন মতবাদ সৃষ্টি করে মুসলিম জামাত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেন, ফিরকা সৃষ্টি করলেন, তারা হলেন বেরেলভী ধারা। আবার জামাতে ইসলামী পাশ্চাত্যের দাজ্জালী সভ্যতার বিরুদ্ধে মজবুত ইসলামী দুর্গ গড়ে তুলেছে বটে, কিন্তু সাহাবায়ে কেরাম মি’য়ারে হক্ব কিনা, অনুসরণ যোগ্য কিনা এ জাতীয় কিছু ফালতু বিষয়ের অবতারণা করল। যা কোরান হাদীসের কোন বিষয়ও নয় আবার উম্মতের পূর্বালোচিত কোন ব্যাপারও নয়। এভাবে তারা একটি নতুন বিষয় সামনে এনে বিতর্কের সৃষ্টি করে মুসলিম জামাত থেকে বেরিয়ে গেল। আবার তাবলীগ জামাতের প্রথম প্রবর্তন হয়েছিল অশিক্ষিত মুসলমানদেরকে ইংরেজ আমলে হিন্দু ও খৃষ্টানদের ধর্মান্তরকরণ ফিতনা থেকে বাঁচিয়ে নামায রোযা ও অন্যান্য দ্বীনি বিষয়াদি শিক্ষা দিয়ে খাটি মুসলমানরুপে তৈরির উদ্দেশ্যে। কিন্তু পরবর্তিতে এ ধারাটি ইসলামি খিলাফত, রাষ্ট্র ব্যবস্থা, অর্থ ব্যবস্থা, বিচার ব্যবস্থা, জিহাদ ইত্যাদি ইসলামের মৌলিক বিষয়াদি বাদ দিয়ে শুধু একটা পদ্ধতি (দাওয়াত) বেছে নিয়ে বাতিল ফেরকায় রূপান্তরিত হয়ে গেল। আবার দেওবন্দি ধারাটি কোন মতাদর্শ ভিত্তিক দল নয়। এটা ইসলামি শিক্ষা ভিত্তিক উপমহাদেশে ইসলামের প্রতিনিধিত্ব কারী একটি মৌলিক ধারা। এ ধারাটি মসজিদ মাদরাসা সহ অন্যান্য ক্ষেত্রে ইসলামের খেদমত আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছে। তাদের খিদমত বন্ধ করে দিলে- উপমহাদেশে ইসলামের অবস্থা তলানিতে গিয়ে ঠেকবে। এমনকি নামায পরার জন্য কোন ইমাম, কোরান শিক্ষার জন্য কোন আলেম খোজে পাওয়া যাবে না। এতদসত্ত্বে ও তাদের অনেক ভ্রান্তি রয়েছে। কারণ ইসলামের প্রতিনিধিত্ব কারী প্রতিষ্ঠান হিসাবে তাদের উচিত ছিল ভারত বর্ষের সকল মুসলমানকে ঐক্যের উপর প্রতিষ্ঠিত রেখে সম্মিলিতভাবে খিলাফত প্রতিষ্ঠার আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া। কিন্তু ইসলামের এ মৌলিক দায়িত্ব পালন না করে তারা বরং চুল ছেড়া মতভেদ ও চুতা নাতার অজুহাতে মুসলমানদের বিভিন্ন দলকে বাতিল ফেরকা ঘোষণা দিয়ে মুসলিম জামাত থেকে বের করে দিয়েছেন, বিশেষত জামাতে ইসলামী, রেজাখানী ও অন্যান্য দলকে। তদুপরি তারা তাবলীগের জন্ম দিয়ে এর লাগাম টেনে না ধরার ফলে আলেম নিয়ন্ত্রিত তাবলীগ এখন ইসলামের ভয়ঙ্কর পয়েন্টের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তদুপরি ধর্ম শিক্ষা থেকে বিজ্ঞান শিক্ষা আলাদা করে জাতির মন মানসিকতা ও চিন্তা-চেতনা বিপরীতমুখী ধারায় বিভক্ত করে নতুন বিদাত সৃষ্টি করে উম্মাহর সর্বনাশ ডেকে এনেছেন। আরো অন্যান্য কারণে দেওবন্দি ধারাও এখন বাতিল ফেরকায় পরিণত হয়ে গেছে। এছাড়া তাদের সম্পর্কে অন্যান্য ফেরকাগুলিরও অনেক আপত্তি আছে। সুতরাং রেজা খানি, জামাতী, দেওবন্দী, তাবলীগি ও অন্যান্য ধারাগুলি যেহেতু ইসলামের মধ্যে নতুন নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করে বিদাতের জন্ম দিয়েছে এবং বিভিন্ন ফিরকায় বিভক্ত হয়ে মুসলিম জামাত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে কাজেই এরা সবাই বাতিল ফিরকা। এরা সবাই উক্ত আয়াতের প্রতিপাদ্য জনগোষ্টি। তাদের সাথে রাসুলের কোন সম্পর্ক নাই। আল্লাহ্‌ তা’লা বিচার দিবসে তাদের কঠোর পরিণতির প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন। (ধারাবাহিক)

Leave a Reply