আল-কোরানের কাঠগড়ায় বিভক্তিবাদ-১০ (ফিরকাবাজদের জন্য মহাবিপদ সঙ্কেত)

ফিরকাবাজরা মুশরিক এবং নিজেদের মতবাদে সন্তুষ্ট

وَلَا تَكُونُوا مِنَ الْمُشْرِكِينَ مِنَ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينَهُمْ وَكَانُوا شِيَعًا كُلُّ حِزْبٍ بِمَا لَدَيْهِمْ فَرِحُونَ (32) এবং মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না, যারা তাদের ধর্মে বিভেদ সৃষ্টি করেছে এবং অনেক দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। প্রত্যেক দলই নিজ নিজ মতবাদ নিয়ে উল্লসিত। (রুম/৩২)

ব্যাখ্যাঃ- অন্যত্র যে প্রাকৃতিক দীনের কথা বলা হয়েছে মানব জাতির আসল দীনই হচ্ছে সেই প্রাকৃতিক দীন, এখানে এদিকেই ইশারা করা হয়েছে। এ দীন মুশরিকী ধর্ম থেকে ক্রম- বিবর্তনের মাধ্যমে তাওহীদ পর্যন্ত পৌঁছে নি। যেমন আন্দাজ অনুমানের মাধ্যমে একটি ধর্মীয় দর্শন রচনাকারীরা মনে করে থাকেন। বরং দুনিয়ায় যতগুলো ধর্ম পাওয়া যায় এ সবেরই উৎপত্তি হয়েছে এ আসল দীনের মধ্যে বিকৃতি সাধনের মাধ্যমে। এ বিকৃতি আসার কারণ হলো এই যে, বিভিন্ন ব্যক্তি প্রাকৃতিক সত্যের ওপর নিজেদের নতুন নতুন কথা বাড়িয়ে দিয়ে নিজেদের জন্য এক একটি আলাদা ধর্ম বানিয়ে নিয়েছে। তাদের প্রত্যেকেই মূল সত্যের পরিবর্তে এ বর্ধিত জিনিসেরই ভক্ত অনুরক্ত হয়ে গেছে। যার ফলে তারা অন্যদের থেকে আলাদা হয়ে গিয়ে একটি স্বতন্ত্র ফিরকায় পরিণত হয়েছে। এখন সঠিক পথনির্দেশনা লাভ করতে চাইলে যে প্রকৃত সত্য ছিল দীনের মূল ভিত্তি , প্রত্যেক ব্যক্তিকেই সেদিকে ফিরে যেতে হবে। পরবর্তীকালের যাবতীয় বর্ধিত অংশ থেকে এবং তাদের ভক্ত-অনুরক্তদের দল থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করে একেবারেই আলাদা হয়ে যেতে হবে। তাদের সাথে তারা যে সম্পর্ক সূত্রই কায়েম রাখবে সেটিই তাদের দীনের মধ্যে বিভ্রান্তি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির কারণ হবে। (তাফহীমুল কোরআন)।

তাফসিরঃ- مِنَ الَّذِينَ فَرَّقُوا = ঈমাম কুরতুবি বলেন, পুর্বে অন্যান্য আয়াতে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে, হজরত আবু হুরায়রা, আয়েশা রাঃ, আবু উমামা-এর মতে অত্র আয়াত দ্বারা উদ্দেশ্য আহলে কিবলা তথা এ উম্মতের বিদাতি ও প্রবৃত্তির অনুসারীরা। অর্থাৎ যারা নিজেদের খেয়াল খুশিমত নতুন নতুন মতবাদ সৃষ্টি করে উম্মাহকে বিভক্ত করেছে। তবে কেউ কেউ বলেন এখানে ইহুদি নাসারা উদ্দেশ্য। ইমাম ইবনে জরীর তাবারী বলেন—

(وَلا تَكُونَوا مِنَ المُشْرِكِينَ)يقول: ولا تكونوا من أهل الشرك بالله بتضييعكم فرائضه، وركوبكم معاصيه، وخلافكم الدين الذي دعاكم إليه. وقوله: (مِنَ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينَهُمْ وكانُوا شِيَعا) يقول: ولا تكونوا من المشركين الذين بدّلوا دينهم، وخالفوه ففارقوه (وكانوا شِيَعًا) يقول: وكانوا أحزابا فرقا كاليهود والنصارى. وقوله: (كُلُّ حِزْبٍ بمَا لَديْهِمْ فَرِحُونَ) يقول: كل طائفة وفرقة من هؤلاء الذين فارقوا دينهم الحقّ، فأحدثوا البدع التي أحدثوا (بِمَا لَديْهم فَرِحُونَ) يقول: بما هم به متمسكون من المذهب، فرحون مسرورون، يحسبون أن الصواب معهم دون غيرهم. — অর্থাৎ (وَلا تَكُونَوا مِنَ المُشْرِكِينَ) এখানে আল্লাহ তা’লা বলেন, তোমরা মুশরেকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না আল্লাহর ফরয সমূহ লঙ্ঘন করে, পাপাচারিতায় লিপ্ত হয়ে এবং দ্বীন যা কামনা করে তার বিরুদ্ধাচরন করে। (অর্থাৎ দ্বীন উম্মাহর মধ্যে ঐক্য কামনা করে – যা ফরয, এর খেলাফ করা শিরকের অন্তর্ভুক্ত)।: (مِنَ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينَهُمْ وكانُوا شِيَعا) এখানে আল্লাহ তা’লা বলেন, তোমরা সেই মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না যারা নিজেদের দ্বীনকে পরিবর্তন করেছে, মতভেদ করেছে এবং বিভক্ত হয়ে গেছে। (وكانوا شِيَعًا) অর্থাৎ তোমরা ইহুদি খৃষ্টানদের ন্যায় বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ো না। (كُلُّ حِزْبٍ بمَا لَديْهِمْ فَرِحُونَ) অর্থাৎ যারা দ্বীনকে বিভক্ত করেছে এবং বিদাত সৃষ্টি করেছে- তারা যে পথ-মত ও মযহাব অবলম্বন করে আছে তাতেই সন্তুষ্ট পরিতৃপ্ত, তারা নিজেদেরকেই সঠিক এবং অন্যদেরকে ভ্রান্ত মনে করে। ( বাহঃ, কী অপুর্ব মিল- দেওবন্দী, বেরেলভী, সালাফী, জামাত, তাবলীগ, ব্রাদার হুড, তালেবান ইত্যাদির সাথে খাপের খাপ লেগে গেল)।

كُلُّ حِزْبٍ بِمَا لَدَيْهِمْ فَرِحُونَ = প্রত্যেক দল নিজেদের যা আছে তা নিয়ে সন্তুষ্ট। বসরিদের মতে এ আয়াত পূর্বের আয়াত. وَلَا تَكُونُوا مِنَ الْمُشْرِكِينَ = এর সাথে মিলিত। কাজেই অর্থ হবে যারা নিজেদের দ্বীনকে বিভক্ত করেছে তারা মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত। কারণ যারা দ্বীনকে বিভক্ত করেছে তারা কোন ব্যক্তি বা মতবাদকে কেন্দ্র করে বিভক্ত হয়েছে। কোন মতবাদ কেন্দ্রিক বিভক্ত হলে তা আল্লাহ্‌র সাথে শিরক হল। আর কোন ব্যক্তি কেন্দ্রিক হলে সেই ব্যক্তি নবীর ন্যায় অনুসৃত হলো। কাজেই এটা শিরক বির-রিসালাত হল। এই ভাবে বিভক্তিবাদিরা মুশরেকে পরিনত হয়ে যায়। এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা সামনে আসছে।

َ كُلُّ حِزْبٍ بِمَا لَدَيْهِمْ فَرِحُونَ অর্থাৎ দ্বীনের মধ্যে বিদাত ও বিভক্তি সৃষ্টিকারী প্রত্যেক দল ও ফিরকা নিজেদের যে মতবাদ ও মাযহাব – যা তারা আকরে ধরে আছে তাতে তারা আনন্দিত ও সন্তুষ্ট। তারা মনে করে একমাত্র তারাই সঠিক অন্যরা ভ্রান্ত।

বাস্তব প্রয়োগঃ- বর্তমানের দেওবন্দী, বেরেলভী, সালাফী, জামাত, তাবলীগ, ব্রাদার হুড, তালেবান ইত্যাদি প্রত্যেকটি ফিরকার মধ্যে এই ব্যাধি পরিদৃষ্ট। (ধারাবাহিক)

Leave a Reply