ধর্মব্যবসা: মুসলমানদের হাতে ইসলাম ধ্বংসের অতীত-বর্তমান (৩)

ভূমিকা

যদিও পলিটিকাল-রিলিজিয়াস ইস্যুতে নিশ্ছিদ্র আর্গুমেন্ট উপস্থাপন করে আলোচনা করার অভ্যাস আমার, কিন্তু এখানে বিস্তারিত ইতিহাস তুলে ধরে আর্গুমেন্ট করার প্রথমতঃ ইচ্ছা নেই, দ্বিতীয়তঃ সময় ও সুযোগ নেই। আমি যা সত্য বলে জানি, তা সংক্ষেপে তুলে ধরছি। যারা আমার উপর আস্থা রাখেন তাদের জন্য এই লেখাটি সোর্স অব ইনফরমেশান, উন্মুক্ত হৃদয়ের মানুষদের জন্য সত্য অনুসন্ধানের নতুন কিছু টপিক, আর প্রেজুডিসড ধর্মান্ধ রোগগ্রস্ত অন্তরের জন্য রোগ বৃদ্ধির উছিলা।শেষ পর্যন্ত আর্গুমেন্ট ও ডায়লগের দুয়ার উন্মুক্ত রাখার পক্ষপাতী আমি, কিন্তু সেই আর্গুমেন্ট অবশ্যই সত্য উন্মোচনের নিয়তে হওয়া উচিত, নিজের দীর্ঘদিনের লালিত বিশ্বাস ও ধ্যান ধারণাকে প্রতিষ্ঠা করবার উদ্দেশ্যে নয়।
(পর্ব-১ পড়ুন এখানে। আলোচিত বিষয়: মক্কা-মদীনা: মুহাম্মদ (সা.) থেকে আলে-সৌদ (৬২৯-১৯২৪) [মুহাম্মদ (সা.), প্রথম চার খলিফা, উমাইয়্যা শাসন থেকে রাজতান্ত্রিক সৌদি আরব প্রতিষ্ঠা, মজলুম আহলে বাইত থেকে ইসলামী ইরান প্রতিষ্ঠা, সৌদি আরবের যে ইতিহাস কখনো বলা হয় না, “ইসলামপন্থীদের” নীরবতা])
(পর্ব-২ পড়ুন এখানে। আলোচিত বিষয়: শিয়া-সুন্নি পার্থক্য: কেবল রাজনৈতিক মতপার্থক্য নয়, Levels of Guidance, মুহাম্মদ (সা.) এর মৃত্যু: নেতৃত্বকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সঙ্কট: গাদীরে খুম এর ঘটনা, “দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি: কুরআন ও আহলে বাইত…”, ধর্মব্যবসা: আলেমগণ কর্তৃক তথ্য, সত্য ও ইতিহাস গোপন করা)

ওহাবী ইসলাম: আধ্যাত্মিকতা বিবর্জিত রুক্ষ, শুষ্ক ইসলাম

ইসলামের ইতিহাস কখনোই নির্ঝঞ্ঝাট ছিল না। মুহাম্মদ (সা.) এর মৃত্যুর পরে ইমামতকে কেন্দ্র করে (অর্থাৎ তৎকালীন ইমাম, ইমাম আলী (আ.)-কে কেন্দ্র করে) বিভক্তির যে দুটি মৌলিক ধারা সৃষ্টি হয়েছিলো, তা পরবর্তীতে কালের প্রবাহে অসংখ্য শাখা প্রশাখা লাভ করে মুসলমানদেরকে শতধাবিভক্ত করে দিয়েছে। আর গোড়া থেকেই ক্ষমতালোভী মানুষেরা বিভিন্ন ধর্মীয় মতবাদকে নিজ স্বার্থে ব্যবহার করেছে, বিভিন্ন মতবাদকে আশ্রয় করেছে। ইসলামের ইতিহাস বিবেচনা করতে গেলে ক্ষমতালোভী জালিমদের সাথে তাদের ধর্ম / মাযহাব / ধর্মীয় মতবাদকে এক করে ফেলা ঠিক হবে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ক্ষমতালোভী ও জালিমেরা এক জাতি, আর মজলুমেরা এক জাতি।
প্রথম নোটেই বলেছিলাম যে ইসলামের ইতিহাস শিয়া-সুন্নি এই দুটি বড় ধারায় প্রবাহিত হয়েছে মুহাম্মদ (সা.) এর মৃত্যুর পর থেকে। শিয়াদের ইতিহাস মূলতঃ নিপীড়িত হবার ইতিহাস: খাঁটি মুহাম্মদী ইসলামকে ধরে রাখা ও প্রচারের স্বার্থে জুলুমের মুখে এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে দেশান্তরী হন তারা। তবুও, তাদের মাঝেও ক্ষমতালোভী মানুষের ইতিহাস আছে, যারা শিয়াইজম, ইমামত ও ইমামগণের নামকে নিজ স্বার্থে ব্যবহার করেছে। তবে যেহেতু প্রথম থেকেই তারা সংখ্যালঘু ছিল এবং সদা নির্যাতনের মুখে ছিল, সেহেতু তাদের মাঝে ধর্মকে ক্ষমতার স্বার্থে ব্যবহার করা বা অপরকে জুলুম করার ঘটনা খুব বেশি ঘটতে পারেনি, বরং তারা নিজেরাই নির্যাতিত হয়েছে বেশি।
অপরদিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের মাঝে, ক্ষমতাসীনদের আশ্রয়ে / ছায়ায় সুন্নি ইসলাম প্রচার-প্রসার লাভ করেছে। এখানেও জুলুমের ইতিহাস আছে, এবং সুন্নির হাতেই সুন্নি আলেমের জুলুমের ইতিহাস আছে, কিন্তু তুলনামূলকভাবে শিয়ারা নির্যাতিত হয়েছে অধিক।

সুন্নি ধারায় ওহাবীজমের মত চরমপন্থী মতবাদের আগমণের কারণ

শিয়াইজম ও সুন্নিইজমের ধর্মতাত্ত্বিক পার্থক্য (আমার দৃষ্টিতে) এই যে, শিয়ারা ইমামতের গাইডেন্স পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছি, আর সুন্নিরা তার আগ পর্যন্ত পৌঁছেছে। দুটির কোনোটিতেই প্রাথমিকভাবে ও বাহ্যিকভাবে দোষ নেই। তবে সুন্নি বিশ্বাসে নিষ্পাপ ও নির্ভুল ছিলেন না এমন অনেক ব্যক্তির কর্মকে বৈধতা দেয়া হয়; তাদের কথা-কর্মকে ধর্মীয় রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করা হয়, এবং তাদেরকে প্রশ্নের ঊর্ধ্ব গণ্য করা হয়। এই কাজটি পরবর্তীতে সুন্নি ইসলামে বেশকিছু অন্যায় ও অগ্রহণযোগ্য বিষয়ের অনুপ্রবেশের সুযোগ করে দিয়েছে। অপরদিকে শিয়া ইসলাম কঠোরভাবে চৌদ্দ মাসুমের (১৪ জন নিষ্পাপ ব্যক্তি – মুহাম্মদ (সা.), তাঁর কন্যা ফাতিমা (সা.) ও বারো ইমাম (আ.)) অনুসরণ করায়, এবং তাদেরকে ছাড়া অন্য যেকারো অনুসরণকে শর্তসাপেক্ষ রাখায় অতটা অগ্রহণযোগ্য বিষয়ের অনুপ্রবেশ ঘটেনি।
সুন্নি ইসলাম মাসুম (নিষ্পাপ) ছাড়াও অন্য ব্যক্তির কথা-কর্মকে ধর্মীয় রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করার নীতিকে গ্রহণ করায় “ধর্মীয় নেতৃত্বের” বা অন্যভাবে বললে, “মুসলমানদের নেতৃত্বের” কোনো সুনির্দিষ্ট মাপকাঠি / বর্ডারলাইন ছিল না। একারণে রাজা বাদশাহ, স্বৈরাচার, এমনকি ইয়াজিদের মত ব্যক্তির শাসন সুন্নি মুসলমানেরা মেনে নিয়েছেন, এদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেননি। অর্থাৎ, নেতৃত্বের শর্ত সুস্পষ্ট না থাকাটা একদিকে যেমন এজিদ-মুয়াবিয়ার মত শাসককে বিনা বাধায় ক্ষমতাসীন হবার সুযোগ করে দিয়েছে, অপরদিকে তেমনি সুন্নি ইসলামের যৌক্তিক ভিত্তি দৃঢ় না থাকায় জালিম-জাহেল শাসক কর্তৃক সুন্নি ইসলামকে বিকৃত (manipulate) করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
শিয়া ইসলামে যুক্তি ও দর্শনের চর্চা কমবেশি ছিল, আছে। একারণে নিরেপক্ষ যাচাইয়ের মাধ্যমে অতীতের খলিফাগণের ভুল ও সঠিক কাজগুলিকে চিহ্নিত করার গ্রাউন্ড তারা পেয়েছে; অতীত থেকে শিক্ষাগ্রহণ করতে পেরেছে। অপরদিকে সুন্নি ইসলামে “খুলাফায়ে রাশেদীনের চারজনের সকল কাজই সঠিক”, “সাহাবীগণ নক্ষত্রতুল্য”, “জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবী…” এজাতীয় বিষয় বেশকিছু ব্যক্তিকে প্রশ্ন করা ও যাচাই করার ঊর্ধ্বে স্থাপন করেছে। একারণে মুহাম্মদ (সা.) এর পর শিয়া ও সুন্নি ধারার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও শাসকদেরকে যাচাই করে সঠিকটা বের করে নেয়া তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। ফলস্বরূপ সুন্নি ইসলাম নেতৃত্বসহ বিভিন্ন ধর্মীয়, রাজনৈতিক, সামাজিক প্রশ্নে কনফিউজড হয়েছে প্রচুর। একটা উদাহরণ হলো নেতৃত্ব। সুন্নি ইসলামের এ সংক্রান্ত একটি আর্গুমেন্ট দেখুন:
“যেহেতু খুলাফায়ে রাশেদীন হলেন হযরত আবু বকর, হযরত ওমর, হযরত উসমান ও হযরত আলী;
এবং যেহেতু খুলাফায়ে রাশেদীনের প্রত্যেকেই সত্যপথে পরিচালিত ছিলেন;
এবং যেহেতু এই চারজন খলিফা চারটি ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতিতে নির্বাচিত হয়েছিলেন;
অতএব মুসলমানদের খলিফা/নেতা নির্বাচন করার কোনো একটি সুনির্দিষ্টি পদ্ধতি নেই।”
এ ধরণের আংশিক আর্গুমেন্টের সাথে যদি আবার এমন অন্ধ বিশ্বাস যুক্ত হয় যে, সাহাবীগণের সমালোচনা করা যাবে না, সাহাবীগণের কর্মকে যুক্তিতর্ক করে যাচাই করা যাবে না — তখন সাহাবীগণের ভালোগুলোর সাথে দোষগুলোরও অনুপ্রবেশের সুযোগ ঘটে। এধরণের চিন্তাধারার প্রবাহেই ওহাবীজমের সৃষ্টি।

কুরআন ও মুহাম্মদ (সা.)-কে আল্লাহপাক যাচাইয়ের মাইক্রোস্কোপের নিচে এনে দিয়েছেন

যেখানে স্বয়ং নবী মুহাম্মদ (সা.) তাঁর নবুওয়্যাত মানুষকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করতে বলেননি, বরং প্রমাণ হাজির করেছেন যেন মানুষ তাঁকে ‘যাচাই’ করে নিতে পারে; চাঁদকে দ্বিখণ্ডিত করেছেন, কুরআনের মত জীবন্ত মুজিজা এনে হাজির করেছেন, এবং নিজের আমল আখলাক সবকিছু দ্বারা মানুষের সামনে নিজেকে ‘প্রমাণ’ করেছেন, এবং আরবের লোকেরা তাঁর সকল কথা-কর্মকে যাচাই বাছাই করে শেষমেষ নবী বলে স্বীকার করে নিয়েছে, সেখানে এটা কীকরে সম্ভব যে, নবী মুহাম্মদের (সা.) চেয়ে কম মর্যাদার কোনো মানুষকে (অর্থাৎ সাহাবীকে, কিংবা খুলাফায়ে রাশেদীনকে) ‘যাচাই’ করা যাবে না, তার কথা-কর্ম-জীবনেতিহাসের পর্যালোচনা করা যাবে না!
অনুরূপভাবে, আল্লাহপাক নিজে কুরআনের ব্যাপারে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন যে, পারলে অনুরূপ রচনা করে দেখাও! এবং আল্লাহপাক দাবী করেছেন যে, যদি আল্লাহ ব্যতীত আর কেউ এই কুরআন রচনা করে থাকত, তবে নিশ্চয়ই তাতে বহু বৈপরীত্য দেখা যেত। অর্থাৎ এটাও একটা চ্যালেঞ্জ যে, জ্বীন ও মানবজাতি মিলে দিনরাত চেষ্টা করেও না কুরআনের মত একটি সূরা রচনা করতে পারবে, আর না তাতে একটি পরস্পরবিরোধিতা দেখাতে পারবে। অর্থাৎ, আল্লাহ তায়ালা কুরআনকে যাচাই-বাছাই করার মাইক্রোস্কোপের নিচে স্থাপন করেছেন, যেভাবে মুহাম্মদের (সা.) গোটা জীবনকেই মক্কার কাফির-মুশরিকদের চোখের সামনে রেখে দিয়েছিলেন: তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা সেখানেই, আকস্মিকভাবে মক্কায় হাজির হওয়া কোনো ‘দরবেশ/ধর্মপ্রচারক’ হিসেবে আগমণ নয়।

মওলানা মওদূদী(র.) কর্তৃক সাহাবীগণের সমালোচনা

অতএব, সাহাবীগণের পর্যালোচনামূলক সমালোচনাও করা যাবে না — এ ধরণের বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। মওলানা মওদূদী(র.) তাঁর খেলাফত ও মুলুকিয়াত (খেলাফত ও রাজতন্ত্র) গ্রন্থে খুলাফায়ে রাশেদীনের বিভিন্ন খলিফার কিছু কিছু কাজের সমালোচনা করেছেন, সমালোচনা করেছেন মুয়াবিয়ার, কঠোর সমালোচনা করেছেন এজিদের ও যুক্তিখণ্ডন করেছেন এজিদের সমর্থকদের। একারণে প্রচলিত ধারার সুন্নি আলেমগণ তাঁর কঠোর সমালোচনা করেছেন, এমনকি তাঁকে ফেতনা সৃষ্টিকারী বলতেও দ্বিধা করেননি।
প্রসঙ্গক্রমে বলতে হয়, জাকির নায়েক ইয়াজিদের উপর সালাম পাঠ করেছেন এবং অনেক আলেমের বিরোধিতা ও দলীল উপস্থাপন সত্ত্বেও তিনি তাঁর মতের উপর স্থির রয়েছেন।
প্রাসঙ্গিক আরেকটি কথা হলো, ওহাবীজম ক্রমশঃ মূলধারার সুন্নীদের গ্রাস করবে – একথা অনেকেই বলেন, আমিও তা-ই মনে করি। জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ (ও তাদের অঙ্গ সংগঠনগুলো) ওহাবীজমের সফট ভার্সন লালন করে, এবং দ্রুতই তারা মওলানা মওদূদীর (র.) চিন্তাধারার একেবারে বিপরীত হয়ে যাবে, ইতিমধ্যে অনেকটা হয়েছেও। একারণে অতীতে শিবিরের পাঠ্য সিলেবাসে “খেলাফত ও মুলুকিয়াত” বইটি (যেখানে কিনা এজিদ-মুয়াবিয়ার সমালোচনা আছে, সেটি) সাথী পর্যায়ে (অর্থাৎ দ্বিতীয় স্তরে) থাকলেও পরবর্তীতে তাকে সদস্য (তৃতীয় স্তরের) সিলেবাসে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে, এবং কাগজে-কলমে যা-ই থাকুক না কেন, বাস্তবে সেটাকে প্রায় বিলুপ্ত করে দেয়া হয়েছে বলে আমি জানতে পেরেছি।
মওলানা মওদুদী (র.) একজন স্কলার ছিলেন, এবং তিনি তাঁর সাধ্যের মধ্যে যথাসম্ভব রিলিজিয়াস রিসোর্স ব্যবহার করে সৎকাজ করে গিয়েছেন। তাঁর মৃত্যুর কয়েকমাস আগে ইরানে ইসলামী বিপ্লব সংঘটিত হলে এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “ইরানের ইসলামী বিপ্লব আমার হৃদয়ের স্পন্দন।” অথচ পরবর্তীতে জামায়াতে ইসলামী সৌদি ইনফ্লুয়েন্সে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের বিরুদ্ধে চটি বই বের করে। এটা শুধু উনার ক্ষেত্রে না যে, অনুসারী দাবীদারেরা উল্টা কাজ করে, বরং এমনটা হয়েছ ও হয়ে আসছে সুন্নি চার মাযহাবের ইমামগণের ক্ষেত্রে, এমনকি স্বয়ং মুহাম্মদ (সা.) এর ক্ষেত্রে। মুহাম্মদের (সা.) শিখানো দ্বীনের নাম করে ISIS আজকে যা করছে, তার সাথে কি দয়াল নবীর আদৌ কোনো সম্পর্ক আছে? ISIS এর কার্যক্রম দেখে যেমন মুহাম্মদের (সা.) সম্পর্কে ধারণা করা ভুল হবে, তেমনি বর্তমান জামায়াত-শিবিরে কার্যক্রম দেখেও মওলানা মওদূদী (র.) সম্পর্কে ধারণা করা ভুল হবে। যাহোক তা ভিন্ন আলোচনা।

ইবনে তাইমিয়্যা (১২৬৩-১৩২৮): বর্তমান চরমপন্থী ইসলামের ‘শাইখুল-ইসলাম’

ইবনে তাইমিয়্যার পিতা ছিলেন হাম্বলি মাযহাবের একজন ফকীহ। পিতা ও বিভিন্ন শিক্ষকের কাছে উসুল ফিকাহ, হাদীস, তাফসির ইত্যাদি শাস্ত্র শিক্ষা করে একটা পর্যায়ে তিনি নিজস্ব ইজতিহাদী মতামত প্রকাশ করতে শুরু করেন, এবং শিয়া ও সুন্নি উভয় মাযহাবেরই, বিশেষতঃ শিয়া মাযহাবের বিপরীতে দাঁড়িয়ে যান। একেতো তিনি শিয়াদের কট্টর বিরোধী ছিলেনই, অপরদিকে তৎকালীন সুন্নি আলেমগণও উনার শরীরি খোদার কনসেপ্ট মেনে নিতে পারেননি। “আল্লাহর হাত আছে, পা আছে, চেহারা আছে, শরীর আছে, তিনি কুরসীতে বসেন, তিনি এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে সক্ষম” — এজাতীয় ধারণা প্রথম জোরেশোরে প্রচার ঘটান তিনি। এ ব্যাপারে তার যুক্তি ছিল এই যে, কুরআনে আল্লাহর সম্পর্কে যেভাবে বলা হয়েছে, সেই বাহ্যিক অর্থই গ্রহণ করতে হবে: যেহেতু কুরআনে আল্লাহর হাত, পা, কুরসী ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, অতএব আল্লাহর হাত আছে, পা আছে, তিনি চেয়ারে (কুরসী) বসেন — এটা আমাদের মেনে নিতে হবে।
অথচ উনার এই দৃষ্টিভঙ্গি কুরআনেরই বিপরীত। কুরআনে আল্লাহ নিজেই ঘোষণা করেছেন দুই রকম আয়াতের কথা: আয়াতে মুহকামাত ও আয়াতে মুতাশাবেহ। মুহকামাত আয়াত সুস্পষ্ট, এবং মুতাশাবেহ আয়াত হলো সেইসব বিষয় সম্পর্কে আয়াত, যা মানুষের ভাষায় পরিপূর্ণরূপে প্রকাশ করা সম্ভব নয়, তাই রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন আল্লাহপাক সূরা নূরের ৩৫ নং আয়াতে একটি কাঁচপাত্রে রাখা প্রদীপের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার জ্যোতির উদাহরণ দিয়েছেন। কুরআনে এমন আরো অনেক বিষয় আছে, যার বাহ্যিক অর্থ গ্রহণ করা যাবে না, বরং সেসব আয়াতকে আধ্যাত্মিকভাবে উপলব্ধি করতে হবে।
ইবনে তাইমিয়্যা একেতো আল্লাহ তায়ালাকে শরীরি খোদা হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন, অপরদিকে যুগযুগ ধরে চলে আসা বেশকিছু প্রতিষ্ঠিত মুসলিম রীতিনীতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন। যেমন, নবী রাসূল, ওলি-আউলিয়া — কারো কবর বাঁধাই করা যাবে না, কোনো কবরের চিহ্ন রাখা যাবে না, নবী-রাসূল-ওলী-আউলিয়ার কাছে শাফায়াত চাওয়া যাবে না, ইত্যাদি। নবীজির কবর যিয়ারত করা, তার কাছে সাহায্য চাওয়া, ইদে মিলাদুন্নবী ইত্যাদিকে হারাম, বিদআত ও শিরক হিসেবে উপস্থাপন করেন তিনি।
অপরদিকে শিয়া মাযহাব প্রথম থেকেই শাফায়াতের কনসেপ্টে বিশ্বাসী হওয়ায় তারা নবীজির কবর ও বিভিন্ন ইমামের কবরকে বিশেষ গুরুত্ব সহকারে সংরক্ষণে বিশ্বাস করত। শিয়াদের হাতে বিভিন্ন ইমামের কবরকে কেন্দ্র করে মসজিদ মাদ্রাসাসহ দ্বীনি কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। তার ফতোয়া শিয়াদেরকে কার্যতঃ কাফির ঘোষণা করে। সুফিদের প্রতিও তিনি অনুরূপ কট্টর দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেন। মূলতঃ তাকফিরি চিন্তাধারা, অর্থাৎ নিজের বিশ্বাসের বাইরে অন্য সকলকে কাফির ঘোষণা করা — এটা ইবনে তাইমিয়ার হাতে সূচিত হয়।
“সালাফগণের (অর্থাৎ সাহাবী, তাবেয়ী, ও তাবে-তাবেয়ীগণের) চেয়ে আর কেউ ইসলাম ভালো বুঝতে পারেননি, বুঝতে পারে না, এবং ইসলামের ইন্টারপ্রিটেশান তাদের থেকেই নিতে হবে: — এজাতীয় অযৌক্তিক দৃষ্টিভঙ্গি তিনি সূচনা করে দিয়ে যান, যা পরবর্তীতে সালাফি মুভমেন্টে পরিণত হয়।
ইসলামকে শিরক-মুক্ত করতে গিয়ে তিনি ইসলামের মূল স্পিরিট, আধ্যাত্মিক চর্চার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। তার সুবিশাল ‘মাজমু আল ফাতওয়া’সহ আরো অসংখ্য বই আজকের ISIS এর ধর্মীয় রেফারেন্স। যেমন, শত্রুসেনা যদি সিভিলিয়ান এরিয়াতে প্রবেশ করে, তাহলে শত্রুদের হত্যা করতে সিভিলিয়ানদেরকেও হত্যা করা যাবে (!!)। এজাতীয় আরো অনেক চরমপন্থী, অমানবিক, অযৌক্তিক ও আধ্যাত্মিকতা বিবর্জিত রুক্ষ শুষ্ক “ইসলামী ফতোয়া” তিনি দিয়ে যান। পরবর্তীতে মুহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহহাব নজদী এগুলিকে পুনরুজ্জীবিত করেন।
ইবনে তাইমিয়া কোনো নতুন মাযহাব ঘোষণা করে যাননি, কিন্তু শিয়া, সুন্নি ও সুফিদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আধ্যাত্মিকতা বিবর্জিত এক রূক্ষ, শুষ্ক শরীরি খোদার ইসলামের তাত্ত্বিক ভিত্তি স্থাপন করে যান তিনি। বিভিন্ন মতবিরোধ সত্ত্বেও শিয়া, সুন্নি ও সুফিরা এযাবত পরস্পর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করে এসেছে। শিয়াদের উপর যে জুলুম যুগে যুগে চলে এসেছে, সে জুলুমের ভিত্তি সুন্নি বিশ্বাস ছিল না। বরং বরাবরের মতই জালিমরা এক জাতি ও মজলুমেরা এক জাতি। কিন্তু ইবনে তাইমিয়ার ফতোয়াসমূহ তাকফিরি চিন্তাধারার সূচনা করে: অর্থাৎ তার বিশ্বাস না মানলেই কাফির, মুশরিক ইত্যাদি, এবং (ক্ষেত্রবিশেষে) তাদেরকে হত্যা করা জায়েজ। এভাবে করে ইসলামের ঘরেই একটি চরমপন্থী অসহিষ্ণু ধারার সৃষ্টি হলো, পরবর্তীতে আলে সৌদের তেলের টাকায় যা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে এবং সুন্নি ইসলামকে গ্রাস করতে শুরু করে। একইসাথে এই তাকফিরি সালাফি মতবাদের প্রচারকেরা শিয়া-সুন্নি ধর্মতাত্ত্বিক দ্বন্দ্বকে অতি প্রকাশ্য রূপ দিয়ে রক্তপাতের দুয়ারে নিয়ে উপস্থিত করেছে।

মুহাম্মাদ বিন আবদুল ওয়াহহাব নজদী (১৭০৩-১৭৯২):

মুহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহহাব নজদী মূলতঃ ইবনে তাইমিয়ার চিন্তাধারাকে পুনরুজ্জীবিত করে অধিকতর রুক্ষ ও শুষ্ক রূপ দান করে সৌদ বংশের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে অস্ত্রের মুখে তার মতধারা বিস্তার ঘটান — ওহাবীজম বলে যা পরিচিত হয়। মুসলিম বিশ্বে কাজ করার জন্য নিযুক্ত ব্রিটিশ গুপ্তচর হ্যামফারের স্মৃতিকথায় যেভাবে এসেছে, তা মোটেও অসম্ভব নয় যে, সেই ব্রিটিশ গোয়েন্দাই তরুণ মুহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহহাবকে manipulate করে ইসলামের চরম বিকৃত এক version সৃষ্টিতে উদ্বুদ্ধ করেন।
বর্তমান সৌদি আরবের একাংশের শাসক মুহাম্মদ বিন সৌদের সাথে ১৭৪৪ সালে তিনি চুক্তিবদ্ধ হন যে, মুহাম্মদ বিন সৌদ অস্ত্রের মুখে তার রাজ্যবিস্তার ঘটাবে, এবং বিজিত অঞ্চলের উপর ওহাবী ইসলাম প্রয়োগ করে জনগণকে নিয়ন্ত্রণে রাখবেন মুহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহহাব। যদিও অস্ত্রের মুখে রাজ্যসীমা সম্প্রসার ইসলামের নীতি নয়, এবং মুহাম্মদ বিন সৌদের শাসন ইসলামী শাসন ছিল না, তবুও সেটাকে তিনি সমর্থন করেন “ধর্মগুরু” পদবী পাবার বিনিময়ে। স্বাভাবিকভাবেই অস্তশস্ত্র ও রাজকীয় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা মুহাম্মদ বিন সৌদের হাতে ছিল, অতএব রাজা ও রাজবংশের লোকেরা (তথাকথিত ইসলামী) আইনের ঊর্ধ্বে থেকে গেল, যা আধুনিক সৌদি আরবে আজ পর্যন্ত বিদ্যমান। আর নিজেদের পদমর্যাদা ও সবকিছুর জন্য রাজা বাদশাহর মুখাপেক্ষী থাকায় ওহাবী ধর্মগুরুরাও কখনো স্বাধীনভাবে সত্য কথা বলতে পারেনি, এখনও পারে না, এবং বলার প্রয়োজনও তারা বোধ করে না।
সৌদ বংশকে প্রথম থেকেই ব্রিটেন নানাভাবে সহায়তা দিয়ে আসছিলো ও নিজের প্রভাবাধীন রেখেছিলো, যা কিনা প্রকাশ্য রূপ লাভ করে প্রায় দুই শত বছর পরের এই ঘটনাগুলোর মধ্যদিয়ে:
১. ১৯২৪ সালে ব্রিটেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় আবদুল আজিজ বিন সৌদের হেজাজের (বর্তমান মক্কা-মদীনা) ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া,
২. ১৯১৭ সালের “ব্যালফোর ঘোষণায়” ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় ব্রিটেনকে বাধা না দেয়ার অঙ্গীকার করা,
৩. ১৯২৭ সালের “জেদ্দা চুক্তিতে” ব্রিটেনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা না করার অঙ্গীকারনামা প্রদান ও বিনিময়ে ব্রিটেন কর্তৃক সৌদি রাজতন্ত্রকে স্বীকৃতি দেয়া,
৪. ১৯৩২ সালে হেজাজের নাম পরিবর্তন করে সৌদ বংশের নামে “সৌদি আরব” রাখা এবং
৫. ১৯৪৮ সালে ব্রিটেনের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে অবৈধ ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও সৌদি আরবের নীরবতা।
১৭৪৪ সালে মুহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহহাব আলে সৌদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হবার পর থেকে আলে সৌদের শাসনাধীন অঞ্চল সালাফিজমকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ধারণ করে, যা বর্তমান সৌদি আরবেও বিদ্যমান। আলে সৌদ মক্কা-মদীনাসহ সংলগ্ন অনেকটা এলাকা অস্ত্রের মুখে দখল করে বর্তমান সৌদি আরবের বিশাল সীমানায় এসে থেমেছে; আর প্রথম থেকেই সেসব অঞ্চলের মুসলমানদের উপর চাপিয়ে দিয়েছে অমানবিক ওহাবী/সালাফি ইসলাম। রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে ১৯৭৩-এ তেলের দাম অনেক বেড়ে গেলে তেল বিক্রির মাধ্যমে আলে সৌদ প্রচুর অর্থ উপার্জন করে। বিশ্বের সকল মুসলমানের অধিকার যে অঞ্চলে, সেই অঞ্চল দখল করে তার তেল বিক্রি করে এখন পর্যন্ত নিজেদের পকেটস্থ করছে সৌদি রাজবংশ। যাহোক, এই তেলের টাকায় বিশ্বব্যাপী “ইসলাম প্রচারের মিশন” শুরু করে সৌদি আরব। অর্থাৎ বিকৃত ওহাবী/সালাফি মতবাদের সম্প্রসারণ: বিকৃত অনুবাদের কুরআন প্রিন্ট করে বিশ্বব্যাপী বিতরণ, বিভিন্ন ভাষায় ওহাবী চিন্তাধারাকে অনুবাদ করা, মিডিয়ার মাধ্যমে তুলে ধরা। এর ফলাফল হিসেবে বাংলাদেশের দিকে তাকান। মাত্র কয়েক যুগ পর আজকে ২০১৫ সালে অধিকাংশ সুন্নি মুসলমানই জানে না যে তারা সুন্নি, ওহাবী নয়। কিংবা যদিওবা নিজেদেরকে সুন্নি বলে জানে, কিন্তু মিডিয়ার কল্যাণে কার্যতঃ তারা ওহাবীজমকেই ইসলাম হিসেবে জানছে। সৌদি অবৈধ তেলের টাকায় টিভি, ইন্টারনেট ও প্রিন্ট মিডিয়ায় ওহাবীজম যে কিভাবে ক্যান্সারের মত ছড়িয়ে পড়ছে, তা বুঝানো বোধকরি একটি আর্টিকেলে সম্ভব নয়। তবে সৌদি আরবের মদীনা ইউনিভার্সিটি থেকে “ট্রেনিং” পেয়ে আসা নানান “মাদানী আলেম” (!?) যে সুন্নি নন, বরং ওহাবী, এজিদের উপর সালাম পাঠকারী জাকির নায়েক যে নিজেকে শিয়া-সুন্নি কিছু দাবী না করলেও কার্যতঃ ওহাবীজমের প্রচারক, এগুলি বুঝতে সহজ হবে যদি শিয়াইজম, সুন্নিইজম, ওহাবীজম/সালাফিজম ও সুফিজম — এগুলির মৌলিক পার্থক্য জানা থাকে।
শিয়ারা কাফির, সুফিরা বাতিল, একে হত্যা বৈধ, ওকে হত্যা বৈধ, মাজারে গমণকারীরা মুশরিক — এজাতীয় ফতোয়া দিয়ে মুহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহহাব নজদী সাদকায়ে জারিয়াহ না গুনাহে জারিয়াহ রেখে গিয়েছেন, তা আল্লাহ তায়ালাই বিচার করবেন; তবে প্রথমদিকে সৌদি রাজবংশের অস্ত্রের জোরে এবং পরবর্তীতে সৌদি আরবের তেলের টাকায় ওহাবীজমের ক্যান্সার বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে, এটা সুস্পষ্ট।
ওহাবী মতবাদ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনার অবকাশ এখানে নেই, কারণ তা ভিন্ন টপিকের আলোচনার বিষয়। পরবর্তী নোটে কুরআনের বিকৃত অনুবাদ ও ইসলামপন্থীদের কর্তৃক জেনেশুনে সত্য গোপনের বিষয়ে কিছু লিখব আশা করি।

Leave a Reply