আল্লাহর কাছে কি চাই,কেন চাই,কিভাবে চাই

আমরা বিপদে পড়লেই আল্লাহর কাছে সাহায্য চাই।বলি, আল্লাহ্‌ আমাকে রক্ষা করো,কিংবা আমাকে উদ্ধার করো।কোন দোষ করে ফেললে বলি,আল্লাহ আর করবো না,এবারের মতন ক্ষমা করে দাও।কিন্তু আমরা সেই দোষ থেকে বের হতে পারিনা।বারংবার এভাবে করতে করতে আমাদের মনে হয়,নাহ,আমি আসলেই খারাপ।নিজে দোষ করি ইচ্ছা করে,আর আল্লাহর কাছে বেহায়ার মতন ক্ষমা চাই।আল্লাহ শুনবেন কেন আমার কথা!

আবার অনেক সময় আমরা বলি,আল্লাহ আমাকে অমুক বিপদে ফেলো না,আমাকে আর কতো পরীক্ষা নিবা ইত্যাদি। আবার অনেক সময় দেখা যায়,আমরা চিন্তা করি,সুখের সময় আল্লাহকে ডাকি না,বিপদে পড়লে ডাকি।এইটা আর করা যাবেনা।হয় সুখের সময়েও ডাকবো নাইলে ডাকবো ই না।কিংবা এভাবে ভাবি,আল্লাহ্‌ তো সব ঠিক করেই রাখছেন।ডেকে লাভ কি?

অনেকে আবার বলেন,বিপদে পড়ে আল্লাহকে ডাকা ভালো,কিন্তু এই উসিলায় নামায ধরবেন,কোরান পড়োবেন,এটা ঠিক না।নামায কোরান তো এমনিতেই পড়া উচিৎ। আসুন,একটু নিজেরাই চিন্তা করে দেখি।আমরা আল্লাহর কাছে কতটূকু চাইতে পারবো,কেন চাইবো আর কিভাবে চাওয়া উচিৎ।

প্রথমে একটা বিষয় আমাদের পরিষ্কার হতে হবে।আমাদের সাথে আল্লাহর সম্পর্ক।আমাদের সাথে আল্লাহর সম্পর্ক আসলে কি?বইয়ে পড়ছি,মুরুব্বীরা বলছেন,আল্লাহ আমাদের মালিক,আমরা তাঁর বান্দা।এটুকু দিয়ে কি আসলে সম্পর্কটা পরিষ্কার হয়?একটা অদৃশ্য দেয়ালের মতন হয়ে থাকেনা সামনে?আবার অনেক সময় দেখা যায়,অনেকে বলেন,যুবক অবস্থায় আল্লাহকে ডাকি নাই,এখন বুড়ো হয়ে আল্লাহকে ডাকলে কি আল্লাহ্‌ শুনবেন?সমাজই বা কি বলবে।

ধরেন,আপনি একটা কুকুর কিংবা বিড়াল পোষেন।কুকুর কিংবা বিড়ালের গড় আয়ু কতো?১৫-২০ বছর।আর আপনার আয়ু?সাধারণভাবে ৬০ বছর।এখন আপনার পোষ্য যখন তার শেষ বয়সে পৌছে যাবে,আপনি কি তাকে বুড়া মনে করবেন?আপনার কাছে সে সারাজীবন আপনার পোষ্য-ই থেকে যাবে।প্রিয় সংগী।ঠিক তেমনি ভাবে,আল্লাহ পাক চিরকাল ছিলেন,থাকবেন।আমরা খুব অল্প কয়েক বছরের জন্য তার পোষ্য হয়ে বেচে আছি।আমাদের জন্মের আগের কিছু আমরা জানিনা,মৃত্যুর পরের কিছুও জানবো না।মাঝের এই কিছু সময়ে আমরা ছোট থেকে বড় হই,বুড়ো হই,মারা যাই।কিন্তু সেটা তো আমাদের মানে মানুষের প্যারামিটার এ।আল্লাহর কাছে আমরা সারাজীবন একই রকম।তার সৃষ্ট।কাজেই আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবার কিংবা তার মুখাপেক্ষী হবার কোনো সময় সীমা নাই।হ্যা,যৌবন কালে আমরা সবচেয়ে বেশী শক্তিশালী থাকি।তাই আল্লাহ্‌ সেই সময়ের কৃতকর্ম বিশেষভাবে দেখবেন,কিন্তু এর মানে এই না বুড়ো হয়ে গেলে আল্লাহর রহমতের দরজা বন্ধ হয়ে যাবে।আমাদের উপলব্ধী যত তাড়াতাড়ি আসবে,তত ভালো।আল্লাহর জন্য ভালো খারাপ কিছু নাই।এই ভালো খারাপ আমাদের জন্য।যত দ্রুত আমরা তার মুখাপেক্ষী হবো,আমরা তত বেশী সময় তাকে কৃতজ্ঞতা জানাতে পারবো।

এখন এই মালিক-দাসের সম্পর্কটাকে আমরা কিভাবে দেখি?এখানেও কিন্তু আমরা সেই আমাদের প্যারামিটারে বিচার করি।দাস যত কাজই করুক,মালিকের মন ভরেনা কিংবা দাস যতবার পালাতে চায়-মালিক তাকে ধরে এনে শাস্তি দ্যায়,তার উপর থেকে বিশ্বাস চলে যায়।আমাদের আসল মালিক এমন নন।আমাদের মালিক আমাদের কিনে আনেননি,কিংবা কেউ তাকে আমাদের উপহার দেননি।উনি নিজে আমাদের সৃষ্টি করেছে।উনার ইচ্ছেমত।উনি আমাদের বিবেক তৈরী করেছেন।মন তৈরী করেছেন।আমাদের পক্ষে কতটূকু করা সম্ভব,তারও সীমারেখা তিনি একে দিয়েছেন।আমরা কত মুর্খ,আমরা নিজেরাই আমাদের সেই সীমারেখা জানিনা।প্রতিদিন আমরা আমাদের সীমারেখা নতুন করে আবিষ্কার করি!আর মুগ্ধ হই।আর দম্ভ করে বলি,মানুষ পারেনা এমন জিনিস নাই!আসলে যদি চিন্তা করে দেখতাম,আমাদেরকে দেয়া ক্ষমতা একেবারে আমরাই জানিনা।বরং দিনে দিনে একেকটি হার্ডলস পার করে আমরা আমদের ক্ষমতা সম্পর্কে জানি।আমাদের ক্ষমতা জানতে জানতেই প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম চলে যায়।কত ক্ষুদ্র আমাদের জ্ঞান,কত ক্ষুদ্র আমাদের শক্তি।

আল্লাহ্‌ জানেন,আমরা ধোঁকা খাবো।আমরা ভুল করবো।একবার,দুইবার…বারবার।জন্মের পর থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমরা ভুল করবো।আল্লাহ তো বলেছেন ই,যদি আমরা ভুল না করতাম,আল্লাহ আমাদের ধ্বংস করে দিয়ে নতুন এক প্রজাতি তৈরী করতেন।আমরা অনেকেই দম্ভ করে বলি,আল্লাহ যদি চান ই,আমরা আল্লাহকে মানবো,সম্মান করবো,তাইলে আল্লাহ্‌ মন দিলেন ক্যান,শয়তাম দিলেন কেন।ফেরেশতাদের মত করেই তো বানাতে পারতেন।কত বোকা আমরা।কিভাবে?দেখুন, আমরা আমাদের ভালোবাসার মানুষকে কতটুকু ভালোবাসি?মা-বাবা,বন্ধু,ভাই-বোন,স্ত্রী কিংবা প্রেমিকাকে?সব সময় কি আমাদের সম্পর্ক ভালো থাকে?মনোমালিন্য হয় না?কয়দিন পর তো আবার সব ঠিক হয়ে যায়।বরং সম্পর্ক এক রকম থাকলে আমরা বলি,ধুর,কি বোরিং সম্পর্ক।একঘেয়ে।সারপ্রাইজ নাই।আল্লাহ আমাদের তারচেয়েও বেশী ভালোবাসেন।অনেক অনেক বেশী।আমরা যতই ভুল করি,আল্লাহ আমাদের ক্ষমা করে দেন।মা-বাবা যেভাবে আমাদের স্নেহ করেন,ভালোবাসেন।আল্লাহর স্নেহ তারচেয়েও বেশী।আমাদের চোখে আমরা বুড়ো হই,সম্মানিত হই।আল্লাহর কাছে তার বান্দারা বুড়ো হয় না।সারাজীবন একভাবেই স্নেহ করেন আমাদের  মালিক আমাদের।আমরা যদি ভুল না করতাম,সম্পর্কটা একঘেয়ে হয়ে যেতনা?আমরা ভুল করি,ক্ষমা চাই।প্রতিবার ক্ষমা চাওয়ার পর এক অদ্ভুত প্রশান্তি আসে না মনে?দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হই না?এই স্পিরিট্টাই কিন্তু সামনের কিছুদিন আমদের এগিয়ে নিয়ে যায়।এসব কিছু আল্লাহর সৃষ্ট এলগরিদম।কাজেই আমি আপনি ভুল করলে সেটা আমদের জন্য অস্বাভাবিক কিংবা কষ্টের,আল্লাহর কাছে স্বাভাবিক।আল্লাহ জানেন,তার যে বান্দা ভুল করে বারবার ক্ষমা চাইবে,তার বোধদয় ততবেশী হবে।আর যে ভুল করে দূরে সরে যাবে,সে নিজের ভেতরে যন্ত্রণায় পূড়ে নিঃশেষ হবে।

আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইবার কোনো সীমারেখা নাই।বরং আল্লাহ্‌ আমাদের জন্য জীবনকে কত সহজ করে দিয়েছেন দেখুন।আমরা ক্ষুধা লাগলে মায়ের কাছে গিয়ে খাবার চাই।মুখ ফুটে না বললে বাবার কাছ থেকে এক টাকাও পাওয়া যায় না।আমরা আল্লাহর কাছে দোয়াকেও সেই প্যারামিটার এ বেধে নিয়েছি।আমরা মনে করি দুই হাত তুলে মোনাজাত ধরে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতে হবে।নাইলে আল্লাহ্‌ বুঝবেন না!আসলে কি তাই?আমাদের প্রত্যেক মুহুর্তে মনে মনে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইবার সুযোগ আল্লাহই আমাদের দিয়েছেন।সকালে ঘুম থেকে উঠা থেকে শুরু করে রাতে ঘুমানোর আগ পর্যন্ত আমরা কত কিছু চাই,কত কিছু চিন্তা করি।এসব ই দোয়া।এসব আল্লাহ্‌ জানেন,মনে রাখেন।দেখবেন,সময় সময়ে সেই দোয়া কবুল হয়ে গেলে আমরা সেই দোয়ার কথা মনে করি।যাক।আল্লাহ কবুল করছে।আল্লাহ কিভাবে জানলেন,সেইটা কি আমরা ভেবে দেখি?নাহ।তা ভাবি না।আল্লাহ আমাদের মনের খবর জানেন।বান্দা সাফল্য পেলে যতটা খুশী হয়,আল্লাহ তাঁর বান্দাদের সাফল্যে তারচেয়েও বেশী খুশি হন।

আল্লাহ কে অনেক সময় রাগ করে বলি,আল্লাহ তুমি কেন আমাকে এইটা দিলানা,কেন ঐটা করতে পারলাম না।আল্লাহ আমাদের সম্পর্কে আমাদের চেয়ে অনেক বেশী জানেন।আল্লাহ জানেন,তার এই বান্দা কখন কিসে খুশী হবে।আমরা অধৈর্য হয়ে পড়ি।কারণ আমরা নিজেদের চিনিনা।দেখেন,প্রচন্ড গরমে প্রাণ যায় যায় অবস্থা হয়।হঠাত এক পশলা বৃষ্টি সবকিছু কিভাবে ঠান্ডা করে দ্যায়।তখন মনে হয় আহ,আগে মনে হয় কখনো গরম ছিলই না।যে আমরা দিনে ৪/৫ বার গোসল দিতাম গরমে,সেই আমরা ই গোসল করি কোনমতে একবার।মুখে যতই বলি,গতকালের গরম টা মারাত্মক ছিল,অনুভুতিতে কতটূকু সেটা ধরে রাখতে পারি?পারিনা।সেই সময়কার কিছু স্মৃতি হয়তো মনে থাকে।কিন্তু আল্লাহ্‌ সে সম্পর্কে অবগত।আল্লাহ গরম দেন,আল্লাহ ঠান্ডা দেন।আল্লাহ জানেন তার কোন বান্দা গরমে কতটুকু কষ্ট পেয়েছিল,ঠান্ডায় কতটূকু খুশী হলো।আল্লাহ ভুলেন না।

আমরা অনেক সময় উসিলা করে নামায পড়ি।রোযা রাখি।এখন আমার এই বিপদ চলছে,কাজেই এখন নামায পড়ি।বিপদ ভুলে গেলে নামায রোযা বাদ।ধরেন আমার আপনার আপনার টাকা দরকার।আপনি মায়ের কাছে চাইলেন।এজন্য কি করেন?মা’কে খুব তেল দেন,খুব কাজ করে দেন মায়ের।তারপর টাকা পেলেই যদি ফুড়ুত হয়ে যান,মা কষ্ট পাবেন না?কিংবা বন্ধুর কাছে থেকে টাকা নিয়ে হাওয়া হয়ে গেলে বন্ধুত্ব নষ্ট হয়ে যায় না?এমন উদাহরণ তো অসংখ্য।এখানেও কিন্তু আমরা আমাদের সম্পর্কের প্যারামিটারে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক বিচার করি।আল্লাহ আমাদের মনে খবর রাখেন।আমাদের উসিলা জানেন।আমাদের তাঁর প্রতি উপলব্ধি ও জানেন।আল্লাহ্‌ জানেন,বান্দা কি শুধু সফল হবার জন্য এভাবে তেল দিচ্ছে নাকি সত্যি বিশ্বাস করে আল্লাহ্‌ ছাড়া তার আসলেই কোনো উপায় নাই।আল্লাহ তাঁর বান্দার উপরে রাগ করেন না।কাজেই কেউ যদি উসিলা করে কোনো কাজ শুরু করে,আমাদের উচিৎ তাকে উতসাহ দেয়া,যেন সে তা ধরে রাখে।একদিন সে অবশ্যই বুঝতে পারবে,লা ইলাহা ইল্লালাহ এর গুরুত্ব।

আমরা আমদের সীমিত জ্ঞান দিয়ে আসলে অনেক কিছুই বুঝতে পারিনা।মানুষের সাথে মানূষের সম্পর্ক দিয়ে আমরা আল্লাহর সাথে আমাদের সম্পর্ক বুঝতে চেষ্টা করি।এটা ভুল।আল্লাহর সাথে আমাদের সম্পর্ক ফরমাল না।একদম ই ইনফর্মাল।আমরা যখন খুশী,যতবার খুশী,যেভাবে খুশী আল্লাহর সামনে সিজদাহবনত হতে পারি।আল্লাহ আমাদের সে সুযোগ দিয়েছেন।আমরা তাঁর ইবাদাত করি,এর এক শতাংশও তাঁর কাজে আসবেনা।পুরোটাই আমাদের কাজে আসবে।আল্লাহ আমাদের ভালোবাসেন।তাই তিনি চান তার বান্দারা কৃতজ্ঞ থাকুক,ভালো থাকুক,সত থাকুক।আল্লাহ আআমদের সুযোগ দিয়েছে,প্রকৃত মালিক কে সেটা বিচার করার।আল্লাহ্‌ জানেন,বান্দা যদি সত্যিই বিচার করে,বান্দা ভুল করবে না।কিন্তু আমরা তা করি না।বাবা-মায়ের গতানুগতিক ধারা বজায় রেখে মুসলমানের ছেলে মুসলমান হই,হিন্দুর ছেলে হিন্দু হই।এই মুসলমানিত্বের মূল্য আদৌ আছে কি?নাই।

আল্লাহ আমাদের যে যেখানে আছে,যেভাবে আছে-সবাইকে সত্য উপলব্ধি করার তৌফিক দিন।সো কলড ধ্যান ধারণার বাইরে এসে  আল্লাহর সাথে আমাদের সম্পর্কের আসল ধারণাটি বোঝার তৌফিক দিন।মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কের রেশ ধরে আল্লাহর সাথে আমাদের সম্পর্ক নিরুপন নয়,আল্লাহরা সাথে আমাদের সম্পর্কের ভিত্তিতে মানুষের সাথে আচরণ করার তৌফিক দিন।আমীন।

Leave a Reply